Story

খড়ের গাদা

October 2, 2026

9 views

১

খালেক মাষ্টার তার বাড়িতে চুপচাপ বসে আছেন। এখন কোন কাজ নেই। স্কুলে যেতে হচ্ছে না। দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্প বসিয়েছে ঐ হাই স্কুলে। সেই থেকে এলাকায় থমথমে অবস্থা।
পাকিস্তানি আর্মিরা এখানে ক্যাম্প তৈরী করার পর হতে এলাকায় অরাজকতা শুরু হয়েছে। মাঝে মাঝেই পাকিস্তানিরা টহলে বেরোয়। যখন যে গ্রামে যাচ্ছে সেখানেই তারা ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাচ্ছে। লুটপাট, লোকজন মেরে ফেলা, মেয়েদের তুলে নেয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এর পাশাপাশি এলাকায় একটা রাজাকার বাহিনী তৈরী হয়েছে। এরা পাকিস্তানিদের ইনফর্মার হিসাবে কাজ করছে আর এলাকায় লুটপাট করে বেড়াচ্ছে।
পাকিস্তানিরা আসার পর খালেক মাষ্টারের এখনো তেমন কোন সমস্যা হয়নি। তাকে দুবার ডেকেছিলো ক্যাম্পে। ক্যাম্প কমান্ডার তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলো। সেখানে তাকে অল্প কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। খালেক মাষ্টার জানতেন পাকিস্তানিরা তাকে কিছু করবে না। তার বড় ভাই জামাল চেয়ারম্যান থানা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে পাকিস্তানিরা তার বড় ভাইকে সম্মান করে, ক্যাম্পেই গেলে বিশেষ খাতির করে। খালেক মাষ্টার তার বড় ভাইয়ের এই শান্তি কমিটিতে যাওয়াটা পছন্দ করেনি। কিন্তু উপায় নাই, বড় ভাইকে খালেক মাষ্টার যমের মতো ভয় পায়। ছোটবেলায় বাবা মা মারা যাবার পর এই বড় ভাইয়ের কাছেই সে বড় হয়েছে। একদিন কথায় কথায় সাহস করে বড়ভাইকে সে বলেছিলো,
ভাইজান, এইগুলোতে না গেলে হতো না? আপনি শান্তিকমিটিতে গেলেন, কাজটা কি ঠিক হলো?
এ কথার জবাবে খালেক মাষ্টারকে তার বড় ভাই যা বলেছিলো, তা সে ভুলতে পারেনি। বড় ভাইয়ের এক কথা, পাকিস্তান দেশটাকে ভেংগে ফেলার ষড়যন্ত্র করছে ইন্ডিয়া। তার মুক্তিযুদ্ধের নামে দেশে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ট্রেনিং দিয়ে দেশের ভিতরে অস্থিরতা তৈরী করছে। দেশের অখন্ডতা বজায় রাখার স্বার্থে সবারই এখন পাকিস্তানি আর্মির সাথে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে হবে। সবার উপরে দেশ, পাকিস্তানি আমার দেশ।
খালেক মাষ্টার মনে মনে বেশ অবাক হয়েছে কথাগুলো শুনে। অখন্ড পাকিস্তানের ইস্যুতে বড় ভাইয়ের কথাগুলোয় হয়তো তার নিজস্ব ব্যাখ্যাভিত্তিক যুক্তি আছে, কিন্তু পাকিস্তানি আর্মি যা করে বেড়াচ্ছে, সেটা যতোটা দেশের সার্বভৌমত্বের স্বার্থে, তার চেয়ে বেশী মনে হয়েছে পাকিস্তানিরা এখানে অত্যাচার, জুলুম এবং খুনখারাবী করার জন্যেই এসেছে। ইলেকশনের ফলাফলটা মেনে নিলেই এতো সমস্যা হতো না। পশ্চিম পাকিস্তানিদের ক্ষমতালিপ্সু মনোভাব এবং গোঁয়ার্তুমির জন্যেই এই খুন খারাবী শুরু হয়েছে। তাছাড়া মার্চ মাসে পাকিস্তানি আর্মি ঢাকায় যে হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে, অন্তত ওই রাতের ঘটনার এখন একটাই জবাব হতে পারে, পাকিস্তানের সাথে আর নয়। সব মিলিয়ে তার এখন মনে হচ্ছে বিচ্ছিন্নতাবাদী নয়, স্বাধীনতার জন্যেই এখন লড়াই হচ্ছে। দেশে মুক্তিবাহিনী যা করছে, সেটাই সঠিক কাজ হচ্ছে। এই ভূখন্ডকে পাকিস্তানিরা নিজেদের ভূখন্ড বলে দাবী করার অধিকার হারিয়েছে। এই ভূখন্ড স্বাধীন হবে, আলাদা একটি দেশ হবে। নতুন দেশ হবে।
বাড়িতে অলস বসে বসে সারাদিন এসব নিয়েই ভাবেন খালেক মাষ্টার। বাইরেও বেরোন না। এখন সময়টা খারাপ। স্কুলে অংকের শিক্ষক হিসাবে তার আলাদা একটা নাম আছে। ক্লাস নাইনে অংক পড়ান তিনি। বাড়িতে একা একা বসে বসে মাঝে মাঝে ক্লাস নাইন টেনের অংক বই নিয়ে নাড়াচাড়া করেন। সময় কাটানোর জন্য ক্লাস নাইনের অংক বইটা টেনে নিলেন।  
২

