Story

তোমার চোখের মায়ায়

October 7, 2026

47 views

বৃষ্টিভেজা বিকেলে ঢাকার ট্রাফিক যেন এক স্থির জলছবি। উইন্ডশিল্ডের কাচে একটার পর একটা জলের ফোঁটা এসে আছড়ে পড়ছে, আর ওয়াইপারের মৃদু ঘষটানির শব্দে তৈরি হচ্ছে এক নিজস্ব তাল। নীলচে আলো জ্বলে থাকা আর্ট গ্যালারির বারান্দায় তখন উপচে পড়া ভিড়। শহরের তরুণ চিত্রশিল্পী অর্ঘ্য সেনের একক প্রদর্শনী চলছে সেখানে। কিন্তু যার কাজ নিয়ে চারপাশের এত গুঞ্জন, সেই অর্ঘ্য নিজেই দাঁড়িয়ে আছে সবার অলক্ষ্যে, কাচের জানালার পাশে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফি হাতে। তার ক্যানভাসগুলো প্রাণবন্ত, রঙের ছটায় মুখর, অথচ অর্ঘ্যর নিজের মনের ভেতর কোথাও এক অদ্ভুত শূন্যতা জমে থাকত। সে খুঁজছিল এমন কিছু, যা রঙ আর তুলির সীমা ছাড়িয়ে আত্মাকে স্পর্শ করে। অর্ঘ্য জানত না, আজকের এই শ্রাবণসন্ধ্যা তার সেই চেনা জগতের সব সমীকরণ নিমেষে ওলটপালট করে দিতে চলেছে।

গ্যালারির মাঝামাঝি টাঙানো ছিল অর্ঘ্যর আঁকা এক রহস্যময় মুখাবয়ব, কুয়াশায় ঢাকা এক নারীর অর্ধেক মুখ, যেখানে চোখ দুটো আঁকা হয়নি। শুধুই এক গভীর ছায়ার ইঙ্গিত। ঠিক সেই ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল একটি মেয়ে। গায়ে হালকা বাসন্তী রঙের সুতির শাড়ি, ভেজা চুল পিঠের ওপর একপাশে এলিয়ে দেওয়া। তার হাতে কোনো ক্যাটালগ নেই, মুখে কোনো সমালোচকের ভারী ভাব নেই। সে কেবল একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অপূর্ণ ক্যানভাসটির দিকে। অর্ঘ্য কফির কাপে চুমুক দিতে গিয়েও থেমে গেল। কী এক অদৃশ্য আকর্ষণে পা বাড়াল সেই মেয়েটির দিকে। পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই ভেসে এল বৃষ্টিভেজা বেলি ফুলের খুব মৃদু এক সুবাস। অর্ঘ্য নরম গলায় বলে উঠল, "ছবিটা শেষ হয়নি, তাই না?"

মেয়েটি একটুও চমকে উঠল না। ধীরে ধীরে মুখ ফেরাল। আর ঠিক তখনই অর্ঘ্যর ভেতরের চেনা পৃথিবীটা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল।

মেয়েটির চোখ দুটো সাধারণ কোনো চোখের মতো নয়। গাঢ় কাজলের রেখায় আঁকা সেই চোখে এক অদ্ভুত মায়া। সেখানে একাধারে খেলা করছে শরতের শান্ত কাশফুলের শুভ্রতা, আবার লুকিয়ে আছে শ্রাবণের মেঘের মতো গভীর আকুলতা। চোখের তারায় বাতির নরম আলো প্রতিফলিত হয়ে তৈরি করেছে এক সম্মোহন, যেখান থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়া অসম্ভব। অর্ঘ্য সারা জীবন আলো আর ছায়ার খেলা এঁকেছে, কিন্তু মানুষের চোখে এমন মায়াবী আলো সে কখনো দেখেনি। মেয়েটি ঠোঁটের কোণে মিষ্টি এক টুকরো হাসি ফুটিয়ে বলল, "অপূর্ণ বলেই হয়তো এটা এত বেশি পূর্ণ। কখনো কখনো শেষ না হওয়া গল্পগুলোই মনের ভেতর বেশি দাগ কেটে যায়।" তার কণ্ঠস্বর বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের চেয়েও স্নিগ্ধ। অর্ঘ্য নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "আমি অর্ঘ্য। এই অপূর্ণ ক্যানভাসের অপরাধী।"

