মেহেদী হাসান নিজের গলার সোনার চেইনটা খুলে রাশেদের হাতে দিয়ে বলল, “নে, এটা তোর কাছে রাখ। কিন্তু প্লিজ, সিনেমার শেষটা বলিস না।”
রাশেদ চেইনটার দিকে তাকাল, তারপর মেহেদীর মুখের দিকে। ছেলেটার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, চোখ দুটো অস্থির, ঠোঁট শুকিয়ে এসেছে। অথচ তারা বসে আছে একটা চায়ের দোকানে। চারপাশে মানুষের হাসি, চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ, রাস্তার ধুলো আর বিকেলের নরম আলো। এখানে ভয়ের কিছু নেই। অন্তত সাধারণ মানুষের চোখে।
রাশেদ মৃদু হেসে বলল, “আরে, আমি তো এখনো কিছু বলিইনি!”
“বলবি! তুই বলবি! তোর মুখ দেখেই বুঝতে পারছি।”
“আচ্ছা, না হয় বলেই ফেললাম—শেষে নায়ক—”
“না!”
মেহেদী এমনভাবে চিৎকার করে উঠল যে পাশের টেবিলের দুজন লোকও ফিরে তাকাল। সে দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরল। তার বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা যেন হঠাৎ দৌড়াতে শুরু করেছে। নিশ্বাস ছোট হয়ে আসছে, হাতের তালু ভিজে যাচ্ছে ঘামে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার মনে হলো, চারপাশের শব্দগুলো দূরে সরে যাচ্ছে, পৃথিবীটা যেন একটু একটু করে তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
রাশেদ এবার আর হাসল না। চেইনটা মুঠোর মধ্যে রেখে বলল, “ঠিক আছে, ভাই। কিছু বলব না।”
মেহেদী ধীরে ধীরে হাত নামাল। তারপর কাঁপা গলায় বলল, “চেইনটা রাখ। শুধু আজকের সিনেমাটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলিস না।”
রাশেদ তার দিকে তাকিয়ে রইল। মেহেদীকে সে ছোটবেলা থেকে চেনে। দুজনের বন্ধুত্ব এত বছরের যে একজনের মুখের সামান্য পরিবর্তন দেখেই অন্যজন বুঝতে পারে, ভেতরে কী চলছে। কিন্তু মেহেদীর এই ভয়টা সে কোনো দিন ঠিক বুঝতে পারেনি। একটা সিনেমার শেষ জেনে গেলে এমন কী ক্ষতি হয়, যার জন্য মানুষ নিজের গলার সোনার চেইন পর্যন্ত খুলে দিতে পারে?
চেইনটা হাতে নিয়ে রাশেদ এবার ইচ্ছে করেই একটু গম্ভীর হলো। “তুই যদি আমাকে এটা দিয়ে দিস, তাহলে একটা কথা বলি?”
মেহেদী সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। “না, না, বলিস না!”
“কথাটা হলো, সিনেমার শেষে—”
মেহেদী চোখ বন্ধ করে ফেলল। “ভাই, প্লিজ! যা চাস নিয়ে নে। শুধু এটা বলিস না।”
আর তখনই রাশেদের বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি হলো। সে বুঝল, বিষয়টা নিছক মজা নয়। চেইনটা মেহেদীর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে তার কাঁধে হাত রাখল।
“নিয়ে নে। আমি মজা করছিলাম।”
মেহেদী চেইনটা হাতে নিয়ে এমনভাবে বুকের কাছে চেপে ধরল, যেন কোনো হারানো জিনিস ফিরে পেয়েছে। তার চোখে রাগ ছিল না, ছিল ক্লান্তি। অনেকক্ষণ ধরে ডুবে থাকা কোনো মানুষ যেন একটু আগে পানির ওপর মাথা তুলেছে।
রাশেদ জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, সত্যি করে বল তো, সিনেমার স্পয়লার নিয়ে তোর এত ভয় কেন?”