খালেক মাষ্টারের ঘরের সামনের উঠোনের একপাশে একটা খড়ের গাদা। সেখান হতে খড় টেনে টেনে এনে খড়ের গাদার পাশেই মাটিতে জড়ো করেছে আলতাফ। আলতাফ এ বাড়িতে কাজ করে। বয়স পনের ষোল হবে। এ বাড়িতে এসেছে অল্প কয়েকদিন হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হবার পর কাজকর্ম নাই বলে বড় ভাই জামাল চেয়ারম্যানের হাত পা ধরে সে এখানে কাজ নিয়েছে। এ বাড়িতে দুটো গরু আছে। আলতাফ গরু দুটোর দেখভাল করে। এখন সে গরুর জন্য খড় কাটতে বসবে। খড়ের গাদার পাশে দাঁড়িয়ে কিছু খড় দুহাতে তেনে বের করতে গিয়ে কেন যেন থমকে গেলো আলতাফ। খরের গাদার ভেতরে কিছু একটার দিকে চোখ পড়েছে তার। থমকে গিয়ে স্থির হয়ে সেদিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো আলতাফ। সাবধানে চারপাশে একবার চোখ বুলালো। কেউ নেই দেখে অর্ধেক বাইরে টেনে আনা খড়গুলোর পাশ দিয়ে একটা হাত ভেতরে দিলো। সকল স্পর্শের একটা করে আলাদা অনুভূতি থাকে। কিন্তু আজকের এই স্পর্শের অনুভূতিটা একেবারে অন্যরকম। সাবধানে হাতটা বের করে এনে হাতে টেনে আনা খড়গুলোকে আবার ভেতরের দিকে ঠেলে দিলো। দেশের অবস্থা সেও বুঝে। কিন্তু এখানে এলো কোথা থেকে? এ বাড়ির গৃহকর্তা এলাকার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। এখানে তো এগুলো থাকার কথা না। তবে কি খালেক মাষ্টার? হতে পারে। ভাবতে ভাবতে আলতাফ একা একা মাথা নাড়লো। খড়ের গাদা থেকে এগিয়ে খালেক মাষ্টারের ঘরের দিকে এগোলো আলতাফ।
টেবিলের উপর বই খাতা নিয়ে খালেক মাষ্টার একমনে সেদিকে তাকিয়ে আছেন। আলতাফ ঘরে ঢুকেই একটা গলা খাঁকারি দিলো। খালেক মাষ্টার মাথা না তুলেই বুঝতে পারলেন, আলতাফ এসেছে।
কিছু বলবি? খালেক মাষ্টার জিজ্ঞেস করলেন।
ভাইজান, একটা সমস্যা হয়েছে। আলতাফ বলল।
কি সমস্যা?
খড়ের গাদার ভেতরে
এটুকু বলতেই খালেক মাষ্টার লাফিয়ে উঠলেন। জিজ্ঞেস করলেন,
তুই দেখেছিস?
জ্বী ভাইজান।
একদম কাউকে বলবি না, কাউকে না, বড় ভাইকেও বলবি না। খালেক মাষ্টার সতর্ক কন্ঠে আলতাফকে বললেন।
আলতাফ পরিস্থিতি বুঝে ফেলেছে। সে বলল, ঠিক আছে ভাইজান। কাউকে বলবো না।
তুই যেদিকে দেখেছিস, তার উল্টা দিক হতে খড় বের করবি। এগুলো কয়েকদিনের মধ্যেই এখান হতে চলে যাবে। খালেক মাষ্টার বলল। এটুকু বলেই আলতাফকে কাছে আসতে বললেন খালেক মাষ্টার। আলতাফ কয়েক পা এগিয়ে মাষ্টারের কাছে এসে দাঁড়ালো। খালেক মাষ্টার তার মাথায় হাত দিয়ে বললেন,
দেশের অবস্থা তো জানিস। বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা অপারেশন শুরু করেছে। আমাদের এখানেও অল্প কদিনের মধ্যে চলে আসবে। আমি তুই কেউ যুদ্ধে যাইনি, কিন্তু আমরা তো ওদেরকে সাহায্য করতে পারি। কি বলিস, পারি না?
জ্বী ভাই পারি। আলতাফের কন্ঠ একটু যেন দীপ্ত শোনালো।  
আমরা যে যে অবস্থায় আছিস, সেখান হতেই আমাদের সাধ্যমতো আমরা ওদেরকে সাহায্য করবো। এটুকু করতে না পারলে আমরা নিজেরা নিজেদের কাছে অপরাধী হয়ে থাকবো।
এ কথায় আলতাফ কি বুঝলো, কে জানে। তবু সে মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো। মাথা নাড়িয়েই সে জিজ্ঞেস করলো,
ভাইজান, এইগুলা এই বাড়িতে রাখলেন কেন? জিজ্ঞেস করেই আলতাফ খালেক মাষ্টারের চোখের দিকে তাকালো।
তুইতো জানিস, বড় ভাই এই এলাকার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। এজন্য আমাদের বাড়িতে পাকিস্তানিরাও আসবে না, রাজাকারেরাও আসবে না। পুরো গ্রামে এ বাড়ি ছাড়া আর কোন নিরাপদ জায়গা নাই। সেজন্যে এগুলো এখানেই রাখা হয়েছে।
তাইলে ঠিক আছে ভাই। ঠিক কাজই করেছেন।  

