১
মামুন সাহেব খানিকটা বিরক্তির সাথেই দাঁড়িয়ে গেলেন। এ পাড়ায় তিনি গত সপ্তাহে এসেছেন। এই এক সপ্তাহের মধ্যে এই পাগলটা আজ নিয়ে দ্বিতীয়বার তার রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে গেলো। তিনি পাগল সহ্য করতে পারেন না। ছোটবেলা হতেই পাগলের ব্যপারে তার এলার্জি আছে। ছোটবেলায় স্কুলে থাকাকালীন তাদের গ্রামে একজন পাগল ছিলো। সে পাগলটা অবশ্য খুব ভীতিকর ছিল না। সে শুধু সামনে এসে ঠা ঠা অট্টহাসি দিতো। কিন্তু শৈশবের সে দিনগুলোতে ঐ হাসিটাই তার জন্যে ভয়ানক ভয়ের ছিল।
এখন মামুন সাহেব নিজে মুর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন। এ পাগলটাকে অবশ্য ক্ষতিকর মনে হচ্ছে না। আগের দিনও সে রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে ছিল। কিছুক্ষণ পর সরে গিয়েছিল। সেদিন তিনি তেমন বিরক্ত হননি। কিন্তু আজ বিরক্তবোধ করছেন। একবার মনে হল, ধাক্কা দিয়ে সামনে থেকে সরিয়ে দেবেন। পরক্ষণেই মনে হল, কাজটা ঠিক হবে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। পাগলটা কিছু বলছেও না, আবার নড়ছেও না। তারপর ভাবলেন, চুপ করেই দাঁড়িয়ে থাকি। পাগলটাও দাঁড়িয়ে রইলো। কিছু বলছেও না। কিছুক্ষণ পর একজন মুরুব্বিগোছের লোক এসে পাগলটাকে বললো,
এই মাসুদ, সরে যা।
কথাটা শোনা মাত্রই পাগলটা সরে গেলো এবং মামুন সাহেবকে পাশ কাটিয়ে হন হন করে হেঁটে চলে গেলো। মামুন সাহেব বেশ অবাক হয়েই ঐ লোকটার দিকে তাকালেন। মামুন সাহেবকে লক্ষ্য করে লোকটা বলল,
ও কিছু করে না। শুধু সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। ওকে কেবল বলতে হয়, এই মাসুদ সরে যা। তাহলেই সরে যাবে।
ধন্যবাদ ভাই, আমি রীতিমতো চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম।
চিন্তার কিছু নেই ভাই। ও কারো কোন ক্ষতি করে না, কিছু বলেও না।
লোকটা কথাগুলো বলেই চলে গেলো।
মামুন সাহেব পাগল লোকটা মানে ঐ মাসুদ কোথায় যাচ্ছে, দেখার জন্যে পেছনে ঘুরেই চমকে গেলেন। মাসুদ তার পেছনে ঠিক তার দিকে ফিরেই তাকিয়ে আছে। একেবারে ঘাড়ের কাছে। তিনি এবার আতংকিত বোধ করলেন। কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,
এই মাসুদ সরে যা।
মাসুদ একপাশে সরে গিয়ে মামুন সাহেবকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। মামুন সাহেব ভয়ে এবার পেছনে তাকালেন না। যে পথে এসেছিলেন, সেই পথেই নিজের বাসার দিকে হেঁটে চললেন। কাছেই একটা মুদি দোকানে কিছু সদাই কেনার জন্যে বেরিয়েছিলেন। এখন মনে মনে ঠিক করলেন, তিনি যাবেন না। বাসার কাজের ছেলেটা, সোলায়মানকেই পাঠিয়ে দেবেন।
কি এক অদ্ভুত এলাকায় বাসা নিলেন ভাবতে ভাবতে বাসার দিকে হেঁটে চললেন। বাসা কাছেই। মিনিট খানেক হাঁটতেই বাসার সামনে পৌঁছে গেলেন। ভয়ে একবারও পেছনে ফিরে তাকাননি। কে জানে, তার পেছনেই হয়তো মাসুদ দাঁড়িয়ে আছে অথবা তার পেছনে পেছনে তার সাথে হেঁটে আসছে। দরজায় কড়া নাড়তেই সোলায়মান দরজা খুলে মামুন সাহেবকে দেখেই বলে উঠলো,
খালু, কিছু আনেন নাই? আপনে না ডিম কিনতে বাইরে গেলেন?
আর বলিস না। এক পাগলের পাল্লায় পড়েছিলাম।
কার কথা বলছেন? মাসুদ নাকি সেলিম?