মেয়েটির চোখের মায়াবী দীপ্তি যেন আরও এক ঝলক বেড়ে গেল। সে একটু মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, "জানি। আপনার তুলির টানে তীব্রতা আছে, তবে এই ছবিটায় এসে আপনার হাত যেন একটু থমকে গেছে। কেন বলুন তো?" "কারণ আমি যে চোখ দুটো খুঁজছিলাম, ক্যানভাসে তা আঁকার মতো রঙ আমার প্যালেটে ছিল না," অর্ঘ্যর মুখ দিয়ে কথাটা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বেরিয়ে এল। বলার পরই তার মনে হলো কথাটা হয়তো একটু বেশি স্পষ্ট হয়ে গেল। মেয়েটি কিন্তু বিব্রত হলো না। কেবল অপলক চোখে অর্ঘ্যর দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল এক চিলতে কৌতুক আর পাহাড়সমান গভীরতা। সে মৃদু হেসে বলল, "আমি মায়াবতী। বন্ধুরা মায়া বলে ডাকে। তবে চোখ খোঁজার জন্য ক্যানভাস ফেলে রাখা কিন্তু একজন শিল্পীর অলসতা, অর্ঘ্যবাবু।"

"মায়া..." নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে অর্ঘ্যর মনে হলো, এই নামের চেয়ে মানানসই নাম এই মেয়ের আর হতেই পারত না। সেদিন গ্যালারির ভিড়, সমঝদারদের প্রশংসা, আলোকচিত্রীদের ক্যামেরার ঝলকানি—সবকিছু ম্লান হয়ে গিয়েছিল। অর্ঘ্যর পুরো সত্তা জুড়ে তখন কেবল একটি অনুভূতিই অনুরণিত হচ্ছিল: তোমার চোখের মায়ায় যে ঘোর লুকিয়ে আছে, তা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো পথ নেই।

সেই সন্ধ্যার পর থেকেই যেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। পরিচয়টা খুব দ্রুত রূপ নিল এক গভীর সখ্যে। মায়া পড়ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ভাস্কর্য বিভাগে। রঙের চেয়ে মাটির ছাঁচেই নাকি সে বেশি জীবন খুঁজে পেত। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, অর্ঘ্য যেখানে রঙের কারিগর, সেখানে মায়ার সঙ্গ পাওয়ার পর থেকে সে ক্যানভাসে রঙের চেয়ে অনুভূতির গভীরতা মাপতে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তাদের দেখা হতো ধানমন্ডি লেকের রবীন্দ্র সরোবরের কাঠের সাঁকোয়, চারুকলার বকুলতলায় কিংবা পুরান ঢাকার কোনো পুরোনো গলির চায়ের টংয়ে।

এক রৌদ্রোজ্জ্বল বিকেলে তারা বসেছিল কার্জন হলের লাল ইটের বারান্দায়। মাথার ওপর প্রাচীন মেহগনি গাছের পাতার ফাঁক গলে নেমে আসছিল সোনালী রোদের ঝিলিক। মায়া খাতার পাতায় পেনসিল দিয়ে এক পাখির অবয়ব স্কেচ করছিল। অর্ঘ্য একপাশে বসে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল মায়ার মুখের দিকে। মায়ার খোলা চুলগুলো বাতাসে বারবার এসে তার গালে পড়ছিল, আর প্রতিবার মায়া যখন অনভ্যস্ত হাতে চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিচ্ছিল, তার কাজলটানা চোখের পল্লবগুলো কেঁপে উঠছিল।

