রাত ১১টা ৪০ মিনিটে থানায় এসে লোকটা বলল, সে তার স্ত্রীকে খুন করেছে।
ডিউটি অফিসার প্রথমে ভেবেছিলেন, লোকটা হয়তো নেশা করেছে। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, পরনে ধূসর শার্ট, কালো প্যান্ট। চেহারায় ক্লান্তি আছে, কিন্তু চোখেমুখে আতঙ্ক নেই। বরং অদ্ভুত এক ধরনের স্বস্তি।
“নাম?”
“সায়েম রহমান।”
“কাকে খুন করেছেন?”
“আমার স্ত্রীকে। নীরা রহমান।”
“কোথায়?”
“আমাদের বাসায়। শোবার ঘরে।”
অফিসার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। দুজন কনস্টেবলকে সঙ্গে নিয়ে সায়েমের দেওয়া ঠিকানায় রওনা হলেন। যাওয়ার আগে সায়েম শুধু একটা কথা বলেছিল,
“স্যার, ওকে হাসপাতালে নেওয়ার দরকার নেই। ও আর বাঁচবে না।”
কথাটা অফিসারের ভালো লাগেনি।
রাত ১২টা ১২ মিনিটে তাঁরা সায়েমের ফ্ল্যাটে পৌঁছালেন। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল না। বসার ঘরে টেলিভিশন চলছিল, টেবিলে দুটো চায়ের কাপ, একপাশে খোলা বই। কোথাও রক্তের চিহ্ন নেই।
শোবার ঘরে গিয়ে অফিসার দেখলেন, বিছানায় একজন মহিলা ঘুমাচ্ছেন।
“ম্যাডাম?”
মহিলাটি চোখ খুললেন। প্রথমে পুলিশের পোশাক দেখে ঘাবড়ে গেলেন। তারপর উঠে বসে বললেন,
“কী হয়েছে?”
“আপনার নাম নীরা রহমান?”
“জি।”
“আপনার স্বামী কোথায়?”
নীরা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলেন।
“আমার স্বামী?”
“সায়েম রহমান। তিনি থানায় গিয়ে বলেছেন, আপনাকে খুন করেছেন।”
মহিলার মুখ থেকে রক্ত সরে গেল।
তিনি ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামলেন। তারপর এমন একটা প্রশ্ন করলেন, যা শুনে অফিসারও থমকে গেলেন।
“উনি কি বলেছেন, আমাকে কীভাবে মেরেছেন?”
থানায় ফিরে নীরাকে সায়েমের মুখোমুখি বসানো হলো।
সায়েম তাকে দেখে হাসল না, কাঁদলও না। শুধু বলল,
“তুমি এখনো বেঁচে আছ?”
নীরা কোনো উত্তর দিলেন না।
“তোমাকে তো আমি মেরেই ফেলেছিলাম।”
“কখন?” অফিসার জানতে চাইলেন।
সায়েম ঘড়ির দিকে তাকাল।
“রাত দশটা পঁয়তাল্লিশে।”
নীরা সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
“অসম্ভব। রাত দশটা পঁয়তাল্লিশে আমি আমার বোনের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলাম।”
“ফোনে?” সায়েম এবার তাঁর দিকে তাকাল। “তুমি তো ফোনটা ভেঙে ফেলেছিলে।”
“কোন ফোন?”
“তোমার কালো ফোনটা।”
নীরা কাঁপা গলায় বললেন,
“আমার ফোন এখনো আমার কাছেই আছে।”
তিনি ব্যাগ থেকে ফোন বের করে টেবিলে রাখলেন।
সায়েমের মুখের ভাব বদলে গেল। প্রথমবারের মতো তাকে সত্যিই বিভ্রান্ত দেখাল।
“না,” সে বিড়বিড় করে বলল। “এটা হতে পারে না।”
তদন্ত কর্মকর্তা ইমরান হোসেন এতক্ষণ চুপচাপ দুজনের কথা শুনছিলেন। তাঁর পনেরো বছরের চাকরিজীবনে স্বামীকে স্ত্রীর খুনের দায়ে থানায় আত্মসমর্পণ করতে দেখেছেন, স্ত্রীকে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে দেখেছেন। কিন্তু জীবিত স্ত্রীকে খুন করার কথা স্বীকার করে এমন নির্বিকার স্বামী দেখেননি।
ইমরান সায়েমকে জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনি কি আজ রাতে মদ খেয়েছেন?”
