আমাদের গ্রামের নাম ছিল ধলেশ্বর। ছবির মতো সাজানো এক পল্লিগ্রাম। গ্রামের বুক চিরে বয়ে গেছে এক শান্ত নদী, যার নাম ছিল আড়িয়াল খাঁ-র এক শাখা মরা গাঙ। মরা গাঙ হলেও বর্ষাকালে তার রূপ বদলে যেত, দুই কূল উপচে জল ছুঁয়ে যেত পাড়ার উঠোন। সেই নদীর পূর্ব পাড়ে ছিল আমাদের বাড়ি, আর পশ্চিম পাড়ে, বাঁশঝাড়ের ছায়াঘেরা মেঠোপথ পেরিয়ে গেলে চৈতন্য বৈরাগীর বাড়ি।
চৈতন্য বৈরাগী, যাকে আমরা ডাকতাম ‘চিত্ত কাকা’। আর আমার বাবা, রইস উদ্দিন মুন্সী।
গ্রামের মানুষ বলত, রইস আর চিত্ত যেন এক বৃন্তের দুটি ফুল। কেউ কারও ছায়া ছাড়া চলত না। তাদের এই দোস্তি কোনো সামাজিক ভদ্রতা বা মুখের কথায় বাঁধা ছিল না; সে ছিল ‘জানে জিগার’ দোস্ত একজনের বুকের ভেতর নিঃশ্বাস আটকালে অন্যজনের চোখে জল আসত। ধর্মের যে অদৃশ্য পাঁচিল আমাদের সমাজ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, সেই পাঁচিল তাদের দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কোনোদিনই টিকতে পারেনি। সেখানে হিন্দু-মুসলমানের বিভেদ ছিল না, ছিল শুধুই মানুষের সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কের চেয়েও যা অনেক বেশি গভীর, অনেক বেশি খাঁটি। আমি জ্ঞান হওয়া থেকেই দেখে এসেছি এই দৃশ্য। ভোরবেলা ফজরের নামাজ পড়ে বাবা যখন তসবিহ হাতে দাওয়ায় এসে বসতেন, ঠিক তখনই মেঠোপথে খড়মের খটখট আওয়াজ তুলে চিত্ত কাকা হাজির হতেন। কাঁধে সাদা সুতির গামছা, মুখে মিষ্টি এক চিলতে হাসি।
"কী রইস, তসবিহ শেষ হলো? তামাকের ছিলিমটা সাজাব নাকি?"
বাবা মুখ তুলে হাসতেন। চোখের কোণে জমে থাকা বয়সের ভাঁজগুলো আলো হয়ে উঠত। "আয় চিত্ত, বোস। তোর হাতের এক ছিলিম তামাক না টানলে আমার সকালের আলসেমি কাটে না।" চিত্ত কাকা দাওয়ার এক কোণে বসে হুঁকো সাজাতেন। নারকেলের খোলের হুঁকোয় পোড়া তামাক আর টিকে পাতার সুবাস ছড়িয়ে পড়ত বাতাসে। বাবা হুঁকোতে টান দিয়ে চিত্ত কাকার হাতে দিতেন, কাকা টানতেন কোনো জাত-পাতের বিচার না করে। কাকা বৈষ্ণব মানুষ, গলায় তুলসীর মালা, নিরামিষাশী। কিন্তু বাবার হুঁকো টানতে তাঁর কোনো অশুচি লাগেনি কোনোদিন।
পাড়ার কিছু গোঁড়া হিন্দু হয়তো বাঁকা চোখে দেখত, আবার আমাদের পাড়ার কিছু অতি-ধার্মিক মানুষও ফিসফিস করত, "মুন্সীর ছেলে হয়ে বৈরাগীর সাথে এত পিরিত কিসের?" বাবা তাদের কথা শুনলে শুধু স্মিত হাসতেন। বলতেন, "আরে খোদা তো মানুষ বানাইছে একটা মাটির দলা দিয়া। রক্ত তো সবারই লাল। চিত্ত আমার ভাই, তারে আমি জাত দিয়া মাপি না, মাপি কলিজা দিয়া।"
