বৃদ্ধটা প্রতিদিন বিকেলে একই জায়গায় বসে থাকে। ঘরের দাওয়ায়, উঠানের পূর্ব ধারে। তার পায়ের সামনে উঠানে শুকনো পাতা পড়ে থাকে, আর একটা পুরোনো লাঠি দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা। বাড়িটা যেন ধীরে ধীরে মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে, ঠিক তার শরীরের মতোই, চুপচাপ, শব্দহীন।
লোকটা খুব কম কথা বলে। তবে কখনো কখনো রাস্তা দিয়ে যাওয়া মানুষদের থামায় এবং অদ্ভুত, অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে।
তুমি কি জানো, একটা শব্দ কতদিন বাঁচে?
অথবা,
মানুষ কি হাঁটে, নাকি তাকে হাঁটানো হয়?
লোকজন হাসে, কেউ কেউ অস্বস্তি বোধ করে, বেশিরভাগই তাড়াহুড়ো করে চলে যায়।
সে মাঝে মাঝে রাস্তায় হাঁটতে বের হয়। হাঁটা বললেও ভুল হবে। এটা যেন একটা ধীর, মাপা গতি, যেন সে কোনো অদৃশ্য সীমারেখা মেপে চলেছে। প্রতিটা পা ফেলার আগে সে একটু থামে, তারপর এগোয়।
একদিন বিকেলে, রাস্তার মোড়ে গিয়ে সে থেমে গেল। সামনে আরেকজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে, তার মতোই ক্ষীণ শরীর, তার মতোই চোখে অদ্ভুত শূন্যতা।
দু’জন একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। কোনো পরিচয় নেই, কোনো সম্ভাষণ নেই। শুধু তাকানো, যেন দু’জনেই অন্যের ভেতরে কিছু খুঁজছে।
প্রথম বৃদ্ধ কিছু না ভাবেই বলল,
তুমি কি এখনও গুনে গুনে হাঁটো?
দ্বিতীয় বৃদ্ধ একটু হেসে ফেলল।
কখনো বন্ধ হয়নি।
আমি থামাতে চেয়েছিলাম, প্রথমজন বলল। কিন্তু তারা থামেনি।
তারা কখনো থামে না, দ্বিতীয়জন উত্তর দিল। তুমি চোখ বন্ধ করলেও না।
তারা দু’জন রাস্তার ধারে বসে পড়ল। কেন যেন কেউই আর কথা বলছে না। আশেপাশে মানুষ চলাফেরা করছে, রিকশা যাচ্ছে, বাচ্চারা খেলছে, কিন্তু তাদের জন্য সময়টা যেন আলাদা হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পর প্রথম বৃদ্ধ হঠাৎ বলল,
তুমি কি যুদ্ধের দিনগুলো মনে করো?
মনে করতে চাই না, দ্বিতীয়জন বলল। কিন্তু যেগুলো ভুলতে চাই, সেগুলোই বেশি মনে পড়ে যায়।
প্রথমজন মাথা নেড়ে বলল,
আমার মনে হয়, আমরা ভুল যুদ্ধ করেছিলাম।
না, ঠিক তা নয়। দ্বিতীয়জন ধীরে বলল, ভুল যুদ্ধ ছিলো বলেই আমরা বেঁচে আছি হয়ত। তবে ভুল জায়গাতে যুদ্ধ করে ফেলেছিলাম।
আবার একটা দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল।
তারপর দ্বিতীয় বৃদ্ধ উঠে দাঁড়াল।
আমাকে যেতে হবে, সে বলল।
কোথায়?
সে একটু ভেবে বলল,
যেখানে আমি আগে থেকেই আছি।
আবার যাবে? প্রথম বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করল।
ডাক আসলেই যাব।
আমিও, ডাক আসার অপেক্ষায় দিন কাটাই।
সে হাঁটতে শুরু করল। ধীরে, কিন্তু থামল না। প্রথম বৃদ্ধ তাকিয়ে রইল, যতক্ষণ না লোকটা দৃষ্টির বাইরে চলে গেল।
সেদিন রাতে, প্রথম বৃদ্ধ ঘরে ফিরে এসে দাওয়ায় বসে রইল অনেকক্ষণ। তারপর হঠাৎ সে তার লাঠিটা হাতে নিল, আর উঠানের মাটিতে অদ্ভুত অদ্ভুত দাগ কাটতে শুরু করল, একটা, দু’টা, তিনটা…
ভোরবেলা প্রতিবেশীরা দেখে, উঠানের মাটি ভরা অদ্ভুত সব দাগে। যেন কোনো কিছুর ছক করা হয়েছে, কিন্তু সেটা কেউ বুঝতে পারছে না।
আর বৃদ্ধটা?
সে দাওয়ায় বসে আছে, আগের মতোই।
শুধু তার সামনে আর কোনো ফাঁকা জায়গা নেই—
সবখানে এখন দাগ,
যেগুলো সে নিজেও আর মুছবে না বলে ঠিক করেছে। শুধু সেই জানে, শেষবার যখন যুদ্ধে ছিল, তার পল্টনের সৈন্যরা এই ছক মোতাবেক মোতায়েন হয়েছিল। উঠানজুড়ে ছকটার দিকে একমনে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল বৃদ্ধ।
Comments
Be this story’s first reader
+25 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.