"তুমি কি জানো মায়া, তোমার এই চোখ দুটো নিয়ে একটা গোটা মহাকাব্য লিখে ফেলা যায়?" অর্ঘ্য হঠাৎ নিচু স্বরে বলল। মায়া পেনসিল চালানো থামিয়ে আড়চোখে তাকাল। তার চোখের কোণে এক অদ্ভুত চঞ্চলতা, "আবার শুরু হলো আপনার কাব্যি? শিল্পীদের মুখে অতিরিক্ত প্রশংসা কিন্তু বিশ্বাস করতে নেই।" "এটা প্রশংসা নয়, মায়া। এটা এক চরম অসহায়ত্ব," অর্ঘ্য একটু ঝুঁকে বসল, "আমি যখনই তোমার চোখের দিকে তাকাই, মনে হয় পৃথিবীর সব কোলাহল হঠাৎ থেমে গেছে। সেখানে এমন একটা গভীর মায়া আছে, যা কোনো রঙ দিয়ে মেশানো যায় না। আমি যতই চেষ্টা করি ক্যানভাসে তোমার সেই দৃষ্টি ফুটিয়ে তুলতে, ততই ব্যর্থ হই।"

মায়ার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তের জন্য গম্ভীর হয়ে গেল। সে খাতাটা কোলে নামিয়ে রেখে সোজা তাকাল অর্ঘ্যর চোখের গভীরে। সেই চাহনিতে কী ছিল? ভালোবাসা, আকুলতা, নাকি কোনো না-বলা দীর্ঘশ্বাস? মায়া খুব ধীরেসুস্থে বলল, "চোখ হলো আত্মার আয়না, অর্ঘ্য। সেখানে যা দেখা যায়, তা চোখের সৌন্দর্য নয়, তা আসলে দেখার মানুষের মনের প্রতিচ্ছবি। তুমি তোমার ভালোবাসার রঙ দিয়ে দেখছ বলেই আমার চোখকে এত মায়াবী মনে হয়।"

"তাহলে তুমি স্বীকার করছ যে আমি তোমাকে ভালোবাসি?" অর্ঘ্যর গলায় ছিল ধরা পড়ার মতো কাঁপন। মায়া কোনো উত্তর দিল না। কেবল এক টুকরো স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল মেহগনি গাছের পাতার দিকে। বাতাসে তখন ঝরে পড়ছে শুকনো পাতা, আর তাদের দুজনের মাঝখানে বয়ে যাচ্ছে এক নিঃশব্দ, মধুর প্রেমের নদী। কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের প্রয়োজন হয়নি তাদের। নীরবতার ভাষাই তাদের ভালোবাসাকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছিল। প্রেমের দিনগুলো যেন ডানায় ভর করে উড়তে লাগল। অর্ঘ্যর জীবনে মায়া আসার পর তার তুলি যেন এক জাদুকরী স্পর্শ পেল। সে একের পর এক অসাধারণ চিত্রকর্ম সৃষ্টি করতে লাগল। শিল্পসমালোচকরা বললেন, অর্ঘ্যর ছবিতে এখন আর কেবল আলোর কৌশল নেই, আছে প্রাণের স্পন্দন। আর সেই স্পন্দনের উৎস ছিল একজনই—মায়া।

একদিন সন্ধ্যায় ঝুম বৃষ্টি নামল শহরে। অর্ঘ্য আর মায়া আশ্রয় নিল ধানমন্ডি লেকের একটি ছাউনির নিচে। চারপাশটা বৃষ্টির জলে ধুয়ে একাকার হয়ে গেছে। সোডিয়াম বাতির হলুদ আলো জলে পড়ে ভেঙেচুরে এক পরাবাস্তব আবহ তৈরি করেছে। মায়া হঠাৎ ছাউনি থেকে এক পা বাড়িয়ে বৃষ্টির জলের ধারা নিজের অঞ্জলিতে তুলে নিল। তারপর সেই জল ছিটিয়ে দিল অর্ঘ্যর মুখে। অর্ঘ্য চোখ বন্ধ করে সেই শীতল স্পর্শ অনুভব করল। চোখ খুলে দেখল, মায়া তার খুব কাছে দাঁড়িয়ে। বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে গেছে তার কপালের চুল, চোখের পাতায় জমে আছে কয়েক ফোঁটা জলবিন্দু। সেই ভেজা চোখে চোখ পড়তেই অর্ঘ্যর সমস্ত চৈতন্য যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। মায়ার চোখের ওই মায়ায় তখন ছিল এক আদিম টান, এক সমর্পণ। অর্ঘ্য আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে আলতো করে নিজের ডান হাতটা তুলে নিল মায়ার ভেজা কপোলে। মায়া কেঁপে উঠল, কিন্তু সরে গেল না। তার চোখের পাতা ধীরে ধীরে নেমে এল, যেন এক পরম আশ্বাসে সে নিজেকে সঁপে দিল এই ভালোবাসার উষ্ণতায়।

