Article

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

October 14, 2026

12 views

একটি জাতির আত্মবিকাশ, বৌদ্ধিক জাগরণ এবং রাজনৈতিক মুক্তির ইতিহাসে কোনো একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কতটা গভীর ও সুদূরপ্রসারী হতে পারে, তার বিরল ও ধ্রুপদী দৃষ্টান্ত হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯২১ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যাপীঠটি কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করেনি; এটি ছিল ঔপনিবেশিক বাংলার দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং পূর্ব বাংলার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার এক তীব্র ঐতিহাসিক অভিঘাত। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল সাম্রাজ্যবাদী প্রশাসনিক স্বার্থে কেরানি তৈরির উদ্দেশ্য নিয়ে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে কাজ করছিল এক সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী আর্থ-সামাজিক, ভূ-রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক টানাপোড়েনের জটিল সমীকরণ। বঙ্গভঙ্গ, বঙ্গভঙ্গ রদ, পূর্ব বাংলার মুসলিম মধ্যবিত্তের বিকাশ, শিক্ষা ক্ষেত্রে কলকাতা-কেন্দ্রিক আধিপত্য এবং এর বিপরীতে তীব্র প্রতিরোধের ইতিহাস ধারণ করে আছে এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠা-পর্ব।

 অবিভক্ত বাংলা ও পূর্ব বাংলার ঐতিহাসিক অনুন্নয়ন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট অনুধাবন করতে হলে উনিশ শতকের শেষার্ধ ও বিশ শতকের শুরুর দিকের অবিভক্ত বাংলার ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া অপরিহার্য । যুদ্ধের পর থেকে ব্রিটিশরা কলকাতাকে কেন্দ্র করে যে শাসন ও শিক্ষা কাঠামো গড়ে তুলেছিল, তার ফলে পূর্ববাংলা ক্রমাগত পরিণত হয়েছিল একটি প্রান্তিক কাঁচামাল সরবরাহকারী পশ্চাৎভূমিতে (hinterland)।

অর্থনৈতিক বৈষম্য: পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী ছিল মুসলিম এবং নিম্নবর্ণের হিন্দু (নমঃশূদ্র), যাদের প্রধান পেশা ছিল কৃষি। পূর্ব বাংলার পাট ও ধান থেকে সংগৃহীত রাজস্ব চলে যেত কলকাতায়, কিন্তু তার বিপরীতে পূর্ব বাংলার অবকাঠামো কিংবা শিক্ষার উন্নয়নে কোনো অর্থ বরাদ্দ হতো না।শিক্ষার অসমতা: ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সমগ্র প্রেসিডেন্সির উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রণ করত। পূর্ব বাংলার ছাত্রছাত্রীদের বিএ বা এমএ ডিগ্রি অর্জন করতে হলে কলকাতায় গিয়ে মেসবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতে হতো, যা দরিদ্র কৃষিজীবী পরিবারের সন্তানদের পক্ষে ছিল প্রায় অসম্ভব। পূর্ব বাংলায় তখন ঢাকা কলেজ, রাজশাহী কলেজ কিংবা ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের মতো কয়েকটি প্রথম সারির কলেজ থাকলেও সেগুলোতে পূর্ণাঙ্গ উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার কোনো সুযোগ ছিল না। এই ভৌগোলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য পূর্ব বাংলার শিক্ষিত সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দেয়।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ: পূর্ব বাংলার জাগরণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বীজ মূলত রোপিত হয়েছিল ১৯০৫ সালের ঐতিহাসিক বঙ্গভঙ্গের মধ্য দিয়ে।

নতুন প্রদেশের সৃষ্টি

লর্ড কার্জনের শাসনামলে ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর প্রশাসনিক সুবিধার যুক্তি দেখিয়ে বাংলাকে বিভক্ত করা হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী এবং আসাম নিয়ে গঠিত হয় নতুন প্রদেশ—‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ (Eastern Bengal and Assam)। এই নতুন প্রদেশের রাজধানী করা হয় ঢাকাকে।

রাজধানী ঢাকার রূপান্তর

প্রায় আড়াই শতক পর ঢাকা আবার একটি রাজধানীর মর্যাদা ফিরে পায়। সুবেদার ইসলাম খাঁর আমলে সুবাহ বাংলার রাজধানী হিসেবে ঢাকার যে জৌলুস ছিল, তা দীর্ঘকাল বিস্মৃতির আড়ালে পড়ে থাকার পর আবার প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

