একুশে বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে তখন উপচে পড়া ভিড়। মলাটের নতুন গন্ধ, ধুলোবালির ওড়াওড়ি আর মাইকের ঘোষণার মাঝে ৪৫ বছর বয়সী আনিসুর রহমান ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন 'শব্দশৈলী প্রকাশনী'র স্টলটার সামনে। তার চারপাশের পৃথিবীটা আচমকাই যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। তার পাণ্ডুলিপিতে লেখা নামটুকুও বদলানো হয়নি; গোটা গোটা অক্ষরে হুবহু ছাপা হয়েছে।
স্টলের প্রধান কাউন্টার জুড়ে তখন এক ঝাঁক ক্যামেরা আর মিডিয়ার বুম। একটা নামী টিভি চ্যানেলের লাইভ ব্রডকাস্ট চলছে। রিপোর্টার মাইক্রোফোন হাতে চড়া গলায় বলছেন, "সুধী দর্শক, আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি শব্দশৈলী প্রকাশনীর সামনে। আমাদের সাথে আছেন এই মেলার সবচেয়ে আলোচিত এবং বেস্টসেলার কবি সাফায়েত আহমেদ! যার নতুন কাব্যগ্রন্থ 'নীল সমুদ্রের এপিটাফ' কিনতে পাঠকদের দীর্ঘ লাইন..."
আনিসের হাতদুটো প্রচণ্ড কাঁপছে। রিপোর্টারের ঠিক পেছনে ঝুলছে বড় ডিজিটাল ব্যানার। আর তার ঠিক নিচে দাঁড়িয়ে সাফায়েত। ত্রস্ত হাতে একটা বই তুলে নিয়ে আনিস দেখলেন। ভেতরে ছাপা হওয়া প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কমা, সেমিকোলন, এমনকি প্রতিটি লাইনের ছন্দও আনিসের নিজের বুকের রক্ত দিয়ে লেখা! গত দশ বছর ধরে লোকাল বাসের ভিড়ে, মাঝরাতে ডায়েরির পাতায় লুকিয়ে রাখা তার সেই কলিজার টুকরো কবিতাগুলো আজ সাফায়েতের নামে কোটি মানুষের সামনে লাইভ প্রচার করা হচ্ছে!
ভিড়ের চাপে আনিস যখন স্টলের কাউন্টারের একদম সামনে, ঠিক ক্যামেরার ফ্রেমে এসে দাঁড়ালেন, তখনই সাফায়েতের সঙ্গে তার চোখাচোখি হলো। সাফায়েতের মুখের চওড়া হাসিটা লাইভ ক্যামেরার সামনেই এক মুহূর্তের জন্য জমে গেল।
কিন্তু সাফায়েত জাত অভিনেতা। মুহূর্তেই সে নিজেকে সামলে নিল। তার চোখেমুখে কোনো অপরাধবোধ বা ভয় ফুটে উঠল না; বরং ক্যামেরার সামনে নিজেকে আরও বিনয়ী ও মহান দেখাতে সে এক মোক্ষম চাল চালল। সে এমন একটা ভাব করল যেন আনিসকে সে চেনেই না!
