Story

জোৎস্নার আলোয় তোমায় খুঁজি

October 5, 2026

224 views

রাত গভীর। হঠাৎ নিশাচর কোনো পাখির ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। সেই ডাকেই যেন ঘুমের ঘোর কেটে গেল এক নিমেষে। জানালার ফাঁক গলে চোখ মেলতেই দেখি—আকাশজুড়ে মেঘ আর জোৎস্নার লুকোচুরি খেলা। এক টুকরো হালকা মেঘ যখন চাঁদের মুখটাকে আড়াল করে, তখন বুকের ভেতর অকারণেই এক সূক্ষ্ম হাহাকার জেগে ওঠে। আবার মেঘ সরে গিয়ে যখন দ্বিগুণ জোৎস্না ঝরে পড়ে, তখন মনে হয়—এই তো! ঠিক এই রুপোলি আলোর ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে আমার সেই পরম প্রাপ্তি। জোৎস্না আসলে এক অদ্ভুত আয়না। যে এই আলোর দিকে কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে, সে হয়তো নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অবদমিত ভালোবাসার মুখোমুখি হয়। কেউ এখানে খুঁজে পায় শৈশবের সরলতা, কেউ শুনতে পায় বহুদিন ভুলে থাকা কোনো প্রিয় গানের সুর, আবার কেউ হঠাৎ আবিষ্কার করে জীবনের এমন কোনো সত্য—যার সামনে দাঁড়িয়ে এতদিন নিজেকেই এড়িয়ে গেছে।

রাত বাড়ে; বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আমি আর চাঁদের জোৎস্না যেন মিলেমিশে একাকার। চারপাশে গভীর নিস্তব্ধতা। পৃথিবী ঘুমে আচ্ছন্ন, অথচ আলোর এই নীরব উৎসবের ভেতর মন যেন এক চিরন্তন জাগরণে মগ্ন। চাঁদের আলো ক্রমেই আরও মায়াবী, আরও নিবিড় হয়ে ওঠে। এই জোৎস্না কোনো সীমানা মানে না, কোনো শর্ত চাপায় না। সে শুধু নিঃশব্দে ঝরে পড়ে—আর মানুষকে দাঁড় করিয়ে দেয় তার নিজের মুখোমুখি। রাতেরও বোধহয় নিজস্ব একটি ভাষা আছে। কোলাহল যখন ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে, চারপাশের চেনা পৃথিবী তার চড়া রংগুলো ধুয়ে ফেলে যখন এক অদ্ভুত ধূসরতায় মিশে যায়, তখন মানুষের ভেতরের সত্তাটাই যেন জেগে ওঠে। আজকের রাতটা যেন আরও আলাদা। শরতের নীল আকাশ চিরে নেমে এসেছে এক মায়াবী পূর্ণিমার ঢল। জানালার কাচ গলে, বারান্দার গ্রিল পেরিয়ে রুপোলি আলো এসে পড়েছে ঘরের মেঝেতে। অদৃশ্য কোনো এক টান মানুষকে টেনে নিয়ে যায় আলো-ছায়ার সেই সীমানায়—যেখানে নীরবতাও কথা বলে।

বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়ালে মনে হয়, এই মহাবিশ্ব যেন এক বিশাল নীরবতার চাদরে ঢাকা। অথচ মানুষের মনের ভেতর তখন কত শত শব্দের আনাগোনা! চাঁদের আলো চারপাশকে এক অপার্থিব শুভ্রতায় স্নান করিয়ে দেয়। সেই আলোর দিকে তাকালেই বুকের গভীরে একই সঙ্গে জন্ম নেয় এক অদ্ভুত শূন্যতা আর এক গভীর পূর্ণতার অনুভব। ঠিক তখনই মনে হয়—চারপাশে কী যেন খুঁজছি। কী যেন থাকার কথা ছিল এই জোৎস্নার রাতে। কোনো মুখ নয়, কোনো নাম নয়—শুধু এক অদৃশ্য অবয়ব? নাকি নিজের হারিয়ে যাওয়া কোনো অতীত? নাকি এমন কাউকে, যার কোনো নাম নেই, কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় নেই, অথচ যার উপস্থিতি প্রতিটি নিঃশ্বাসে টের পাওয়া যায়? আসলে এই খোঁজাটা কোনো বাইরের মানুষের খোঁজ নয়। এই খোঁজাটা একান্তই নিজের। মানুষ যখন খুব একা হয়, যখন তার চারপাশের আলো ম্লান হয়ে আসে, তখন সে জোৎস্নার এই অকৃপণ আলোর ধারায় নিজের অস্তিত্বকে মেলাতে চায়।