৩

পাকিস্তানি ক্যাম্পে ক্যাম্প কমান্ডারের সামনে বসে আছেন জামাল চেয়ারম্যান। ক্যাম্প কমান্ডার তাকে জিজ্ঞেস করলেন,
এলাকায় যে সব ছেলেরা যুদ্ধে গেছে, সবার নামের তালিকা এখনো আমরা পাইনি।
মাঝে মাঝেই কিছু কিছু ছেলেপুলে চলে যাচ্ছে। তাই পুরো নামের তালিকা একবারে বানানো সম্ভব হচ্ছে না স্যার। জামাল চেয়ারম্যান জবাব দিলো।
কথাটা শুনে ক্যাম্প কমান্ডার গম্ভীর হয়ে গেলো। কিছুক্ষন চুপ থেকে তারপর বলল, তাহলে আরেকটা কাজ করুন। এলাকার সকল যুবকদের নামের তালিকা দেন, বাড়ির ঠিকানাসহ।
ব্যাপারটা একটু বেশী বেশী হয়ে গেলো, ভাবলেন জামাল চেয়ারম্যান। এদেরকে ঢালাওভাবে নামের তালিকা দিলে এরা এই ছেলেদের ধরে ধরে অত্যাচার করবে, এলাকায় রাজাকার দিয়ে নজরবন্দী করে রাখবে। সেটা এলাকায় জুলুমের মাত্রা বাড়িয়ে দেবে। ক্যাম্প কমান্ডারের মুখের উপর কোন কথা বলার সাহস তার নাই। তাই মাথা নাড়িয়ে বললেন, আমাকে কটা দিন সময় দেন।
ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি দেয়ার ব্যবস্থা করুন।
জ্বী স্যার, জামাল চেয়ারম্যান বলল।
জ্বী স্যার বলার পরও জামাল চেয়ারম্যানকে সামনে বসে থাকতে দেখে ক্যাম্প কমান্ডার মুখ তুলে তার দিকে তাকালেন। তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, আর কিছু বলবেন?
জ্বী স্যার। একটা বিষয় ছিলো।
বলুন।
কয়েকদিন আগে আমাদের গ্রাম হতে মনসুর নামে একজনকে ক্যাম্পেই আনা হয়েছিলো। আমি খবর নিয়েছি, উনি এখনো বেঁচে আছেন। উনার অপরাধ ছিলো, উনার বড় ছেলে মুক্তিযুদ্ধে গেছে। এটুকু বলে থামলেন জামাল মাষ্টার।
ক্যাম্প কমান্ডার এবার বললেন, কি করতে হবে?
স্যার, উনাকে যদি ছেড়ে দেয়া যায়, তাহলে একটু ভালো হতো।
এটা কিভাবে সম্ভব? ক্যাম্প কমান্ডার চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছেন জামাল চেয়ারম্যানের দিকে।
স্যার, আমি ক্যাম্পে সুবেদার রফিকের সাথে কথা বলেছি।
সুবেদার রফিকের নামটা শুনেই ক্যাম্প কমান্ডার নরম কন্ঠে বললেন, ঠিক আছে। আপনি টাকা নিয়ে আসুন। ছেড়ে দেয়া হবে।
জ্বী স্যার। বলে এবার জামাল চেয়ারম্যান উঠে দাঁড়ালেন।
ক্যাম্প কমান্ডারকে একটা সালাম দিয়ে উঠে এলেন জামাল চেয়ারম্যান। ক্যাম্প হতে বেরোবার আগে সুবেদার রফিকের সাথে কথা বলে নিলেন। পাঁচ হাজার টাকায় মীমাংসা হলো। টাকা দেয়া হলেই মনসুর মিয়াকে ছেড়ে দেবে ওরা।
বাড়ি যেতে যেতে তার মনে হলো, মনসুরের বাড়িতে খবরটা পৌছাতে হবে। তিনি জানেন, মনসুরের বাড়িতে এখন নগদ টাকা নেই। একটা প্রস্তাব দেবেন তিনি মনসুরের বউকে। মনসুরের বউটা রাজী হলেই হলো। এর মধ্যে আগামীকাল ক্যাম্পে গিয়ে মনসুরের সাথে কথা বলে নেবেন। বাজারের কাছেই মনসুরের একটা বড় জমি আছে। সেটা যদি মনসুর তাকে দিয়ে দেয়, তাহলে তিনি মনসুরকে ক্যাম্প হতে ছাড়ানোর জন্য টাকাটা দিয়ে দেবেন। তার কাছে নগদ টাকা আছে। সারা দেশে এখন গন্ডগোল চলছে। এর মধ্যে যদি বুদ্ধি করে কিছু সয়সম্পত্তি বাড়িয়ে নেয়া যায়, তবে মন্দ কি? সুযোগ সবসময় আসে না। এবারের সুযোগটা মোক্ষম সুযোগের বছর। ভাবতে ভাবতে মুচকি হাসলেন জামাল চেয়ারম্যান।
নিজের বুদ্ধিতে নিজের উপরেই খুশী হয়ে গেলেন জামাল চেয়ারম্যান।    
৪