“না।”
“কোনো ওষুধ?”
“নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খাই।”
“আজ খেয়েছেন?”
“হ্যাঁ। রাত আটটার দিকে।”
“কেন স্ত্রীকে খুন করলেন?”
সায়েম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“কারণ সে আমাকে মেরে ফেলত।”
নীরা মাথা তুলে তাকালেন।
“আমি?”
“তুমি জানো, তুমি কী করেছ।”
“আমি কিছুই করিনি।”
সায়েম টেবিলে দুই হাত রাখল। তার আঙুলগুলো কাঁপছিল।
“আপনি চাইলে আমার বাসায় গিয়ে দেখুন। বিছানার নিচে একটা ছুরি আছে। রান্নাঘরের ছুরি না। কালো হাতলওয়ালা ছুরি।”
ইমরান একজন কনস্টেবলকে ফোন করলেন। ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালানো হলো। বিছানার নিচে সত্যিই একটা ছুরি পাওয়া গেল।
ছুরিতে রক্ত ছিল না।
কিন্তু ছুরির হাতলে সায়েমের আঙুলের ছাপ পাওয়া গেল।
পরদিন সকালে সায়েমকে মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নের জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। তবে তার আগে ইমরান ঘটনাটার প্রতিটি অংশ যাচাই করতে চাইলেন।
নীরার বোনকে ফোন করা হলো। তিনি নিশ্চিত করলেন, রাত দশটা থেকে এগারোটা পর্যন্ত নীরা তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। কল রেকর্ডেও তার প্রমাণ পাওয়া গেল।
অন্যদিকে, ভবনের নিরাপত্তাকর্মী জানালেন, সায়েম রাত দশটার পর একবার বাইরে বেরিয়েছিলেন। প্রায় এগারোটার দিকে ফিরে এসে সরাসরি লিফটে উঠেছিলেন।
“কোথায় গিয়েছিলেন?” ইমরান জিজ্ঞেস করলেন।
সায়েম বলল,
“থানায়।”
“কিন্তু আপনি তো বলছেন, রাত দশটা পঁয়তাল্লিশে স্ত্রীকে খুন করেছেন।”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে এগারোটায় বাইরে থেকে ফিরলেন কীভাবে?”
সায়েম এবার মাথা চেপে ধরল।
“আমি জানি না।”
ইমরান তাঁর সামনে একটা কাগজ রাখলেন।
“আপনার স্ত্রী জীবিত। আপনি বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ও তিনি জীবিত ছিলেন। আপনার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত খুনের কোনো প্রমাণ নেই। তাহলে আপনি কেন বারবার বলছেন যে তাঁকে খুন করেছেন?”
সায়েম কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
“কারণ আমি আগামীকালও একই কাজ করব।”
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
“মানে?”
“আপনারা আমাকে ছেড়ে দিলে আমি বাড়ি যাব। নীরা দরজা খুলবে। আমি ওর সঙ্গে কথা বলব। তারপর ও চা বানাতে যাবে। আমি পেছন থেকে ছুরিটা তুলে নেব। ও ফিরে আসার সময় আমি ওকে আঘাত করব।”
ইমরান ঠান্ডা গলায় বললেন,
“আপনি ভবিষ্যতের কথা বলছেন, অথচ এমনভাবে বলছেন যেন ঘটনাটা ঘটে গেছে।”
সায়েম মাথা নাড়ল।
“আমার কাছে এটা ভবিষ্যৎ নয়, স্যার। আমার কাছে সবকিছু ইতিমধ্যে ঘটে গেছে।”
সায়েমের ফ্ল্যাটে দ্বিতীয়বার তল্লাশি চালিয়ে ইমরান একটি ছোট নোটবুক পেলেন। নোটবুকটি আলমারির ভেতর পুরোনো জামাকাপড়ের নিচে রাখা ছিল।
প্রথম কয়েকটি পাতায় দৈনন্দিন হিসাব। বাজারের খরচ, বিদ্যুতের বিল, অফিসের সময়সূচি। তারপর হঠাৎ তারিখসহ কিছু বাক্য।
“নীরা আজ আবার বলল, সে আমাকে চেনে না।”
“আজ আমি দরজা খুলিনি। তবু সে ঘরে ঢুকে পড়ল।”
“ডাক্তার বলেছে, ঘুমের আগে ক্যামেরা বন্ধ রাখতে। কিন্তু ক্যামেরায় সব ধরা পড়ে।”
সবচেয়ে শেষের পাতায় লেখা ছিল—
“২৬ অক্টোবর। রাত ১০টা ৪৫। নীরাকে মেরে ফেলেছি। সে হাসছিল। মরার আগেও হাসছিল।”
তার নিচে আরেকটি বাক্য।
“আগামীকাল আবার শুরু হবে।”
ইমরান পাতাটা বন্ধ করলেন। আজকের তারিখ ২৬ অক্টোবর।
সায়েম যে সময়টাকে খুনের সময় বলছে, সেই সময়টা নোটবুকে আগেই লেখা ছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া দরকার।
নোটবুকের কাগজ পরীক্ষা করে জানা গেল, লেখাগুলো সব একই কলমে লেখা নয়। কয়েকটি পাতায় কালি পুরোনো, কয়েকটিতে নতুন। তবে শুধু দেখে কোনটি কখন লেখা হয়েছে, তা নির্ভরযোগ্যভাবে বলা যায় না।
ইমরান আবার সায়েমের সঙ্গে দেখা করলেন।
“আপনি কি আগেও আপনার স্ত্রীকে খুন করেছেন?”