আমাদের শৈশবটা ছিল এক অদ্ভুত স্বর্গের মতো। দুই ধর্মের কোনো উৎসবই একার ছিল না। রোজার ঈদের দিন সকালবেলা থেকেই আমাদের রান্নাঘরে মা আর দাদির ব্যস্ততা শুরু হতো। ক্ষীর, জর্দা আর ঘিয়ে ভাজা সেমাইয়ের সুবাসে ম-ম করত চারপাশ। নামাজ পড়ে বাবা বাড়ি ফিরতেই দেখতাম উঠোনে দাঁড়িয়ে চিত্ত কাকা। তাঁর পরনে ধুতি আর হালকা হলদে পাঞ্জাবি, হাতে থাকত পিতলের কাঁসার বাটিতে সাজানো নিজের বাগানের কচি ডাব আর মিষ্টি বাতাসা।
বাবা জায়নামাজ রেখে উঠোনে নেমেই চিত্ত কাকাকে বুকে জড়িয়ে ধরতেন। সেই কোলাকুলি শুধু ঈদের রীতির ছিল না, সে যেন দুই ভাইয়ের হৃদয়ের মিলন। মা হাসিমুখে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলতেন, "ঠাকুরপো, তোমার জন্য আলাদা করে মিষ্টি আর লাচ্ছা সেমাই সাজিয়ে রেখেছি। আজ কিন্তু কোনো বাহানা চলবে না, পেট ভরে খেতে হবে।"
চিত্ত কাকা হাত জোড় করে বলতেন, "বউদি, তোমার হাতের সেমাই না খেলে কি আমার ঈদ হয়? সারা বছর তো এই দিনটার জন্যই পথ চেয়ে থাকি।"
দাওয়ায় বসে কাকা তৃপ্তি করে খেতেন। বাবার দিকে তাকিয়ে বলতেন, "কী রইস, এবার একটা গান হোক নাকি?" বাবা গলা ছেড়ে শুরু করতেন লালনের গান
"সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে..."
চিত্ত কাকা মাথা নেড়ে সুর মেলাতেন।
আবার যখন দুর্গোৎসব বা সরস্বতী পূজা আসত, তখন আমাদের আনন্দের কোনো সীমা থাকত না। চিত্ত কাকার বাড়িতে যখন প্রতিমা আনা হতো, তখন প্রথম যে মানুষটি বাঁশ আর খড় কেটে কাঠামো বানাতে হাত লাগাতেন, তিনি ছিলেন আমার বাবা। বাবার মতো শক্ত হাতের গাঁথুনি ছাড়া নাকি কাকার মণ্ডপের ছাউনি সোজা হতো না! অষ্টমীর সকালে স্নান সেরে আমি আর বাবা চলে যেতাম কাকার বাড়ি। সেখানে কাঁসর-ঘণ্টার আওয়াজ, ধূপের গন্ধ আর ঢাকের বাদ্যে চারপাশ গমগম করত। কাকিমা বড় এক কাঁসার থালায় নারকেলের নাড়ু, তিলের তক্তি আর মোয়া এনে বাবার সামনে রাখতেন।
"দাদা, এই নাড়ুগুলো আমি নিজের হাতে নাড়ু বানিয়েছি, কোনো ছোঁয়াছুঁয়ি নেই।"
বাবা গম্ভীর মুখে বলতেন, "ছোট বউ, ছোঁয়াছুঁয়ির কথা বলে আমাকে পর কোরো না তো। তোমার হাতের নাড়ু তো আমার জন্য অমৃত।"
এমনই ছিল তাদের জীবন। সুখ-দুঃখের প্রতিটি ক্ষণ যেন এক সুতোয় গাঁথা ছিল। কারও জমিতে জল আটকানো নিয়ে পাড়ায় মাতব্বরদের সাথে বিরোধ হলে বাবা গিয়ে চিত্ত কাকার পক্ষে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে যেতেন। আবার আমাদের ঘরে যখন আমার ছোট বোনের টাইফয়েড হয়েছিল, গভীর রাতে মরা গাঙের ঝড়ো বাতাস আর বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দশ মাইল দূরের থানা শহর থেকে ডাক্তার ডেকে নিয়ে এসেছিলেন চিত্ত কাকা। সারারাত আমার বোনের শিয়রে বসে মাথায় জলপট্টি দিয়েছিলেন তিনি, এক মুহূর্তের জন্য চোখের পাতা এক করেননি।