ক্যামেরার লেন্সের দিকে তাকিয়ে, মুখে চাটুকারিতা মেশানো একগাল হাসি নিয়ে সাফায়েত আনিসকে উদ্দেশ্য করে বলল, "দেখুন দর্শক, এই যে আমার সাধারণ পাঠকদের ভালোবাসা! এই ভদ্রলোক বোধহয় আমার কবিতার একনিষ্ঠ ভক্ত। কেমন আছেন ভাইয়া? বইটা নেবেন? এবারের মেলার স্পেশাল কালেকশন।"
আনিস পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে রইলেন। লেন্সের লাল আলোটা তার চোখের ওপর জ্বলজ্বল করছে। তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ সরল না। সাফায়েত নিজেই কাউন্টার থেকে আনিসের বুকের রক্তে লেখা সেই চুরি করা বইটার একটি কপি হাতে নিল। লাইভ ক্যামেরার সামনে দামী জেল-পেন দিয়ে প্রথম পাতায় ঝটপট লিখল—‘প্রিয় পাঠককে শুভেচ্ছাসহ—সাফায়েত’।
তারপর অটোগ্রাফ দেওয়া সেই চুরি করা বইটা আনিসের কাঁপতে থাকা হাতের ওপর আলতো করে ধরিয়ে দিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলল, "এই নিন আপনার কপি ভাইয়া। আপনার মতো পাঠকদের অনুপ্রেরণাতেই আমি কবি সাফায়েত হতে পেরেছি। আশা করি কবিতাগুলো আপনার ভালো লাগবে। পাশের কাউন্টারে গিয়ে পেমেন্টটা ক্লিয়ার করে দেবেন প্লিজ। নেক্সট..."
ক্যামেরার সামনে সাফায়েত খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আনিসকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে পেছনের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য এক তরুণী ভক্তের দিকে মনোযোগ দিল। রিপোর্টার তখন ক্যামেরার দিকে ঘুরে বলছেন, "দেখলেন তো দর্শক, কবির এই বিনম্রতা..."
আনিসের মনে হলো কেউ যেন তার কলিজাটা টেনে বের করে মেলার ধুলোবালির মধ্যে পিষে ফেলল। হাতের বইটার দিকে তাকিয়ে তার শরীর কাঁপতে লাগল। রাগে, ক্ষোভে আর অপমানে তার ইচ্ছে হলো চিৎকার করে ক্যামেরার সামনেই বলে—'এই লোকটা চোর! ও আমার পাণ্ডুলিপি মেরে দিয়েছে!'
এই জাঁকজমকপূর্ণ লাইভ মিডিয়া আর প্রভাবশালী প্রকাশকের বিরুদ্ধে মেলাপ্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে চ্যাঁচামেচি করলে বাউন্সাররা তাকে ঘাড় ধরে বের করে দেবে, আর লাইভ টিভিতে লোকে তাকেই পাগল ভাববে। কারণ ক্ষমতাবানদের সঙ্গে আনিস সাহেবের মতো ছাপোষা মানুষদের যুদ্ধ করার মতো সামর্থ্য থাকে না।
মনে মনে ভাবলেন, সেদিন সাফায়েতের কথায় প্ররোচিত হয়ে সাধের চাকরিটা ছেড়ে দিলে আজ তিনি পুরোপুরি বেকার হয়ে বসে থাকতেন। পায়ের তলার মাটি হারিয়ে ফেলা আনিস বইটা কাউন্টারে ফেলে রেখে ধীরপায়ে ভিড় ঠেলে স্টলটা থেকে দূরে সরে এলেন।
টিএসসির মোড়ে এসে যখন জ্যামের মাঝে একটা চেনা লোকাল বাস এসে থামল, আনিসের শূন্য দৃষ্টি চলে গেল আকাশের দিকে। তিনি অতীতে ফিরে গেলেন। ঠিক চার মাস আগের এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়... যে রাতে ধানমন্ডির সেই ক্যাফেতে বসে সাফায়েত তার বিশ্বাসের গলায় ছুরি চালিয়েছিল...
ধানমন্ডির একটা নামী ক্যাফে। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি, কাঁচের দেয়ালে জলবিন্দু গড়িয়ে পড়ছিল। ভেতরে মৃদু আলো আর ব্যাকগ্রাউন্ডে হালকা ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক।
টেবিলের একপাশে আনিস বসে ছিলেন, তার পরনে ইস্ত্রি করা কিন্তু কিছুটা রংচটা শার্ট। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু টেবিলে রাখা পুরোনো ডায়েরিটার দিকে তাকালে তার চোখ দুটো চকচক করে উঠছিল। অন্য পাশে সাফায়েত, দামী পাঞ্জাবি পরা, চোখে ব্র্যান্ডেড চশমা।
সে ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাচ্ছিল, মুখে ফুটিয়ে তুলেছিল এক অদ্ভুত মুগ্ধতা। সাফায়েত কফি কাপে একটা চুমুক দিয়ে ডায়েরিটা ধপ করে টেবিলের ওপর রাখল। আনিসের দিকে ঝুঁকে এসে বলল,
— "আনিস, তুই আসলেই একটা গাধা! এত বড় একটা অপরাধ তুই কীভাবে করছিস রে ভাই?"