সায়েম চোখ বন্ধ করল।
“প্রতিদিন।”
“কীভাবে?”
“ঘুম ভাঙার পর সব ভুলে যাই। কিন্তু রাতে আবার মনে পড়ে।”
“আপনার স্ত্রী কি আপনাকে নির্যাতন করেন?”
“না।”
“আপনি কি তাঁকে ভয় পান?”
সায়েম চোখ খুলল।
“আমি ওকে ভয় পাই না, স্যার। আমি ভয় পাই, ওকে হারানোর পর আমি কী হয়ে গেছি সেটা।”
এই প্রথম কথাটার মধ্যে কোনো অসংলগ্নতা ছিল না।
ইমরান তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“আপনার স্ত্রীর সঙ্গে কী ঘটেছিল?”
সায়েম ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“দুই বছর আগে ওর একটা দুর্ঘটনা হয়েছিল। গাড়ি চালাচ্ছিলাম আমি। বৃষ্টির রাতে একটা ট্রাক হঠাৎ সামনে চলে আসে। গাড়িটা রাস্তার পাশে উল্টে যায়। আমার তেমন কিছু হয়নি। নীরা মাথায় আঘাত পেয়েছিল।”
“তারপর?”
“ও বেঁচে যায়। কিন্তু কয়েক মাস হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। সুস্থ হওয়ার পর থেকে ওর স্মৃতিতে কিছু সমস্যা হয়। কিছু ঘটনা মনে থাকে, কিছু থাকে না। মাঝে মাঝে একই প্রশ্ন বারবার করে।”
“আপনি কি মনে করেন, দুর্ঘটনার জন্য আপনি দায়ী?”
সায়েম উত্তর দিল না।
ইমরান বুঝলেন, কথাটার উত্তর হ্যাঁ।
কিন্তু এই অপরাধবোধই কি তাকে এমন আচরণ করতে বাধ্য করছে? নাকি এর পেছনে আরও কিছু আছে?
সেদিন বিকেলে নীরা নিজে থানায় এলেন।
তিনি জানালেন, সায়েমের মানসিক অবস্থা গত কয়েক মাসে খারাপ হয়েছে। রাতে ঘুমের মধ্যে উঠে বাড়ির দরজা পরীক্ষা করে। মাঝেমধ্যে বলে, কেউ নাকি বাড়িতে ঢুকেছিল। একদিন রান্নাঘরের ছুরি লুকিয়ে রেখেছিল। পরে নিজেই ভুলে যায় কোথায় রেখেছে।
“আপনি কি কখনো তাঁকে নিজের ক্ষতি করতে দেখেছেন?” ইমরান জিজ্ঞেস করলেন।
“নিজের না,” নীরা বললেন। “কিন্তু আমাকে নিয়ে ভয় পায়। মনে করে, আমি মারা যাব।”
“আপনি কি জানেন, তিনি কেন বলেছেন আপনাকে খুন করেছেন?”
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
“জানি না। তবে একটা কথা বলব?”