মানে কি?
খালু এই পাড়ায় মোট চারজন পাগল আছে। মাসুদ, সেলিম ছাড়াও দুইজন আছে। শফিক আর বেলায়েত। এর মধ্যে তিনজনের সাথে আমার দেখা হয়েছে। শুধু বেলায়েতের সাথে এখনো দেখা হয় নাই। শুনছি বেলায়েতকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
কি বলিস? এই পাড়ায় এতো পাগল?
বললাম না, মোট চারজন খালু। তবে এরা সবাই খুব ভালো। কেউ কারো ক্ষতি করে না। এরা সারাদিন খালি এ পাড়ার রাস্তাগুলোতে হাঁটাহাঁটি করে।
মামুন সাহেব এখন অবশ্য বিরক্তিবোধ করছেন না। তার কেবল মনে হল, আহারে মাসুদ ছেলেটার বয়স কম। এই বয়সেই এই ছেলেটার এই অবস্থা! না জানি, তার বাবা মা কীভাবে দিন পার করছে, এই পাগল ছেলেকে নিয়ে।
২
রাতে কি খাবেন চিন্তা করেই ডিম আনতে গিয়েছিলেন। পরে সোলায়মান ডিম নিয়ে এলো। দুটো ডিম সিদ্ধ করে ভাত খেয়ে নিলেন। সোলায়মান ডাল রান্না করেছিলো। মামুন সাহেবের বয়স এখন পঁয়তাল্লিশ চলছে। বিয়ে থা করেননি। একা হাত পা ঝাড়া মানুষ। সোলায়মান তার সাথে বছর দুয়েক ধরে আছে। সেই সংসারের সব সামলায়। রান্না বান্না থেকে শুরু করে সবই করে সে।
সোলায়মানকে নিয়ে তিনি ভালোই আছেন। রাতে খেয়ে দেয়ে বাইরে হাঁটাহাঁটি করার অভ্যাস মামুন সাহেবের বহুদিনের। গতরাতেও তিনি বেরিয়েছিলেন। কিন্তু আজ বাইরে যেতে সাহস হচ্ছে না। এলাকায় পাগলদের কথা শুনে তিনি এখন ভাবছেন, দিনের বেলাতেই এরা যদি এরকম করে, রাতের বেলা এরকম ঘাড়ের উপর এসে দাঁড়ালে খুব একটা ভয়ের ব্যপার হয়ে যাবে।
সোলায়মানকে ডাকলেন। সোলায়মানের কোন সাড়া শব্দ নাই। আরেকবার ডাক দিলেন। নাহ, মনে হচ্ছে বাসাতেই নাই।
কোথায় গেলো ভেবে বাসার দরজা খুলে বিল্ডিং এর সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে সোলায়মান বলে ডাক দিলেন। সোলায়মানের গলার শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু জবাব দিচ্ছে না কেন? ভাবতে ভাবতে নিচতলায় সোলায়মানকে দেখেই ভয় পেয়ে গেলেন। সোলায়মান বিল্ডিং এর নিচ তলায় ঐ মাসুদের সাথে হেসে হেসে গল্প করছে। একবার ভাবলেন, সোলায়মানকে আবার ডাক দেবেন। নাহ, দরকার নেই, ভেবে উল্টো ঘুরে পা টিপে টিপে দোতলায় নিজের ঘরে এসে বসে রইলেন। সোলায়মান আসুক, ঐ মাসুদের সাথে কী আলাপ করলো, জানতে হবে। তিনি অবাক হয়ে ভাবছেন, সোলায়মান এতো স্বাভাবিকভাবে মাসুদের সাথে গল্প করছে কিভাবে?
কিছুক্ষণ পর সোলায়মান ঘরে ফিরতেই মামুন সাহেব তাকে ডাক দিলেন। সোলায়মান মুখ হাসি হাসি করে রুমে আসতেই মামুন সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,
তুই ঐ পাগলের সাথে কী কথা বলছিলি? তোর ভয় করলো না?
না খালু। আমি পাগল ভয় পাই না। পাগলরা ভালো মানুষ।
পাগলদের তুই ভয় পাস না, কী বলিস?
জ্বি খালু। আমি জানি, কীভাবে তাদের সাথে কথা বলতে হয়।
তুই কীভাবে জানিস?