রমনা এলাকায় নতুন সচিবালয় (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভবন), কার্জন হল, গভর্নমেন্ট হাউস (পুরনো হাইকোর্ট ভবন) এবং কর্মকর্তাদের জন্য দৃষ্টিনন্দন ইউরোপীয় স্থাপত্যের ভবন নির্মিত হয়। পূর্ব বাংলার অর্থনীতি, যোগাযোগ ও প্রশাসনে আমূল পরিবর্তন আসতে শুরু করে। সবচেয়ে বড় জাগরণ ঘটে শিক্ষা খাতে। ১৯০৫ থেকে ১৯১১—এই মাত্র ছয় বছরে পূর্ব বাংলার শিক্ষাখাতে সরকারি বাজেট বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। নতুন নতুন বিদ্যালয়, কলেজ ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।

পূর্ব বাংলার মুসলিম সমাজ এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠী অনুভব করতে শুরু করে যে, কলকাতা-কেন্দ্রিক জমিদার ও অভিজাতদের শোষণমুক্ত হয়ে তারা এবার নিজস্ব আত্মমর্যাদা নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে।

বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১) এবং পূর্ব বাংলায় গভীর হতাশা

কিন্তু পূর্ব বাংলার এই অগ্রযাত্রা বেশি দিন স্থায়ী হতে পারেনি। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে পশ্চিম বাংলার উচ্চবিত্ত, বুদ্ধিজীবী এবং কংগ্রেসের নেতৃত্বে শুরু হয় তীব্র স্বদেশী ও সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন। তাদের যুক্তি ছিল—বঙ্গভঙ্গ হলো বাঙালির জাতীয় চেতনাকে বিভক্ত করার এক ব্রিটিশ চক্রান্ত (‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’)। আন্দোলনের তীব্রতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের চাপে নতিস্বীকার করে ব্রিটিশ সরকার।

ঐতিহাসিক দিল্লি দরবার ও রাজকীয় ঘোষণা

১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লির ঐতিহাসিক দরবারে পঞ্চম জর্জ ঘোষণা করেন যে, বঙ্গভঙ্গ রদ করা হলো এবং ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তর করা হলো। এর ফলে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ বিলুপ্ত হয়ে পুনরায় যুক্ত বাংলার অংশ হয়ে যায় এবং ঢাকা তার রাজধানীর মর্যাদা হারায়।

বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১) ───► পূর্ব বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয় ───► নবাব সলিমুল্লাহর ক্ষোভ ও মধ্যস্থতা ───►   বড়লাটের ঢাকা সফর ও প্রতিশ্রুতি (১৯১২) ───►       ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত

ক্ষোভ ও প্রতিবাদের আগুন

বঙ্গভঙ্গ রদের এই রাজকীয় ঘোষণা পূর্ব বাংলার মুসলিম সমাজকে এক চরম হতাশা ও বিশ্বাসঘাতকতার মুখে ফেলে দেয়। যে স্বপ্ন ও সম্ভাবনার আলো তারা ছয় বছর ধরে দেখেছিল, তা মুহূর্তের মধ্যে নিভে গেল। পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক নেতৃত্ব উপলব্ধি করলেন যে, ব্রিটিশরা তাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির চেয়ে কলকাতার উগ্র রাজনৈতিক চাপকেই বেশি সমীহ করেছে। ফলে ঢাকায় গভীর ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সঞ্চার হয়। মুসলিম মধ্যবিত্ত মনে করতে থাকে—ব্রিটিশদের ওপর আর কোনোভাবেই আস্থা রাখা যায় না।

ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি: নেতাদের ভূমিকা

ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পেরেছিল যে পূর্ব বাংলার শান্ত, অনুগত মুসলিম সমাজকে এভাবে বঞ্চিত করলে গোটা সাম্রাজ্যের ভিত নড়ে যেতে পারে। এই অসন্তোষ প্রশমিত করার জন্য ব্রিটিশদের একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণমূলক উপহার দেওয়া অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়।

১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি: বড়লাটের ঢাকা সফর

পূর্ব বাংলার তীব্র অসন্তোষ আঁচ করতে পেরে ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় ও বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালের ২৯ জানুয়ারি ঢাকা সফরে আসেন। ৩১ জানুয়ারি ঢাকার শীর্ষস্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন তিন দিকপাল নেতা:

নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ: ঢাকার নবাব এবং নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, যাঁর ব্যক্তিগত ত্যাগ ও নেতৃত্ব ছিল এই আন্দোলনের মূল প্রাণ। নওয়াব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী: ধনবাড়ির জমিদার, যিনি বাংলা ভাষা ও শিক্ষার একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

