আমরা পত্র-পত্রিকা সহ অনলাইনে অনেক সময় নানা রকম ভাবে খাঁজ কাটা কুমিরের গল্প পড়েছি এবং শুনেছিও। আমি প্রথম গল্প টি পড়ি বুদ্ধুদেব গুহ'র লেখা সবিনয় নিবেদন বইটাতে। একটা বাচ্চা ছেলে, তাকে যে বিষয়ে পড়া জিজ্ঞাসা করা হয়, সে একটু বলেই সব কিছু কুমিরের পেটে দিয়ে দেয়।
আমি "সবিনয় নিবেদন" মূল বইথেকে গল্পটি আলাদা করে আপনাদের জন্য নিয়ে এলাম। চলুন পরে দেখি-
এক মাষ্টারমশাইয়ের এক ছাত্র ছিলো। এটা কোনো গল্প নয়। অগণ্য মাষ্টারমশাইদের অগণ্য ছাত্র থাকে। কিন্তু এই ছাত্রটির বিশেষত্ব ছিলো এই যে, এ কোনো সাব্জেক্টেই পাঁচ এর বেশি নম্বর পায় না । মাষ্টারমশায়ের লজ্জার সীমা পরিসীমা নেই। ব্যবসাদার বাবা। তিনিও ভাবেন, মাষ্টারের পেছনে এতো টাকা খরচ হচ্ছে আর রেজাল্টের বেলা এই । অল ডেবিট , নো ক্রেডিট।
একদিন তো তিনি ডেকে পাঠালেন মাষ্টারমশাইকে। ভেতর থেকে বড় ডিশে করে ভালোমন্দ খাওয়ার-দাওয়াও এলো। ছেলের বাবা বললেন, ব্যাপারটা কি ? মাষ্টারমশাই বললেন, ব্যাপার আর কিছুই নয়, কুমীর।
কুমীর ?
সে কী কথা !
হ্যাঁ স্যার। কুমীর। আপনি স্বকর্ণেই শুনুন। শেখাইতো আমি সবই কিন্তু আপনার ছেলের কুমীরের জন্যে সাধ্য কী যে স্কুলের মাষ্টারেরা আপনার ছেলেকে নম্বর দেন।
তা কি করে হয় ? কুমীর না হয় এক বিষয়ের নম্বর খেল। সব বিষয়ের নম্বর কুমীর খায় কি করে তা তো আমার সাধারণ বুদ্ধির বাইরে।
শুধু আপনারই কেন স্যার, ব্যাপারটা যা দাড়িয়েছে তা সব মাষ্টারমশাইদের অসাধারণ বুদ্ধির বাইরে।
শুনি, দেখি ছেলেকে কী পড়িয়েছেন ? আপনি প্রশ্ন করুন আর ও আমার সামনেই জবাব দিক। ওর কুমীর মেরে তার চামড়া দিয়ে আমি গিন্নীকে একটা ব্যগ বানিয়ে দেবো।
বলো তো খোকন । আচ্ছা প্রথমে কঠিন প্রশ্ন নয়। প্রথমে গরুর উপরেই মূখে মুখে একটা নিবন্ধ রচনা করো।
বাচ্চা ছেলেটি বললে, গলু ? মাত্তারমশাই ?
হ্যাঁ বাবা গলু।
ছাত্র গড়গড় করে বলতে শুরু করলে, গলু একটি উপকালি জন্ত। গলুর দুধ আমলা থকলে কাই। গলুর দুধ দিয়ে থানা হয়, দই হয়। গলুর তামলা দিয়ে দুতো হয়, গলুর থিং দিয়ে কত্বো কিছু হয়। কিন্তু মাত্তারমশাই।
কি ? বলো বলো, মাস্টারমশাই বললেন।
থামলে কেন?
বাবা বললেন, বলো, খোকন, কী হলো ?
একদিন না গলুটা বিতেল বেলা, বেলাতে বেলাতে একটা নদীল ধালে যেইনা গিয়ে পৌঁছেছে আর- মাত্তারমশাই—।
চোখ ছানাবড়া করে বললো খোকন।
আঃ বলোই না।
মাষ্টারমশাই বিরক্ত হয়ে বললেন।
মাত্তারমশাই, এতটা কুমিল এতে না, গলুটার পা কামলে ধরে এক্কেলে দলের তলায়।—ও মাত্তারমশাই ! গলু থেথ।
মাষ্টারমশাই বললেন, দেখলেন তো স্যার। গরু আরম্ভ হতে না হতেই শেষ হয়ে গেলো। যাকে নিয়ে নিবন্ধ তাকেই যদি কুমীর দিয়ে খাইয়ে দেয় গোড়া তেই তো মাস্টারেরা কত নম্বর দিতে পারেন? আপনিই বলুন।
এটা কোনো কথা নয়। এ অবিশ্বাস্য ব্যাপার। সব বিশ্বয়েই কুমির আমার ছেলেকে খাচ্চে …। আসলে সি পি এম-এর আমলে স্কুলগুলো সব গোল্লায় গেছে মশায়। পড়াশোনাই হয় না। নইলে একী মামদোবাজি পেয়েছেন? কুমিরের কুমীরের দোহাই পাড়ছেন সব সাব্জেক্টে আমার ছেলে ফেল করা জন্যে ?
আহা আমি তো প্রাইভেট, স্কুলের তো নই। আমার উপর রাগ করেন কেন ?
তাহলে করব কার উপরে ?
কী বলেন স্যার আপনি ? কুমীর আপনার ছেলেকে খাচ্ছে ? না না, আপনার ছেলেকে কুমীর খাবে কেন, কুমীর তো…
ঐ হলো ! নেট এফেক্টা তো তাই। প্রত্যেক সবজান্তেই যদি তিন চার করে পায় তো কুমীরেই খেলো নাকি ছেলেকে ?
একটু খেমে মাষ্টারমশাইকে বললেন, আচ্ছা রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে আমার ছেলে কিছু জানে ? বাঙালির ছেলেকে রবি ঠাকুরের সম্বন্ধে কিছু শেখাননি ?
আমার বিদ্যে-বুদ্ধি অনুযায়ী যতটুকু পারি শিখিয়েছি স্যার। বলেই বললেন, বলো তো বাবা , রবি ঠাকুরের সম্বন্ধে। তুমি কী জানো।
লবি ঠাকুর মাত্তারমশাই ! ও লবি ঠাকুল কুব বালো কবি ছিলেন ।টিনি গীতাঞ্জলি বলে একতা বই লিকে নোবেল প্লাইজ পেয়েথিলেন। তিনি অনেক গানও লিখেথিলেন। থে গানের নাম লবীন্দথংগিত। কিন্ত মাত্তামশাই!
একদিন কি না তিনি বেলাতে বেলাতে থিলাইদহের পদ্মার পাথে গেতেন, আল মাত্তারমশাই !
কি ?
আর কী ! এট্টা কুমীল না এথে তাঁর ঠ্যাং ধলে দলে টেনে নিয়ে তোলে গেলো-মাষ্টারমশাই !
এ কী জালারে বাবা !
ছেলের বাবা রীতিমত বিরক্ত হয়েই বললেন। সাহেব কবি-টবি সম্বন্ধে পড়িয়েছেন কিছু ? এই কুমীরকে যদি সাহেব দিয়ে জব্দ করা যায়।
হ্যাঁ। আপনি নিজেই জিজ্ঞেস করুন না এবারে স্যার।
বলো তো খোকা, উইলিয়াম শেক্সপীয়র কে ছিলেন ?
খোকন সংগে সংগে বলল “থেকথপিয়ার ইংল্যান্দ্যের মহাকবি থিলেন। তিনি অনেক বই লিখেথিলেন। নাটক, কবিতা আলো কত্ত কি। তিনি জন্মেথিলেন ত্যাথফোর্ড অন এভনএ।
কিন্তু মাত্তারমশাই।
কি ?
একদিন না তিনি তাঁর বালি থেকে বেলিয়ে অ্যাভন নদীল পাশে বেলাতে বেলাতে যেই গেছেন, সে নদীতে অনেক হাথও ভাসছিলো । কিন্তু মাত্তারমশাই একতা কুমীল, কী পাজী কুমীল, এত্তো বলো বলো ল্যাজ হাথগুলোকে না ধরে থেক্সপিয়ারের পা কামলে ধলে অ্যাভন নদীর মদ্দে এক্কেবালে মাত্তামশাই–
ছেলের বাবা অত্যান্ত চিন্তান্বিত গলায় বললেন, আরে সত্যি তো
মাস্টারমশাই। একে একি কুমীরের ব্যামোয় পেলো বলুন ত দেখি! জ্যোতিবাবুর ভাষায় এযে দেখি “গভীর চক্রান্ত”।
কি আর বলব আমি ? শুধুই দেখি। মাস্টারমশাই অসহায় গলায় বললেন। আচ্ছা এবারে একটা ইতিহাসের প্রশ্ন করুন তো। দেখি কুমীর কি করে ঢোকে হিস্ট্রিতে। প্রেজেন্ট টেন্স-এ তো ট্যা-ফো হবে না।
মাস্টারমশাই এক টিপ নস্যি নিয়ে বললেন, ঢুকবে তাও ঢুকবে দেখবেন। অসীম ক্ষমতা আপনার ছেলের। আপনার ছেলের কুমীর লখীন্দর-বেহুলার বাসরঘরে ঢোকা সাপেরই মতো। বড় সুক্ষ শরীর সে সর্বনাশার। তাকে আটকায় সে সাধ্য কারোই নেই।
বাবাই বললেন এবারে, আচ্ছা বলো তো খোকন তুমি শাজাহান সম্বন্ধে কিছু জানো ?
হ্যাঁ। জানি। বাবা।
কী জানো ? বলো।
"সাজাহান খুব বলো নবাব থিলেন। দিল্লির নবাব। তাঁর বউএর নাম থিলো মমতাজমহল। তিনি তাজমহল বানিয়েথিলেন।
একদিন...মাত্তারমশাই...।
কী ? কী হলো ?
একদিন থাদাহান দমুনা নদীল পাথে দালিয়ে দালিয়ে দমুনার দলে তার তলোয়াল পলিস্কার কত্তিলেন আর ওমনি...মাত্তারমশাই ! ওমনি একতা কুমীল থাদাহানের পা ধলে দলের নিচে...মাত্তারমশাই।
ছেলের বাবা Exasperated হয়ে এবারে মাথায় হাত দিয়ে মাষ্টারমশাইকে বললেন, মাটির উপরে তুলে দেঁখেছেন কখনও ? মানে শুন্যে, সেখানেও কি কুমীর ?
হ্যাঁ স্যার তাও দেখেছি। সব জায়গায় কুমীর !
সে কী ! না না। এ আপনার বাড়াবাড়ি। দাঁড়ান। আমি প্রশ্ন করি। আচ্ছা খোকন, অ্যারোপ্লেন সমন্ধে তুমি কি জানো বলো ? অ্যারোপ্লেন দেখেছো তো ?
হ্যাঁ জানি।
বলবো ?
হ্যাঁ খোকন বলতো ।
অ্যালোপ্লেন আকাশের দাহাদ। আকাথে তলে। উলে উলে তলে। তার দুটো দানা আতে। অনেত মাল আর মানুথ তাল পেতের মধ্যে বথে থাতে। অ্যালোপ্লেন দিনে ও লাতেও উলতে পারে।
বাবা বললেন, অ্যাই তো কেমন ফ্লুয়েন্টলি বলে যাচ্ছে, আপনারা না...
হ্যাঁ খোকন বলো, তারপর ?
একদিন অ্যালোপ্লেন টা একতা নদীল উপল দিয়ে যেতে যেতে কালাপ হয়ে গিয়ে...মাত্তারমশাই...
নদীর নাম কি ?
কঙ্গো নদী মাত্তামশাই ! কুমীলে ভলা !
মাষ্টারমশাই আর এক টিপ নস্যি নিয়ে বললেন, ঐ দেখুন ! অ্যারোপ্লেনও কি বাঁচবে ?
মাত্তারমশাই ! অ্যালোপ্লেনতা দেই দলে এসে পললো একটা কুমীল দুতো কুমীল অনেক কুমীল এসে পাইলতদের আগে তাপ্পর...মাত্তামশাই !...