“বলুন।”
“আমার স্বামীকে আপনারা অপরাধী ভেবে আটকে রাখবেন না। ও অসুস্থ হতে পারে। কিন্তু ও আমাকে ভালোবাসে।”
ইমরান বললেন,
“ভালোবাসে বলেই কি খুন করার কথা স্বীকার করেছে?”
নীরা মাথা নিচু করলেন।
“ওর মাথায় দুর্ঘটনার রাতটা আটকে আছে। ও মনে করে, আমাকে বাঁচানোর জন্য ও যথেষ্ট করেনি।”
“আপনার কি সেই রাতের কথা মনে আছে?”
নীরা একটু থেমে বললেন,
“সবটা নয়।”
“সায়েমের কথা মনে আছে?”
“অবশ্যই। ও আমার স্বামী।”
“তাহলে ও আপনাকে খুন করেছে বললে আপনি ভয় পাননি কেন?”
নীরা এবার ইমরানের দিকে তাকালেন।
“কারণ ও যখন বলেছে, আমি বেঁচে আছি কি না, তখন ওর চোখে এমন ভয় ছিল, যেন সে সত্যিই বিশ্বাস করছে আমাকে আর কখনো দেখতে পাবে না।”
কথাটা ইমরানের মনে রয়ে গেল।
সেই রাতে তিনি নোটবুকটা আবার খুললেন। শেষ পাতার বাক্যটি পড়লেন।
“নীরা আজ আবার বলল, সে আমাকে চেনে না।”
তারিখটা ছিল দুই মাস আগের।
ইমরান হঠাৎ বুঝলেন, নোটবুকের কথাগুলো শুধু অপরাধবোধের বর্ণনা নয়। সায়েম হয়তো কোনো একটা ঘটনা বারবার লিখে রাখছে, যাতে পরদিন ভুলে গেলেও সে নিজের কাছে প্রমাণ রাখতে পারে।
কিন্তু কী ভুলে যাচ্ছে সে?
পরদিন সকালে ইমরান হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বললেন। সায়েমের পুরোনো চিকিৎসার কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেগুলোতে দুর্ঘটনার পর থেকে তার ঘুমের সমস্যা, তীব্র উদ্বেগ এবং কিছু সময়ের স্মৃতিবিভ্রাটের উল্লেখ ছিল।
চিকিৎসক সতর্ক করে বললেন, শুধু এসব তথ্য দিয়ে কাউকে বিপজ্জনক বা অপরাধী বলা যায় না। সায়েমের বর্তমান অবস্থা বুঝতে বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
ইমরান সেই পরামর্শ মেনে সায়েমের সঙ্গে আবার বসলেন।
“আপনি বলেছেন, আগামীকাল আপনার স্ত্রীকে খুন করবেন। কিন্তু আপনি কি নিশ্চিত, ঘটনাটা সত্যিই ঘটবে?”
সায়েম বলল,
“আমি নিশ্চিত, কারণ আগেও ঘটেছে।”
“কোথায়?”
“আমাদের বাড়িতে।”
“কোন বাড়িতে?”
সায়েম চুপ করে গেল।
ইমরান এবার ধীরে ধীরে বললেন,
“আপনি যে বাড়ির কথা বলছেন, সেখানে কি আপনি এখন থাকেন?”
সায়েমের মুখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।
“কী বলতে চাইছেন?”
“আপনি আমাকে বলেছিলেন, আপনার স্ত্রী দুর্ঘটনার পরও বেঁচে আছেন। কিন্তু নীরা বলেছেন, আপনার স্মৃতিতে দুর্ঘটনার রাতটা বারবার ফিরে আসে। আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, আপনি যে খুনের কথা মনে করছেন, সেটা বাস্তবে ঘটেনি—বরং আপনি বারবার সেই দুর্ঘটনার রাতটাকে অন্যভাবে কল্পনা করছেন?”
সায়েম কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।
তারপর হঠাৎ বলল,
“না। না, এটা হতে পারে না।”
“কেন?”
“কারণ নীরা তো আমার সঙ্গে কথা বলে।”
ইমরান উত্তর দিলেন না।
সায়েমের চোখে পানি এসে গেল।
“ও আমার সঙ্গে কথা বলে, স্যার। আমাকে চা দেয়। রাতে ঘুমাতে বলে। ও যদি সত্যি না হয়, তাহলে আমি কার সঙ্গে এত দিন কথা বলেছি?”
