Story

প্রতিশোধ

October 2, 2026

9 views

১
রাসেল খালের পাড়ে গিয়ে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তার সাথে গ্রামের আরো কিছু লোকজন এসেছে। সবাই এসে খালের পাড়ে পড়ে  থাকা মৃতদেহগুলো নেড়েচেড়ে দেখছে। যখনি কোন পরিচিতজনের লাশ পাওয়া যাচ্ছে, তখনি সেখানে একটা কান্নার রোল পড়ে যাচ্ছে। রাসেলের এখানে কেউ নেই। তবু সে এখানে এসেছে।

গত রাতে পাকিস্তানিরা এসেছিলো গ্রামে। গ্রামের একদিক হতে একটা একটা করে বাড়িতে গিয়েছে, সেই বাড়িতে যুবক শ্রেণির কাউকে পেলে তাকে বেদম মারধর করে হাত পা বেঁধে ট্রাকে তুলেছে। সারারাত ধরে পুরো গ্রামে তারা  তাণ্ডব চালিয়েছে। প্রথমে যে যে বাড়িতে গিয়েছে, সেখানেই যুবকদের ধরেছে। পরের দিকে যে সব বাড়িতে গিয়েছে, সেসব বাড়িতে কাউকে পায়নি। সবাই বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে আশেপাশের ধানক্ষেতের মধ্যে গিয়ে লুকিয়েছে।  মোট একুশ জনকে ট্রাকে করে তুলে এনেছিল ওরা। এনে গ্রামের পূর্বদিকে ওয়াপদা খালের পাশে এনে লাইন করে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরেছে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লাশগুলোর দিকে একঠায় তাকিয়ে আছে রাসেল। একুশটা তরতাজা প্রাণ এভাবেই নিভে গেলো ভাবতেই নিজের অজান্তে দুই হাত মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে গেলো রাসেলের। এরা সকলেই তার পরিচিত। অনেকেই তার সমবয়েসী। এদের মধ্যে কয়েকজনকে সে গতকাল দিনের বেলা দেখেছে। কথাও হয়েছিলো কয়েকজনের সাথে। মনে মনে বলল, দিন ঘুরে যাবে অচিরেই। মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা এলাকায় এলেই সব পাশার দান উল্টে যেতো।  শুধু পাকিস্তানি আর্মিরাই এখানে একমাত্র সমস্যা নয়, স্থানীয় রাজাকারগুলো সবচেয়ে বড় সমস্যা। আর্মিদের দেখলেই চেনা যায়। কিন্তু রাজাকারদের দেখলে চেনা যায় না। এরা সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। গ্রামের রাজাকারদের সে চেনে। লাশগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রাসেল মনে মনে ঠিক করলো, রাজাকারদের যদি শায়েস্তা করা যেতো, তাহলে খুব ভালো হতো।