এ কে ফজলুল হক (শেরে বাংলা): তরুণ আইনজীবী ও উদীয়মান জননেতা, যাঁর রাজনৈতিক তেজ ব্রিটিশদের ভাবিয়ে তুলেছিল। প্রতিনিধিদল অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাষায় ভাইসরয়ের কাছে তুলে ধরেন যে, বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে পূর্ব বাংলার মানুষ রাজনৈতিক ও শিক্ষাগতভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁদের দাবি ছিল—পূর্ব বাংলার মানুষের শিক্ষা ও বৌদ্ধিক উন্নয়নের জন্য ঢাকায় অবিলম্বে একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বড়লাটের প্রতিশ্রুতি

নেতৃবৃন্দের জোরালো যুক্তি এবং পূর্ব বাংলায় সম্ভাব্য বিদ্রোহের আশঙ্কা বিবেচনা করে লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করেন যে, সরকার ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। এর পরপরই একই বছরের ৪ এপ্রিল ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত সম্বলিত এক প্রেসনোট জারি করা হয়।

তীব্র বিরোধিতা ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা আসার সাথে সাথেই সমকালীন বাংলার এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ এবং কলকাতা-কেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও নজিরবিহীন বিরোধিতা শুরু হয়। তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক জটিলতার এটি এক অত্যন্ত বিতর্কিত অধ্যায়।

                                  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা

                                                     │

        ▼                                           ▼                                           ▼

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থহানি                   সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি      আঞ্চলিক ঈর্ষা ও উপহাস

• সিন্ডিকেটের কর্তৃত্ব খর্ব হওয়ার ভয়    • এটিকে "মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়" আখ্যা দেওয়া   • "মফস্বলে আবার কিসের বিশ্ববিদ্যালয়?"

• ফি বাবদ রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা    • হিন্দু-মুসলিম বিরোধ সৃষ্টির প্রচারণা      • ঢাকাইয়া ছাত্রদের নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র

• স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব      • জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ক্ষতি হবে যুক্তি       • কলকাতার দৈনিক পত্রিকার তীব্র আক্রমণ

বিরোধিতার মূল কারণসমূহ

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একচ্ছত্র আধিপত্য নষ্টের ভয়: তৎকালীন সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সমগ্র বাংলা, বিহার, ওড়িশা ও আসামের কলেজগুলোর পরীক্ষা ও সনদ নিয়ন্ত্রণ করত। ঢাকায় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হলে পূর্ব বাংলার কলেজগুলো কলকাতার হাতছাড়া হবে এবং তাদের আয়ের একটি বড় অংশ (পরীক্ষার ফি) কমে যাবে।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়: তিনি ছিলেন এই বিরোধিতার অন্যতম প্রধান মুখ। তিনি যুক্তি দেন যে, একই প্রদেশে দুটি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলে শিক্ষার মান নেমে যাবে এবং ডিগ্রিগুলোর আন্তর্জাতিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে।

সাম্প্রদায়িক প্রচারণা: কোনো কোনো মহল প্রচার করতে শুরু করে যে এটি হবে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি 'সাম্প্রদায়িক' বা 'মুসলিম' প্রতিষ্ঠান, যা সাধারণ বাঙালিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভেদ তৈরি করবে। গণমাধ্যমের আক্রমণ: কলকাতার প্রভাবশালী সাময়িকী ও দৈনিক পত্রিকাগুলো (যেমন—অমৃতবাজার পত্রিকা, দ্য বেঙ্গলি, প্রবাসী) নিয়মিতভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে প্রবন্ধ, সম্পাদকীয় ও ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশ করতে থাকে।

ড. রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে স্মারকলিপি

১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি খ্যাতনামা আইনজীবী ড. রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে ১৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির একটি প্রতিনিধিদল লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে দেখা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন।

ভাইসরয়ের আপস ফর্মুলা

লর্ড হার্ডিঞ্জ বিরোধীদের আশ্বস্ত করে বলেন যে, এটি কোনো সাম্প্রদায়িক বিশ্ববিদ্যালয় হবে না; এটি হবে একটি আধুনিক, সর্বজনীন আবাসিক প্রতিষ্ঠান যেখানে সব ধর্মের ও বর্ণের ছাত্ররা সমান সুযোগ পাবে। এছাড়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটি নতুন অধ্যাপকের পদ (Chair Professorship) সৃষ্টির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারি অনুদানের প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁর বিরোধিতার সুর নরম করেন।