কিন্তু পৃথিবীর সব সুন্দর গল্প হয়তো চিরকাল সুন্দর থাকে না। সময় বদলাতে শুরু করল। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে দেশে এবং সীমান্তের ওপারে যেন এক অদৃশ্য বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়তে লাগল। রাজনীতির বাতাস ভারী হয়ে উঠল। রেডিওতে ভেসে আসত অস্থিরতার খবর। শহরে দাঙ্গা, এখানে-সেখানে ভাঙচুর, অবিশ্বাস আর সন্দেহের খবর বাতাসে ভেসে বেড়াত। আমাদের শান্ত গ্রাম ধলেশ্বরেও সেই ঢেউ এসে আছড়ে পড়তে খুব বেশি সময় নিল না। বাইরে থেকে কিছু উটকো লোক গ্রামে আনাগোনা শুরু করল। হাটের চায়ের দোকানে হঠাৎ হঠাৎ অদ্ভুত সব আলোচনা শুরু হতো। রাতের অন্ধকারে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়ির দেওয়ালে কেউ কেউ ঢিল ছুঁড়ে যেত। বাতাসে কেমন যেন এক থমথমে ভয়, এক অদৃশ্য আতঙ্ক ডালপালা মেলতে শুরু করল।
আমি খেয়াল করলাম, চিত্ত কাকা কেমন যেন বদলে যাচ্ছেন। সেই প্রাণখোলা হাসিটা যেন মিলিয়ে যেতে লাগল। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে নেমে এল এক অদ্ভুত বিভ্রান্তি আর ক্লান্তি। ভোরবেলা বাবার কাছে আসতেন ঠিকই, কিন্তু তামাক টানতে টানতে হঠাৎ আনমনা হয়ে যেতেন। দূর দিগন্তের পানে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। একদিন বিকেলে আমি বারান্দায় বসে পড়ছিলাম। বাবা আর চিত্ত কাকা বসেছিলেন বাইরের কাঁঠাল গাছটার নিচে। চারপাশ শুনশান।
হঠাৎ চিত্ত কাকা খুব নিচু গলায় বাবাকে বললেন, "রইস, দেশটা কি আর আমাদের রইল?"
বাবা চমকে উঠে কাকার দিকে তাকালেন। বাবার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল। "কী বলিস চিত্ত? এই মাটি তোর না তো কার? তুই এই মাটিতে জন্মাইছিস, তোর বাপ-দাদার হাড় এই মাটিতে মিশে আছে। তুই এই কথা মুখ দিয়া বের করলি কেমনে?" চিত্ত কাকা মাথা নিচু করে রইলেন। তাঁর হাত দুটো কাঁপছিল। "আমি হয়তো ভয় পেতাম না ভাই। কিন্তু আমার ঘরে যে যুবতী মেয়েটা আছে, রাধার মা আছে... ওদের দিকে তাকালে আমার বুকের ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। রাতের বেলা কুকুরের ডাক শুনলেও চমকে উঠি। হাটে গেলে মানুষ যেভাবে তাকায়... মনে হয় আমরা বুঝি এই দেশের কেউ না, ভিনদেশি আপদ।"
বাবা কাকার কাঁধে হাত রাখলেন। বাবার হাতটাও কাঁপছিল, তবে তা রাগে আর যন্ত্রণায়। "যতদিন রইস উদ্দিনের গায়ে এক ফোঁটা রক্ত আছে, তোর দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস এই গ্রামের কারও নাই। তুই নিশ্চিন্তে থাক।" চিত্ত কাকা বাবার হাতের ওপর নিজের হাত রাখলেন। সেই স্পর্শে ছিল এক অসহায় কৃতজ্ঞতা, কিন্তু বাবার আশ্বাস তাঁর ভেতরের ভয়কে সম্পূর্ণ দূর করতে পারল না। কারণ যে ভয়ের নাম সাম্প্রদায়িকতা, তা কোনো একজন মানুষের লাঠির শক্তিতে থামানো যায় না; সে এক সর্বগ্রাসী আগুন, যা তিলে তিলে মানুষের বিশ্বাসকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।