এই প্রশ্নের উত্তর ইমরানের কাছে ছিল না।
তিনি শুধু জানতেন, নীরাকে আবার দেখতে হবে।
দুপুরে তিনি সায়েমের ফ্ল্যাটে গেলেন। দরজা খুললেন নীরা।
ইমরান এবার বসার ঘরে ঢুকে চারদিকে তাকালেন। টেবিলে দুটো চায়ের কাপ। টেলিভিশন বন্ধ। দেয়ালে সায়েম ও নীরার বিয়ের ছবি।
“সায়েম কোথায়?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
নীরা বললেন,
“থানায় তো।”
ইমরান থমকে গেলেন।
“আপনি জানেন, ও কোথায় আছে?”
“জি। ও মাঝে মাঝে এমন করে। কোথাও চলে যায়, পরে ফিরে আসে।”
“আপনি কি গত রাতে ওর সঙ্গে কথা বলেছেন?”
নীরা মাথা নাড়লেন।
“না। গতকাল আমি সারাদিন বাসায় একাই ছিলাম।”
ইমরান ছবিটার দিকে তাকালেন। বিয়ের ছবিতে সায়েমের মুখ স্পষ্ট, নীরার মুখও। ছবিটা বেশ পুরোনো।
“আপনারা কত বছর ধরে এখানে থাকেন?”
“পাঁচ বছর।”
“সায়েমের চিকিৎসা কোথায় চলছে?”
নীরা উত্তর দিলেন না। শুধু ইমরানের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
ইমরান এবার ধীরে ধীরে বললেন,
“নীরা, আপনি কি জানেন, সায়েমের মনে হয় সে আপনাকে খুন করেছে?”
নীরার চোখ ভিজে উঠল।
“জানি।”
“কেন?”
তিনি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন,
“কারণ দুর্ঘটনার রাতে ও আমাকে গাড়ি থেকে বের করতে পারেনি।”
ইমরান কিছু বললেন না।
নীরা আবার বললেন,
“ও যখন জ্ঞান ফিরে পায়, তখন আমি হাসপাতালে। কয়েক দিন পর ও আমাকে দেখতে আসে। আমি বেঁচে ছিলাম। কিন্তু ও নিজেকে ক্ষমা করতে পারেনি। তারপর থেকে প্রতি বছর দুর্ঘটনার দিন ওর অবস্থা খারাপ হয়।”
ইমরান ঘড়ির দিকে তাকালেন।
আজ ২৬ অক্টোবর।
সায়েমের নোটবুকে লেখা তারিখ।
নীরা ফিসফিস করে বললেন,
“আজ সেই দিন।”
ইমরান হঠাৎ সবকিছু বুঝতে পারলেন। সায়েম যে খুনের কথা স্বীকার করেছে, তা আসলে অতীতের দুর্ঘটনার স্মৃতি, অপরাধবোধ আর ঘুমের সমস্যার সঙ্গে মিশে তৈরি হওয়া এক বিশ্বাস। তার কাছে দুর্ঘটনার রাতটা এমনভাবে ফিরে আসে, যেন সে নীরাকে হারানোর ঘটনাটা নিজের হাতে ঘটিয়েছে। সে ভবিষ্যৎ বলছিল না; তার মনে হচ্ছিল, ঘটনাটা আবার ঘটছে।
কিন্তু একটা প্রশ্ন তখনও বাকি ছিল।
সায়েম কেন থানায় এসেছিল?
ইমরান দ্রুত থানায় ফিরে গেলেন। সায়েমকে তখন চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।
ইমরান তার সামনে বসে বললেন,
“আপনি আজ থানায় এসেছেন কেন, মনে আছে?”
সায়েম মাথা নাড়ল।
“কারণ আমি নীরাকে মেরে ফেলেছি।”
“না। আপনি এসেছেন, কারণ আপনি ভয় পেয়েছিলেন যে আবার একই ঘটনা ঘটবে। আপনি চেয়েছিলেন, কেউ আপনাকে থামাক।”
সায়েমের চোখ ধীরে ধীরে স্থির হলো।
“আমি কি ওকে বাঁচাতে পারব?”
ইমরান বললেন,
“নীরা বেঁচে আছে। আপনি তাকে খুন করেননি। কিন্তু আপনার কষ্টটা সত্যি, আর সেটার চিকিৎসা দরকার।”
সায়েম মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করল।
কয়েক মিনিট পর সে মাথা তুলল।
“স্যার, একটা কথা বলি?”