গ্রামের যে সকল যুবক শ্রেণির ছেলেরা রাতে পালিয়েছিল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ ফিরে এসে এখন খালের পাড়ে দাঁড়িয়েছে। রাসেল খালের পাশ দিয়ে একটু এগোতেই জামিলের সাথে দেখা। তার পাশের বাড়ির। রাসেল তার পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,
দিনে দিনে অবস্থা চরমের দিকে যাচ্ছে।
হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। জামিল ছোট করে জবাব দিলো।
পাকিস্তানিদেরকে এই বাড়িগুলো চিনিয়ে দিয়েছে কারা, জানিস তো? রাসেল জিজ্ঞেস করলো।
হ্যাঁ, সবাই চেনে তাদেরকে। তুইও চিনিস, আমিও চিনি। জামিল জবাবে বলল।
যুদ্ধ শুরু হলে ক্ষেতখামারের কাজ বন্ধ হয়ে গেলো। দিনমজুরগুলো বেকার হয়ে গেলো। তাদের ঘরে ঘরে একপাল বাচ্চা কাচ্চা। সবাই অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাতে শুরু করেছে। গ্রামের চেয়ারম্যান তখন এদেরকে ডেকে ডেকে রাজাকারে নাম লিখিয়ে আটা দিচ্ছে, চাউল দিচ্ছে,  নগদ টাকা দিচ্ছে। এভাবেই চেয়ারম্যান নিজে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হয়ে দল পাকিয়েছে। রাসেল বলল।
সবই তো জানিস। বলেই জামিল রাসেলের মুখের দিকে তাকাল।
রাসেল শুধু বলল, কটা দিন অপেক্ষা কর। একটা ব্যবস্থা করে ফেলব।
করে ফেল। আমি তোর সাথে থাকবো। কাউকে না, যা করার চেয়ারম্যানকেই করবো। জামিল গলা নামিয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে বলল।
ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, সেটাতেও স্বান্তনা থাকে। কিন্তু একুশজন মানুষকে চোখের পলকে মেরে ফেলল, এটার কোন মাফ নাই।  অন্তত এ জন্য একদিন চেয়ারম্যানের শাস্তি পাওয়া উচিত। আমাদের গ্রাম হতে যেন কেউ মুক্তিবাহিনীতে না যায়, সেজন্য ভয় দেখাতেই সে একাজটা করেছে। সাথে লুটপাট করেছে।  রাসেল বলল।
গোপনে একটা ছোট দল বানাই। কি বলিস? আমাদেরই কাজে লাগবে।
হ্যাঁ, ঠিক আজ হতেই শুরু করবো। বেশি লোক নেবো না। সাত আটজন হলেই চলবে।
ঠিক বলেছিস।
২
সপ্তাহখানেক পর। বিকেল বেলা। রাসেল, জামিল দুজনেই একসাথে রাসেলদের বাড়ির কাছারিঘরে বসে আছে। দুজনের সামনে একটা বাটিতে কিছু মুড়ি আর পাটালি গুড় রাখা। একমুঠো মুড়ি মুখে পুরে চিবোতে চিবোতে জামিল জিজ্ঞেস করলো,
কি করবি, কিছু চিন্তা করেছিস?
হ্যাঁ, মনে মনে একটা প্ল্যান করে ফেলেছি। রাসেল বলল।
গ্রাম থেকে আর কোন ছেলেদেরকে দলে নিতে পারলিনা? জামিল জিজ্ঞাসা করলো।
বলেছিলাম কয়েকজনকে। কিন্তু তাদের সবাইকে কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্ত মনে হলো। এখন তো ঝামেলা বেশি হয়ে গেছে। রাজাকারেরা চারিদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। কোন বাড়ি থেকে আমাদের বয়েসী কেউ অকস্মাৎ নিখোঁজ হয়ে গেলে মিলিটারিরা সে বাড়িতে অত্যাচার চালাবে। এজন্য আসতে চাচ্ছে না। রাসেল বলল।
এখন তাহলে কি করবি?
দলটা ছোট হয়ে গেলো। আমি যেভাবে চেয়েছিলাম, সেভাবে দলটা বানাতে পারলাম না। তবে অসুবিধা নাই। আমরা দুজনে মিলেই যা করার করবো। রাসেল জবাব দিলো।
কোন প্ল্যান করেছিস? জামিলের চোখেমুখে জিজ্ঞাসা।
আমি একটা প্ল্যান করেছি। আমরা একটা ছোট ট্রেনিং নেবো। আমাদের পাশের গ্রাম, অর্জুনতলায় একজন লোককে আমি চিনি। যদ্দুর জানি, তার সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের যোগাযোগ আছে। তার সাথে আমি দেখা করে এসেছি। তাকে আমাদের গ্রামের এ ঘটনাটা আমি বলেছি। আমি ঘটনাটা বলার পর উনি বলেছেন, উনি আমাদেরকে একটা সহজ উপায় শিখিয়ে দেবেন। সেটা দিয়েও নাকি বড় কাজ করা যায়।