নাথান কমিশন (১৯১২): রূপরেখা প্রণয়ন

বিরোধিতা প্রশমিত হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়টির বাস্তব কাঠামো ও শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হবে, তা নির্ধারণের জন্য ব্রিটিশ সরকার একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। ১৯১২ সালের ২৭ মে ব্যারিস্টার রবার্ট নাথান-এর নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি কমিশন গঠিত হয়, যা ইতিহাসে ‘নাথান কমিশন’ (Nathan Committee) নামে পরিচিত।

  কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যবৃন্দ                                  

  • জি. ডব্লিউ. কুচলার (ডি.পি.আই, বাংলা)                               

• উন্নত মানের টিউটোরিয়াল পদ্ধতি চালু করা হবে।

নাথান কমিশনের সুপারিশমালা

১৯১৩ সালে নাথান কমিশন তাদের বিস্তারিত প্রতিবেদন পেশ করে। কমিশনের সুপারিশ ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও বৈপ্লবিক:

ইউনিটারি এবং আবাসিক চরিত্র: বিশ্ববিদ্যালয়টি হবে সম্পূর্ণ আবাসিক ও শিক্ষাদানকারী। এর অধীনে কোনো বহিরাগত কলেজ অধিভুক্ত (Affiliated) থাকবে না; সকল শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে ক্লাস করতে হবে এবং হলে থাকতে হবে।

আধুনিক গবেষণা: শুধু সাধারণ ডিগ্রি প্রদান নয়, বরং বিজ্ঞান ও মানবিক শাখায় উচ্চতর গবেষণার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। ইসলামিক স্টাডিজ ও প্রাচ্যবিদ্যা: ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের আধুনিক মূলধারার উচ্চশিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একটি বিশেষ 'ইসলামিক স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট' খোলার প্রস্তাব করা হয়।

রমনার অবকাঠামো: তৎকালীন পরিত্যক্ত রাজধানীর রমনা এলাকার ২৪৩ একর মনোরম উদ্যান এবং পূর্ববর্তী প্রাদেশিক সরকারের নবনির্মিত ভবনগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য হস্তান্তরের সুপারিশ করা হয়। ১৯১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্রিটিশ ভারত সরকার নাথান কমিশনের রিপোর্টটি অনুমোদন করে।

বিশ্বযুদ্ধ ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা

নাথান কমিশনের অনুমোদনের পর বিশ্ববিদ্যালয়টি দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় ভূ-রাজনীতি এর পথে এক বিশাল প্রাচীর তৈরি করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত (১৯১৪–১৯১৮)

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যুদ্ধের ফলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এক চরম অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক সংকটের মুখে পড়ে। সমস্ত উন্নয়ন প্রকল্প ও শিক্ষা খাতের বাজেট বন্ধ করে যুদ্ধের রসদ জোগাড়ের জন্য অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফাইলটিও তখন হিমাগারে চলে যায়।

নবাব সলিমুল্লাহর প্রয়াণ ও শোকের ছায়া

১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি মাত্র ৪৩ বছর বয়সে কলকাতায় আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে না দেখে তাঁর এই অকালমৃত্যু পূর্ব বাংলার মানুষের মনে এক বিরাট আঘাত হানে। নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর এই আন্দোলনের হাল শক্ত হাতে ধরেন নওয়াব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী এবং এ কে ফজলুল হক। নওয়াব আলী চৌধুরী কেন্দ্রীয় আইনসভায় বারবার গর্জে ওঠেন এবং ব্রিটিশদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা না করলে সরকারের ওপর থেকে মানুষের আস্থা চিরতরে মুছে যাবে।

স্যাডলার কমিশন (১৯১৭) এবং চূড়ান্ত আইনি ভিত্তি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষের দিকে এলে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় উচ্চশিক্ষার সংকট নিরসনের জন্য আরেকটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠন করে।

১৯১৭ সালে লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার মাইকেল স্যাডলার-এর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি কমিশন’, যা সংক্ষেপে ‘স্যাডলার কমিশন’ (Sadler Commission) নামে পরিচিত।

স্যাডলার কমিশন (১৯১৭) ──► ঢাকা সফর ও বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন ──► নাথান কমিশনের সুপারিশ অনুমোদন ──► ডাবলিনের আদলে কাঠামো ──►  'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯২০'

স্যাডলার কমিশনের মূল্যায়ন ও অবদান

স্যাডলার কমিশনের মূল কাজ ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা, কিন্তু তাদের অন্যতম প্রধান ম্যান্ডেট ছিল ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাই করা।