আনিস কিছুটা ভড়কে গিয়ে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করতে করতে বললেন,
— "অপরাধ? কীসের অপরাধ সাফায়েত?"
— "এই যে এই কবিতাগুলো!" সাফায়েত ডায়েরিটার ওপর হাত চাপড়ে বলল, "এগুলো কবিতা না রে ভাই, এগুলো এক একটা মাস্টারপিস! 'নীল সমুদ্রের এপিটাফ' কবিতাটা পড়ে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেছে। আর তুই এই খাতাটা আলমারির নিচে লুকিয়ে রেখে প্রতিদিন ওই থার্ড ক্লাস কোম্পানিতে গিয়ে নয়টা-পাঁচটা গোলামি করছিস? বসের ঝাড়ি খাচ্ছিস? এটা তোর প্রতিভার সঙ্গে অপরাধ না?"
আনিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু হাসলেন। মলিন সেই হাসি।
— "তোর মতো প্রতিভাবান মানুষের এই গোলামি করার কোনো দরকার নেই। তুই চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি কবি হয়ে যা। তোর কবিতার পাণ্ডুলিপি আমাকে দে, আমি বইমেলায় বড় করে বের করব। এমনভাবে মার্কেটিং করব যে তুই রয়্যালিটির টাকা দিয়েই রাজকীয়ভাবে সংসার চালাতে পারবি। তুই কি তোর ভাইয়ের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারিস না?"
সাফায়েতের চোখের দিকে তাকিয়ে আনিসের মনে হয়েছিল, এই ঢাকা শহরে এত বছর পর বোধহয় একজন সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষী পাওয়া গেল। আনিস ডায়েরিটা সাফায়েতের দিকে এগিয়ে দিয়ে সরল মনে বলেছিলেন,
"তোর ওপর আমার পুরো বিশ্বাস আছে রে সাফায়েত। ঠিক আছে, কালই আমি রিজাইন লেটারটা মেইল করে দেব।"
উচ্ছ্বাস নিয়ে রাতে বাড়ি ফিরেছিলেন আনিস। ড্রয়িংরুমে ব্যাগটা রেখেই স্ত্রী রেহানাকে ডেকে বললেন,
"রেহানা, একটা দারুণ খবর আছে! সাফায়েত আমার কবিতার খাতাটা দেখেছে। ও বলল এগুলো নাকি অসাধারণ মাস্টারপিস! ও নিজের প্রকাশনী থেকে আমার একক বই বের করবে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কালই চাকরিটা ছেড়ে দেব। এই কর্পোরেট গোলামি করে কবিতা লেখা যায় না।"
রেহানা তখন রান্নাঘরের কাজ শেষ করে এসে সোফায় বসেছিল। আনিসের কথা শুনে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। ঢাকার কঠিন বাস্তবতায় সংসার টেনে নেওয়া রেহানা এক মুহূর্তের জন্য চুপ করে রইল, তারপর দৃঢ় গলায় বলল,
“আবেগে ভেসে চাকরি ছাড়ার কথা মুখেও আনবেন না।”
আনিস অবাক হয়ে বললেন, "কেন রেহানা? সাফায়েত তো আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু, ও এখন বড় প্রকাশক..."