“বলুন।”
“আমি থানায় আসার আগে নীরাকে ফোন করেছিলাম।”
ইমরান চুপ করে রইলেন।
“ও ফোন ধরেছিল। আমি বলেছিলাম, দরজা খুলিস না। আমি আসছি। ও বলেছিল, দরজা খোলাই আছে।”
“তারপর?”
সায়েমের ঠোঁট কেঁপে উঠল।
“আমি বলেছিলাম, আমি আবার তোমাকে মেরে ফেলব। ও বলেছিল, ‘তাহলে এবার আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করো।’”
ঘরের মধ্যে কেউ কথা বলল না।
সায়েম চোখ বন্ধ করে বসে রইল। বহুদিন পর তার মুখে আর কোনো যুক্তি, কোনো ব্যাখ্যা নেই। শুধু ক্লান্তি।
ইমরান উঠে দাঁড়ালেন। বাইরে তখন বিকেলের আলো। তিনি জানতেন, সায়েমের চিকিৎসা সহজ হবে না। কিন্তু অন্তত আজ সে নিজের ভয় থেকে পালিয়ে থানায় এসেছে, আর কেউ তাকে সেই ভয়কে সত্যি ভেবে শাস্তি দিচ্ছে না।
দরজার কাছে পৌঁছে ইমরান একবার পেছনে তাকালেন।
সায়েম চুপচাপ বসে আছে।
হঠাৎ সে বলল,
“স্যার?”
“জি?”
“আজ কি ২৬ অক্টোবর?”
ইমরান থেমে গেলেন।
“হ্যাঁ।”
সায়েমের মুখ সাদা হয়ে গেল। সে ফিসফিস করে বলল,
“তাহলে আজ রাতেও আমি ওকে মারব।”
ইমরান ফিরে এসে তার সামনে বসলেন।
“না, সায়েম। আজ রাতে আপনি একা থাকবেন না। আমরা চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলব। নীরার সঙ্গেও কথা হবে। আপনাকে এই রাতটা একা পার করতে হবে না।”
সায়েম অনেকক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর প্রথমবারের মতো সে বলল,
“আমি কি ওর কাছে যেতে পারি?”
ইমরান মাথা নাড়লেন।
“চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে, নিরাপদভাবে। এখনই নয়।”
সায়েম চোখ নামিয়ে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর তার মুখে খুব ছোট একটা হাসি দেখা গেল।
“জানেন, স্যার, নীরা সব সময় বলত, আমি ভয় পেলে বাচ্চাদের মতো হয়ে যাই।”
ইমরান বললেন,
“হয়তো সে আপনাকে ভালো করেই চিনত।”
সায়েম মাথা তুলল।
“হ্যাঁ। চিনত।”
সেদিন সন্ধ্যায় ইমরান নীরাকে ফোন করলেন। সায়েমের অবস্থা স্থিতিশীল, চিকিৎসা শুরু হয়েছে—এ কথা জানালেন। নীরা শুধু বললেন,
“ওকে বলবেন, আমি অপেক্ষা করছি।”
ফোন রাখার আগে ইমরান জিজ্ঞেস করলেন,
“একটা কথা জানতে চাই। সায়েম যখন বলেছিল, সে আপনাকে খুন করেছে, তখন আপনি ভয় পাননি কেন?”
নীরা কিছুক্ষণ নীরব রইলেন।
তারপর বললেন,
“ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু ওর জন্য নয়।”
“তাহলে?”
