Story

শিল্পী

October 2, 2026

10 views

১

ঘুম থেকে উঠেই বারান্দায় এসে দাঁড়ালো শফিক। চারপাশে চোখ পড়তেই অবাক হয়ে গেলো, রাতে বৃষ্টি হয়েছে। সে টেরই পায়নি। দোতলার বারান্দার লাগোয়া আম গাছটার সবগুলো পাতা এখনো ভিজে আছে। সূর্যের আলো ভেজা পাতাগুলোকে যেন আরও সজীব করে দিয়েছে। সবুজ রঙ এত গাঢ় হতে পারে! তার মনে হলো, এতোটা প্রাঞ্জল সবুজ রঙ বহুদিন চোখে পড়েনি। বারান্দা থেকে চারপাশে ঢাকা শহরের দালান ছাড়া বিশেষ কিছু দেখা যায় না। এ বাসাটা খানিকটা পুরনো, এজন্য এর সামনে কিছু জায়গা আছে, সে জায়গায় কয়েকটা গাছও আছে। পৃথিবীর রঙ যেটুকু এখানে বসে দেখা যায়, সেটি হলো এই বাড়ির কয়েকটা গাছ। আর বাকী সব কৃত্রিম, প্রকৃতিকে হত্যা করে সেসব বানানো হয়েছে। এক কাপ চা হলে মন্দ হতো না। রুমের ভেতর দিয়ে হেঁটে রান্নাঘরে গিয়ে ইলেকট্রিক হিটারে পানি গরম করে নিজে নিজে চা বানিয়ে এনে আবার বারান্দায় বসতেই শফিকের মনে পড়লো, আজ শাহবাগ যাবার কথা আছে বিকেলে। পরক্ষণেই মনে হলো, সে যাবে না। কোলাহল ভালো লাগছে না ইদানীং। শাহবাগ না গিয়ে সারাদিন এ বারান্দায় বসে থাকা অনেক ভালো।
চা শেষ হতেই কাপটা নিয়ে রান্নাঘরে রেখে আসতেই মোবাইলের রিং শুনতে পেয়ে বিছানা থেকে মোবাইলটা হাতে নিতেই দেখলো, মিসেস লতিফা ফোন করেছেন।
কলটা রিসিভ করেই বললো, আসসালামু আলাইকুম।
ওপাশ থেকে মিসেস লতিফা বললেন, কেমন আছ শফিক? তুমি গত পনের দিন আমাকে ফোন করোনি।
শফিক কি বলবে ভেবে পেলো না। তবু বললো, না ফোন করতাম। কিন্তু করি করি করেও ফোন করা হয়নি।
আমি ভেবেছিলাম আজ আমি নিজে তোমার বাসায় চলে আসবো।
কথাটা শুনেই শফিক মনে মনে প্রমাদ গুনলো।
তোমার পকেটের কি অবস্থা? ওপাশ থেকে মিসেস লতিফা জিজ্ঞেস করলেন।
শফিক কিছুটা আমতা আমতা করে বললো, এই আছি, আরকি।
বুঝতে পেরেছি। ঠিক আছে, আমি এখন রাখছি। পরে তোমার সাথে আবার কথা হবে।
বলেই তিনি লাইনটা কেটে দিলেন। শফিক ফোনটা কানে রেখেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। কান থেকে ফোন নামাতে না নামাতেই ফোনে টুং করে একটা আওয়াজ হলো। সে জানে, কী হয়েছে। মিসেস লতিফা তাকে টাকা পাঠিয়েছেন। গত তিন মাসে একটা ছবিও বিক্রি হয়নি তার। গ্রিনরোডের এক গলিতে দুই রুমের একটি বাসা নিয়ে থাকছে সে। এক রুমে সে থেকে, অন্য রুমটা তার স্টুডিও। গত তিন মাস ধরে মিসেস লতিফা তাকে টাকা পাঠাচ্ছেন। নইলে ঢাকায় থাকাটাই মুশকিল হয়ে যেত তার এতদিনে।
বছর পাঁচেক আগে মিসেস লতিফা তার দুটো পেইন্টিংস কিনেছিলেন। তখনই তার সাথে পরিচয়। একা মহিলা, স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ হয়ে যাবার পর নিজেই পৈত্রিক ব্যবসার হাল ধরেছেন। তাকে ধনকুবের বললেও কম বলা হবে। প্রায়শই শফিককে এটা ওটা উপহার দেন। এমনকি শফিকের বর্তমান মোবাইল ফোন সেটটাও তারই দেয়া। মোবাইল সেটটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো শফিক। মোবাইলটা হাত থেকে বিছানায় নামিয়ে রেখেই পাশের রুমের দিকে পা বাড়ালো। আজ তিনদিন হলো সে স্টুডিওতে ঢুকছে না। কেন যেন ক্যানভাসের উপর সে ভয়ানক অভিমান করে আছে। তার কেবলই মনে হচ্ছে নিজের সক্ষমতার সবটুকু দিয়েই সে চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুই মনোমতো হচ্ছে না।
তিন দিন না যাওয়াতেই যেন মনে হলো, স্টুডিওটা তার খানিকটা অচেনা হয়ে গেছে। যা কিছু আমাদের চেনা, সেগুলোর সাথে প্রতিদিন সময় কাটাতে হয়। নইলে চেনা মানুষ, চেনা জিনিসও দিনে দিনে অচেনা হতে থাকে। চেনা মানুষও দীর্ঘদিনের না দেখায় অচেনা হয়ে যায়, কথাটা মনে হতেই শিউলির কথা মনে পড়লো। শিউলিকে বহুদিন দেখে না। জামালপুরে তাদের বাড়ির পাশের বাড়িতে শিউলি থাকতো। ঢাকায় এসে চারুকলায় ভর্তি হবার আগ পর্যন্ত শিউলির সাথে প্রতিদিন দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। নিজের হাতের তালুর মতো চেনা মানুষ ছিলো সে। দুজনে দুজনকে পছন্দ করতো। সেটি হয়তো পছন্দের মাত্রার ভেতরেই ছিলো, তার বেশি কিছু নয়। তবু কিছু মানুষ পছন্দের সীমারেখার বাইরেও কেমন করে যেন বুকের ভেতর একটা অন্যরকম জলছাপ রেখে যায়। সে জলছাপ থেকে যায় চিরদিনের জন্য। মাঝে মাঝে সে জলছাপ চারপাশকে ছাপিয়ে নিজে উজ্জ্বল হয়ে নিজের অস্তিত্বের কথা জানান দেয়।  জলছাপ তখন জিজ্ঞেস করে, আমাকে বুকের ভেতর পুষে রেখেছ কেন? শিউলি এখন কেমন আছে? বছর দুয়েক আগে তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো, সেটুকু পর্যন্ত সে জানে, তারপর আর জানে না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুমের চারদিকে তাকালো শফিক। সে দীর্ঘশ্বাসটা স্টুডিওর জন্য নাকি শিউলির জন্য, সেটা সে নিজেও জানে না।
২