"বন্ধু হতে পারে, কিন্তু ও ব্যবসায়ী," রেহানা আনিসের হাতদুটো ধরে বলল। "ঢাকা শহরে ওই সাফায়েত আপনার মাস শেষের বাসা ভাড়া আর বাচ্চার স্কুলের ফি দিতে আসবে না। কবিতা দিয়ে যদি সংসার চলত, তবে দেশের সব কবিরা কোটিপতি হতো। আমার সোজা কথা—বই বের হতে থাকে হোক, ওটা আপনার শখ। কিন্তু আপনার চাকরিটা যেভাবে করছেন, সেভাবেই করবেন। ওই নিশ্চিত আয়ের পথ আপনি বন্ধ করতে পারবেন না।"
আনিস সেদিন রেহানার ওপর মনে মনে কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। ভেবেছিলেন রেহানা হয়তো তার প্রতিভাকে মূল্য দিচ্ছে না, তার ভেতরের কবিকে বুঝতে পারছে না। কিন্তু স্ত্রীর অনড় অবস্থানের কাছে বাধ্য হয়ে তিনি আর পরদিন রিজাইন লেটার জমা দেননি। ক্ষোভ আর ক্লান্তি নিয়ে হলেও প্রতিদিন নিয়ম করে নয়টা-পাঁচটার অফিসটাই করে গিয়েছেন।
হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ বাসের হর্নের আওয়াজে আনিসের ঘোর কাটল। তিনি নিজেকে আবিষ্কার করলেন বইমেলার বাইরের ধুলোবালি আর টিএসসির চিরচেনা জ্যামের বাস্তবতায়।
আনিসের চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। তবে এই জলটা শুধু ধোঁকা খাওয়ার কষ্টের ছিল না; এর মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক পরম স্বস্তি আর স্ত্রীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা। আনিস পকেটে হাত দিলেন। তার আঙুল স্পর্শ করল অফিসের চেনা আইডি কার্ড আর মানিব্যাগটা, যেখানে মাসের শেষে নির্দিষ্ট একটা বেতন জমা হয়।
তিনি মনে মনে ভাবলেন—যদি সেদিন রেহানার কথা না শুনে সাফায়েতের মায়াজালে পড়ে চাকরিটা ছেড়ে দিতেন, তবে আজ তার পুরো পরিবার না খেয়ে রাস্তায় বসত। সাফায়েত তার বহু বছরের সৃষ্টি চুরি করেছে ঠিকই, কিন্তু রেহানার সেই কঠিন বাস্তববুদ্ধির দেওয়া দেয়ালটা ভাঙতে পারেনি। সাফায়েত তার লেখা কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু তার সংসার কাড়তে পারেনি।
আনিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বুকটা হালকা লাগল। তিনি ভিড় ঠেলে চেনা মিরপুরগামী লোকাল বাসটিতে উঠে পড়লেন। বাসের ভেতর চেনা জ্যাম, চেনা মানুষের ধাক্কাধাক্কি। জানালার পাশে একটা সিট পেয়ে আনিস বসে পড়লেন।
বাইরে বসন্তের বাতাস। আনিস পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করলেন। নোটপ্যাড খুলে স্ক্রিনের সাদা পাতায় কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করলেন—
“তুমি আমার সৃষ্টি চুরি করেছো, হে ধূর্ত বণিক !
স্রষ্টার সৃষ্টিশীলতা চুরি করতে পারোনি;
আমার শব্দ কেড়ে নিয়েছো,
শব্দের জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা নয়...”
আনিস থামলেন। ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য একটা হাসি ফুটে উঠল।
সাফায়েত তার বহু বছরের সঞ্চয় চুরি করেছে—তার লেখা, তার স্বপ্ন, তার পরিশ্রম। কিন্তু একটা জিনিস সে কোনোদিনই চুরি করতে পারবে না—আনিসের সৃষ্টির ক্ষমতা।
বাসটি তখন ধীরে ধীরে জ্যাম পেরিয়ে তার চেনা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। সামনে তার ছোট্ট সংসার, অপেক্ষায় রেহানা। আর আনিসের বুকের ভেতর, বহুদিন পর, আবার একটি নতুন কবিতা জন্ম নিচ্ছে।
(সমাপ্ত)