এর ঠিক কয়েক মাস পরের ঘটনা। গ্রামের পরিবেশ আরও থমথমে হতে লাগল। হিন্দু পাড়ার দুই-একটি পরিবার রাতের অন্ধকারে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে শুরু করল। কেউ জানত না তারা কোথায় যাচ্ছে, কিন্তু সবাই বুঝত তারা সীমান্ত পেরিয়ে ওপারে চলে যাচ্ছে, যে পারকে তারা ভাবছে ‘নিরাপদ’। একদিন গভীর রাতে আমাদের ঘরের দরজায় টোকা পড়ল।
আমি তখনো জেগে ছিলাম, পরীক্ষার জন্য ল্যাম্পের আলোয় পড়ছিলাম। বাবা দ্রুত গিয়ে দরজা খুললেন। বাইরে দাঁড়িয়ে চিত্ত কাকা। মাথায় একটা চাদর জড়ানো, মুখটা ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে। বাবা তাঁকে ভেতরে টেনে এনে দরজা বন্ধ করে দিলেন। "কী হয়েছে চিত্ত? এত রাতে?"
চিত্ত কাকা মেঝেতে বসে পড়লেন। জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।-"রইস ভাই, আমাকে মাফ করে দাও। আমি আর পারছি না। আমি দেশ ছেড়ে চলে যাব।"
ঘরের ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। বাবা পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। অনেকক্ষণ কোনো কথা বের হলো না বাবার গলা দিয়ে। ল্যাম্পের শিখাটা সামান্য কেঁপে উঠল বাতাসের ঝাপটায়।
বাবা ধীরে ধীরে নিচু হয়ে চিত্ত কাকাকে টেনে তুললেন। কাকার দুই চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় জল ঝরছিল। বাবার কণ্ঠস্বর ছিল ভাঙা, অথচ বরফের মতো শান্ত।-"তুইও চলে যাবি, চিত্ত? আমাকে একা ফেলে?"
-"আমার আর কোনো উপায় নেই ভাই," কাকা কাঁদতে কাঁদতে বললেন। "আজ বিকেলে সনাতন সাহার বাড়িটা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে শুনেছ তো? ওরা বলছে, একে একে সবাইকে তাড়িয়ে দেবে। আমার রাধার বিয়ে দিতে হবে, ওর ভবিষ্যৎ আছে। আমি কাপুরুষের মতো পালাচ্ছি ভাই, কিন্তু এই মেয়েটার জন্য আমাকে পালাতেই হবে।"
বাবা অনেকক্ষণ দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল সাদা দাঁড়িতে। কিন্তু তিনি আর বাধা দিলেন না। তিনি বুঝেছিলেন, যে বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে চিত্ত কাকা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা কোনো আবেগের বাঁধ মানে না। একজন পিতার অসহায়ত্বের কাছে আজ তাদের আজন্মের বন্ধুত্বকে হার মানতে হচ্ছে।
"কবে যাবি?" বাবা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
"সব ঠিক হতে মাসখানেক লাগবে। জায়গা-জমিগুলো তো বেচতে হবে। কিন্তু কাউকে জানানো যাবে না ভাই। জানাজানি হলে পানির দরেও কেউ কিনবে না, উল্টো দখল হয়ে যাবে।"
