১
মতিন সাহেব বাসায় বসে আছেন। কোন কাজ নেই। ইদানীং প্রায়ই দোকান বন্ধ রাখেন। যুদ্ধ শুরু হবার পর এই অবস্থা। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন সময়মতো দোকান খুলতেন। এখন সময় খারাপ। দোকান খুলতে ভয় লাগে। দোকান খুলে সারাক্ষণ মনে হয় দোকানের আশেপাশে কেউ বুঝি তাকে অনুসরণ করছে। তাই মাঝে মাঝে দোকান ইচ্ছে করে বন্ধ রাখেন। দোকান খোলা রাখা যেতো। কিন্তু তার দোকানটা ঔষধের। এজন্যেই সমস্যা হয়েছে।
মাসখানেক আগে একদিন দোকানে বসে আছেন। দুপুরের ঠিক আগমূহুর্তে হঠাৎ আর্মির লোকজন আসলো। সাথে স্থানীয় এক যুবক। যুবকটা আর্মির লোকদেরকে তার সামনেই বলল, তিনি নাকি মুক্তিযোদ্ধাদেরর ঔষধ দিয়েছেন। কথাটা শুনে তিনি আকাশ থেকে পড়েছিলেন। যে যুবকটা এ কথা বলেছিলো, সে তার মহল্লাতেই থাকে। ছেলেটা বিহারী এবং তিনি তাকে চেনেন। আর্মির লোকগুলোর মধ্যে যে লোকটা কমান্ডার, তাকে মতিন সাহেব বোঝাতে চেষ্টা করলেন, লোকটা কিছুতেই বুঝতে চাইলো না। মতিন সাহেব বারবার বলতে লাগলেন, তিনি এ ধরনের কোন কাজ করেননি। শুনতেই চাইলো না আর্মির লোকগুলো। তিনি তার দোকানের হিসাবের খাতাটা বের করে দিলেন। তারা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করলো না। উলটো তাকে গালিগালাজ করা শুরু করলো। একসময় মতিন সাহেবকে দোকান হতে বের করে এনে রাস্তার উপর নিয়ে বেত দিয়ে পেটাতে লাগলো। বেতের বাড়িতে তার পিঠের চামড়া ফেটে রক্ত বেরিয়ে এলো। তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। মাটিতে পড়ে যাওয়াতে আর্মির লোকগুলো যেন অধিকতর উৎসাহ পেয়ে গেলো। সমানে বুট দিয়ে লাথি মারা শুরু করলো। লাথি খেয়ে মতিন সাহেবের শরীরটা কুঁকড়ে এলো। মারের চোটে একসময় জ্ঞান হারানর উপক্রম হয়েছে মতিন সাহেবের। তখন আর্মির লোকগুলো তাকে রাস্তার উপর ফেলেই চলে গেলো।
সেই থেকে মতিন সাহেব নিয়মিত দোকান খোলেন না। সপ্তাহে এক বা দুই দিন দোকান খোলেন। বাসায় বসে একঘেয়ে লাগছে তার। দ্বিতীয় কাপ চা খেলেন। তারপর কেন যেন মনে হলো, আজ দোকান খুলবেন তিনি। দোকানের চাবি পকেটে পুরে বাসা হতে বেরোলেন। রাস্তায় লোকজন কম। যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকেই ঢাকা শহরের মানুষের সংখ্যা কমে গেছে। লাখ লাখ লোক শহর ছেড়ে চলে গেছে। হাজার হাজার মানুষকে আর্মিরা মেরে ফেলেছে। পাকিস্তানি আর্মি ঢাকা শহরে পঁচিশে মার্চ হতে যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম বর্বরতার উদাহরণ হয়ে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে মতিন সাহেব মিটফোর্ডের দিকে রওনা হলেন। মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনেই তার দোকান। রাস্তায় কিছুদুর এগোতেই মিটফোর্ড হাসপাতালের ডাক্তার আহমেদের সাথে দেখা হলো। দুজনেই দুজনকে চেনেন। ডাক্তার আহমেদের চেম্বার তার দোকানের পাশেই। মতিন সাহেবকে দেখেই এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,
আসসালামু আলাইকুম মতিন সাহেব। কেমন আছেন?