উনি কি বলেছেন?
উনার ওখানে যেতে বলেছেন। ওখানে গেলে উনি আমাদেরকে মিনিট দশেকের মধ্যে একটা জিনিষ শিখিয়ে দেবেন। বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করলে সেটা দিয়েও নাকি বড় সাফল্য সম্ভব। রাসেল বলল।
কি সেটা?
সেটা সেখানে গেলেই জানতে পারবি। এখন তোকে কিছু বলবো না। রাসেল বলতে থাকলও। দুদিন পর আমরা দুজন আলাদা আলাদা রওনা দিয়ে অর্জুনতলায় যাবো। সেখানে গিয়ে শফি মণ্ডলের বাড়ি খুঁজে বের করবি। সে বাড়িতেই থাকে ঐ লোকটা। নাম আব্দুল্লাহ। আমি সকালে রওনা হবো, তুই দশটার দিকে রওনা দিবি। আমরা দুজনে দুপুর বারটার দিকে সে বাড়িতে গিয়ে ঐ আব্দুল্লাহ ভাইয়ের সাথে দেখা করবো। আমি আগে পৌছাবো। তখন গিয়ে তোর কথা বলে ঐ বাড়ি হতে বেরিয়ে চলে আসবো। দুপুরে দুজন একসাথে দেখা করবো। কথা বুঝতে পেরেছিস?
জামিল বলল, হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি।
তাহলে আজ এ নিয়ে আর আলোচনা নয়। মুড়ি শেষ কর। রাসেল বলল।
৩
রাসেল অর্জুনতলায় এসেছে। শফি মণ্ডলের বাড়ি গিয়ে এক ঝলকের জন্য আব্দুল্লাহ’র সাথে দেখা করে এসেছে।
ভাই আসসালামু আলাইকুম।
ওয়ালাইকুম সালাম। কি অবস্থা? আব্দুল্লাহ জিজ্ঞেস করলো।
কোন অবস্থা নাই। আপনি সব জানেন। এখন আপনাকে একটা ব্যবস্থা করতে হবে। সেজন্যেই তো তোমাদেরকে আসতে বলেছিলাম। তোমার বন্ধু কই?
দুপুরে এসে পৌঁছাবে।
ঠিক আছে, দুপুর বেলা ও আসলে তোমরা দুজনে আমাদের বাড়ির পেছন দিকে বাগানে অপেক্ষা করবে। তখন বিস্তারীত কথা হবে। আব্দুল্লাহ এটুকু বলে একটু থেমে আবার বলা শুরু করলো। তোমরা এ গ্রামে বেশী ঘোরাঘোরি করোনা। এলাকায় পাকিস্তানি আর্মির ইনফরমার আছে। ও এসে পৌঁছালেই বাড়ির পেছনের বাগানে চলে যাবা। আগে এলে দুজনে সেখানেই অপেক্ষা করবা। আমি বাড়িতেই আছি। আমি বুঝতে পারবো কখন তোমরা দুজনে এসে পৌঁছেছ।
ঠিক আছে ভাই। কথাটুকু বলেই রাসেল সে বাড়ি হতে বেরিয়ে সামনের রাস্তার দিকে চলে গেলো।
রাস্তায় গিয়ে রাসেল কিছুক্ষণ এলোমেলো হাঁটাহাঁটি করলো। কিছুক্ষণ পর জামিলকে রাস্তায় দেখেই তাকে গিয়ে বাগানে অপেক্ষা করার কথা বলল। জামিলও কিছু না বলে রাসেলসহ শফি মণ্ডলের বাড়িতে ঘরের পেছনের বাগানে গিয়ে বসে রইলো।
বাগানে বসে থাকতে থাকতে একঘেয়ে লাগছিলো জামিলের। কিছুক্ষণ উসখুস করে জিজ্ঞেস করেই বসলো রাসেলকে,
উনি আমাদেরকে কি শেখাবেন?
কথাটা শুনে রাসেল একটু মুচকি হাসলো। তারপর বলল, তোর আর অপেক্ষা সইছে না, দেখছি।
সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? জামিল পালটা জিজ্ঞেস করলো।
রাসেল সে কথার জবাব না দিয়ে বলল, উনি আমাদেরকে গ্রেনেড ছোঁড়া শেখাবেন। বুদ্ধি করে গ্রেনেড ছুঁড়লে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। আমিতো উনাকে বলেছিলাম, আমাদের টার্গেট শুধু আমাদের  এলাকার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। একটা ছোট জমায়েতকে ধ্বংস করার জন্য গ্রেনেড খুব ভালো জিনিষ। তাছাড়া এটি ছোঁড়ার সময় শব্দও হয়না। যখন পড়ে, তখন একটা ঢিল পরার মতো শব্দ হয়। রাসেল একদমে কথাগুলো বলে থামলো।