মেহেদী কোনো উত্তর দিল না। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে ঠোঁটে ছোঁয়াল, কিন্তু চা খেল না। দোকানের সামনে একটা বাস এসে থামল, কয়েকজন যাত্রী নেমে গেল, একজন বাদামওয়ালা হাঁক দিল। পৃথিবী তার স্বাভাবিক নিয়মেই চলতে থাকল। শুধু মেহেদীর মনে হলো, প্রশ্নটা যেন তাকে বহু বছর পেছনে টেনে নিয়ে গেছে।
তার একটা বোন ছিল। বড় বোন। নাম মেহেরিন।
মেহেরিন ছিল মেহেদীর পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। মা-বাবার শাসন, পড়াশোনার চাপ, জীবনের ছোট ছোট ব্যর্থতা—সবকিছুর শেষে সে বোনের ঘরে গিয়ে বসত। মেহেরিন কখনো তাকে বকত, কখনো হাসাত, কখনো এমনভাবে কথা বলত যেন পৃথিবীর কোনো সমস্যাই খুব বড় নয়। তাদের দুজনের একটা অভ্যাস ছিল। প্রতি শুক্রবার রাতে একসঙ্গে সিনেমা দেখা। কখনো পুরোনো বাংলা সিনেমা, কখনো রহস্য, কখনো এমন কোনো ইংরেজি সিনেমা যার অর্ধেক সংলাপ বুঝতে না পেরে মেহেদী বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত।
মেহেরিনের সবচেয়ে প্রিয় খেলা ছিল সিনেমার শেষটা নিয়ে মেহেদীকে জ্বালানো।
সিনেমা শুরু হওয়ার আধঘণ্টা পরেই সে গম্ভীর মুখে বলত, “শোন, শেষের দিকে একটা ঘটনা আছে। শুনলে তোর মাথা ঘুরে যাবে।”
মেহেদী রিমোটটা বুকে চেপে ধরে বলত, “আপু, খবরদার! একটা কথাও বলবা না!”
মেহেরিন হাসত। “আচ্ছা, বলব না। তবে নায়কটা আসলে—”
“আপু!”
“কী? আমি তো শুধু বলতে যাচ্ছিলাম, নায়কটা আসলে খুব ভালো মানুষ!”
তারপর দুজনের হাসিতে ঘর ভরে যেত। কখনো মেহেরিন সত্যিই গল্পের শেষ বলে দেওয়ার ভান করত, কখনো এমন একটা মিথ্যা ক্লাইম্যাক্স বানিয়ে বলত যে মেহেদী বিরক্ত হয়ে বালিশ ছুড়ে মারত। মেহেদী সিনেমার শেষটা আগে জানতে চাইত না, কারণ তার বিশ্বাস ছিল, গল্পের আসল আনন্দ লুকিয়ে থাকে না-জানার মধ্যে। কিন্তু বোনের সঙ্গে সেই না-জানাটাও ছিল আনন্দের। তার ভয় ছিল অভিনয়, আর বোনের নিষ্ঠুরতা ছিল স্নেহের আরেক নাম।
তারপর একদিন সবকিছু শেষ হয়ে গেল।
সেদিন সন্ধ্যায় মেহেরিনের শরীরটা ভালো ছিল না। মাথা ধরেছিল, শরীর দুর্বল লাগছিল। মেহেদীকে সে বলেছিল, “আজ বাইরে যাস না। একটু বাসায় থাক না, আমার সঙ্গে।”
মেহেদীর সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। সে ভেবেছিল, সামান্য অসুস্থতা। একটু বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। বোনকে বলেছিল, “একটু পরেই আসছি। তুমি ঘুমিয়ে পরো।”
মেহেরিন হেসে বলেছিল, “ঠিক আছে, তবে ফিরে এসে আমার সঙ্গে একটা সিনেমা দেখবি।”
মেহেদী বেরিয়ে গিয়েছিল।
রাতটা অন্য সব রাতের মতোই শুরু হয়েছিল। বন্ধুরা গল্প করছিল, কেউ হাসছিল, কেউ ফোনে ব্যস্ত ছিল। মেহেদীরও মনে হয়েছিল, জীবন আসলে এমনই—একটু বাইরে যাওয়া, কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা করা, তারপর ঘরে ফিরে যাওয়া। কিন্তু রাতের মাঝামাঝি ফোনটা বেজে উঠল। ওপাশ থেকে কেউ বলল, মেহেরিনের অবস্থা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেছে। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
মেহেদী যখন পৌঁছাল, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
একটা আকস্মিক জটিলতা। কিছু দ্রুত সিদ্ধান্ত। কিছু ছুটে চলা মানুষ। কিছু চিকিৎসা-সংক্রান্ত শব্দ, যেগুলোর অর্থ সে তখন বুঝতেও পারেনি। তারপর একটা সাদা চাদর। আর তার নিচে এমন একজন মানুষ, যে কয়েক ঘণ্টা আগেও তাকে বলেছিল, ফিরে এসে একসঙ্গে সিনেমা দেখতে।
মেহেদী প্রথমে কাঁদতে পারেনি। সে শুধু বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, মেহেরিন বুঝি একটু পরেই চোখ খুলে বলবে, “কী রে, এত দেরি করলি কেন?”