ওয়ালাইকুম সালাম ভাই। যা আছি, আলহামদু লিল্লাহ। আপনার কি অবস্থা? মতিন সাহেব পাল্টা জিজ্ঞেস করলেন।
আছি ভাই, ভালো আছি। এটুকু বলেই ডাক্তার আহমেদ রাস্তার এদিক ওদিক তাকিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললেন, তবে আজকাল একটু ব্যস্ত আছি।
মতিন সাহেবের মনে হলো, তিনি ব্যপারটা ধরে ফেলেছেন। ডাক্তার মুক্তিবাহিনীর বিষয়েই বলেছেন ব্যস্ত আছি।
মতিন সাহেব এবার বললেন, ভাই আপনি নিশ্চয়ই কোন ভালো কাজে আছেন।
মতিন সাহেবের কথা শুনে ডাক্তার আহমেদ মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে বললেন, আপনিও এতে সামীল হতে পারেন।
আমি সাধারণ মানুষ ভাই, আমি কিভাবে কি করবো? মতিন সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
ডাক্তার আহমেদ এবার বললেন, বিকেলে দোকান বন্ধ করে যাবার আগে আমার চেম্বারে আসবেন। কথা আছে আপনার সাথে। এটুকু বলেই ডাক্তার সাহেব একটু জোরে হেঁটে সামনে এগিয়ে গেলেন।
হাঁটতে হাঁটতে মতিন সাহেবের মনে হলো, ডাক্তার সাহেবের কাছে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? না জানি, কি বিপদের পথে পা বাড়াচ্ছেন! পরক্ষণেই মনে হলো, না, তিনি যাবেন। দেশের এই অবস্থাতেও যদি দেশের জন্য কিছু না করেন, তাহলে নিজের কাছে সারাজীবন দোষী থেকে যাবেন। মতিন সাহেব মনে মনে ঠিক করে ফেললেন, তিনি আজ বিকেলে ডাক্তার সাহেবের চেম্বারে যাবেন। সেখানে উনার সাথে মিলে দেশের কোন কাজে হাত লাগাতে পারলে সেটা একটা ভালো কাজ হবে।
২
ডাক্তার আহমেদের চেম্বারে বসে আছেন মতিন সাহেব। ডাক্তার সাহেব একটা রুগী দেখছিলেন। রুগীটা বিদায় হবার পরই ডাক্তার আহমেদ নড়ে চড়ে বসলেন। মতিন সাহেবও বুঝলেন, ডাক্তার সাহেব এখন কথা বলার জন্য তৈরী হচ্ছেন।
আপনার ঔষধের দোকানটা মিটফোর্ডের বড় দোকানগুলোর একটা। আমার কিছু সাহায্য দরকার আপনার কাছ হতে।
বলুন, কি সাহায্য করতে পারি। মতিন সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
কেরাণিগঞ্জে একজায়গায় আমি রুগী দেখি। সেখানে বিভিন্ন এলাকা হতে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা আসে। তাদের ঔষধ দরকার হয়। আপনি কি আমাকে কিছু ঔষধ দিতে পারবেন? ডাক্তার আহমেদ এর কন্ঠে অনুনয়।
মতিন সাহেব এক পলক ভাবলেন। তারপর সাথে সাথেই বললেন,
আপনার যদি নিতে পারেন, তাহলে আমার দোকানের সকল ঔষধ আপনাকে দিয়ে দিলাম, ভাই। কথাটা বলেই মতিন সাহেব নিজের মনের মধ্যে একটা অন্যরকম অনুভুতি টের পেলেন। দেশের জন্য তার এ কাজটা খুব ছোট, তবুও দেশের কাজে তিনি আছেন, এ আনন্দে তার মনটা ভরে গেলো
অসংখ্য ধন্যবাদ ভাই। ডাক্তার আহমেদ বললেন। আমি ঔষধের অভাবে ভূগছিলাম। আপনি আমার এই সমস্যাটা দূর করে দিলেন। কৃতজ্ঞতায় তার দুচোখ প্রায় নুয়ে এসেছে। মতিন সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে ডাক্তারের হাত ধরে বললেন,