বনানীতে একটা অফিসে এসেছে শফিক। এ অফিসের বসের সাথে দেখা করার জন্য ঘণ্টা দুয়েক ধরে বসে আছে সে। এ লোকটি শফিকের কয়েকটা পেইন্টিংস কিনেছিলেন। তার কাছে এসে নতুন আঁকা ছবিগুলো দেখাবে সে, এ আশায় এসেছে। ভেতরে কীসের একটা মিটিং হচ্ছে। তার জন্যেই দুই ঘণ্টা বসে থাকা। বাসা ভাড়া বাকী পড়েছে। পকেটের অবস্থা ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর সপ্তাহখানেক পর খাবারের টাকাও থাকবে না।
প্রায়ই শফিকের মনে হয় ছবি আঁকার কাজ আর করবে না। ছোটখাট একটা  চাকুরী যোগাড় করতে পারলে জীবনকে চালিয়ে নিতে পারবে সে। দিনে দিনে শিল্পী হবার স্বপ্নটা ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে। নিজের উপর নিজে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে সে। গত ছয়মাস ধরে যে ছবিগুলো এঁকেছে, সেগুলো বিক্রি করার জন্য চেনাজানা লোকদের ফোন করতেও সে দ্বিধাবোধ করছে। শফিকের কেবলই মনে হচ্ছে, হাতের তুলি তার কথা শুনছে না। ছবি আঁকার সময় সে ক্রমাগত তুলির সাথে কথা বলতে থাকে। তুলিকে সে নিজেও বিভিন্ন জিনিস নিয়ে প্রশ্ন করে। তুলিকে সে এও জিজ্ঞেস করে, এ জায়গাটায় বাদামী রংটা আরেকটু ফ্যাকাসে হলে কি ভাল হয়? তুলি নিজের মতো করে ক্যানভাসে রঙ এর ছোপে রঙ মেখে জবাব দেয়। কিন্তু গত ছয়মাস ধরে শফিকের মনে হচ্ছে, তুলিগুলো তার কথা শুনছে না।
এই অফিসের মিটিং শেষ হয়েছে। ভেতর থেকে একজন এসে শফিককে বললো, আপনি আসুন। বস আপনাকে ডেকেছেন।
৩

দশটা বনরুটি কিনেছে শফিক। সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের ভেতর একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে সে। তাকে দেখে একটা কুকুর এগিয়ে এসে তার পায়ের কাছে বসে পড়লো। সন্ধ্যা নেমে গেছে। আধো অন্ধকারের একটা প্রলেপ নেমে এসেছে চারপাশে। বনানীর অফিসের ওই বস তার দুটো ছবি পছন্দ করেছেন। তাকে অগ্রিম কিছু টাকাও দিয়েছেন। টাকাগুলো নিয়েই বাসায় গিয়ে ভাড়ার টাকা শোধ করেছে। তারপর সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে চলে এসেছে। একে একে আরও তিনটে কুকুর এসে বসে পড়েছে তার পায়ের কাছে। হাতের পলিথিনের ব্যগ হতে পাউরুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে কুকুরগুলোর দিকে এগিয়ে দিচ্ছে সে। কোন প্রকার শোরগোল না করে নীরবে কুকুরগুলো পাউরুটির টুকরো মুখে দিচ্ছে। শফিকের মনে হলো, আর সব জীব জানোয়ার খাবারের সময় নীরব থাকে। মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা সবসময়েই হট্টগোল করে। পাউরুটিগুলো শেষ হতেই শফিক গাছটার নিচে বসে পড়লো। কুকুরগুলো তার সামনে চুপ করে বসে আছে। পকেটের মোবাইলটা বেজে উঠতেই দেখে মিসেস লতিফা কল করেছেন। কলটা রিসিভ করতেই ও পাশ থেকে মিসেস লতিফা বলে উঠলেন,
তুমি এখন কোথায়?
সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে।
এর মানে তোমার আজ ছবি বিক্রি হয়েছে?
হ্যাঁ।
কুকুরগুলো এসেছে?
হ্যাঁ।
ওপাশে খানিকটা নীরবতা। এবার শফিক জিজ্ঞেস করলো, আপনি কেমন আছেন?
নিঃসঙ্গ মানুষকে এ কথাটি জিজ্ঞেস করতে নেই শফিক। আচ্ছা, এখন কি আকাশে চাঁদ আছে?
নাহ, দেখা যাছে না। তবে তারা আছে, অনেক তারা।
ঠিক বলেছ। আমি এখন ছাদে। আকাশে অনেক তারা আজ। তারার আলো দেখতে ভালোই লাগছে।
কথাটা শুনে শফিক মুচকি হেসে বলল, সে আলোর কোন মূল্য নেই। এই আলো হাজার লক্ষ বছরের পুরনো। এটি অতীতের আলো। তারার আলোকে তাই কেউ মূল্য দেয় না।
আমি কি তোমার কাছে তারার আলোর মতো কেউ?
মিসেস লতিফার এ প্রশ্নের জবাব কী দেবে, ভেবে পেলো না শফিক।
ও পাশ থেকে মিসেস লতিফা এবার বললেন, আধ ঘণ্টা পর জাদুঘরের সামনে আমার গাড়িটা থাকবে। সেটিতে উঠে আমার কাছে চলে আসো।
এখনতো রাত হয়ে গেছে।
তুমি আজ আমার কাছে থাকবে। আমি তুমি আজ একসাথে থাকতে চাই। চলে এসো।

৪
জামালপুরে নিজের বাড়িতে একটা স্টুডিও বানিয়েছে শফিক। যে ঘরে স্টুডিও, সেটির সামনে উঠোনে খালী গায়ে লুঙ্গী পরে মাটিতে বসে আছে শফিক। দুটো কুকুর তার পায়ের সামনে বসে আছে।  ডান হাতে রঙ মাখা তুলিটা নিয়ে সেটি নাড়িয়ে নাড়িয়ে একটা কুকুরকে জিজ্ঞেস করলো,
তুই বড় বেশী ঘেউ ঘেউ করিস। আমার কাজে বিরক্ত করিস। চুপচাপ থাকবি, নইলে তোকে এ বাড়ি থেকে বের করে দেব।
সে কুকুরটা দুবার মাথা উপর নীচ করে কুঁই কুঁই আওয়াজ করলো। শফিক এবার তার হাতের তুলির দিকে তাকিয়ে বললো,
আজ আকাশটা দেখেছিস?
তুলি জবাব দিলো, হ্যাঁ দেখেছি।
ঠিক এরকম একটা আকাশ লাগবে ক্যানভাসে।
তুলিকে মনে হলো, মাথা তুলে একমনে আকাশ দেখছে এখন। শফিকও আকাশের দিকে তাকালো। আকাশের দিকে তাকিয়েই মিসেস লতিফার কথা মনে পড়লো তার, সেদিন সে মিসেস লতিফার কাছে যায়নি। বরং সোজা মহাখালীতে গিয়ে বাসে চড়ে বাড়ি চলে এসেছিলো। পরদিনই জেনেছিল মিসেস লতিফা আত্মহত্যা করেছেন। মৃত্যুর আগে উইলে শফিককে ঢাকায় একটা ফ্ল্যাট দিয়ে গেছেন।

এটি জানার পর শফিক কেন যেন আর কোনদিন ঢাকায় যায়নি, সেও আজ অনেক বছর। প্রায় দুই যুগ হয়ে গেছে।

(গল্পটি আমার লেখা মেহেরজান গল্পগ্রন্থ থেকে নেয়া)

Picked up where you left off

Comments

sayed mahmud was this story’s first reader

+20 XP

    Please login to post comment. Login

  • sayed mahmud 4 hours ago First reader

    একজন শিল্পীর আত্মসম্মানবোধকে অনেকেই হয়ত অহংকার ভাবে। গল্পের প্রোটাগনিস্ট এর আত্মসম্মানবোধের সুন্দর চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। সুন্দর গল্প।