রাত হয়ে এসেছে। খালেক মাষ্টার বাড়ির পেছনে বাগানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছেন। তিনি সচরাচর সিগারেট খান না। আজ তিনি একটু উত্তেজিত হয়ে আছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা দল এখানে আসবে। বাড়ির পেছনে বিরাট ধানী জমি। ধানী জমির পর একটা ছোট নদী। সেই নদী পেরিয়ে তারা আসবে। খালেক মাষ্টারের কাছে সংবাদ দেয়া হয়েছে , রাতে এলাকায় একটা অপারেশন হবে আজ। সেজন্য তার উঠানের খড়ের গাদায় লুকিয়ে রাখা অস্ত্রগুলো তারা নিয়ে যাবে। খালেক মাষ্টার ধারণা করতে চেষ্টা করছেন, কোথায় অপারেশনটা হতে পারে। বিভিন্ন ভাবে ভেবেও মিলাতে পারলেন না, কোথায় অপারেশন হবে। মুক্তিযোদ্ধারা অন্তত ক্যাম্পেই আক্রমণ করবে না। সেখানে আক্রমণ করতে হলে মুক্তিযোদ্ধাদের দলটা আরো বড় হতে হবে। খালেক মাষ্টার এখনো অবশ্য জানেন না , মোট কতোগুলো দল এখানে আসবে বা কতোজন আসবে।
সিগারেটটা শেষ হয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে। খালেক মাষ্টার আরেকটা সিগারেট ধরালেন। সিগারেটটার মাঝপথে লক্ষ্য করলেন ছয় সাতজনের একটা দল ধানক্ষেতগুলোর আল ধরে ধরে এ বাড়ির দিকে এগোচ্ছে। সতর্ক হয়ে একটা গাছের আড়ালে চলে গেলেন খালেক মাষ্টার। আগে নিশ্চিত হওয়া দরকার আসল মুক্তিযোদ্ধারা এসেছে কিনা। তাকে বলা হয়েছিলো, যারা আসবে, তাদের মধ্যে তার পরিচিত লোক থাকবে। তিনি মনে মনে ভাবছেন, পরিচিত মানুষটা কে হতে পারে?
লোকগুলো ধান ক্ষেত পেরিয়ে বাগানের মধ্যে ঢুকে পড়লো। খালেক মাষ্টার গাছের আড়াল হতে লক্ষ্য রাখছেন, এরা কোথায় যায়। লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে বুঝে ফেললেন, একেবারে সামনের লোকটাই এদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এনেছে। পেছনের সবাই তাকে অনুসরণ করছে। খালেক মাষ্টার ভাবছেন, এরা যদি সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধাদের দল, তাহলে তাড়াতাড়ি খড়ের গাদা হতে অস্ত্র আর গুলির বাক্সগুলো নিয়ে গেলেই হয়। বড় ভাই জামাল মাষ্টার আজ থানা সদরে গিয়েছেন কি একটা জমি নাকি রেজিষ্ট্রেশন করবেন।  এখনো বাড়ি ফেরেননি। যুদ্ধ শুরু হবার পর জামাল চেয়ারম্যান মাঝেই মাঝেই জমিজিরাত কিনছে। কোথা থেকে টাকা পাচ্ছে কে জানে। খালেক মাষ্টারের সন্দেহ, এলাকার রাজাকারেরা যেসব লুটপাট করছে, তার একটা ভাগ সম্ভবত জামাল চেয়ারম্যানের কাছেও আসে। ভাবতে ভাবতে একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন খালেক মাষ্টার।