"মায়া, যদি কখনো এমন হয় যে আমি অন্ধ হয়ে গেলাম, তবুও আমি শুধু তোমার চোখের এই মায়াটুকু মনে রেখে সারাটা জীবন ক্যানভাস ছুঁয়ে বেঁচে থাকতে পারব," অর্ঘ্য আবেগভরা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল। মায়া চোখ খুলে অর্ঘ্যর হাতের ওপর নিজের নরম হাতটি রাখল। তার চোখে তখন ভালোবাসার চেয়েও বেশি ছিল গভীর এক মায়াবী আকুলতা। সে বলল, "অর্ঘ্য, সময় কখনো কখনো বড্ড নিষ্ঠুর হয়। কিন্তু তুমি মনে রেখো, আমার এই চোখ দুটো যদি কখনো তোমার চোখের সামনে নাও থাকে, এগুলোর দৃষ্টি সব সময় তোমার হৃদয়ের ওপরই স্থির থাকবে। কোনো দিন ভুলে যেও না।"

অর্ঘ্য মায়ার কথাটির গভীরতা তখন বুঝতে পারেনি। সে ভেবেছিল, এটা হয়তো ভালোবাসার অতিশয্যে বলা এক রোমান্টিক কথা মাত্র। কিন্তু নিয়তির চিত্রনাট্য যে তখন আড়ালে দাঁড়িয়ে এক করুণ পরিণতি আঁকছিল, তা বোঝার সাধ্য কার ছিল!

কয়েক মাস পরের এক ঘটনা। অর্ঘ্য তখন জাতীয় পর্যায়ের এক বড় প্রদর্শনীর প্রস্তুতিতে দিনরাত এক করে কাজ করছে। সে তৈরি করছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ—মায়ার একটি পূর্ণাঙ্গ পোট্রেট। সব আঁকা হয়ে গেছে, শুধু বাকি সেই চোখ দুটো। যে চোখে সে প্রথম দিন ডুবে গিয়েছিল, যে চোখ তাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে।

কিন্তু ঠিক সেই সময়েই মায়ার উপস্থিতিতে কেমন যেন এক অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করতে শুরু করল অর্ঘ্য। মায়া আগের মতো দীর্ঘক্ষণ কথা বলত না। প্রায়ই ফোনে আনমনা হয়ে যেত। দেখা করতে চাইলে নানা অজুহাত দেখাত। এমনকি যখন দেখা হতো, তখনো তার চোখের সেই চিরাচরিত মায়াবী দীপ্তির আড়ালে যেন এক অচেনা বিষাদের ছায়া উঁকি দিত।

এক বিকেলে চারুকলার সিঁড়িতে বসে অর্ঘ্য মায়ার হাত শক্ত করে ধরল। "মায়া, কী লুকিয়ে রাখছ তুমি আমার কাছ থেকে? তোমার চোখ কখনো মিথ্যা বলতে পারে না। আমি দেখতে পাচ্ছি, সেখানে কিছু একটা ভাঙছে।" মায়া হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল না। বরং মাথা নিচু করে রইল। অনেকক্ষণ পর যখন সে চোখ তুলে তাকাল, অর্ঘ্য দেখল সেই মায়াবী চোখ দুটো জলে টলমল করছে। "অর্ঘ্য, বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছেন," এক নিশ্বাসে কথাটি বলে ফেলল মায়া। মুহূর্তের মধ্যে অর্ঘ্যর পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। চারপাশের চেনা পৃথিবীটা দুলতে লাগল। সে অবিশ্বাসের সুরে বলল, "বিয়ে? মানে কী? তুমি জানো না আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি? তোমার বাবাকে আমরা গিয়ে বলি..."

"কোনো লাভ নেই অর্ঘ্য," মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলল, "বাবার শরীর খুব খারাপ। তার শেষ ইচ্ছা এটা। আর ছেলেটি বাবার দীর্ঘদিনের বন্ধুর ছেলে, লন্ডনে থাকে। বাবা আমার কোনো কথাই শুনবেন না। আমি যদি এই বিয়ে না করি, বাবা হয়তো বাঁচবেনই না। আমি বড্ড নিরুপায়, অর্ঘ্য।"

অর্ঘ্য স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার মনে হলো তার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন যেন কোনো ধারালো ছুরির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে। সে মায়ার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে তখন ভালোবাসার বদলে উপচে পড়ছে নিদারুণ অসহায়ত্ব। যে চোখ একদিন তাকে মুক্তির স্বাদ দিয়েছিল, আজ সেই চোখেই নেমে এসেছে চরম বন্দীত্বের অন্ধকার।

"তুমি কি সত্যিই আমাকে ছেড়ে চলে যাবে, মায়া? আমাদের সেই স্বপ্নগুলো, সেই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যাগুলো?" অর্ঘ্যর কণ্ঠ ভেঙে এল কান্নায়। মায়া অর্ঘ্যর চোখের জল নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিল। তার নিজের চোখ দিয়ে তখন অঝোরে ঝরছে শ্রাবণের ধারা। সে বলল, "আমি কোথাও যাচ্ছি না অর্ঘ্য। এই শরীর হয়তো অন্য কোথাও বাঁধা পড়বে, কিন্তু আমার চোখের প্রতিটি মায়া, প্রতিটি দৃষ্টি চিরদিনের জন্য তোমার কাছেই রেখে যাচ্ছি। তুমি তো শিল্পী, তুমি আমাকে তোমার হৃদয়ে ধরে রেখো।"

সেই ছিল তাদের শেষ দেখা। মায়া সেদিন বৃষ্টিহীন এক বিকেলে অর্ঘ্যর হাত ছেড়ে ধীরে ধীরে হেঁটে চলে গেল। অর্ঘ্য শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল তার জীবনের আলো মিলিয়ে যাচ্ছে দূর দিগন্তে। পরের দুটো বছর কীভাবে কেটেছিল, অর্ঘ্যর নিজেরই তা মনে নেই। সে যেন এক জ্যান্ত লাশ হয়ে বেঁচে রইল। রঙ আর তুলি ফেলে দিল একপাশে। স্টুডিওর এক কোণে ঢাকা পড়ে রইল মায়ার সেই অসমাপ্ত ছবিটি। অর্ঘ্যর জীবন থেকে যেন সমস্ত রঙ হারিয়ে গিয়ে শুধুই এক বিবর্ণ ধূসরতা নেমে এল। বন্ধুরা এসে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করত, কিন্তু অর্ঘ্যর কানে কোনো কথাই পৌঁছাত না। সে শুধু রাত জেগে বারান্দায় বসে থাকত আর আকাশের তারাদের দিকে তাকিয়ে খুঁজত সেই পরিচিত চোখের মায়া। কিন্তু কোথাও সে সেই চাহনি খুঁজে পেত না। দুই বছর পর, এক কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে অর্ঘ্যর স্টুডিওর দরজায় কড়া নাড়ল এক ডাকপিয়ন। হাতে একটি বাদামি রঙের খাম। প্রেরকের জায়গায় লেখা একটি চেনা নাম: মায়া। ঠিকানা চট্টগ্রামের একটি নির্জন উপকূলীয় এলাকার। অর্ঘ্যর হাত কাঁপতে লাগল। বুকের ভেতর জমে থাকা সেই পুরনো ঝড় আবার এক নিমেষে জেগে উঠল। সে খামটি ছিঁড়ে চিঠিটা বের করল। পাতার ওপর মায়ার সেই চেনা মুক্তোর মতো হাতের লেখা।

প্রিয় অর্ঘ্য,জানি, এই চিঠিটা পাওয়ার কোনো প্রত্যাশা তোমার ছিল না। হয়তো তুমি আমাকে এক চরম স্বার্থপর প্রতারক ভেবে নিজের মন থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছ। কিন্তু আমি জানি, তোমার মন তা পারেনি। কারণ যে চোখ দিয়ে তুমি আমাকে ভালোবেসেছিলে, সেই চোখের মায়া মিথ্যা হতে পারে না। সেদিন তোমাকে মিথ্যে বলেছিলাম, অর্ঘ্য। বাবার অসুস্থতা কিংবা লন্ডনের পাত্রের গল্প—সবটাই ছিল আমার সাজানো এক নিষ্ঠুর নাটক। আমি কোনো বিয়ে করিনি। সেদিন যদি আমি সত্যিটা বলতাম, তুমি আমাকে কোনো দিন যেতে দিতে না। নিজের জীবন ধ্বংস করে আমার পাশে বসে থাকতে।আমার চোখে রেটিনার এক জটিল ও বিরল রোগ বাসা বেঁধেছিল। চিকিৎসকরা অনেক আগেই জানিয়েছিলেন, ধীরে ধীরে আমার চোখের দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে। এক নিশ্ছিদ্র অন্ধকার অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। আমি চাইনি আমার অন্ধত্বের বোঝা তোমার উজ্জ্বল শিল্পীজীবনের ওপর চেপে বসুক। আমি চাইনি তোমার ক্যানভাসে রঙের বদলে নেমে আসুক আমার জীবনের চিরস্থায়ী অন্ধকার। আজ আমার দু'চোখে আর আলো নেই, অর্ঘ্য। পৃথিবীটা আমার কাছে এখন শুধুই এক ঘন কালো আঁধার। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার জানো? চোখ বন্ধ থাকার পরও আমি তোমাকে ঠিক আগের মতোই স্পষ্ট দেখতে পাই। তোমার সেই প্রেম, তোমার হাতের উষ্ণতা, কার্জন হলের মেহগনি গাছের পাতার ছায়া—সব আমার মনের ভেতর জীবন্ত। আমি এখন সমুদ্রের কাছে এক ছোট বাড়িতে থাকি। বাতাস আর ঢেউয়ের শব্দ শুনে দিন কাটাই। কিন্তু আজও যখন সমুদ্রের হাওয়া আমার চোখ ছুঁয়ে যায়, আমার মনে হয় তোমার তুলির কোমল স্পর্শ যেন আমার চোখে বুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যদি এখনো তোমার মনে সেই পুরনো টান বেঁচে থাকে, তবে একবার এসো। আমি তোমাকে দেখতে পাব না সত্যি, কিন্তু আমার এই অন্ধ চোখের কোণে হাত রেখে অনুভব করতে তো পারবে-তোমার চোখের মায়ায় আমি আজও কতটা আচ্ছন্ন হয়ে বেঁচে আছি।

ইতি, তোমার মায়া।

চিঠিটা শেষ করার পর অর্ঘ্যর চোখের জলে কাগজের কালি লেপটে গেল। তার ভেতরটা এক তীব্র অনুশোচনা আর ভালোবাসার হাহাকারে ভেঙে পড়ল। সে কী ভেবেছিল, আর সত্যটা কী! যে মেয়েটি তার ভালোবাসার ভবিষ্যতের জন্য নিজের সমস্ত আলো বিসর্জন দিয়ে একা অন্ধকারে চলে গেল, সে কিনা তাকে ভুল বুঝে দূরে সরে রইল! অর্ঘ্য আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। তুলি, রঙ আর সেই পুরনো অপূর্ণ ক্যানভাসটি নিয়ে সে ছুটে গেল স্টেশনের দিকে। চট্টগ্রামের এক নির্জন সমুদ্রতীর। বিকেলের সূর্য তখন সাগরের জলে নিজের সোনালী আভা ছড়িয়ে ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে। ঢেউগুলো এসে আছড়ে পড়ছে বেলাভূমিতে। একটি ছোট কাঠের বারান্দায় রকিং চেয়ারে বসে ছিল মায়া। পরনে সেই চেনা হালকা রঙের শাড়ি। তার চোখ দুটো খোলা, আকাশের দিকে তাকানো, কিন্তু সেই চোখের তারায় আর কোনো আলো নেই। দৃষ্টিহীন সেই শূন্য চাহনি সাগরের দিগন্তের দিকে নিবদ্ধ।

হঠাৎ পেছনে পরিচিত পদশব্দ। বাতাস বয়ে নিয়ে এল চেনা পারফিউম আর রঙের গন্ধ। মায়ার শরীর কেঁপে উঠল। সে রকিং চেয়ারের হাতল শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে বলল, "অর্ঘ্য?" অর্ঘ্য কোনো কথা বলতে পারল না। তার গলা কান্নায় রুদ্ধ হয়ে আসছিল। সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল মায়ার চেয়ারের সামনে। তারপর আলতো করে মায়ার দুটি হাত তুলে নিল নিজের মুখের কাছে। মায়ার দৃষ্টিহীন চোখ দুটো দিয়ে তখন নেমে এল অবিরল অশ্রুধারা। সে হাত বাড়িয়ে অর্ঘ্যর মুখমণ্ডল স্পর্শ করল। অর্ঘ্যর চোখ, নাক, গাল ছুঁয়ে দেখতে দেখতে বলল, "তুমি কেন এলে? এই অন্ধকারকে দেখার জন্য কেন তোমার আলো ফেলে এলে অর্ঘ্য?" অর্ঘ্য মায়ার চোখের পাতাগুলো নিজের ঠোঁট দিয়ে ছুঁয়ে দিল। খুব কোমল, অত্যন্ত পবিত্র এক স্পর্শ। তারপর বলল, "কে বলেছে তুমি অন্ধ, মায়া? তোমার চোখের আলো কোনো দিন নিভতে পারে না। কারণ তোমার চোখের সেই মায়া আমার হৃদয়ে অমর হয়ে আছে।" অর্ঘ্য তার সঙ্গে নিয়ে আসা ক্যানভাসটি বের করল। মায়াকে জড়িয়ে ধরে সে সমুদ্রের গর্জন আর পড়ন্ত সূর্যের আলোর নিচে বসল। তার ডান হাতে তুলি, আর বাঁ হাতে শক্ত করে ধরা মায়ার নরম হাত।

অর্ঘ্য তুলির ডগায় সোনালী আর গাঢ় নীল রঙ মেখে শেষবারের মতো স্পর্শ করল সেই অপূর্ণ ক্যানভাসটির চোখের জায়গায়। সে আঁকল না কোনো বাস্তব রেখা, সে আঁকল দুটি অন্তহীন সমুদ্রের মতো চোখ, যার গভীরতায় মিশে আছে আত্মত্যাগ, বিরহ আর পরম ভালোবাসার অনন্ত জ্যোতি ছবিটা শেষ করে অর্ঘ্য মায়ার হাতটি সেই ক্যানভাসের ভেজা রঙের ওপর আলতো করে রাখল।

"দেখো মায়া, তোমার চোখ ফিরে এসেছে," অর্ঘ্য মৃদু স্বরে বলল। মায়া চোখ বন্ধ করে হাসল। সেই হাসি যেন সূর্যের সব আলোকে ম্লান করে দিল। সে অর্ঘ্যর কাঁধে মাথা রেখে সাগরপারের শীতল বাতাস বুকে টেনে নিল।

পৃথিবীর চোখ হয়তো মায়াকে অন্ধ বলবে, কিন্তু সেই মুহূর্তে অর্ঘ্যর বুকে মাথা রাখা মায়ার চেয়ে বেশি দৃশ্যমান, বেশি আলোকিত মানুষ হয়তো এই গোটা নিখিল ভূমণ্ডলে আর কেউ ছিল না। ভালোবাসার কাছে দৃষ্টিশক্তি বড় তুচ্ছ; তোমার চোখের মায়ায় যে একবার নিজেকে সঁপে দেয়, সে অন্ধকারের বুকেও অনন্ত আলোর সন্ধান পেয়ে যায়।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login