কিন্তু কেউ চোখ খোলেনি।
পরের কয়েক দিন মানুষ তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিল। কেউ বলেছিল, আল্লাহর ইচ্ছা। কেউ বলেছিল, সময় সব ঠিক করে দেয়। কেউ বলেছিল, নিজেকে শক্ত রাখতে হবে। মেহেদী সবার কথা শুনেছিল, মাথা নেড়েছিল, কিন্তু তার ভেতরে একটা প্রশ্ন আটকে গিয়েছিল—যদি সে সেদিন বাসায় থাকত?
হয়তো সে কিছুই করতে পারত না। হয়তো ঘটনাটা তার উপস্থিতিতেও একইভাবে ঘটত। সে জানত না। কোনো প্রমাণ ছিল না যে তার বাইরে যাওয়াই বোনের মৃত্যুর কারণ। কিন্তু শোকের ভেতর যুক্তির কণ্ঠ খুব দুর্বল হয়ে যায়। মেহেদীর মনে বারবার ফিরে আসত বোনের সেই কথাটা—“আজ বাইরে যাস না। একটু বাসায় থাক না, আমার সঙ্গে।”
তার মনে হতো, সে যদি পাশে থাকত, হয়তো অসুস্থতাটা আগে বুঝতে পারত। হয়তো দ্রুত সাহায্য ডাকতে পারত। হয়তো বোনকে একা থাকতে হতো না। হয়তো, হয়তো, হয়তো।
এই ছোট্ট শব্দটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়ে উঠল।
বোনের ঘরটা প্রথম দিকে সে এড়িয়ে চলত। পরে একদিন সাহস করে দরজা খুলেছিল। বিছানার পাশে একটা পুরোনো ল্যাপটপ, টেবিলের ওপর আধখাওয়া পানির বোতল, আর আলমারির তাকে কয়েকটা সিনেমার ডিভিডি। একটা ডিভিডির গায়ে মেহেরিনের হাতের লেখায় লেখা ছিল, “মেহেদীর সঙ্গে দেখব—শেষটা বলব না!”
লেখাটা দেখে মেহেদী প্রথমবার কেঁদেছিল। এমন কান্না, যার শব্দ নিজের কানেই অসহ্য লাগে। সে ডিভিডিটা বুকে চেপে ধরে বসে ছিল অনেকক্ষণ।
এরপর থেকে সিনেমা তার কাছে আর শুধু সিনেমা থাকেনি। পর্দায় কোনো গল্প শুরু হলে তার মনে হতো, কোথাও মেহেরিন বসে আছে, একটু পরেই হাসতে হাসতে শেষটা বলে দেওয়ার ভান করবে। আবার কেউ যদি সত্যি সত্যি গল্পের শেষ বলে দিতে চাইত, তার শরীরের ভেতর অদ্ভুত একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ত। বুক ধড়ফড় করত, হাত ঘেমে যেত, মাথার ভেতর একসঙ্গে অনেক চিন্তা ঘুরতে থাকত।
সে নিজেও বুঝত না, একটা সিনেমার শেষ জেনে ফেললে তার এত কষ্ট কেন হয়। গল্পের শেষ তো কোনো মানুষের মৃত্যু নয়। একটা দৃশ্য আগে জেনে গেলে পৃথিবী বদলে যায় না। তবু তার মনে হতো, কেউ যেন তার কাছ থেকে এমন কিছু কেড়ে নিতে চাইছে, যেটা সে একবার হারিয়ে আর কোনো দিন ফিরে পাবে না।
কখনো সে ভাবত, সিনেমার শেষ না জানার আনন্দটা হয়তো তার বোনের সঙ্গে কাটানো সময়ের শেষ অবশিষ্ট অংশ। আবার কখনো মনে হতো, কেউ যদি তাকে আগে থেকেই শেষটা বলে দেয়, তাহলে তার নিজের মতো করে গল্পের ভেতরে থাকার সুযোগটুকুও হারিয়ে যাবে। আর এই হারানোর অনুভূতিটাই তার কাছে অসহনীয়।
দিনের পর দিন সে নিজের আচরণ লুকানোর চেষ্টা করেছে। বন্ধুরা নতুন সিনেমার গল্প তুললে সে উঠে চলে যেত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো সিনেমার পোস্ট দেখলে মন্তব্য পড়ত না। কেউ বলত, “শেষটা একদম অবিশ্বাস্য!”—সে সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রল করে অন্যদিকে চলে যেত। এমনকি কোনো সিনেমা দেখার আগে পরিচিতদের বারবার জিজ্ঞেস করত, “কেউ কিছু বলে দেয়নি তো?”