বাবা কাকার কাঁধে হাত রেখে বললেন, "তুই কোনো চিন্তা করিস না। তোর জমি বিক্রির ব্যবস্থা আমি করব। কিন্তু টাকা তোদের ঘরে রাখা নিরাপদ না। সব টাকা আমার কাছে থাকবে।" পরের এক মাস ধরে চলল এক নীরব, বেদনাদায়ক নাটক। চিত্ত কাকা গোপনে তাঁর ভিটেমাটি আর চাষের জমিগুলো বিক্রি করতে লাগলেন। পাশের গ্রামের কিছু মাতব্বর আর ধনিক শ্রেণির লোক এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। তারা জলের দামে সেই পৈতৃক সম্পত্তি কিনতে শুরু করল। বাবা ছিলেন প্রতিটি চুক্তির সাক্ষী। চিত্ত কাকা জমি বিক্রির প্রতিটি পাইপয়সা এনে বাবার হাতে তুলে দিতেন।
আমাদের ঘরের মাটির নিচে একটা পুরনো লোহার সিন্দুক ছিল। বাবা সেই সিন্দুকে কাকার জীবনের সমস্ত সঞ্চয়, তাঁর ভিটেমাটির শেষ মূল্য সযত্নে রেখে দিতেন। মা প্রতিদিন রাতে সেই সিন্দুকের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলতেন। মা বলতেন, "মানুষের ভিটেমাটি কি এভাবে টাকায় মাপা যায়? এ যে রক্ত বেচা টাকা!" চিত্ত কাকা মাঝে মাঝে রাতে আসতেন। ঘরে বসে বাবার সাথে হিসাব মেলাতেন। কিন্তু টাকার অঙ্কের চেয়ে তাদের চোখের ভাষা ছিল অনেক বেশি ভারী। দুজন মানুষ মুখোমুখি বসে থাকতেন, কিন্তু কারও মুখে কোনো কথা ফুটত না। কেবল তামাকের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠত ঘরের চালের দিকে।
অবশেষে সেই দিনটি এল। অগ্রহায়ণের এক অমাবস্যার রাত। চারপাশ ঘন কুয়াশায় ঢাকা, হিমেল বাতাসে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা। গ্রামের সবাই তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কুকুরগুলো পর্যন্ত ডাকছিল না, এক নিস্তব্ধ, ভৌতিক পরিবেশ। চিত্ত কাকার বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে বের হলো চারটি ছায়া। চিত্ত কাকা, কাকিমা, তাঁদের তরুণী মেয়ে রাধা আর ছোট ছেলেটা। তাদের হাতে কোনো বড় বাক্সপেটরা ছিল না, শুধু ছোট দুটো কাপড়ের পোঁটলা। যাতে কেউ সন্দেহ না করে যে তারা দেশ ছেড়ে চিরতরে চলে যাচ্ছে। তারা কেবল তাঁদের শরীর নিয়ে বের হয়েছিল, পেছনে ফেলে যাচ্ছিল তাঁদের সাজানো ভিটে, গোয়ালঘর, তুলসীতলা আর শত বছরের পূর্বপুরুষের স্মৃতি।
আমাদের বাড়ির পেছনে বাঁশঝাড়ের আড়ালে বাবা দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাবার চাদরের নিচে ছিল সেই কাপড়ের থলে, যাতে রাখা ছিল চিত্ত কাকার সমস্ত টাকা। চিত্ত কাকা এসে বাবার সামনে দাঁড়ালেন। কুয়াশার ভেতর বাবার চোখ দুটো চিকচিক করছিল। বাবা কোনো কথা না বলে থলেটা চিত্ত কাকার হাতে তুলে দিলেন। তারপর কাকার হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরলেন।