লোকগুলোর মধ্যে একদম প্রথম লোকটা গাছের ফাঁকে ফাঁকে এগিয়ে এসে কিভাবে যেন ঠিক খালেক মাষ্টারের সামনেই এসে দাঁড়ালো। অন্ধকারে খালেক মাষ্টার লোকটার চেহারা ঠিক ঠাহর করতে পারছেন না। কিন্তু লোকটার চোখ বোধহয় অন্ধকারে সয়ে এসেছিলো। লোকটা খালেক মাষ্টারের সামনে এসে বলল,
ভাইজান, আমি।
খালেক মাষ্টার হতবাক হয়ে গেলেন। আলতাফের গলা। তিনি ফিসফিস করে শুধু বললেন,
আলতাফ!    
জ্বী ভাই। আমি আলতাফ। আমি জানতাম শুরু থেকেই। এ দলের সাথে আমারও যোগাযোগ হয়েছিলো। আমি এখানে এ বাড়িতে কাজ করার অজুহাতে সেগুলোকে পাহারা দিতাম। 
খালেক মাষ্টারের বিস্ময় কাটছে না। তবু বললেন,
ঠিক আছে, সব নিয়ে যা। বড় ভাই বাড়ি নাই। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে।
জ্বী ভাই। আলতাফ বলেই সাথের লোকগুলোকে কাছে ডেকে নিয়ে খড়ের গাদার দিকে এগোলো।
খালেক মাষ্টার শুধু ভাবছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের দলটা তার সাথে যোগাযোগ করে এখানে এগুলো রেখেছিলো। এর বাইরে তারা আবার আলতাফকে এগুলোর পাহারায় রেখেছিলো। নিরাপত্তার প্রশ্নে কাজটা নিখুঁত ছিলো, ভাবলেন খালেক মাষ্টার।
অস্ত্রগুলো আর গুলির বাক্সগুলো নিয়ে আলতাফের দলটা আবার বাগানের ভেতরে এলো। খালেক মাষ্টার এখনো সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন। আলতাফকে সামনে দেখেই খালেক মাষ্টার জিজ্ঞেস করলেন, আজ কোথায় যাবি?
ভাই, দোয়া করবেন। আজ একটা বড় অপারেশন আছে। মুক্তিযোদ্ধাদের আরো তিনটা দল আসবে আজ কিছুক্ষনের মধ্যে। দোয়া করবেন যেন কিছু একটা করতে পারি।
খালেক মাষ্টার কিছু না বলে অন্ধকারেই চুপচাপ আলতাফের মুখ বরাবর তাকিয়ে রইলো। আলতাফ বোধহয় বুঝতে পেরেছে খালেক মাষ্টারের মধ্যে কি প্রশ্ন এসেছে। একটু চুপ থেকে আলতাফ বলল,
ভাই, আমি অস্ত্র চালাতে জানি না। তবু আমি উনাদের সাথে আছি । আমি কেবল গ্রেনেড ছুঁড়তে পারি। আমি কেবল সেটাই শিখেছি। আর সময় সময় উনাদের গুলির বাক্স মাথায় করে নিয়ে যাই উনাদের সাথে।
খালেক মাষ্টার শুধু বললেন, যা, ঈনশা আল্লাহ আজ তোরা কিছু একটা করতে পারবি।
কথাটা শুনে আলতাফ আবার বলল, ভাই দোয়া করবেন। বলেই দলটাকে নিয়ে বাগানের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেলো।
ওদের যাবার পথের দিকে চেয়ে রইলেন খালেক মাষ্টার। তিনি কেবল ভাবছেন, আলতাফও ঘর হতে বেরিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পথে। তিনিই কিছু করলেন না।
৬

জামাল মাষ্টারের মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে আছে। মনসুরের জমিটার কাগজপত্রের কাজ আজ ষেষ হয়ে গেছে। থানাসদরে কয়েকজন পরিচিত লোক আছে। জমি রেজিষ্ট্রি শেষ করে একে একে তাদের সাথে দেখা করলেন। যুদ্ধের এ সময়ে সেরকম করে থানাসদরে আসা হয় না। তাই ভাবলেন, এসেছিই যখন সবার সাথে দেখা করেই যাই।

সবার সাথে দেখা হতে হতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। তাড়াতাড়ি রওনা হলেন বাড়ির দিকে। একটা রিকশা নিলেন। এসময় রিকশা পাওয়াও কঠিন। ভাগ্যক্রমে রিকশাটা পেয়ে খুশীই হলেন জামাল চেয়ারম্যান। কাঁচা রাস্তায় রিকশা চালানো খুব কঠিন কাজ। জোরে চালানো মুশকিল। আস্তে আস্তে এগোচ্ছে বলে জামাল চেয়ারম্যান মনে মনে নিজের উপর অসন্তুষ্ট। তার মনে হলো, দিনের আলো থাকতেই রওনা দেয়া উচিত ছিলো।
থানা সদর হতে গ্রামের দুরত্ব বারো মাইল। রাত গভীর হয়ে এসেছে। এলাকার কাছাকাছি আসতেই গোলাগুলির আওয়াজ শুনলে জামাল চেয়ারম্যান। একটু অবাক হলেন। আজ তো পাকিস্তানি ক্যাম্প হতে বেরোবার কথা নয়, অন্তত সেটাই জানতেন তিনি। ক্যাম্প হতে কবে কোথায় আর্মিরা যাবে সেটা সবার আগে তিনি জানতে পারেন। কারণ তাদের সাথে কতোজন রাজাকার যাবে, সেটা তিনি ভাগ করে দেন। এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা আসবে, এটা তার কল্পনাতেও ছিলো না। তবু একবার মনে হলো, মুক্তিযোদ্ধারা এলাকায় এসেছে কি? নাকি তারা পাকিস্তানিদের ক্যাম্পেই আক্রমন করেছে? ভাবনাটা মাথায় আসতেই ভয়ের একটা ঠান্ডা স্রোত মনে হলো, তার ঘাড় হতে পিঠ বেয়ে নিচে নেমে গেলো। জামাল চেয়ারম্যান রিকশাওয়ালাকে বললেন তাড়াতাড়ি চালানোর জন্য। গুলিগোলার আওয়াজ শুনে রিকশাওয়ালা বলে উঠলো, আপনি হেঁটে চলে যান। আমি আর যাবো না।
জামাল চেয়ারম্যান হতবিহবল হয়ে রিকশা হতে নেমে হাঁটা শুরু করলেন। বাড়ির কাছাকাছি আসতে আসতে গোলাগুলির আওয়াজ থেমে গেছে। সারা শরীর ঘেমে গেছে তার। যতোটা হেঁটে আসার জন্যে তারচেয়ে বেশী সার্বিক ঘটনা কি হচ্ছে, সেটা নিয়ে তার দূর্ভাবনার জন্য।
বাড়ির কাছে পৌছে গেছেন জামাল চেয়ারম্যান। রাস্তায় হতে বাড়ির প্রবেশ মুখে আসতেই চমকে গেলেন জামাল চেয়ারম্যান। পাঁচ ছয় জনের একটা দল এসে তার সামনে পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছে। ব্যাপারটায় এতোই চমকে উঠেছেন তিনি যে, একটা চিৎকারও দিতে পারলেন না। একজন তাকে জিজ্ঞেস করলো, চেয়ারম্যান সাহেব কেমন আছেন?
তিনি জবাব দেয়ার আগেই দুজন এসে তাকে জাপটে ধরে রশি দিয়ে বাঁধা শুরু করেছে। প্রায় সাথে সাথেই আরেকজন এসে একটা গামছা তার মুখে পুরে দিয়েছে। তারপর তাকে ধরে বাড়ির ভেতরের দিকে এগিয়ে গেলো। উঠোনের পাশে খড়ের গাদার পাশে তাকে দাঁড় করিয়ে একজন শুধু ফিসফিস করে বলল, এখানেই একে খতম কর। ফায়ার।
৭

উঠোনের দিক হতে গুলির আওয়াজ কানে যেতেই খালেক মাষ্টার ভয়ে বিছানা থেকে লাফিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়লেন। একটু পর অবাক হয়ে দেখলেন, স্রেফ একটাই গুলির আওয়াজ হয়েছে। ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে উঠোনের দিকে তাকালেন। কাউকে সেখানে দেখতে পেলেন না। অনেকক্ষন ধরে সেদিকে তাকিয়েও কাউকে নাড়াচাড়া করতে না দেখে আস্তে আস্তে খালেক মাষ্টার দরজা খুলে উঠোনে এলেন। আশেপাশে কাউকে দেখতে পেলেন না। খড়ের গাদার দিকে চোখ পড়তেই অবাক হয়ে গেলেন, কিছু একটা পড়ে আছে সেখানে। আলতাফরা কি সবকিছু নিয়ে যেতে পারেনি? ভেবে সামনে এগোতেই থ মরে গেলেন। বড় ভাই, শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান, জামাল চেয়ারম্যানের লাশ পড়ে আছে। অন্ধকারেই বোঝা যাচ্ছে, খড়ের গাদার যেদিকটায় অস্ত্রগুলো রাখা ছিলো, সেদিকটা রক্তে ভিজে আরো গাড় রঙের হয়ে আছে। নিজের সাথে নিজে অবাক হয়ে গেলেন খালেক মাষ্টার। বড় ভাইয়ের মৃত্যুতে তার মধ্যে কোন শোক হচ্ছে না। আস্তে আস্তে লাশের পাশে বসলেন খালেক মাষ্টার। লাশের দিকে তাকিয়ে তার কেবল মনে হলো, সারা দেশে অসংখ্য শান্তি কমিটির লোক আছে। মাত্র একজন এখানে মারা পড়েছে।

(গল্পটি আমার লেখা প্রতিশোধ নামক গল্পগ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। বইটি শিখা প্রকাশনী থেকে ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে)

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login