ধীরে ধীরে তার ভয় শুধু সিনেমার মধ্যে আটকে থাকল না। ভয়টা ছড়িয়ে পড়ল মানুষের কথার মধ্যে, হঠাৎ কোনো বাক্যের মধ্যে, এমনকি কারও মুখের হাসির মধ্যেও। কেউ মজা করে বলল, “তোর জন্য একটা খবর আছে”—মেহেদীর বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে গেল। সে আগে থেকেই ভাবতে লাগল, এবার কী হারাতে যাচ্ছে?
রাশেদ একদিন তাকে বলেছিল, “তুই কি বুঝিস, তুই নিজেকেই কষ্ট দিচ্ছিস?”
মেহেদী সেদিন রেগে গিয়েছিল। “তুই বুঝবি না।”
রাশেদ চুপ করে গিয়েছিল। কারণ সত্যিই, সে পুরোটা বুঝত না। কিন্তু সে এটুকু বুঝেছিল, মেহেদীর ভেতরে এমন কিছু আছে, যা নিয়ে হাসাহাসি করলে ছেলেটা আরও একা হয়ে পড়বে।
সোনার চেইনটা ফিরিয়ে দেওয়ার পর চায়ের দোকানে রাশেদ আর কোনো প্রশ্ন করেনি। শুধু বলেছিল, “তুই চাইলে আমাকে সব বলতে পারিস। আমি হাসব না।”
সেদিন মেহেদী প্রথমবার কাউকে মেহেরিনের কথা বলেছিল। বলেছিল সেই রাতের কথা, নিজের অপরাধবোধের কথা, আর সেই অদ্ভুত আতঙ্কের কথা, যা তার কাছে কোনোভাবেই সাধারণ ভয় বলে মনে হতো না। বলতে বলতে তার গলা ধরে এসেছিল। অনেক কথা সে ঠিকমতো গুছিয়ে বলতে পারেনি। তবু রাশেদ মাঝখানে বাধা দেয়নি।
সব শুনে রাশেদ বলেছিল, “তোর বোন তোকে ভালোবাসত, তাই না?”
মেহেদী মাথা নেড়েছিল।
“তাহলে তুই কি সত্যিই মনে করিস, সে চাইত তুই সারাজীবন এভাবে ভয় পেয়ে থাকিস?”
প্রশ্নটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু মেহেদী উত্তর দিতে পারেনি। সে শুধু চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে ছিল।
কয়েক দিন পর রাশেদ তাকে একজন মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিল। প্রথমে মেহেদী রাজি হয়নি। তার মনে হয়েছিল, সে কি পাগল হয়ে গেছে? একটা সিনেমার শেষ নিয়ে ভয় পায় বলে কি তাকে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?
রাশেদ শান্তভাবে বলেছিল, “কষ্টটা যদি সত্যি হয়, তাহলে সাহায্য নেওয়াটাও সত্যি। নাম কী, সেটা বড় কথা না।”
শেষ পর্যন্ত মেহেদী গিয়েছিল।
সেখানে তাকে কেউ নিয়ে হাসেনি। কেউ বলেনি, “এত সামান্য ব্যাপারে আবার ভয় কিসের?” বরং মন দিয়ে তার কথা শোনা হয়েছিল। ধীরে ধীরে সে বুঝতে শুরু করল, তার প্রতিক্রিয়াগুলো শুধু সিনেমার শেষ নিয়ে নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর শোক, বোনকে হারানোর যন্ত্রণা, আর সেই রাত নিয়ে নিজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অপরাধবোধ। তার শরীর কখনো কখনো এমন বিপদের সংকেত দিচ্ছিল, যখন বাস্তবে তাৎক্ষণিক কোনো বিপদ ছিল না।
তাকে কেউ তাড়াহুড়ো করে কোনো নাম দিয়ে চিহ্নিত করেনি। শুধু বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কোনো অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ভয় কখনো কখনো এত তীব্র হতে পারে যে তা দৈনন্দিন জীবনেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এর পেছনের কারণ বুঝতে সময় লাগে, আর সেই ভয় সামলাতে ধৈর্য, অনুশীলন ও প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা দরকার হয়।
মেহেদী শিখতে শুরু করল, ভয় এলেই তার সঙ্গে লড়াই করে তাকে তাড়িয়ে দিতে হবে না। কখনো শুধু থেমে শ্বাস নিতে হয়, নিজের চারপাশটা দেখতে হয়, নিজেকে মনে করিয়ে দিতে হয়—সে এখন কোথায়, কী ঘটছে, আর কোনটা পুরোনো স্মৃতি, কোনটা বর্তমানের বাস্তবতা। বোনের মৃত্যুর জন্য নিজেকে দোষী ভাবার অনুভূতিটাকেও সে ধীরে ধীরে প্রশ্ন করতে শিখল। সে বুঝল, কাউকে ভালোবাসা মানে তার প্রতিটি বিপদ আগেভাগে ঠেকিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা থাকা নয়। মানুষ সব সময় সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
তবু সব দিন সমান ছিল না। কোনো দিন একটা সিনেমার নাম শুনেই তার বুক কেঁপে উঠত। কোনো দিন কেউ মজা করে স্পয়লারের কথা বললে তার হাত ঠান্ডা হয়ে যেত। আগের মতোই ভয় ফিরে আসত, কিন্তু এবার সে জানত, ভয় ফিরে আসা মানেই সে আবার শূন্যে ফিরে গেছে, এমন নয়।
এক সন্ধ্যায় রাশেদ তাকে ফোন করে বলল, “আজ একটা সিনেমা দেখবি? খুব ভালো। কিন্তু একটা শর্ত আছে।”
মেহেদী হেসে বলল, “কী শর্ত?”
“শেষটা আমি জানি। কিন্তু তোকে বলব না।”
মেহেদীর বুকের ভেতর হালকা একটা টান অনুভব হলো। আগের মতো তীব্র নয়, তবু পরিচিত। সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, “ঠিক আছে। চল।”
সেদিন তারা সিনেমাটা দেখেছিল। মাঝখানে দুবার রাশেদের মনে হয়েছিল, মেহেদী হয়তো উঠে যাবে। কিন্তু সে যায়নি। একবার উত্তেজনাপূর্ণ দৃশ্যের সময় তার হাতের তালু ঘেমে উঠেছিল। সে টেবিলের ওপর হাত রেখে ধীরে ধীরে শ্বাস নিয়েছিল। তারপর আবার পর্দার দিকে তাকিয়েছিল।
সিনেমার শেষটা তার ভালো লেগেছিল কি না, সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ ছিল, শেষটা জানার ভয় থাকা সত্ত্বেও সে পুরো গল্পটার সঙ্গে থাকতে পেরেছিল।
বাড়ি ফেরার পথে রাশেদ জিজ্ঞেস করল, “কী রে, কেমন লাগল?”
মেহেদী একটু ভেবে বলল, “ভালো। তবে শেষটা আরেকটু অন্যরকম হলে ভালো হতো।”
রাশেদ হেসে উঠল। “এই তো! এখন নিজেই শেষটা বদলাতে শুরু করেছিস!”
মেহেদীও হাসল। অনেক দিন পর এমন একটা হাসি, যার ভেতরে আতঙ্কের চেয়ে স্বস্তি বেশি ছিল।
কয়েক সপ্তাহ পর এক রাতে সে আবার বোনের ঘরে গেল। জানালার পাশে বসে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইল। তারপর আলমারির তাকে রাখা সেই পুরোনো ডিভিডিটা নামিয়ে হাতে নিল। মেহেরিনের হাতের লেখাটা এখনো সেখানে আছে—“মেহেদীর সঙ্গে দেখব—শেষটা বলব না!”