এমনিই খালু।
এমনিই কীভাবে? আসলে খালু আপনার কাছে আসার আগের চার বছর আমি নিজে পাগল ছিলাম। এখন আমি ঠিক হয়ে গেছি।
কথাটা শুনেই মামুন সাহেব আতংকিত হয়ে গেলেন। তিনি এখন সোলায়মানকেই ভয় পাচ্ছেন। সোলায়মানের মুখের দিকেও তাকালেন না। সোলায়মান বলল,
খালু খাওয়াদাওয়া শেষ হইছে। এখন ঘুমান। বলেই পাশের রুমে চলে গেলো সোলায়মান।
মামুন সাহেব রীতিমতো চিন্তায় পড়ে গেলেন। তার মনে কেবল একটাই প্রশ্ন এলো, সোলায়মান তাকে এতদিন বলেনি কেন যে সে পাগল ছিল। অবশ্য কেউতো নিজে যেচে এ কথা বলবে না। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হল, সোলায়মান কীভাবে জানলো যে সে নিজে পাগল ছিল? পাগল লোক তো নিজে বোঝে না যে সে পাগল। একটা অস্বস্তি যেন তাকে ঘিরে ধরেছে। আজ রাতে তার আর ঘুম হবে না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে তিনি পাশের জানালা দিয়ে বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সোলায়মানকে নিয়ে কী করবেন ভাবছেন? সোলায়মান মানুষ হিসাবে ভালো, কিন্তু যখন শুনলেন সে একসময় পাগল ছিল, তাকে নিয়ে এখন আলাদা করে চিন্তা করতে হবে।
মামুন সাহেব এই এলাকায় একটা স্কুলে চাকুরী নিয়েছেন। সে জন্যেই এখানে এসেছেন। তার বাড়ি নীলফামারী। এতদিন নিজের জেলায় নিজের গ্রামের পাশেই একটা স্কুলে চাকুরী করতেন। সে চাকুরীটা ছেড়ে এখন এখানে এসেছেন। এ স্কুলটা একটি প্রাইভেট স্কুল। এটি স্থানীয় একজন ধনী লোক তার মায়ের নামে এ স্কুলটা প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনিই বিভিন্ন এলাকা হতে ভালো শিক্ষকদেরকে এখানে আনাচ্ছেন। কারণ তিনি চাচ্ছেন, এ স্কুলটা যে অত্র এলাকাতে ভালো স্কুল হিসেবে পরিচিতি পায়। মামুন সাহেব ক্লাস নাইন টেন এ অংক পড়ান। আজ জুন মাসের ২৭ তারিখ। জুলাই মাসের এক তারিখে এ স্কুলে তার জয়েনিং। থাকার জায়গা ঠিক করতে হবে চিন্তা করে এখানে দশ বারো দিন আগেই চলে এসেছেন।
এসব ভাবতে ভাবতে তার হঠাৎ মনে হল, পাগল মানুষেরা অংকে কেমন? নিজের মনে প্রশ্নটা আসতেই তিনি বিছানাতে উঠে বসলেন। কোন পাগল অংক করতে পারে কিনা, সেটি তার মনে আসছেনা। তবে যারা গণিতজ্ঞ ছিলেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ পাগলামি করেছেন বা খ্যাপাটে হয়ে ভয়ানক কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছিলেন। লুদ্ভিগ বোলৎসম্যান নামের একজন গণিতবিদ স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেকানিক্সে প্রোবাবিলিটির উপর বেস করে এটমিক বিহেভিয়র বর্ণনা করেছিলেন। তিনি সবসময় হতাশায় ভুগতেন। তার আরও নানা রকম মানসিক সমস্যা ছিল। তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। অবশ্য এই বোলৎসম্যান সাহেবকে সম্ভবত পাগল বলা যায় না। আরও একজন গণিতবিদ পল এথ্রেনফেস্ট, যিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর সাথে স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেকানিক্স এর রিলেশন নিয়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন। তিনিও আত্মহত্যা করেছিলেন। মামুন সাহেবের হঠাৎ চিন্তা হল, এরা আত্মহত্যা করা মানেইতো উনারা পাগল ছিলেন না। তিনি আরও মনে করার চেষ্টা করলেন, নাহ, পাগলগোছের কোন গণিতবিদের কথা তিনি মনে করতে পারছেন না। তবে ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছেন যে, খুব বিদ্বান লোকদের মাঝে কিছু পাগলামি থাকে। রাতের নির্জনতার মধ্যে তার বিভোর হয়ে ভাবনাতে হঠাৎ ছেদ পড়লো। কে যেন কথা বলে উঠেছে। শব্দ কানে যেতেই তিনি লাফ দিয়ে উঠে বসলেন। তার একবার মনে হল সোলায়মান কথা বলছে। বিছানায় বসে কান খাড়া করে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। নাহ, কোন শব্দ নেই। তার মনে হল, তিনি ভুল শুনেছেন। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়েই চমকে গেলেন। রাত দুটো বেজে গেছে। ঘুমিয়ে পড়া দরকার।
ঘুমুতে যাবার আগে কেন যেন তার বোলৎসম্যান এর কথা মনে পড়লো। মন থেকে তার নামটা তাড়াতে চাইলেন তিনি। মনে হল পারছেন না। আবার চেষ্টা করলেন। মনকে স্থির করার জন্য ভেড়া গুনতে শুরু করলেন। একশ থেকে এক পর্যন্ত গুনে দেখলেন, ঘুম আসছে না, এবার তিনি আটশত থেকে এক পর্যন্ত গুনতে শুরু করলেন।
৩
খালু, খালু। কে যেন ডাকছে তাকে। চোখ মেলে তাকিয়েই দেখলেন সোলায়মান বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
উঠবেন না, খালু? দশটা বাজে।
ওহ, এতো দেরী হয়ে গেছে। বলেই উঠে বসলেন মামুন সাহেব। একা একা থাকার এটা একটা স্বাধীনতা। ইচ্ছেমত ঘুমানো যায়। সোলায়মান বলল,
আপনি হাত মুখ ধুয়ে নিন। আপনাকে চা দিচ্ছি। বলে সে রুম থেকে চলে গেলো।
চা খেয়ে তার মনে হলো একবার বাইরে থেকে হেঁটে আসবেন। গতকালের কথা তিনি মাথাতেই আনলেন না। বাসা থেকে বেরিয়ে কিছুদূর এগোতেই আচমকা রাস্তায় মাসুদকে দেখেই তার মনে হলো, ভুল হয়ে গেছে। বাসা থেকে বের হওয়াটাই উচিৎ হয়নি। মাসুদ তার মুখোমুখি এসে পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে। একটু সাহস করে তিনি মাসুদকে বললেন,
এই মাসুদ, সরে যা।
মামুন সাহেব অবাক হয়ে দেখলেন, মাসুদ নিজের জায়গা থেকে একচুলও সরলো না। বরং মাসুদ তাকে উদ্যেশ্য করে বলে উঠলো,
এনট্রপি তো একটা ম্যাথম্যাটিক্যাল টার্ম। এর ব্যখ্যাটা আমি ভুলে গেছি।
প্রশ্নটা শুনে মামুন সাহেব ভীমড়ি খেলেন। মাসুদকে তিনি মনে করেছিলেন যে, সে কথা বলে না। তার বরং অবাক লাগছে, মাসুদ তাকে একটা কঠিন প্রশ্ন করে ফেলেছে। এনট্রপি তার পরিচিত একটা শব্দ। কিন্তু ঠিক এখনই তার সম্পর্কে কিছুই মনে আসছে না। নিজের উপর ভয়ানক বিরক্ত হয়ে গেলেন মাসুদ সাহেব।
পারলেন না, স্যার? মাসুদ তাকে স্বাভাবিক মানুষের মতো করে জিজ্ঞেস করলো।
নাহ, মনে পড়ছে না।
আপনি না অংকের শিক্ষক? বলেই মাসুদ তাকে পাশ কাটিয়ে হেঁটে চলে গেলো।
মামুন সাহেবের মন খারাপ হয়ে গেলো। তিনি বাসায় ফিরে এলেন। তার মাথায় এখন এনট্রপি শব্দটা ঘুরছে। বাসায় সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে তার মনে পড়ে গেলো, আরে এই এনট্রপি তো একটা গাণিতিক রাশি, যার কথা ঐ বোলৎসম্যানও বলেছিলেন। সময়মত মনে পড়লে তিনি মাসুদকে এটা ব্যখ্যা করে বলতে পারতেন। তার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। ছেলেটা পাগল হলেও বোধহয় শিক্ষিত ছেলে। নইলে এই শব্দটা সে জানলো কেমন করে?
সোলায়মান দরজা খুলেই বলে ফেলল,
খালু, আজকেও কি মাসুদের সাথে দেখা হয়েছে?
তিনি কোন জবাব দিলেন না। তার কেন যেন ভাল্লাগছে না। তিনি রুমে গিয়ে চুপচাপ ভাবতে লাগলেন, মাসুদ এ শব্দটা কোথা থেকে জেনেছে?