আমাকে ধন্যবাদ দিতে হবে না, ভাই। আমি আপনার সাথে এ কাজে সামীল হতে পেরেছি, সেটার সুখটা আমি নিতে চাই।
ঠিক আছে, ভাই। এখন আমি একটা ছোট লিস্ট আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি। আপনি এ ঔষধগুলো আপনি এখন আলাদা করে রেখে দিন। আমি কিছুক্ষণ পর আপনার দোকানে এসে নিয়ে যাবো, ডাক্তার আহমেদ বললেন।
মতিন সাহেব ডাক্তারের চেম্বার হতে বেরিয়ে নিজের দোকানে এলেন। ডাক্তারের দেয়া তালিকা অনুযায়ী ঔষধগুলো আলাদা করে কয়েকটা প্যাকেটে ভরে নিলেন। তারপর ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার আহমেদ একটা বাজারের থলে নিয়ে আসলেন। প্যাকেটগুলো নিয়ে বাজারের থলেতে ভরে নিলেন। বাজারের থলে হওয়ায় ব্যাগ নিয়ে চট করে রাস্তায় কেউ তাকে সন্দেহ করবে না। মতিন সাহেব ডাক্তারের বুদ্ধি দেখে খুশী হলেন।
৩
সপ্তাহখানেক পর। মতিন সাহেব দোকানে বসে আছেন। একটা কাস্টমার এসে ঔষধ চাইলো। কাষ্টমারটাকে দেখেই ভ্রু কুঁচকালেন মতিন সাহেব। একই কাস্টমার গত তিনদিন ধরে আসছে। একটা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে ঔষধ নিয়ে গেছে গত দুই দিন। আজও সেই একই প্রেসক্রিপশন নিয়ে এসে ঔষধ চাইলো। এ নিয়ে সে মোট তিনবার একই প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে ঔষধ নিলো।
মতিন সাহেব মনে মনে একটু অস্বস্তিবোধ করতে লাগলেন। কি মনে করে মন থেকে অস্বস্তিভাবটা দূর করে দিলেন নিজেই। কোন কাষ্টমার কি ঔষধ নেবে, সেটা নিয়ে তার ভাবনার দরকার কি- এই ভেবে তিনি ঔষধগুলো দিয়ে দিলেন।
একই দিন বিকেলবেলা। একটু পর ডাক্তার আহমেদ এর চেম্বার হতে ঔষধের লিস্ট আসবে। তার জন্য অপেক্ষা করছেন তিনি। প্রতিদিন বিকেলে ডাক্তার আহমেদ এর জন্য ঔষধ দিয়ে দিচ্ছেন মতিন সাহেব। ডাক্তার সাহেব যে ধরনের ঔষধ নিচ্ছেন, সেগুলো সবই কাটাছেঁড়া করার কাজের। মতিন সাহেব মনে মনে শুধু ভাবেন, কতো ছেলেরা আহত হচ্ছে! সারা দেশে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। কাতারে কাতারে পাকিস্তানি সৈনিকেরা মারা যাচ্ছে, তাদের সাথে সাথে মুক্তিযোদ্ধাসহ সাধারণ জনগনও মারা পড়ছে। যারা মারা যাচ্ছে, তাদের ব্যপারে একরকম ভাবনা। কিন্তু যারা আহত হচ্ছেন, তাদের জন্যে দূর্ভাবনা খুব বেশী। এখন ডাক্তার পাওয়া যায় না, ডাক্তার পাওয়া গেলেও ঔষধ পাওয়া যাচ্ছে না। যুদ্ধের অনেকগুলো কুৎসিত চেহারা থাকে। স্বাস্থ্যসেবার দুরবস্থা পৃথিবীর সকল যুদ্ধে ঘটে। এখানেও সেটাই হচ্ছে। দেশের এরকম পরিস্থিতিতে ডাক্তার আহমেদ যে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, সেটা ভাবতেই তার প্রতি শ্রদ্ধা আরো বেড়ে গেলো মতিন সাহেবের। প্রতিদিন নিয়ম করে সন্ধ্যায় কেরাণিগঞ্জ যাচ্ছেন। সেখানে গোপনে বিনামূল্যে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন।
