চিরন্তন সুরটি কেবল এক বিরহী অন্তরের আকুতি নয়, এটি এক পরম অপেক্ষা এবং অন্তহীন একাকীত্বের মহাকাব্য- “ওকে গাড়িয়াল ভাই, আমি কত রব পন্থের পানে চাইয়া রে...”। এ যেন এক অন্তর্নিহিত হাহাকার ও আবেগঘন হৃদয়ের প্রতীক্ষার আকুতি। গাড়ির চাকার দাগ মেঠোপথে পড়ে আর মিলিয়ে যায়, কিন্তু এই কালজয়ী সুরের হাহাকার কখনো মিলিয়ে যায় না। তা অনন্তকাল ধরে এই বাংলার আকাশে-বাতাসে, মেঠোপথে আর মানুষের অলক্ষ্য অন্তরে প্রতিধ্বনিত হতেই থাকে। পথটি তেমনই রয়ে যায়—উদাস, ধূসর আর অপেক্ষমাণ। এক বুক আশা আর চোখভরা ক্লান্তি নিয়ে সে তাকিয়ে থাকে সেই সুদূরের পানে, যেখানে আকাশ আর মাটি এক হয়ে মিশে গেছে কোনো এক দিগন্তে।
প্রকৃতিটাও এমনেই! মানুষের সাথে মিলেমিশে সে যেন প্রতীক্ষাকে আপন করে নিয়েছে। “আমি কত রব পন্থের পানে চাইয়া রে...” সেই সুর এখন আর কোনো মানুষের কণ্ঠের নয়, যেন এই প্রকৃতিরই এক অবাধ্য ক্রন্দন। এই আকুতি কোনো নির্দিষ্ট কাল বা পাত্রের গণ্ডিতে বাঁধা নেই। এ যেন এক চিরন্তন বিরহের গান, যা প্রতিটি ধূলিকণায়, প্রতিটি ঘাসের ডগায় মিশে আছে। গন্তব্যহীন এক যাত্রার পেছনে ছুটে চলা মন যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন কেবলই চেয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। চোখ দুটো ক্লান্ত হয়, পথের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে, কিন্তু ভেতরের সেই ব্যাকুলতা একবিন্দুও কমে না।
ধূ ধূ বালুচর আর নির্জন মেঠোপথ। কাশবনের বুক চিরে পথটি মিশে গেছে দিগন্তের ওপারে, যেখানে আকাশ এসে মাটির কানে কানে কী যেন এক গোপন বিষাদের কথা বলে। সেই পথের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন বটবৃক্ষ, যার ঝুরিগুলো জটাধারী সন্ন্যাসীর মতো মাটির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এই পথ, এই গাছ আর এই উদাস বাতাস যেন যুগ যুগ ধরে এক পরম অপেক্ষার নীরব সাক্ষী। এখানে কোনো পদচিহ্ন স্থায়ী হয় না। উত্তুরে হাওয়া আর চরের তপ্ত বালু নিমেষেই মুছে দেয় মুসাফিরের হেঁটে যাওয়ার দাগ। কিন্তু মুছে যায় না এক অলিখিত প্রতীক্ষা। এক অবিনশ্বর শূন্যতা এই চরাচরের বাতাসকে ভারী করে রাখে। বহুদূর থেকে ভেসে আসা কোনো এক উদাসীন গরুর গাড়ির চাকার ‘চুঁই-চাঁই’ শব্দ যখন দুপুরের তপ্ত নিস্তব্ধতাকে ভেঙে খানখান করে দেয়, তখন এই পথেরও বুক কেঁপে ওঠে। মনে হয়, এই বুঝি প্রতীক্ষার অবসান হলো। এই বুঝি সেই কাঙ্ক্ষিত আগমনী বার্তা নিয়ে কেউ এল। কিন্তু না, গাড়িটি ধুলো উড়িয়ে পার হয়ে যায়, আর পেছনে ফেলে যায় কেবল আরও কিছু ধূসর দীর্ঘশ্বাস।
অপেক্ষা যেন বুক চেপে বসে থাকা এক দীর্ঘশ্বাস। তার কোনো নিজস্ব ভাষা নেই, রংও নেই। যখন গোধূলির আলোয় আকাশটা সিঁদুরে মেঘে রাঙা হয়ে ওঠে, তখন এই মেঠোপথের ধারে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা নেমে আসে। চারদিকের পাখিগুলো নীড়ে ফেরে, কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। শুধু ফেরে না সেই একজন, যার জন্য পথটি বুক পেতে বসে আছে অনন্তকাল। ঝরে পড়া শুকনো পাতার মচমচ শব্দে মনে হয়, এই বুঝি চেনা চরণের স্পর্শ লাগল ধুলোয়। কিন্তু পরক্ষণেই বোঝা যায়, ওটা কেবলই ধোঁয়াশামাখা বাতাসের খেলা।
রাতের অন্ধকার যখন চারপাশকে গ্রাস করে নেয়, তখন জোনাকির আলোয় পথটি এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। নিঝুম রাতের সেই স্তব্ধতায় চাকার শব্দটা আরও বেশি স্পষ্ট, আরও বেশি মর্মভেদী মনে হয়। গাড়িয়াল ভাই হয়তো আপন মনে গাড়ি চালিয়ে চলে যায় অচিন দেশের পানে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া সুরের রেশটুকু এই জনহীন প্রান্তরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। সেই সুর প্রশ্ন করে—এই অন্তহীন চাহিয়া থাকার শেষ কোথায়? এই পন্থ কি শুধুই অপেক্ষার?
প্রকৃতির এই নির্বাক ক্যানভাসে বিরহ এক চরম সত্য রূপ নিয়ে ফোটে। যখন বর্ষার মেঘে আকাশ কালো হয়ে আসে, যখন অবিশ্রান্ত ধারায় বৃষ্টি ঝরে এই মেঠোপথে, তখন মনে হয় চরাচর কাঁদছে। এই জলধারা যেন সেই পথ চেয়ে থাকা চোখেরই অশ্রু, যা যুগ যুগ ধরে জমা হয়ে আজ মেঘ হয়ে ঝরে পড়ছে। মাটির সোঁদা গন্ধে তখন এক তীব্র একাকীত্বের হাহাকার মিশে থাকে। প্রতিটি ঋতু আসে আর যায়, বসন্তের কোকিল ডাকে, শীতে কুয়াশার চাদরে ঢেকে যায় চারপাশ। তবুও সেই একাকী পথের শূন্যতা আর কখনো পূর্ণতায় রূপ নেয় না।
হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এই সুরটি এক পরম সত্যকে মনে করিয়ে দেয়—মানুষের জীবনটাই হয়তো এক মহতী প্রতীক্ষা। কেউ সুদিনের অপেক্ষায়, কেউ বা হারিয়ে যাওয়া কোনো স্মৃতির অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকে। এই চেয়ে থাকার মধ্যে যে কী ভীষণ যন্ত্রণা, আবার কী অদ্ভুত এক পবিত্রতা লুকিয়ে আছে, তা কেবল সেই বোঝে, যে নিঃশর্তভাবে অপেক্ষা করতে জানে। কোনো প্রাপ্তির আশা ছাড়াই, কেবল ভালোবাসার টানে পথের দিকে তাকিয়ে থাকা—এর চেয়ে বড় আর কোনো সাধনা হতে পারে না।
মোঃ আবু হানিফ
১১ কার্তিক ১৪৩৩
Comments
Be this story’s first reader
+25 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.
-
-
Borhan Mahmud
16 hours ago
খুব ভালো লিখেছেন ভাই। শুভেচ্ছা রইল।