কমিশন ১৯১৮ সালে ঢাকা সফর করে এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাক্ষাত্কার গ্রহণ করে।

স্যাডলার কমিশন মত দেয় যে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে এবং পূর্ব বাংলার পশ্চাৎপদতাকে দূর করতে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা কেবল যৌক্তিকই নয়, বরং অপরিহার্য।

নাথান কমিশনের প্রস্তাবিত আবাসিক কাঠামোর সাথে একমত পোষণ করে স্যাডলার কমিশন আরও সুপারিশ করে যে, আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের আদলে এটি পরিচালিত হওয়া উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯২০

স্যাডলার কমিশনের ইতিবাচক রিপোর্টের ভিত্তিতে ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইনসভা (ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল)-এ বিল উত্থাপিত হয়।

২৩ মার্চ ১৯২০: ভারতীয় আইনসভায় ‘The Dacca University Act, 1920’ (১৯২০ সালের ১৩ নম্বর আইন) পাস হয়।বড়লাট লর্ড চেমসফোর্ড বিলটিতে স্বাক্ষর করে একে আইনে পরিণত করেন। এর ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ নয় বছরের আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের সমাপ্তি ঘটে।

১৯২১ সালের ১ জুলাই: ঐতিহাসিক উদ্বোধন ও প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা

আইন পাস হওয়ার পর বাস্তবায়নের কাজ দ্রুতগতিতে এগোতে থাকে।

যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ (Sir Philip Joseph Hartog)-কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য (Vice-Chancellor) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। হার্টগ ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী ও গুণী প্রশাসক। তিনি বিশ্বমানের গবেষক ও অধ্যাপকদের নিয়োগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির মান আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেন।

                                ১ জুলাই ১৯২১: সূচনালগ্নের রূপরেখা

    অনুষদ ও বিভাগসমূহ                              হল ও আবাসন ব্যবস্থা                     শিক্ষক ও শিক্ষার্থী

  • ৩টি অনুষদ: কলা, বিজ্ঞান, আইন               • ৩টি ছাত্রাবাস:                          • শিক্ষক: ৬০ জন

  • ১২টি বিভাগ: সংস্কৃত ও বাংলা, ইংরেজি,         ১. ঢাকা হল (বর্তমান শহীদুল্লাহ হল)          (হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ,

    ইতিহাস, আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ,              ২. জগন্নাথ হল (হিন্দু ছাত্রদের জন্য)         সত্যেন্দ্রনাথ বসু, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ)

    ফারসি ও উর্দু, দর্শন, অর্থনীতি ও রাজনীতি,     ৩. সলিমুল্লাহ মুসলিম হল (প্রথমে মূল ভবনে,   • শিক্ষার্থী: ৮৭৭ জন

    পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, আইন              পরে বর্তমান মনোরম ভবনে স্থানান্তরিত)       (যার মধ্যে মাত্র ১ জন নারী ছাত্রী)

১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য তার জ্ঞান বিতরণের দ্বার উন্মুক্ত করে। তৎকালীন পরিত্যক্ত রমনা গ্রিন, গভর্নমেন্ট হাউস এবং কার্জন হলের লাল ইটের ঐতিহ্যবাহী চত্বরে শুরু হয় এক নতুন সভ্যতার অভিযাত্রা।

সমকালীন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের অবদান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কারও একক দানে গড়ে ওঠেনি; এটি ছিল একাধিক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ত্যাগ, মেধা ও দূরদর্শিতার সম্মিলিত ফল।

নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রধান রূপকার ও স্বপ্নদ্রষ্টা। রাজনৈতিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে ব্রিটিশদের প্রতিশ্রুতি আদায় করেন এবং তাঁর পরিবারের বহু জমি ও প্রভাব এই কাজের জন্য উৎসর্গ করেন।

নওয়াব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক ও আইনি লড়াইয়ের কাণ্ডারি। আইনসভায় সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। এমনকি নিজের জমিদারির অংশ বন্ধক রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ডে অর্থ জোগাড় করেছিলেন।

এ কে ফজলুল হক

বাঙালি তরুণ নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে ব্রিটিশ বিরোধী ক্ষোভ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবির যৌক্তিকতা আইনি ও রাজনৈতিকভাবে সরকারের কাছে তুলে ধরেন।

স্যার ফিলিপ হার্টগ

প্রথম উপাচার্য হিসেবে তিনি অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজের মতো টিউটোরিয়াল পদ্ধতি চালু করেন এবং জাত-ধর্ম নির্বিশেষে ইউরোপ ও ভারতের সেরা পণ্ডিতদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন।

পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ

প্রাচ্যবিদ্যা, বাংলা ভাষা এবং মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণায় সূচনালগ্নেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ন্তর্জাতিক মর্যাদায় পৌঁছে দেন।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু (এস এন বোস)

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে বসেই তিনি ১৯২৪ সালে বিশ্বখ্যাত 'বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিস্টিকস' আবিষ্কার করেন, যা কোয়ান্টাম ফিজিক্সের ভিত্তি গড়ে দেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলায় যে রূপান্তর ঘটেছিল, তার গভীরতা ছিল অপরিসীম:

বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্বে পূর্ববাংলায় মুসলিম বা সাধারণ অনগ্রসর পরিবারের সন্তানদের জন্য মধ্যবিত্ত পেশাজীবী (আইনজীবী, চিকিৎসক, শিক্ষক, সরকারি আমলা) হওয়ার পথ ছিল রুদ্ধ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে প্রথম এমন একটি প্রথম প্রজন্মের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের জন্ম হয়, যাঁরা পরবর্তীতে এই অঞ্চলের সমাজ ও রাজনীতিকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

ধর্মনিরপেক্ষ ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা

যদিও একটি রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের দাবির মুখে এর জন্ম হয়েছিল, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কখনোই কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেনি। সূচনা থেকেই এটি ছিল আধুনিক, বহুত্ববাদী এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার পীঠস্থান। ১৯২৬ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’, যা থেকে সূচনা ঘটেছিল বিখ্যাত ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর। আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ মনীষী চিন্তার স্বাধীনতা ও অন্ধ কুসংস্কারমুক্ত সমাজের ডাক দিয়েছিলেন এখান থেকেই।

ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা: জাতীয় মুক্তির কেন্দ্রবিন্দু

পরবর্তী ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকেনি; এটি পরিণত হয়েছিল বাঙালির যাবতীয় মুক্তির আন্দোলনের সূতিকাগারে:

১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন: মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভেঙে রক্ত দিয়েছিলেন। ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন ও ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান: সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মূল কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন ও বটতলা।

১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৭১ সালের ২ মার্চ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের প্রাঙ্গণেই প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। ২৫ মার্চ কালোরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের নারকীয় অপারেশন সার্চলাইটের মূল লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে শিক্ষক ও ছাত্রদের অপরিসীম আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

বিশ্বের ইতিহাসে এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজে পাওয়া বিরল, যা একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের জন্মকে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছে। ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ভারতের বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ কর্তৃক ঢাকায় একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহল, আইনজীবী সমাজ, রাজনীতিক এবং সমসাময়িক সংবাদপত্রগুলোতে তীব্র ও বহুমাত্রিক বিরোধিতার ঝড় ওঠে। এই বিরোধিতা নিছক কোনো আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর পেছনে সক্রিয় ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক একাধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টা, আর্থিক সুবিধা হারানোর শঙ্কা এবং সমকালীন সমাজকাঠামোয় পূর্ব বাংলার অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উত্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ। তৎকালীন নথিপত্র, আইনসভার কার্যবিবরণী এবং পত্রপত্রিকার সম্পাদকীয় পাতা বিশ্লেষণ করলে এই বিরোধিতার সুনির্দিষ্ট চিত্র পাওয়া যায়:

১. প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিরোধিতার ঐতিহাসিক দলিল

ক. ড. রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে স্মারকলিপি (১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯১২)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় কলকাতার ১৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির একটি প্রতিনিধিদল বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে সাক্ষাৎ করে আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি পেশ করে। এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন প্রখ্যাত আইনবিদ ও তৎকালীন কংগ্রেস নেতা ড. রাসবিহারী ঘোষ।

দাবির যুক্তি: স্মারকলিপিতে দাবি করা হয়, বঙ্গভঙ্গ রদের পর বাংলায় যখন একটি অখণ্ড জাতীয়তাবাদী চেতনা পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে, তখন ঢাকায় পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করলে তা হবে "শিক্ষাগত বিভাজন" (Educational Partition)। বড়লাটের পাল্টা যুক্তি: লর্ড হার্ডিঞ্জ প্রতিনিধিদলকে স্পষ্ট জানান যে, এটি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে সুবিধা দেওয়ার বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়; বরং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ কমানো এবং পূর্ব বাংলার সুপ্ত মেধার বিকাশ ঘটানোই এর লক্ষ্য।