“ও যদি সত্যিই আমাকে খুন করতে চাইত, তাহলে থানায় গিয়ে নিজের অপরাধ স্বীকার করত না। ও জানত, ওর মনে যা ঘটছে আর বাস্তবে যা ঘটেছে, দুটো এক নয়। শুধু মাঝে মাঝে সেই পার্থক্যটা ও ধরে রাখতে পারে না।”
ইমরান ফোন রেখে দিলেন।
রাত তখন আটটা।
তিনি থানার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। দূরে রাস্তার বাতিগুলো একে একে জ্বলছে। তাঁর মনে হচ্ছিল, আজকের ঘটনাটা হয়তো শেষ হয়েছে।
ঠিক তখনই তাঁর ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
“স্যার, আমি নীরা। একটা কথা বলা হয়নি।”
ইমরান উত্তর দিলেন,
“বলুন।”
কয়েক সেকেন্ড পর আরেকটা মেসেজ এল।
“সায়েমের দুর্ঘটনার দিনটা ২৬ অক্টোবর নয়। দুর্ঘটনা হয়েছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি।”
ইমরান ভ্রু কুঁচকে গেলেন।
আরেকটি মেসেজ এল।
“আজ ২৬ অক্টোবর ওর জন্মদিন। প্রতি বছর এই দিনে ওর এমন হয়। দুর্ঘটনার দিনটা ও ভুলে গেছে, কিন্তু নিজের জন্মদিনের সঙ্গে সেই রাতটাকে জুড়ে ফেলেছে।”
ইমরান ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর শেষ মেসেজটি এল।
“আর একটা কথা, স্যার। আমি আজ থানায় গিয়েছিলাম। আপনার সঙ্গে কথা বলেছি। ডিউটি অফিসারের সঙ্গেও দেখা হয়েছে। কিন্তু সায়েমের সঙ্গে কথা বলিনি।”
ইমরান কিছুক্ষণ মেসেজটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর নীরাকে ফোন করলেন।
নীরা ধরলেন।
“আপনি আজ থানায় এসেছিলেন?”
“জি, স্যার।”
“সায়েম কি আপনাকে দেখেছে?”
“দেখেছে। অন্তত আমার সামনে বসে ছিল। আমি ওর নাম ধরে ডেকেছিলাম। ও আমার দিকে তাকিয়েছিলও।”
“তাহলে কথা বললেন না কেন?”
নীরা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“আমি কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ও আমাকে চিনতে পারেনি।”
ইমরান চুপ করে রইলেন।
নীরা আবার বললেন,
“আমি ওর সামনে বসেছিলাম, স্যার। ওর হাতের কাছেই আমার হাত ছিল। কিন্তু ও একবারও আমাকে নীরা বলে ডাকেনি। বরং আপনার কাছে জানতে চেয়েছে, আমি কে।”
ইমরানের বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।
“তাহলে আপনি ওকে বলেছিলেন, ‘তাহলে এবার আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করো’?”
“না, স্যার। আজ বলিনি। কথাটা আমি ওকে বলেছিলাম গত বছর, ঠিক এই দিনে। ও আজ আবার সেই কথাটাই মনে করেছে।”
ইমরান ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“সায়েম থানায় আসার আগে আপনাকে ফোন করেনি?”
“না, স্যার। আমার ফোনে কোনো কল নেই।”
ইমরান ফোন নামিয়ে রাখলেন।
তাঁর মনে পড়ল, সায়েম প্রথমবার থানায় এসে বলেছিল,
“আমি আমার স্ত্রীকে খুন করেছি।”
কিন্তু সে একবারও বলেনি, সে কীভাবে থানায় এসেছে।
আর সেদিন থানার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছিল, রাত ১১টা ৪০ মিনিটে সায়েম একাই দরজা দিয়ে ঢুকেছে।
তার পেছনে কেউ ছিল না।
ইমরান আবার ফোনটা হাতে নিলেন। সায়েমকে যেখানে রাখা হয়েছে, সেখানে যোগাযোগ করলেন।
ডিউটি কর্মী জানালেন, সায়েম শান্ত আছে। ঘুমিয়ে পড়েছে।
ইমরান জিজ্ঞেস করলেন,
“ঘুমানোর আগে কিছু বলেছে?”