চোখ চলে যায় আকাশের দিকে। চাঁদের আলোয় যখন চারপাশ ভেসে যায়, তখন মনে হয়—প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি গাছের পাতা যেন এক পরম শান্তির কথা বলছে। বাতাসে এক ধরনের স্নিগ্ধতা, যা মনের সব ক্লান্তি, সব জমানো অভিমানকে আলতো করে ছুঁয়ে যায়। মন তখন কোনো জাগতিক হিসাব-নিকাশ মানে না। সে চায় এমন এক মুহূর্ত, যেখানে কোনো প্রাপ্তি কিংবা অপ্রাপ্তির বেদনা থাকবে না; থাকবে শুধু এক চিরন্তন বয়ে চলা। রেলিং থেকে হাতটা সরিয়ে চাঁদের আলোর দিকে বাড়িয়ে দিলে মনে হয়, জোৎস্না ছুঁয়েছে আমায় এক পরম প্রাপ্তির লুকোচুরি খেলায়। কিন্তু তাকে মুঠোবন্দী করা যায় না। আলো আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে পড়ে যায়—ঠিক যেমন আমাদের জীবন থেকেও অনেক কিছু গলে যায়; কিছু স্বপ্ন, কিছু মুহূর্ত, কিছু না-বলা কথা। তবু মানুষ আশায় বুক বাঁধে। সে প্রতিটি পূর্ণিমায়, প্রতিটি আলোকময় রাতে আবার এসে দাঁড়ায়। সে জানে, যা হারিয়ে গেছে, তাকে হয়তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না; কিন্তু এই মায়াবী আলোর স্পর্শে সেই হারিয়ে যাওয়া অনুভূতির যেন আবারও পুনর্জন্ম ঘটে।

বারান্দা ছেড়ে ঘরে ফেরার আগে আরও একবার আকাশের দিকে তাকালে এক অদ্ভুত শান্তি মনকে গ্রাস করে। তখন আর কোনো হাহাকার থাকে না, কোনো শূন্যতা থাকে না। মানুষটা বুঝতে পারে—এই খোঁজার কোনো শেষ নেই, আর এই শেষ না হওয়াটাই তো জীবনের সৌন্দর্য। মনের গহীন থেকে এক মৃদু স্বগতোক্তি ভেসে আসে—তুমি যেখানেই থাকো, যেভাবেই থাকো, আমি জানি, তুমি আছ। এই জোৎস্নারই কোনো এক অদৃশ্য ভাঁজে। আমি তাই চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকি। আলো আর অন্ধকারের এই লুকোচুরি খেলায়, মেঘের আড়ালে, রাতের নীরবতায়—বারবার তোমাকেই খুঁজি। যে চাঁদ এত দূর থেকেও পৃথিবীকে আলোয় ভরিয়ে দিতে পারে, তুমি কি এতটুকু দূরত্ব পেরিয়ে আমার কাছে আসতে পারো না? কারণ কিছু মানুষকে পাওয়া যায় না—শুধু অনুভব করা যায়। আর কিছু ভালোবাসা কখনো কাছে আসে না—শুধু পূর্ণিমার রাতে নিঃশব্দে জোৎস্না হয়ে ঝরে পড়ে। আর তাই তো, প্রতিটি স্নিগ্ধ জোৎস্নার আলোয়, বারবার তোমায় খুঁজি।

মোঃ আবু হানিফ
২০ আশ্বিন ১৪৩৩

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login