খ. স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিরোধ ও চিঠিচালাচালি

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতার কেন্দ্রবিন্দু। তিনি ভারত সরকারের কাছে একাধিক চিঠি লিখে জানান:

একই প্রদেশে দুটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান ক্ষুণ্ন হবে এবং ডিগ্রিগুলোর আন্তর্জাতিক মর্যাদা নষ্ট হবে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা পূর্ব বাংলার কলেজগুলো হাতছাড়া হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বিরাট অংকের পরীক্ষার ফি ও নিবন্ধন রাজস্ব হারাবে। ঐতিহাসিক রফা (Compromise): ব্রিটিশ সরকার যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতিপূরণ বাবদ রাজকীয় কোষাগার থেকে অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং একই সাথে চারটি নতুন অধ্যাপকের পদ (Chair Professorship) সৃষ্টির আর্থিক নিশ্চয়তা প্রদান করে, কেবল তখনই আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁর বিরোধিতার সুর নরম করেন এবং পরবর্তীতে ১৯১৭ সালের স্যাডলার কমিশনের সদস্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখায় স্বাক্ষর করেন। 

২. সমকালীন পত্রপত্রিকার ভাষা ও সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ

তৎকালীন কলকাতার প্রধান প্রভাবশালী সংবাদপত্রগুলো—বিশেষ করে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘দ্য বেঙ্গলি’ (The Bengalee), শিশির কুমার ঘোষ ও মতিলাল ঘোষের ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ (Amrita Bazar Patrika) এবং রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের ‘প্রবাসী’ পত্রিকা—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সম্পাদকীয় ও নিবন্ধ প্রকাশ করে।

ক. অমৃতবাজার পত্রিকা (Amrita Bazar Patrika)

পত্রিকাটির সম্পাদকীয়তে ঢাকার প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়কে "অভ্যন্তরীণ জাতীয় সংহতি বিনষ্টকারী পদক্ষেপ" হিসেবে চিত্রিত করা হয়। যুক্তি তোলা হয়েছিল—যেখানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় বাংলার সাধারণ মানুষের বড় ঘাটতি রয়েছে, সেখানে পূর্ব বাংলার মতো অনুন্নত মফস্বল এলাকায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে একটি বিলাসবহুল আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা অপচয় মাত্র।

খ. দ্য বেঙ্গলি (The Bengalee)

সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পত্রিকায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় যে, ঢাকাকে কেন্দ্র করে স্বতন্ত্র শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় প্রভাব বিনষ্ট হবে শিক্ষাব্যবস্থাকে দুই ভাগে বিভক্ত করার মাধ্যমে ব্রিটিশরা আবারও বঙ্গভঙ্গের মতো পরোক্ষ বিভাজনের বীজ বপন করছে বলে পত্রিকায় দাবি করা হয়।

গ. প্রবাসী ও অন্যান্য সাময়িকীর যুক্তি

রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের প্রবাসী পত্রিকায় সামগ্রিক শিক্ষার মানের প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল: পূর্ব বাংলার কলেজ ও স্কুলগুলোর যা বর্তমান মান, তাতে সরাসরি একটি আধুনিক গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় ধারণ করার মতো বৌদ্ধিক পরিপক্বতা ঢাকার আছে কি না।

 বিরোধিতার প্রধান যুক্তি ও কাঠামোগত বিশ্লেষণ

ঐতিহাসিক দলিলসমূহ বিশ্লেষণ করলে বিরোধীদের যুক্তিগুলোকে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:

বিরোধিতার ক্ষেত্র

তৎকালীন কলকাতার অবস্থান ও যুক্তি

ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও অন্তর্নিহিত কারণ

আর্থিক যুক্তি

"প্রাথমিক শিক্ষার চরম সংকটকালে ঢাকায় উচ্চশিক্ষায় অর্থ ঢালা অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা।"

পূর্ব বাংলার পাট ও ফসলের বিপুল রাজস্ব কলকাতায় ব্যয় হতো; অথচ সেই টাকায় ঢাকায় প্রতিষ্ঠান হলে তা মেনে নিতে দ্বিধা ছিল।

শিক্ষাগত মান

"মফস্বল শহরে মানসম্পন্ন গবেষক বা শিক্ষক পাওয়া যাবে না; ডিগ্রির মান পড়ে যাবে।"

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মনোপলি বা একাধিপত্য খর্ব হওয়ার আশঙ্কা।

রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সন্দেহ

"এটি একটি তথাকথিত ‘মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’ হবে, যা বাঙালি জাতীয় ঐক্যকে নষ্ট করবে।"