তারপরই তার মনে হল, আচ্ছা তিনি যখন রাস্তায় বের হন, তখন রাস্তায় কোন লোক থাকে না কেন? অবশ্য গতকাল একজন লোক ছিল। আর মাসুদ এই রাস্তা খালী থাকলেই তার সামনে আসে কেন? এই মাসুদ আসলে কে? মাসুদ সম্পর্কে না জেনে অবশ্য তাকে নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা যাবে না।
তিনি ঘরের একা একা পায়চারী করতে করতে এনট্রপি নিয়ে ভাবতে লাগলেন। এনট্রপির বিস্তারিত মনে করার চেষ্টা করলেন। হ্যাঁ, হ্যাঁ, কিছু কিছু মনে পড়ছে, সব ঠিক আছে
এনট্রপি একটি প্রাকৃতিক রাশি। এটি বস্তুর একটি ভৌত ধর্ম। এটিকে পরিমাপ করা যায় না। এনট্রপি ইজ এ মিজার অব ডিজর্ডারলিনেস। এনট্রপি বৃদ্ধি পেলে বস্তু শৃঙ্খলা অবস্থা থেকে বিশৃঙ্খল পরিণত হয়। বিশ্বের এনট্রপি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রকৃতির সকল ভৌত অথবা রাসায়নিক ক্রিয়া এমনভাবে সংঘটিত হয় যার ফলে সার্বিক ব্যবস্থার এনট্রপি বৃদ্ধি পায়। সীমায়িত ক্ষেত্রে একটি প্রত্যাবর্তী প্রক্রিয়ার এনট্রপি অপরিবর্তিত থাকে।
এনট্রপি নিয়ে বিড়বিড় করে বলেই যাচ্ছেন মামুন সাহেব।
৪
ডক্টর রাসেল খুব গম্ভীর মুখে বিছানায় শোয়া রোগীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার পাশে মাঝবয়েসী একজন লোক দাঁড়িয়ে আছেন। মাঝবয়েসী লোকটা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলেন,
আপনি মামুন স্যারকে বিছানার সাথে বেঁধে রেখেছেন কেন?
মঝে মাঝে সিভিয়ার হাইপার হয়ে যাচ্ছেন তিনি। অন্য রোগীরা ভয় পেয়ে যাচ্ছে বলে এভাবে রেখেছি। ডাক্তার জবাব দিলেন।
উনাকে আপনারা ছাড়বেন কবে?
একটু সময় লাগবে। উনার মেন্টাল হেলথ কন্ডিশন মোটেই ভালো না। অদ্ভুত অদ্ভুত টার্মিনোলজি নিয়ে কথা বলেই যাচ্ছেন ক্রমাগত। পাশাপাশি ভিজ্যুয়াল হেলুসিনেশনতো আছেই। বিভিন্ন কাল্পনিক বা অদৃশ্য ক্যারেক্টার এর সাথে কথা বলে যাচ্ছেন। ঘুমাচ্ছেনও খুব কম।
কার কার সাথে কথা বলে? কারো নাম কি বুঝতে পেরেছেন?
হ্যাঁ, সোলায়মান নামে উনার একটা ক্যারেক্টার আছে। এই সোলায়মান মনে হয় সারাক্ষণ উনার সাথেই থাকে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি ক্যারেক্টার আছে। ডাক্তার বললেন।
মাঝবয়েসী লোকটা আর কিছু বললো না। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
ওহ, ভিজিটিং আওয়ারতো শেষ। আজ যাই, ডাক্তার সাহেব।
আচ্ছা, ঠিক আছে।
পুনশ্চ
মাঝবয়েসী লোকটি হাসপাতালের বাইরে এসে দাঁড়াতেই তার পকেটের মোবাইল ফোনটি বেজে উঠলো। লোকটি ফোন রিসিভ করতেই অন্যপাশ হতে কেউ জিজ্ঞেস করলো,
সোলায়মান ভাই বলছেন?
জ্বি বলছি।
ভাই, আমি শাহজাহানপুর থেকে বলছি। আমাদের এখানে একজন অংকের শিক্ষক পেয়েছি। একা থাকে।
আচ্ছা, আমি আপনার এলাকায় আসতেছি। লোকটাকে দেখতে হবে।
বলেই ফোনটা পকেটে রেখে বিড়বিড় করে সোলায়মান বলল, পৃথিবীতে সকল অংক শিক্ষককে পাগল বানিয়ে ফেলবো আমি। বলেই মুচকি হাসি দিলো সোলায়মান।
(এ গল্পটি আমার অপ্রাকৃত গ্রন্থ থেকে নেয়া। )