তুই গ্রেনেড সম্পর্কে এতকিছু জানিস কিভাবে? জামিল চোখেমুখে বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
আমি তোকে বলেছি না, আমি একবার আব্দুল্লাহ ভাইয়ের সাথে দেখা করে কথা বলে এসেছি।
জামিল আর কিছু বলল না। চুপ করে বসে রইলো।
কিছুক্ষণ পর গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে আব্দুল্লাহ রাসেল আর জামিলের কাছে এলো।    
দুজনকেই মাটিতে বসতে বলল আব্দুল্লাহ। ওদের দুজনের সামনেই মুখোমুখি মাটিতে বসে চাদরের নিচ হতে দুটো গ্রেনেড বের করে মাটিতে রাখলো। গ্রেনেড দুটো মাটিতে রাখতেই রাসেল আর জামিল গ্রেনেড দুটোর দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো।
৪
অর্জুনতলা থেকে আসার পর থেকে রাসেল আর জামিল তক্কে তক্কে আছে। তারা প্রায় প্রতিদিন পালাক্রমে চেয়ারম্যানকে অনুসরণ করে, কিন্তু কোথাও চেয়ারম্যানকে একা পাচ্ছে না। এর মধ্যে প্রায় তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। রাসেল এর মধ্যে একদিন জামিলের বাড়ি এলো।
চেয়ারম্যানকে একা পাইনা কখনো। যে কদিন একা পেয়েছিলাম, সেদিন আশেপাশে অন্যান্য লোকেরা ছিলো। তাই কিছু করতে পারি নাই। রাসেল বলল।
আমারও একই অবস্থা। তবে ধৈর্য্য রাখতে হবে আমাদেরকে। ঠাণ্ডা মাথায় কাজটা করতে হবে। জামিল জবাবে বলল।
আজ হতে সন্ধ্যার পর বের হবো। রাসেল বলল। অন্ধকারে নিজেকে তো পালানোর রাস্তা রাখতে হবে।
ঠিক বলেছিস দোস্ত।
একটু খেয়াল রাখতে হবে। নিজেদেরকেও সাবধান থাকতে হবে। ধরা পড়লে এরা আমাদেরকে মেরে ফেলবে। মারার আগে চরম অত্যাচার করে জানতে চাইবে, আমাদের দলে আর কে কে আছে। রাসেল বলল।
তবে একটা সুখবর বোধহয় আছে। আমাদের অপেক্ষার পালা শেষ হবার পথে। জামিল বলল।
কি সেটা? রাসেল উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করে বসলো।
আজ আমি বাজারে গিয়েছিলাম। দুজন লোক বলাবলি করছিলো। এরা এই এলাকার রাজাকার। চেয়ারম্যানের সাথেই উঠাবসা। ক্যাম্প কমান্ডার নাকি  চেয়ারম্যানের সাথে ডেকেছে। আগামীকাল চেয়ারম্যান আর্মি ক্যাম্প এ যাবে। জামিল বলল।
তাতে আমাদের কি হবে? আমাদের কি লাভ এই খবরে? রাসেল জিজ্ঞেস করলো।
ক্যাম্পের সামনে মাঠের পূর্ব ধারে রাস্তার কিনারে একটা তাঁবু সামিয়ানার মতো করে টাঙ্গানো আছে। সে রাস্তা দিয়ে লোকজন চলাচল করে। কেউ ক্যাম্পে এলে ক্যাম্প কমান্ডার সেই সামিয়ান্র নিচে রাখা চেয়ারে বসেই কথা বলে। সামিয়ানার মতো হওয়ায় সেটি চারদিকে খোলা। সেখানে রাতে হ্যাজাক বাতি জ্বালানো হয়। সন্ধ্যার পর যদি চেয়ারম্যান সেখানে যায়, তাহলে ক্যাম্প কমান্ডার ঐ সামিয়ানার নিচে বসেই চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলবে। সামিয়ানাটা রাস্তার ধারেই। আমরা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার ভান করে রাস্তা থেকে অন্ধকারে গ্র্যান্ড ছুঁড়তে পারি। অন্ধকার বিধায় আমাদের পালিয়ে আসাটাও সহজ হবে, কি বলিস?
জামিলের প্ল্যানটা শুনে রাসেল অবাক হয়ে গেলো। অর্থাৎ এক ঢিলে দুই পাখি। চেয়ারম্যান আর ক্যাম্প কমান্ডার। দারুণ প্ল্যান তো, দোস্ত। রাসেল বলল। তাহলে এই প্ল্যানেই আমরা এগোবো। আগামীকাল বিকেলে আমরা দুজন একসাথে ক্যাম্পের দিকে রওনা হবো। এমন সময়ে বের হবো যাতে সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অন্ধকার নেমে আসে।
ঠিক আছে। এ কথাই রইলো। জামিল বলল।  
৫

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। আর কিছুদূর এগোলেই পাকিস্তানিদের ক্যাম্প। চারদিকে অন্ধকার হয়ে এসেছে। রাসেল আর জামিল রাস্তায় একটু দূরত্ব রেখে হাঁটছে। দুজনের গায়েই চাদর। রাসেল লুঙ্গি পরেছে। চাদরের নিচে লুঙ্গির খোঁটে গ্রেনেডটা রাখা। গত তিন সপ্তাহে এটাকে এভাবে নিয়ে চলার অভ্যাস হয়ে গেছে। রাসেলের কিছুটা পেছনে জামিল। সে প্যান্ট পরেছে। প্যান্টের পকেটে গ্রেনেডটা। উপরে দুজনেই পাঞ্জাবী পরেছে। পাঞ্জাবী পড়ায় গ্রেনেডের জন্য লুঙ্গীতে বা প্যান্টের পকেটের উঁচু হয়ে উঠাটা বোঝা যায় না।
অন্ধকারে দুজনের চোখ সয়ে গেছে। জামিল স্পষ্ট রাসেলকে দেখতে পাচ্ছে। ক্যাম্পের যতো কাছে যাচ্ছে, ততোই দুজনের বুকে ঢিপ ঢিপ বাড়ছে। ক্যাম্পের পাশের রাস্তায় এখন ওরা দুজনেই। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে সামিয়ানার নিচে ক্যাম্প কমান্ডার আর চেয়ারম্যান মুখোমুখি দুটো চেয়ারে বসে কথা বলছে। সামিয়ানার পাশেই দুজন সিপাইও আছে। দুজনেই সামিয়ানা বরাবর রাস্তায় এসে রাসেল একটু থেমে গেলো। অন্ধকারে আশেপাশের কেউ সেটা লক্ষ্য করলো না। ততোক্ষণে পেছন হতে জামিল তার কাছে চলে এসেছে। জামিল দেখতে পেলো, রাসেল পাঞ্জাবির নিচে লুঙ্গীর খোঁটের দিকে হাত বাড়িয়েছে। ততক্ষণে তার নিজের হাতটাও পকেটে গ্রেনেডের কাছে চলে এসেছে।
দুজনেই প্রায় একই সময়ে গ্রেনেড দুটো বের করে এনেছে। একই সময়ে দুজনেই গ্রেনেডের পিন খুলে ছুঁড়ে মারলো। গ্রেনেড দুটো ঐ সামিয়ানার দুপাশে কাছেই পড়ল। একঝলকে দুজনেই লক্ষ্য করল, ক্যাম্প কমান্ডার বা চেয়ারম্যান দুজনেই আলাপে এতো মগ্ন, গ্রেনেড দুটো সেখানে পড়ার আওয়াজটা বুঝতে পারেনি।
রাসেল আর জামিল দুজনেই সেখান হতে উর্ধশ্বাসে দৌড় দিলো। কয়েক সেকেন্ড পরই গ্রেনেড দুটো প্রায় একই সময়ে বিস্ফোরিত হলো। বিস্ফোরণের আওয়াজটা কানে যেতেই দুজনে দৌড়াতে দৌড়াতে পাশাপাশি তাকিয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে নিলো। অন্ধকারে দুজনেই  বিজয়ের আনন্দে উভয়ে উভয়ের ঝলমলে চোখগুলো  দেখতে পেলো। অন্ধকারে দৌড়াতে দৌড়াতে রাসেলের মনে হলো তাদের গ্রামের একুশ জন লোককে হত্যা করার প্রতিশোধটা আজ নেয়া হয়েছে।  

(গল্পটি আমার লেখা প্রতিশোধ নামক গল্পগ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। বইটি শিখা প্রকাশনী থেকে ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে)

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login