অনগ্রসর পূর্ব বাংলার মুসলিম ও নিম্নবর্গের হিন্দু জনগোষ্ঠীর শিক্ষালাভ ও নিজস্ব মধ্যবিত্ত শ্রেণি গঠনের পথ রুদ্ধ রাখার মনস্তত্ত্ব।

প্রশাসনিক অধিকার

"এক প্রদেশে দুটি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলে দ্বৈত শাসন ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।"

পূর্বাঞ্চলের কলেজগুলোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও ফি বাবদ আয় কলকাতায় ধরে রাখার চেষ্টা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংক্রান্ত বিতর্ক ও ঐতিহাসিক সত্যতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার আলোচনায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা নিয়ে প্রায়শই রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক উত্থাপিত হতে দেখা যায়। তবে ঐতিহাসিক দলিল ও গবেষণার আলোকে বিষয়টি স্পষ্ট. গড়ের মাঠের সভা বিতর্ক: কিছু স্মৃতিকথা ও জনশ্রুতিতে দাবি করা হয় যে, ১৯১২ সালে গড়ের মাঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধী যে প্রতিবাদ সভা হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ তাতে উপস্থিত ছিলেন। তবে তৎকালীন কোনো পুলিশি রিপোর্ট, সরকারি গোয়েন্দা প্রতিবেদন কিংবা সমকালীন পত্রপত্রিকার কার্যবিবরণীতে এমন কোনো অকাট্য তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না।

দলিলে অনুপস্থিতি: জাতীয় অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম তাঁর গবেষণাগ্রন্থ ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশি বছর’-এ বিস্তারিত পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন যে, তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধী স্মারকলিপি কিংবা প্রতিবাদের দলিলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রত্যক্ষ কোনো স্বাক্ষর বা সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ নেই।

পরবর্তীতে ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ ঢাকায় আসেন, কার্জন হলে বক্তৃতা দেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবর্ধনা গ্রহণ করেন। ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি-লিট (D.Litt) উপাধিতে ভূষিত করে।

বিরোধিতার ফলাফল ও ঐতিহাসিক শিক্ষা

কলকাতা-কেন্দ্রিক এই তীব্র বিরোধিতার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছিল প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াটিতে:

১. আইনি দীর্ঘসূত্রতা: ১৯১২ সালের ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দিতে সময় লেগেছিল দীর্ঘ ৯ বছর (১৯২১ সাল পর্যন্ত)। নাথান কমিশন (১৯১২) ও স্যাডলার কমিশনের (১৯১৭) মতো একাধিক কমিশন গঠন করে বিরোধীদের সন্তুষ্ট করতে হয়েছিল।

২. বাজেট সংকোচন: বিরোধীদের চাপের মুখে ব্রিটিশ সরকার প্রথমাবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রস্তাবিত মূল অবকাঠামোগত বাজেট ও পরিকল্পনা অনেকটাই কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়।

কলকাতা-কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী সমাজের এই তীব্র বিরোধিতার কারণেই নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নওয়াব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী এবং এ কে ফজলুল হকের মতো পূর্ব বাংলার নেতৃবৃন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে কেবল একটি বিদ্যাপীঠ তৈরির লড়াই হিসেবে দেখেননি; এটিকে রূপ দিয়েছিলেন পূর্ব বাংলার আপামর অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর বৌদ্ধিক মুক্তি ও আত্মমর্যাদার এক ঐতিহাসিক আন্দোলনে।

উপসংহার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ইতিবৃত্ত নয়; এটি হলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, আত্মমর্যাদার সংগ্রাম এবং অপমানের মুখে মাথা তুলে দাঁড়ানোর এক অনন্য মহাকাব্য। যে প্রতিষ্ঠানটিকে একসময় "মফস্বলের বিশ্ববিদ্যালয়" বলে উপহাস করা হয়েছিল, জ্ঞানচর্চা ও মুক্তচিন্তার গুণে সেটিই দ্রুত পরিচিতি পেয়েছিল ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ (Oxford of the East) হিসেবে। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গের আশা, ১৯১১-এর বঙ্গভঙ্গ রদের গভীর হতাশা এবং ১৯১২ থেকে ১৯২০ সালের দীর্ঘ নয় বছরের রাজনৈতিক ও আইনি লড়াইয়ের পথ ধরে যে চারাগাছটি রোপিত হয়েছিল, আজ তা শতবর্ষ পেরিয়ে এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ইটের পর ইট সাজানো কোনো ভবন নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, মুক্তচিন্তা এবং সার্বভৌম বাংলাদেশের চেতনার এক অমর বাতিঘর।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login