"চিত্ত..." বাবার গলা দিয়ে কেবল এই একটি শব্দ বের হলো।
আর চিত্ত কাকা? তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। কাপড়ের থলেটা এক হাতে ধরে অন্য হাতে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। সেই কান্না কোনো সাধারণ মানুষের কান্না ছিল না। সে যেন নিজের শেকড় উপড়ে ফেলার তীব্র যন্ত্রণার চিৎকার, যা শব্দ হয়ে বের হতে পারছিল না বলে বুকের ভেতর গুমরে গুমরে মরছিল। বাবাও জড়িয়ে ধরলেন কাকাকে। দুই বয়োবৃদ্ধ মানুষ, একজন হিন্দু, একজন মুসলমান, সেই কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের রাতে বাঁশঝাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন। তাদের কান্নায় ভিজে যাচ্ছিল দুজনের চাদর। কাকিমা আঁচলে মুখ গুঁজে নিঃশব্দে কাঁদছিলেন, আর রাধা আমার মার পা জড়িয়ে ধরে বসে পড়েছিল।
মা রাধার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলেন, "মা রে, ভালো থাকিস। যেখানেই যাস, মা দুর্গাকে ভুলিস না।"
চিত্ত কাকা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "রইস ভাই, আমার ভিটেটা রইল... আমার তুলসীতলাটা একটু দেইখো ভাই। যদি কোনোদিন পারি... যদি কোনোদিন দেশটা ভালো হয়, আমি ফিরে আসব ভাই, আমি ফিরে আসব..."
বাবা কাকার পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, "তোর ভিটে কেউ নিতে পারবে না চিত্ত। আমি যতদিন বেঁচে আছি, তোর ভিটায় আমি একটা আগাছাও জমতে দেব না। তুই যা ভাই... খোদা তোদের নিরাপদে রাখুক।"
সীমান্তের দালাল অপেক্ষা করছিল মরা গাঙের ওপারে, চরের কাছে। নৌকায় করে তাদের নদী পার হতে হবে, তারপর মাইল পাঁচেক হেঁটে সীমান্ত পেরোতে হবে।
বাবা বললেন, "আমি তোদের একা ছাড়ব না। চরের ঘাট পর্যন্ত আমি এগিয়ে দিয়ে আসব।"
চিত্ত কাকা বারণ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলতে পারলেন না।
আমরা সবাই হাঁটতে লাগলাম। নিশুতি রাত, কুয়াশায় পথ দেখা যায় না। বাবা আর চিত্ত কাকা পাশাপাশি হাঁটছিলেন। কাকার হাতটা শক্ত করে ধরা ছিল বাবার হাতের মুঠোয় ঠিক যেমনটা তারা ছোটবেলায় মেঠোপথ ধরে মক্তব আর পাঠশালায় যাওয়ার সময় হাত ধরে হাঁটতেন। এই দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের পথচলা আজ এক অচেনা নদীর ঘাটে এসে শেষ হতে চলেছে।
ঘাটে বাঁধা ছিল একটা ছোট ডিঙি নৌকা। মাঝি হ্যারিকেনের আলো ঢেকে বসে ছিল। নৌকায় ওঠার সময় চিত্ত কাকা আবার ফিরে তাকালেন বাবার দিকে। কাকার দুই চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় জল ঝরছিল। তিনি নিচু হয়ে একমুঠো ভিজে মাটি তুলে নিলেন হাতে। সেই মাটি তিনি নিজের কপালে ছোঁয়ালেন, তারপর সযত্নে গুঁজে নিলেন চাদরের কোণায়।
"রইস ..."