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
“জি, স্যার। বলেছে, কাল সকালে যেন তার স্ত্রীকে ফোন করা হয়। একটা কথা বলতে ভুলে গেছে।”
ইমরান ফোন রেখে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।
সায়েমের স্ত্রী বেঁচে আছে। সে তার স্ত্রীকে খুন করেনি। তার মনে যে ঘটনা বারবার ফিরে আসে, তা বাস্তবের সঙ্গে মেলে না।
কিন্তু নীরার বলা শেষ কথাটা ইমরানের মাথায় ঘুরছিল।
সায়েম নীরাকে দেখেছিল। তার সামনে বসেছিল। অথচ কিছুক্ষণ পরই তার মনে হচ্ছিল, সে কোনোদিন নীরাকে দেখেনি।
ইমরান বুঝতে পারলেন, ব্যাপারটা শুধু অতীত ভুলে যাওয়ার নয়। সায়েম যেন প্রতিবারই একই বাস্তবতার সামনে দাঁড়ায়, অথচ সেই বাস্তবতাকে সঙ্গে নিয়ে পরের মুহূর্তে এগোতে পারে না।
সে থানায় এসেছিল খুনের দায় স্বীকার করতে নয়।
সে এসেছিল, যেন কেউ তাকে বিশ্বাস করায়—এবারও সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি।
আর হয়তো তার নিজের অজান্তেই সে এমন একটা জায়গায় সাহায্য চাইতে এসেছিল, যেখানে অন্তত কিছু মানুষ তাকে চিনতে পারবে, তার কথা শুনবে, তার উপস্থিতি মনে রাখবে।
কারণ যে মানুষটিকে সে সবচেয়ে বেশি মনে রাখতে চায়, তাকেই সে বারবার ভুলে যাচ্ছে।
সেদিন রাতের ডিউটি শেষ হওয়ার আগে ইমরান আবার সিসিটিভি ফুটেজটি দেখতে চাইলেন।
রাত ১১টা ৪০ মিনিটে সায়েম থানায় ঢুকছে।
ক্লান্ত মুখ। এলোমেলো চুল। ধূসর শার্ট।
দরজা দিয়ে ঢোকার পর সে এক মুহূর্ত থেমে যায়। তারপর ডিউটি অফিসারের দিকে এগিয়ে যায়।
ইমরান ফুটেজটা থামিয়ে দিলেন।
সায়েমের পেছনে করিডরের এক কোণে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে ছিলেন।
ইমরান ছবিটা বড় করে দেখলেন।
নীরা।
তিনি ফুটেজের সময় দেখলেন। সায়েম থানায় ঢোকার ঠিক কয়েক মিনিট আগে নীরা সেখানে এসেছিলেন। সায়েম যখন ভেতরে ঢোকে, নীরা তখনও করিডরে দাঁড়িয়ে।
ইমরান আবার ফুটেজ চালালেন।
নীরা একবার সায়েমের দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে অন্যদিকে চলে গেলেন।
সায়েম একবারও পেছনে তাকাল না।
অথচ কয়েক মিনিট আগেই সে তার পাশ দিয়ে হেঁটে এসেছে।
ইমরান মনিটরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তাঁর মনে হলো, সায়েম হয়তো নীরাকে ভুলে যায়নি।
হয়তো সে প্রতিবারই তাকে হারিয়ে ফেলে।
আর প্রতিবারই, সেই হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে, নিজের স্মৃতির ভেতর নতুন একটা গল্প তৈরি করে।
সেই গল্পে নীরা বেঁচে থাকে।
সেই গল্পে সায়েম তাকে খুন করে।
সেই গল্পে পরদিন আবার সবকিছু নতুন করে শুরু হয়।
ইমরান মনিটর বন্ধ করলেন।
তাঁর মনে পড়ল, সায়েমের নোটবুকের শেষ লাইনটি—
“আগামীকাল আবার শুরু হবে।”
পরদিন সকালে সায়েমের ঘুম ভাঙার পর তাকে একটি কাগজ দেওয়া হলো।
কাগজের ওপর লেখা—
“আজকের তারিখ ২৭ অক্টোবর।
তোমার স্ত্রী নীরা রহমান জীবিত।
তুমি তাকে খুন করোনি।
গত রাতে তুমি থানায় এসেছিলে সাহায্য চাইতে।
তোমার চিকিৎসা চলছে।
তুমি একা নও।”
সায়েম অনেকক্ষণ কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ডিউটি কর্মীকে জিজ্ঞেস করল,
“এই নীরা রহমান কে?”
লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“আপনার স্ত্রী।”
সায়েম কাগজটার দিকে আবার তাকাল।
“আমার স্ত্রী?”
“জি।”
সায়েম ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
তারপর হঠাৎ বলল,
“আমি কি ওকে একবার দেখতে পারি?”
ডিউটি কর্মী উত্তর দিলেন না। শুধু কাগজটা তার হাতে দিয়ে বাইরে চলে গেলেন।
সায়েম আবার কাগজটার দিকে তাকাল।
কিছুক্ষণ পর তার চোখের কোণে পানি জমল।
সে জানত না কেন কাঁদছে।
শুধু মনে হচ্ছিল, কাউকে সে খুব ভালোবাসে।
কাউকে সে খুব বেশি খুঁজছে।
কিন্তু মানুষটার মুখটা মনে করতে পারছে না।