হাতঘড়ির দিকে তাকালেন মতিন সাহেব। লিষ্ট আসতে আজ একটু দেরী হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হলো। এমন সময় তার দোকানের সামনে এসে আর্মির দুটা গাড়ি এসে থামলো। গাড়ি থেকে ইউনিফর্ম পরা কয়েকজন লোক নেমে এলো। মতিন সাহেব অবাক হয়ে দেখলেন, যে কাস্টমারটা রোজ একই ঔষধ কিনে নিয়ে যাচ্ছিলো, সেও ঐ গাড়ি থেকে নামলো। মনে মনে সতর্ক হয়ে গেলেন মতিন সাহেব।
৪
একটা খালি ঘরে বসে আছেন মতিন সাহেব। একই রুমে ডাক্তার আহমেদও আছেন। দুজনেই মাটিতে বসে আছেন। সারা গায়ে মারের চোটে কালশিটে পড়ে গেছে দুজনের। দুজনেই মাটিতে বসে বসে কোঁকাচ্ছেন। মতিন সাহেব বেশী কোঁকাচ্ছেন। ব্যথা সহ্য করতে পারেন না তিনি। একটু আগেই তাদেরকে এক দফা পিটিয়ে গেছে কয়েকজন পাকিস্তানি আর্মি। তাদের সাথে একটা বিহারীও এসেছিলো। সে চুপচাপ মতিন সাহেব আর ডাক্তার সাহেবের মার খাওয়া দেখছে, কিছু বলে না।
প্রতিদিন আসা ওই কাস্টমারটা মতিন সাহেবকে দেখিয়ে কানে কানে আর্মির দলটার কমান্ডারকে কি যেন বলে দিয়েছিলো। তারপর পাকিস্তানিগুলো কোন কথা না বলে তাকে ধরে তাদের গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে এসেছে। পাকিস্তানিদের ক্যাম্পেই আনার পর মতিন সাহেব দেখতে পেয়েছিলেন, সেখানে ডাক্তার আহমেদকে তারা আগেই ধরে নিয়ে এসেছে।
ক্যাম্পেই আনার পর দুজনকেই খান সেনারা বারবার জিজ্ঞেস করেছে, মুক্তি কোথায় আছে?
প্রশ্নের জবাবে দুজনেই নিরব থেকেছে। কারো কাছে কোন জবাব না পেয়ে উপস্থিত অফিসারটি রেগে গিয়ে সেখানে থাকা সেপাইগুলোকে বলে দিলেন, দুজনকে ভালো মতো ট্রিটমেন্ট দেয়ার জন্য। তখন হতে শুরু করে কিছুক্ষণ পরপর তাদের দুজনকেই মারধোর করা চলছে। এখন পর্যন্ত দুজনের কেউই ওদের কোন প্রশ্নের জবাব দেয়নি। এখানেই পাকিস্তানি সৈন্যগুলোর রাগ। তারা হয়তো ভেবেছিলো মাঝবয়েসী দুজন লোক, অল্প মারধোরেই কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন প্রশ্নের কোন জবাবই তারা বের করতে পারেনি। ক্যাম্প কমান্ডার তাদের দুজন সম্পর্কে সকল খোঁজখবর নিয়েছেন। তারা খুব ভালো করে খোঁজখবর নিয়েই ওদের দুজনকে ধরে এনেছে। ক্যাম্পে এনেই ক্যাম্প কমান্ডার তাদের সাথে যেভাবে কথা বলেছিলেন, তখনই তারা দুজনেই বুঝে ফেলেছে, তারা তাদের বাড়িঘর কোথায়, কি করে, ছেলেমেয়ে কজন – সব খবর তারা আগে থেকেই জানে।
এখন ঘরের ভেতর দুজনে মাটিতে বসে আছে। মতিন সাহেব আর পারলেন না, তিনি মাটিতে শুয়ে পড়লেন। এসময় ডাক্তার আহমেদ তাকে বললেন,
আমার জন্যেই আপনি এরকম বিপদে পড়লেন ভাই।