বাবা এগিয়ে গিয়ে শেষবারের মতো কাকার কপালে হাত রাখলেন। "যা চিত্ত। সাবধানে যাস। পৌঁছে খবর দিস।"
নৌকা ছেড়ে দিল। জলের ওপর বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ হতে লাগল। কুয়াশার চাদর ভেদ করে নৌকাটি ধীরে ধীরে দূরে চলে যেতে লাগল। চিত্ত কাকা নৌকার গলুইয়ে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছিলেন। সেই হাত নাড়ার মাঝে যেন ধরা ছিল এক অপূরণীয় শূন্যতা।
বাবা দাঁড়িয়ে রইলেন নদীর কূলে। কুয়াশা আর অন্ধকারের মধ্যে নৌকাটি যখন পুরোপুরি মিলিয়ে গেল, তখনো বাবা একইভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নদীর ঠান্ডা বাতাস এসে বাবার গায়ের চাদর উড়িয়ে দিচ্ছিল। বাবার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছিল তাঁর সাদা দাঁড়িতে। আমি গিয়ে বাবার হাত ধরলাম, "আব্বা, চলেন বাড়ি যাই। অনেক ঠান্ডা।" বাবা আমার দিকে তাকালেন। সেই চোখে যে তীব্র যন্ত্রণা আর শূন্যতা আমি দেখেছিলাম, তা আমি আজও ভুলতে পারিনি। বাবা ফিসফিস করে বললেন, "আমার একটা ডানা ভাইঙ্গা গেল রে বাজান। রইস উদ্দিনের শরীরটা আজ থেইকা আধা হয়ে গেল।"
সেদিন রাতে অনেক দূর পর্যন্ত বাবা চিত্ত কাকাকে এগিয়ে দিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু বাবার মনটা হয়তো সেই নৌকার সাথে ভেসে সীমান্ত পেরিয়ে চলে গিয়েছিল।
চিত্ত কাকা চলে যাওয়ার পর ধলেশ্বর গ্রামটা যেন বাবার কাছে এক অচেনা বিজন প্রান্তরে পরিণত হলো। পরের দিন সকাল থেকেই গ্রামে খবর রটে গেল চৈতন্য বৈরাগী দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। কিছু লোক আফসোস করল, আর কিছু লোভী মানুষ তৎক্ষণাৎ কাকার শূন্য ভিটের দিকে শকুনের মতো চোখ দিতে শুরু করল। কিন্তু বাবা ছিলেন এক অনড় দেয়াল। বাবা গ্রামের মাতব্বরদের ডেকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, "চিত্তর ভিটায় কেউ নজর দিলে আমি নিজের হাতে তার গর্দান নেব। ওই ভিটে চিত্তর, চিত্ত না থাকলে ওই ভিটে খোদার।" বাবার ব্যক্তিত্ব আর সম্মানের সামনে কেউ সেই ভিটে দখল করার সাহস পেল না।
কিন্তু বাবার ভেতরের মানুষটা দিন দিন ফুরিয়ে যেতে লাগল। আগের মতো বাবা আর ফজরের পর দাওয়ায় এসে বসতেন না। হুঁকো টানতেন না। সারাক্ষণ কেমন যেন মনমরা হয়ে থাকতেন। একা একা বসে থাকতেন কাঁঠাল গাছটার নিচে, যেখানে বসে চিত্ত কাকা তামাকের ছিলিম সাজাতেন। কখনও কখনও বাবা নিজেই হেঁটে চলে যেতেন মরা গাঙের ওপারে, চিত্ত কাকার পরিত্যক্ত বাড়িতে। আমি একদিন বাবার পিছু পিছু গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম, বাবা দাঁড়িয়ে আছেন কাকার উঠোনে। কাকার ঘরের দরজায় মরচে ধরা তালা ঝুলছে। উঠোনে আগাছা জমেছে। তুলসীতলার মাটি শুকিয়ে ফেটে গেছে। বাবা নিজের কাঁধের গামছা দিয়ে তুলসীতলার জঞ্জাল পরিষ্কার করলেন। তারপর পাশে থাকা পাতকুয়ো থেকে এক ঘটি জল তুলে তুলসীগাছের গোড়ায় ঢেলে দিলেন।
আমি অবাক হয়ে বললাম, "আব্বা, আপনি এ কী করছেন?"
বাবা ফিরে তাকালেন। বাবার চোখে জল। বললেন, "চিত্ত যাওয়ার সময় বলে গেছিল তার তুলসীতলাটা দেইখো। আমি ওর কাছে ওয়াদা করছিলাম। মানুষ হিসেবে মানুষের ওয়াদা রাখা ধর্মের চেয়েও বড় রে বাজান।" বাবা প্রায়ই কাকার শূন্য বারান্দায় গিয়ে বসে থাকতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বাতাস যখন বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে শনশন করে বয়ে যেত, বাবার মনে হতো চিত্ত বুঝি ডাকছে "কী রইস ভাই, তামাক টানবা না?"
মাস ছয়েক পর এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের মাধ্যমে কলকাতা থেকে একটা চিঠি এল। পোস্টকার্ডের সেই চিঠি ছিল চিত্ত কাকার। চিঠিতে বেশি কিছু লেখা ছিল না। শুধু লেখা ছিল
"পরম শ্রদ্ধেয় রইস,
আমরা বেঁচে আছি। বনগাঁর এক কলোনিতে এক চিলতে টিনের ঘরে ঠাঁই হয়েছে। শরীরটা ভালো নেই, মনটা তো সেই ধলেশ্বরের চরেই ফেলে এসেছি। রাধার বিয়ে ঠিক হয়েছে এক সাধারণ পাত্রের সাথে। টাকাগুলো দিয়েই সব করছি। কেমন আছেন ভাই? আমার জন্য মন খারাপ করবে না। পরজন্মে যদি খোদা মানুষ করে পাঠায়, তবে যেন আবার আপনার পাশেই আমার বাড়িটা হয়। ইতি- চিত্ত।"
বাবা চিঠিটা বুকের সাথে চেপে ধরে সারারাত কেঁদেছিলেন। সেই চিঠিটা বাবা তাঁর পাঞ্জাবির পকেটে রেখে দিতেন সবসময়, যেন ওটা কোনো চিঠি নয়, চিত্ত কাকার শরীরের উষ্ণতা।
বহু বছর কেটে গেছে। মরা গাঙের অনেক জল শুকিয়ে গেছে, ধলেশ্বর গ্রামে আজ পিচঢালা রাস্তা হয়েছে, আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। বাবা আজ আর বেঁচে নেই। জীবনের শেষ দিনগুলোতেও বাবা যখন স্মৃতি হারিয়ে বিছানায় পড়ে ছিলেন, প্রলাপ বকতেন, তখনো একটি নামই বারবার তাঁর মুখে উচ্চারিত হতো "চিত্ত... অ চিত্ত... হুঁকোটা সাজালি না?" চিত্ত কাকাও হয়তো ওপারে আর বেঁচে নেই, কিংবা বার্ধক্যের ভারে স্মৃতি হারিয়ে কোনো এক অচেনা গলিতে শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছেন।
কিন্তু আজ যখন আমি গ্রামে ফিরে যাই, যখন সেই মেঠোপথ ধরে হেঁটে যাই মরা গাঙের পাড়ে, তখন আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে দুই বন্ধুর সেই চিরন্তন ছবি। এক অমাবস্যার রাতে কুয়াশার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা দুটি মানুষ, যারা ধর্মের সমস্ত বিভেদ, রাজনীতির সমস্ত কুটিলতা আর সীমান্তের সমস্ত কাঁটাতারকে তুচ্ছ করে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই, নহে কিছু মহীয়ান।
তাঁদের সেই অশ্রুভেজা কোলাকুলি, সেই রাতের অন্ধকারে এগিয়ে দেওয়া আর আজীবন এক শূন্য ভিটে পাহারা দেওয়ার গল্প আজও ধলেশ্বরের বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়। তাঁদের বন্ধুত্ব হিন্দু-মুসলমানের সংকীর্ণ সীমানা পেরিয়ে হয়ে উঠেছিল এক খাঁটি মানবিকতার উপাখ্যান যা শিখিয়ে গেছে, দেশ ভাগ হতে পারে, ভূগোল বদলে যেতে পারে, কিন্তু আত্মার টান কোনোদিন কাঁটাতারে আটকে রাখা যায় না।