তার চোখ ভিজে উঠল। কিন্তু এবার সে ডিভিডিটা ফেলে দিল না, লুকিয়েও রাখল না। খুব যত্ন করে আবার তাকে তুলে রাখল।
তার মনে পড়ল, বোনের সঙ্গে দেখা সিনেমাগুলোর কত শেষ সে ভুলে গেছে। কত দৃশ্য ঝাপসা হয়ে গেছে সময়ের ভেতর। কিন্তু মেহেরিনের হাসিটা এখনো তার মনে আছে। সেই হাসির সঙ্গে মিশে আছে শুক্রবারের রাত, বালিশ ছোড়াছুড়ি, একসঙ্গে চা খাওয়া, আর সিনেমার শেষ নিয়ে সেই মিষ্টি ঝগড়া।
হয়তো স্মৃতি ঠিক এভাবেই বেঁচে থাকে। সবকিছু নিখুঁতভাবে মনে রাখার মধ্যে নয়, বরং যেটুকু রয়ে যায়, সেটুকুকে ভালোবাসতে শেখার মধ্যে।
পরদিন রাশেদ আবার সিনেমার প্রসঙ্গ তুলেছিল। মেহেদী মজা করে বলেছিল, “শোন, কোনো দিন আমাকে সিনেমার শেষ বলার ভয় দেখিয়ে, কিন্তু চেইন চাইতে পারবি না!”
রাশেদ হেসে বলেছিল, “চেইনটা তোর কাছেই থাক। আমার এত দামী জিনিসের দরকার নেই।”
মেহেদীও হেসেছিল। তারপর একটু থেমে বলেছিল, “জানিস, আমি আগে ভাবতাম, গল্পের শেষ জেনে গেলে গল্পটা শেষ হয়ে যায়। এখন মনে হয়, শেষটা জানা আর গল্পটা বেঁচে ফেলা এক জিনিস নয়।”
রাশেদ তার দিকে তাকিয়ে রইল। মেহেদী কথাটা বলেই আকাশের দিকে তাকাল। সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছিল, আর শহরের ওপর নামছিল রাত।
মেহেরিন আপু আর কোনো দিন ফিরে আসবে না। এই সত্যটা বদলানোর ক্ষমতা কারও নেই। কোনো সিনেমার শেষও বদলে দেওয়া যায় না, কোনো গল্পকে অনন্তকাল ধরে মাঝপথে আটকে রাখা যায় না। কিন্তু একটা শেষের পরেও স্মৃতি থাকে, ভালোবাসা থাকে, আর থাকে নতুন করে বেঁচে ওঠার সম্ভাবনা।
মেহেদী এখনো স্পয়লার পছন্দ করে না। কেউ সিনেমার শেষ বলে দিতে চাইলে তার ভেতরে কখনো কখনো অস্বস্তি জাগে। কিন্তু সে আর প্রতিবার নিজের সবকিছু দিয়ে সেই ভয়কে থামানোর চেষ্টা করে না। সে জানে, ভয়কে সঙ্গে নিয়েও সামনে এগোনো যায়। জানে, কাউকে হারানোর কষ্টের জন্য নিজেকে সারাজীবন শাস্তি দিতে হয় না।
আর সবচেয়ে বড় কথা, সে বুঝতে শুরু করেছে—মেহেরিনের সঙ্গে তার গল্পটা সেই রাতেই শেষ হয়ে যায়নি।
কারণ মানুষ চলে যায়, কিন্তু ভালোবাসা সব সময় চলে যায় না। কখনো তা থেকে যায় একটা পুরোনো ডিভিডির গায়ে লেখা কয়েকটা শব্দে, কখনো বন্ধুর হাতে ফিরিয়ে দেওয়া সোনার চেইনে, কখনো অন্ধকার ঘরে একা বসে থাকা একজন মানুষের চোখের জলে।
আর কখনো থেকে যায় এমন এক হাসিতে, যে হাসি অনেক দিন পর ফিরে এসে বলে—
গল্পের শেষ আছে। কিন্তু শেষ মানেই সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়।