জবাবে মতিন সাহেব কিছু বললেন না। তার কোন আক্ষেপ নাই। তিনি বুঝেশুনেই এ কাজে নেমেছিলেন। দেশের সোনার ছেলেদের জন্য এটুকু কাজতো কোন ব্যাপারই না।
ডাক্তার আহমেদ এবার তাকে ডাক দিলেন।
মতিন ভাই, মতিন ভাই।
মতিন সাহেব ম্রিয় কন্ঠে বললেন, বলুন ভাই।
আমাকে মাফ করে দিয়েন। ডাক্তারের কন্ঠে অনুনয় ঝরে পড়ল। মতিন সাহেবের চোখে পানি এসে গেলো। তিনি কোনরকমে ঘাড় ঘুরিয়ে ডাক্তার সাহেবের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন,
মাফের কিছু নাই ভাই। আমি নিজের জ্ঞানবুদ্ধিতে আপনার কাজে আপনার সাথে হাত মিলিয়েছি। আপনি মনে কিছু রাখবেন না।
তারপর দুজন মানুষই চুপ করে রইলো। কে কি ভাবছে, সেটা কেবল সৃষ্টিকর্তাই জানেন। মতিন সাহেব আর ডাক্তার আহমেদ এখন যে অবস্থায় আছে, এরকম অভিজ্ঞতা সাধারণত সবার সাথে ঘটে না। তাই তাদের মনে কি চিন্তা হচ্ছে, সেটা অনুমান করা কঠিন। কিন্তু দুজনেই শূন্য দৃষ্টিতে ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। জীবনের হিসেব নিকেশ হয়তো করছেন অথবা জীবন কতো অর্থহীন, সেটাই ভাবছেন দুজনেই।
৫
মতিন সাহেব এবং ডাক্তার আহমেদ, দুজনকেই হাত পা বেঁধে ক্যাম্পের বাইরে অপেক্ষমান ট্রাকের পাশে আনা হয়েছে। গত চারদিন ধরে তাদেরকে ক্যাম্পেই বন্দি রেখে অকথ্য অত্যাচার চালানো হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে সিলিং এ ঝুলিয়ে পেটানো হয়েছে দুজনকেই। তখনো দুজনের কেউই কোন কথা না বলায় ক্যাম্প কমান্ডার সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলেন।
মতিন সাহেব আর ডাক্তার আহমেদ দুজনই চুপ করে আছেন। সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে তারা দুজনেই অনুমান করতে পারছেন। ভোর হয়ে এসেছে। গাড়িতে উঠানো হলো দুজনকেই, সাথে পাঁচজন সিপাই আর একজন হাবিলদার। সবাই ট্রাকে উঠার পর গাড়িটি চলতে শুরু করল। মিনিট পাঁচেকের মাথায় ট্রাকটা থেমে যাওয়াতে দুজনেই বুঝে ফেললেন, তাদের গন্তব্যে তারা চলে এসেছে। মিটফোর্ড হাসপাতালের দক্ষিণে বুড়িগংগার ধারে এসে গাড়িটা থেমেছে।
তাদের দুজনকেই গাড়ি হতে নামিয়ে নদীর ধারে দাঁড় করানো হলো। একজন সিপাই এসে দুজনের চোখ বেঁধে দিলো। মতিন সাহেবের মাথা ভোঁতা হয়ে গেছে। এখন কি হবে খুব বুঝতে পারছেন তিনি। ডাক্তার আহমেদের কলমা পড়ার শব্দে তিনি যেন একটু দিশা পেলেন। সাথে সাথে তিনিও জোরে জোরে কলমা পড়া শুরু করলেন। একবার পড়ে দ্বীতিয়বার পড়ার মাঝামাঝি সময়ে গুলির শব্দ শুনলেন মতিন সাহেব। ছিটকে পড়ে যাওয়ার সময় বুড়িগংগার পানির স্পর্শটুকু পর্যন্ত তিনি টের পেলেন।
(গল্পটি আমার লেখা প্রতিশোধ নামক গল্পগ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। বইটি শিখা প্রকাশনী থেকে ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে)