পদ্মা নদীর পলিমাটি দিয়ে গড়ে ওঠা চরাঞ্চলের রাতগুলো শহর কিংবা সাধারণ গ্রামের মতো নয়। পৌষের কনকনে শীতে যখন কুয়াশার চাদর নামে, তখন মনে হয় যেন আসমান থেকে কোনো মায়াবী কাফনের কাপড় ধরণীর বুক ঢেকে দিয়েছে। চারিদিকে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত ধু-ধু বালুচর, কোথাও কোথাও নিচু বাবলা আর কাশফুলের বন, আর মাঝে মাঝে জেগে থাকা মরা খালের কালো জল। বাতাস যখন সেই বাবলা বনের ভেতর দিয়ে সাঁই সাঁই শব্দে বয়ে যায়, তখন মনে হয় কোনো অতৃপ্ত আত্মা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলেছে। ফরিদপুর আর রাজবাড়ীর সীমানায় পদ্মা আর চন্দনা নদীর সঙ্গমস্থলের কাছাকাছি এমন এক বিচ্ছিন্ন চরের নাম ‘কাটাখালির চর’। কাটাখালির চরে মানুষের বসতি খুব কম। চরের উত্তর মাথায় রয়েছে আঠারো শতকের এক ভগ্নপ্রায় ব্রিটিশ নীলকুঠি। স্থানীয়রা বলে ‘সাহেব বাড়ি’। দেয়ালের চুন-সুরকি খসে গিয়ে পোড়ামাটির লাল ইটগুলো এমনভাবে বেরিয়ে আছে, যেন কোনো হিংস্র দানব নিজের পাজরের হাড় প্রদর্শন করছে। এই কুঠির চারপাশের প্রায় পাঁচ মাইল এলাকাকে চরের মানুষ এক অলিখিত সীমানা মেনে সূর্যাস্তের পর এড়িয়ে চলে। কারণ এই চরের রাতের নিস্তব্ধতা চিরে মাঝেমধ্যে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়,এক বরফ-সাদা তেজি ঘোড়া, আর তার পিঠে আসীন এক রক্তবর্ণ অবয়ব। স্থানীয়রা সেই অপচ্ছায়াকে ডাকে ‘লাল ভূত’।
শীতের এক সন্ধ্যায় কুষ্টিয়া থেকে গবেষণার কাজে এলেন আশফাক সাহেব। আশফাকুজ্জামান,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একজন সহকারী অধ্যাপক। সঙ্গে রয়েছে তার তরুণ ছাত্র ও গবেষক তৌকির। আশফাক সাহেব বাস্তববাদী মানুষ। প্রাচীন ইমারত, শিলালিপি আর লোকগাথা নিয়ে কাজ করলেও ভূত-প্রেত বা অতিপ্রাকৃতিক বিশ্বাসকে তিনি নিছকই গ্রামীণ মূর্খতা ও মনের ভুল বলে মনে করেন। কাটাখালির চরের দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে একটি ছোট বাজার, হাশেম আলীর হাট। সেখান থেকে শেষ রাতে নদী পার হয়ে চরে প্রবেশের একমাত্র উপায় মহিষের গাড়ি অথবা নৌকা। আশফাক সাহেব ও তৌকির যখন চরের খেয়াঘাটে পৌঁছালেন, তখন সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমের কুয়াশাচ্ছন্ন দিগন্তে। নদীপাড়ের নৌকার মাঝি শুকুর আলী যখন শুনল বাবুরা নীলকুঠির আশপাশে রাত কাটাতে চায়, তখন তার হাতের বৈঠা প্রায় খসে পড়ার উপক্রম হলো।
"বাবু, কিয়ের শখ চাপছে আপনাগো? সাহেব কুঠির সীমানায় দিনমানেও রাখালরা গোরু চড়াইতে যায় না! আর আপনেরা যাইবেন রাইতে? ক্যান, জীবনডা কি বেশি হইয়া গেছে?" শুকুর মাঝি চোখ বড় বড় করে বলল।
আশফাক সাহেব হাসলেন। তিনি নিজের ভারী ট্রাভেল ব্যাগটি নৌকায় তুলে দিয়ে বললেন, "শুকুর ভাই, ভূত বলে দুনিয়ায় কিছু নেই। তোমাদের কুঠির দেওয়ালের প্লাস্টারের নিচে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলের একটা বিশেষ তাম্রলিপির সন্ধান রয়েছে বলে আমাদের কাছে পুরনো গেজেটিয়ারের নথি আছে। আমরা এসেছি সেই লিপির মাপজোখ নিতে।"
শুকুর মাঝি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৈঠা তুলে নিল। নৌকা যখন কাটাখালির কালো জলের বুক চিরে চরের দিকে এগোতে লাগল, তখন সে নিচু গলায় বলতে শুরু করল সেই রহস্যময় লোকগাথা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চরের বাতাসে ঘুরে ফিরছে।
"বাবু, আপনেরা লেখাপড়া জানা মানুষ, বইয়ের অক্ষর চেনেন; কিন্তু এই চরের রক্ত চেনেন না। আজ থেইকা প্রায় দেড়শো-পৌনে দুইশো বছর আগের কথা। এই কাটাখালির চরে নীলকুঠির প্রধান ছিল এক অত্যাচারী ইংরেজ ম্যানেজার, নাম আলেকজান্ডার হার্বার্ট। সাধারণ মানুষ তারে ডাকত ‘হারপাত সাহেব’। চরের কৃষকদের সে জোর কইরা নীলের চাষ করাত। যে চাষি কথা শুনত না, তার ভিটায় আগুন লাগাইয়া দিত। আর তার পিছে পিছে থাকত তার বিশ্বস্ত এক পাইক প্রধান, নাম রক্তিম সিং। রক্তিম সিংয়ের পরনে থাকত সব সময় রক্ত-লাল রঙের এক রেশমি আলখেল্লা আর লাল পাগড়ি। সে চড়ত সাহেবের সবচেয়ে প্রিয়, বিজলির মতো দ্রুতগামী এক দুধসাদা জাতের আরবি ঘোড়ায়।"
শুকুর মাঝির গলা নেমে গেল এক গা-ছমছমে ফিসফিসানিতে, "একদিন চরের চাষিরা বিদ্রোহ করল। রক্তিম সিং সেই বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে এক রাতের মধ্যে পাশের চরের বারোটা ঘর জ্বালাইয়া দিল, কুপাইয়া মারল শত শত নিরীহ মানুষ। কিন্তু পাপের ঘড়া তো চিরকাল ভরে না বাবু! এক অমাবস্যার রাতে চরের বাগী প্রজা আর বুনো সাঁওতালরা একসাথে কুঠি ঘিরে ফেলল। তারা কুঠির গেট ভাইঙ্গা আগুন লাগাল। রক্তিম সিং তার সেই সাদা ঘোড়ায় চইড়া পলাইতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রজারা তাকে ওই কাটাখালির মোহনায় ঘেরাও করল। শত শত বর্শা আর বল্লম দিয়া তারা রক্তিম সিংরে ফালাফালা কইরা কাটল। তার নিজের রক্তের বন্যায় তার সেই লাল আলখেল্লা ভিইজা একাকার হইয়া গেল। ঘোড়াটাকেও তারা পানিতে ডুবাইয়া মারল।"
নৌকা চরের তীরে গিয়ে ঠেকল। শুকুর মাঝি বৈঠা ধরে দাঁড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে শেষ কথাটা বলল, "মরার আগে রক্তিম সিং অভিশাপ দিয়া গেছিল—এই চরে যারাই রাতের বেলা সীমানা পার হবে, তাদের সে এই সাদা ঘোড়ায় চইড়া আইসা নিজের রক্ত দিয়া গোসল করাবে! আজ দেড়শো বছর পার হইয়া গেল বাবু, অমাবস্যা আর পৌষের কুয়াশায় আজও ওই সাদা ঘোড়া খুরের শব্দ তুইলা চরের বালু উড়ায়। আর তার পিঠে বইসা থাকে সেই লাল ভূত!"
তৌকিরের মেরুদণ্ড দিয়ে যেন একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। কিন্তু আশফাক সাহেব সশব্দে হেসে উঠলেন। তিনি মানিব্যাগ থেকে শুকুর মাঝির ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ টাকা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, "ধন্যবাদ শুকুর ভাই, চমৎকার গল্প। রাতে কুয়াশার মধ্যে হাওয়া আর নদীর গর্জন এক হয়ে এমন হ্যালুসিনেশন তৈরি করা খুব স্বাভাবিক। তবে তুমি পরশু ভোরে আমাদের নিতে এসো।"
শুকুর মাঝি টাকাটা হাত পেতে নিল, কিন্তু তার চোখে রইল এক করুণ ভয়ের ছাপ। সে কোনো কথা না বলে দ্রুত নৌকা ঘুরিয়ে সন্ধ্যার ধোঁয়াটে নদীর বুকে মিলিয়ে গেল।
কাটাখালির চরের বালিয়াড়ি পার হয়ে প্রায় আধা মাইল হেঁটে আশফাক সাহেব আর তৌকির যখন নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষে পৌঁছালেন, তখন পৃথিবীর বুক থেকে সমস্ত আলো মুছে গেছে। আকাশে মেঘের ঘনঘটা না থাকলেও পৌষের নিরেট কুয়াশা যেন একটা সীসার ছাদের মতো নেমে এসেছে। কুঠিবাড়িটির কাঠামো সুবিশাল। মূল প্রবেশদ্বারে দুটি ভাঙা খিলান এখনও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। সামনে এককালে হয়তো বিরাট চত্বর ছিল, এখন সেখানে বিষাক্ত ভাটগাছ, ক্যাকটাস আর বুনো কাশফুলের জঙ্গল। কুঠির দক্ষিণ দিকে একটি দোতলা অংশ এখনও কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে, যার ছাদের বেশিরভাগ ধসে পড়লেও দুটি কামরার ছাদ অক্ষত। আশফাক সাহেব তার শক্তিশালী এলইডি লণ্ঠনটি একটি কাঠের বক্সের ওপর বসিয়ে দিলেন। সাদা আলোয় ঘরের দেয়ালগুলো দৃশ্যমান হলো। স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে শতাব্দীর পুরোনো শেওলার পুরু আস্তরণ। মেঝেতে চামচিকার বিষ্ঠা আর শুকনো পাতার জঞ্জাল।
তৌকির তার পোর্টেবল গ্যাস স্টোভ বের করে চা বসাল। আশফাক সাহেব নিজের ব্যাগ থেকে ক্যামেরা, ট্রাইপড আর মেজারিং টেপ বের করে কাজে লেগে পড়লেন।
"তৌকির, ইতিহাসের দিকে তাকাও," আশফাক সাহেব দেয়ালে ঝুলন্ত একটি ভাঙা লোহার আংটার দিকে আলো ফেলে বললেন। "এই সেই আংটা, যেখানে বেঁধে প্রজাদের চাবুক মারা হতো। শুকুর মাঝির গল্পের রক্তিম সিং কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়, সে ছিল বাস্তবের এক পৈশাচিক চরিত্র। কিন্তু অতিলৌকিক রূপটা হলো মানুষের ভয়ের ফসল। কোনো মানুষ মারা গেলে তার শক্তি মহাবিশ্বের মৌলিক শক্তিতে বিলীন হয়ে যায়। কোনো রক্তমাখা ভূত দেড়শো বছর ঘোড়া ছুটিয়ে ঘুরে বেড়ায় না।"
তৌকির চায়ের মাগ এগিয়ে দিয়ে বলল, "স্যার, বৈজ্ঞানিকভাবে আপনার কথা একশো ভাগ সত্যি। কিন্তু এই জায়গাটার বাতাস কেমন যেন ভারী। খেয়াল করেছেন? চরে কোনো পাখির ডাক নেই, এমনকি ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজও থেমে গেছে। এমন নিস্তব্ধতা আমি কখনো দেখিনি।"
আশফাক সাহেব চায়ে চুমুক দিয়ে দেয়ালের ইটের ফাঁকফোকর দেখতে লাগলেন। রাত যখন এগারোটা ছুঁইছুঁই, তখন বাইরে কুয়াশার ঘনত্ব আরও বাড়ল। ঘরের ভেতরেও যেন ঠান্ডা কামড় বসাচ্ছিল। তৌকির নিজের স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে, বাতাসের কোনো দমকা ছাড়াই ঘরের কোণে ঝুলিয়ে রাখা লণ্ঠনের শিখাটা কয়েকবার কেঁপে উঠল।
তারপরই শুরু হলো শব্দটা। প্রথমে মনে হলো অনেক দূর থেকে ভেসে আসা কোনো মৃদু ছন্দ। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শব্দটা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠল। টগবগ... টগবগ... টগবগ...
ঘোড়ার খুরের আওয়াজ!
কোনো সাধারণ নরম বালুতে পা ফেলার আওয়াজ নয়; যেন পাথুরে মেঝের ওপর কোনো ভারী নাল-বাঁধানো ঘোড়ার লোহার খুর প্রচণ্ড গতিতে আছড়ে পড়ছে! তৌকির এক ঝটকায় উঠে বসল। তার হাত কাঁপছিল। "স্যার! শুনছেন ওটা?"
আশফাক সাহেবও কান খাড়া করলেন। তার কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। তিনি টর্চলাইটটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। "অদ্ভুত তো! এই চরে কোনো ঘোড়া থাকার কথা নয়। রাখালরা মহিষ চড়ায়, ঘোড়া পালন করার মতো সামর্থ্য চরের কোনো গৃহস্থের নেই।" টগবগ... টগবগ... হিঁহিঁহিঁইইই!
এবার শুধু খুরের শব্দ নয়, কুয়াশা ভেদ করে ভেসে এলো এক অতিপ্রাকৃতিক, দীর্ঘ এবং যন্ত্রণাকাতর এক অশ্বের হ্রেষারব! সেই ডাক যেন সাধারণ কোনো পশুর নয়; মনে হলো মাটির পাতালপুরী থেকে কোনো অন্ধকারের জীব বাতাস চিরে চিৎকার করে উঠল।
শব্দটা কুঠির চারপাশের জঙ্গলের ভেতর গোল হয়ে ঘুরতে লাগল। একবার মনে হয় উত্তর দিকে, পরক্ষণেই মনে হয় ঠিক জানালার বাইরে! আশফাক সাহেব নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, "কেউ মজা করছে তৌকির। চরের ডাকাতরা হয়তো আমাদের ভয় দেখিয়ে মালপত্র লুট করতে চায়।" তিনি টর্চ জ্বেলে ভাঙা বারান্দার দিকে পা বাড়ালেন।
"স্যার, যাবেন না!" তৌকির পেছনে থেকে আর্তনাদ করে উঠল। কিন্তু আশফাক সাহেব ততক্ষণে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। বারান্দা থেকে নিচের বিস্তৃত চত্বরের দিকে আলো ফেলতেই আশফাক সাহেবের পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছিল এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য।
কুঠির প্রধান ফটকের ভাঙা খিলান গলে প্রবেশ করছে এক সুবিশাল ঘোড়া। ঘোড়াটির গায়ের রঙ বরফের মতো ধবধবে সাদা, আর তার শরীর থেকে যেন এক হালকা ফসফরাসের নীলচে আভা ঠিকরে বের হচ্ছে! ঘোড়াটির পাগুলো মাটিকে স্পর্শ করছে কি না বোঝা যাচ্ছে না, কারণ তার খুরের তলায় কুয়াশাগুলো বাষ্পের মতো পাক খাচ্ছে।
আর সেই সাদা ঘোড়ার পিঠে বসে আছে এক বিশালদেহী অবয়ব। তার আপাদমস্তক মোড়া ঘন রক্তবর্ণ এক পোশাকে। পোশাকের প্রান্তগুলো বাতাসে কোনো ডানা মেলা বাদুড়ের মতো কাঁপছে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল তার মুখের অংশটি—সেখানে কোনো চেনা চোখ, নাক বা মুখাবয়ব নেই; সেখানে কেবল জ্বলছে দুটি গনগনে লাল কয়লার মতো আলোর বিন্দু! আর সেই অবয়বের ডান হাতে ধরা রয়েছে রক্তে ভেজা এক দীর্ঘ, বাঁকানো তরবারি, যার ডগা থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় নিচে পড়ছে তরল লাল রক্ত!
ঘোড়াটি কুঠির চত্বরের ঠিক মাঝখানে এসে স্থির হয়ে দাঁড়াল। তার পিঠে বসা সেই রক্তিম মূর্তিটি ধীরে ধীরে তার মাথা তুলল সোজা দোতলার সেই ভাঙা বারান্দার দিকে, যেখানে আশফাক সাহেব টর্চ হাতে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন।
বাতাসের তাপমাত্রা মুহূর্তের মধ্যে নিচে নেমে গেল। আর সেই লাল ভূতের বুকের ভেতর থেকে এক অমানুষিক, গুমোট গর্জন ভেসে এলো--
"কার হুকুমে এসেছিস হারপাতের ভিটায়? আজ তোদের রক্ত দিয়ে কাটাখালির পিপাসা মিটবে!"
ঘোড়াটি তার সামনের দুটি পা শূন্যে তুলে বিকট শব্দে ডেকে উঠল। আশফাক সাহেবের হাত থেকে ভারী মেটাল টর্চলাইটটি ছিটকে নিচে পড়ে গেল। পৃথিবীর যাবতীয় বিজ্ঞান, যুক্তি আর যুক্তিবাদিতা এক মুহূর্তে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল তার চোখের সামনে।
তৌকির দৌড়ে এসে আশফাক সাহেবকে একরকম টেনেহিঁচড়ে ঘরের ভেতরে নিয়ে এলো। আশফাক সাহেবের চোখ তখন বিস্ফারিত, শরীর থরথর করে কাঁপছে, মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না। যে মানুষটি কিছুক্ষণ আগেও বিজ্ঞান দিয়ে ভূতকে উড়িয়ে দিচ্ছিলেন, তিনি এখন সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে স্তব্ধ।
"স্যার! দরজা বন্ধ করার মতো কোনো কপাট নেই এখানে!" তৌকির প্রায় কেঁদে ফেলল।তারা ভাঙা ঘরের এক কোণে থাকা একটি ভারী সেগুন কাঠের টেবিল টেনে কোনোমতে প্রবেশপথের সামনে আড়াল তৈরি করল। কিন্তু তারা ভালো করেই জানত, কোনো অতিপ্রাকৃতিক শক্তির সামনে এই কাঠের টেবিল এক খড়কুটোর চেয়ে বেশি কিছু নয়।
বাইরে তখন শুরু হয়ে গেছে এক নারকীয় তাণ্ডব। ঘোড়ার খুরের শব্দ এবার আর চত্বরে সীমাবদ্ধ নেই। শব্দটা যেন কুঠির চারপাশের দেয়াল বেয়ে উঠছে! খটাশ... খটাশ... খটাং!
দেয়ালের পোড়ামাটির ইটগুলো খসে পড়ার শব্দ হতে লাগল। ঘরের ছাদের ফাটল দিয়ে বালু আর চুনসুরকির গুঁড়ো বৃষ্টির মতো ঝরে পড়তে লাগল তাদের মাথায়। আর সেই সাথে ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়তে লাগল এক তীব্র, বমি-উদ্রেককারী গন্ধ। এটা কোনো সাধারণ দুর্গন্ধ নয়, এটা হলো পচা রক্ত আর কাঁচা মাংসের এমন এক আঁশটে গন্ধ, যা নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করামাত্র মস্তিষ্ক অসাড় হয়ে আসে।
হঠাৎ, সেই কাঠের টেবিলের ওপর সজোরে কিছু একটা আছড়ে পড়ল। ধড়াম! টেবিলটি চুরমার হয়ে দুই টুকরো হয়ে গেল। ঘরের ভাঙা দরজার চৌকাঠে এসে দাঁড়াল সেই রক্তবর্ণ অবয়ব! কাছ থেকে দেখে তৌকিরের আত্মা যেন খাঁচাছাড়া হওয়ার উপক্রম হলো। মূর্তিটির শরীর থেকে আগুনের মতো তাপ বের হচ্ছে, অথচ বাতাস বরফের মতো ঠান্ডা! তার লাল আলখেল্লার ভেতর থেকে কোনো কঙ্কালসার হাত নয়, বেরিয়ে এসেছে সম্পূর্ণ কালো, চামড়া-পোড়া এক দানবীয় থাবা।
মূর্তিটির চোখ দুটো অন্ধকারের ভেতর লেলিহান শিখার মতো কাঁপছিল। তার বাঁকানো তরবারিটা বাতাসে এক চক্কর ঘুরে আশফাক সাহেবের গলা বরাবর নেমে আসতে লাগল।
"রক্ত! আরো রক্ত চাই!" সেই বিকট আওয়াজে ঘরের প্রাচীন দেয়ালগুলো কেঁপে উঠল।
এই চরম মুহূর্তে আশফাক সাহেবের ভেতরে থাকা আদিম আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি যেন এক সেকেন্ডের জন্য সজাগ হয়ে উঠল। মৃত্যুর নিশ্চিত মুখে দাঁড়িয়ে তিনি কোনো যুক্তি খুঁজলেন না। তার হাতের কাছে পড়ে ছিল গবেষকদের ব্যবহৃত উচ্চ-তীব্রতার ম্যাগনেশিয়াম ফ্লেয়ার গান,যা দুর্গম চরে রাতের বেলা বিপদে পড়লে উদ্ধারের সংকেত হিসেবে আকাশে ছুড়তে হয়।
আশফাক সাহেব কাঁপতে কাঁপতে ফ্লেয়ার গানের ট্রিগার চেপে দিলেন সরাসরি সেই লাল অবয়বের বুক লক্ষ্য করে! ফটাস! হিসসসস! ম্যাগনেশিয়ামের সেই তীব্র, চোখ-ধাঁধানো সাদা আলোর গোলাটি হাজার ডিগ্রি তাপমাত্রায় প্রজ্বলিত হয়ে আছড়ে পড়ল সেই লাল মূর্তির ঠিক বক্ষস্থলে!
মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘর এক অন্ধ করা সাদা আলোয় ভরে গেল। কিন্তু যা ঘটল, তার জন্য তারা প্রস্তুত ছিলেন না। কোনো সাধারণ রক্ত-মাংসের দেহে এমন ম্যাগনেশিয়াম ফ্লেয়ার লাগলে তা পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেই আলোর গোলাটি লাল অবয়বের বুকে স্পর্শ করামাত্র এক ভয়ংকর বিস্ফোরণ ঘটল, তবে আগুনের নয়, ধোঁয়ার!
মূর্তিটি কোনো শারীরিক যন্ত্রণার চিৎকার দিল না; বরং এক তীব্র হিসহিস শব্দ তুলে তার শরীরটা চারদিকে লাল বাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়তে লাগল। আর তার সাথে মিশে গেল সেই সাদা ঘোড়ার এক বিকট কানফাটানো চিৎকার! সেই তীব্র আলোর ঝলকানিতে তৌকির আর আশফাক সাহেব দুজনেই চোখের দৃষ্টি হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন। ঘরের ছাদ থেকে বিশাল এক খণ্ড প্রাচীন কড়ি-কাঠ খসে পড়ল আশফাক সাহেবের পায়ের ওপর। তীব্র ব্যথায় তিনি চিৎকার দিয়ে উঠলেন, তারপর চারপাশ এক নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে তলিয়ে গেল।
ভোরের প্রথম আলো যখন কাটাখালির চরের কুয়াশা ভেদ করে নীলকুঠির ভাঙা বারান্দায় এসে পড়ল, তখন এক পরম নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। গাঙচিলের ডানার শব্দ আর পদ্মার ঢেউয়ের মৃদু কলকল ধ্বনি ছাড়া কোথাও কোনো রাতের আতঙ্কের চিহ্ন নেই। তৌকিরের যখন জ্ঞান ফিরল, তখন তার সারা শরীর ব্যথায় অবশ। সে চোখ পিটপিট করে দেখল, ঘরের ছাদ দিয়ে সকালের মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে মেঝেতে। পাশে আশফাক সাহেব পড়ে আছেন, তার বাঁ পা একটি ভারী কাঠের নিচে চাপা পড়ে আছে।
"স্যার! স্যার, উঠুন!" তৌকির কোনোমতে নিজেকে টেনে তুলে আশফাক সাহেবের পা থেকে ভারী কাঠটি সরাল। আশফাক সাহেব গোঙাতে গোঙাতে চোখ মেললেন। তার পা মারাত্মকভাবে মচকে গেছে, রক্ত জমে নীল হয়ে আছে। কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন।
তৌকির চারদিকে তাকাল। রাতের সেই বীভৎসতা কি শুধুই কোনো দুঃস্বপ্ন ছিল?
কিন্তু না! মেঝের দিকে তাকাতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। যেখানে ম্যাগনেশিয়াম ফ্লেয়ারটি বিস্ফোরিত হয়েছিল, সেখানে মেঝের প্রাচীন টাইলসের ওপর কালো পোড়া দাগ লেগে আছে। আর সেই পোড়া দাগের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কিছু অদ্ভুত জিনিস।
তৌকির হাঁটু গেড়ে বসে সেই জিনিসগুলো পরীক্ষা করতে লাগল। সেখানে কোনো রক্তের ফোঁটা নেই। বরং পড়ে রয়েছে শুকনো লালচে এক ধরনের রঞ্জক পদার্থ বা পাউডার, কিছু রাসায়নিক ফসফরাসের পোড়া অবশেষ, আর মাটিতে স্পষ্ট বসে যাওয়া ঘোড়ার লোহার নালের দাগ! কিন্তু সবচেয়ে চমকপ্রদ ছিল অন্য একটি জিনিস।
পোড়া দাগের ঠিক মাঝখানে পড়ে ছিল একটি ভাঙা আধুনিক মেটালিক বেল্ট বাকল,যার ওপর ছোট করে খোদাই করা রয়েছে: 'ইউ.এস. কোস্ট গার্ড, স্পেশাল ট্যাকটিক্যাল'। আর তার পাশেই পড়ে ছিল একটি আধুনিক উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন ব্লুটুথ অডিও রিসিভার ও আল্ট্রাসনিক সাউন্ড অ্যামপ্লিফায়ারের পুড়ে যাওয়া সার্কিট! আশফাক সাহেব দেয়াল ধরে কোনোমতে উঠে বসলেন। তিনি ভাঙা বাকল আর সার্কিটটির দিকে তাকালেন। তার পণ্ডিত চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে লাগল। ভয়ের মেঘ কেটে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠল এক ক্ষুরধার অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি।
"তৌকির..." আশফাক সাহেবের ভাঙা গলা দিয়ে শব্দ বের হলো। "ওই পোড়া গুঁড়োগুলো রুমালের ভেতর তোলো।"
তৌকির সাবধানে লাল পাউডারগুলো একটি পলিথিনে ভরল। পাউডারটি নাকের কাছে নিতেই সে চমকে উঠল। "স্যার! এটা তো সালফার, বারুদ আর শুকনো রঙ-এর মিশ্রণ! থিয়েটারে বা মিলিটারিতে যে স্মোক-গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়, এটা হুবহু সেই জিনিস!"
"আর এই অডিও রিসিভারটা?" আশফাক সাহেব সার্কিটের পোড়া চিপটা হাতে নিলেন। "আল্ট্রাসনিক সাউন্ড বিটার। যা খুব কম কম্পাঙ্কের শব্দ তরঙ্গ তৈরি করতে পারে। বিজ্ঞানীরা একে বলে 'ইনফ্রাসাউন্ড' (Infrasound)—যার কম্পাঙ্ক ১৯ হার্টজের নিচে। এই শব্দ মানুষ সরাসরি কানে শুনতে পায় না, কিন্তু এই তরঙ্গ মানব মস্তিষ্কে চরম আতঙ্ক, চোখের দৃষ্টিতে কাঁপুনি এবং হ্যালুসিনেশন তৈরি করে!"
তৌকির হতবাক হয়ে গেল। "তার মানে... কাল রাতে আমরা যা দেখেছি... সেই সাদা ঘোড়া... সেই লাল ভূত..."
"ঘোড়াটা বাস্তব ছিল তৌকির!" আশফাক সাহেব মাটির নালের দাগের দিকে আঙুল তুললেন। "ঘোড়াটা ছিল রক্ত-মাংসের জ্যান্ত ঘোড়া। তার গায়ে হয়তো লাগানো ছিল রেডিয়াম বা ফসফরাস ডাই, যা অন্ধকারে জ্বলে। কিন্তু তার পিঠের সেই রক্তিম সওয়ারি কোনো অপার্থিব ভূত নয়! কেউ একজন অতিলৌকিক রূপ ধারণ করে এই চরে এক বিশাল মিথ্যাকে টিকিয়ে রেখেছে।"
"কিন্তু কেন স্যার?" তৌকিরের মাথায় কিছু ঢুকছিল না। "দেড়শো বছর ধরে একটা পুরো চরে এই ভূতের নাটক সাজিয়ে কার কী লাভ?"
আশফাক সাহেব মেঝের পোড়া অংশ থেকে চোখ তুলে তাকালেন নীলকুঠির ভাঙা দেওয়ালের দিকে।
যে দেয়ালটির পাশে ফ্লেয়ারটি বিস্ফোরিত হয়েছিল, সেই দেয়ালের শতবর্ষের পুরোনো চুনাপাথরের প্লাস্টার ধসে গিয়ে ভেতরের অংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। আর সেই উন্মুক্ত গহ্বরের ভেতরে দেখা যাচ্ছে আধুনিক প্লাস্টিকের তৈরি বড় বড় নীল রঙের ড্রাম এবং কালো ওয়াটারপ্রুফ মেটাল কেস! আশফাক সাহেব হামাগুড়ি দিয়ে সেই দেয়ালের ফাটলের কাছে এগিয়ে গেলেন। তিনি একটি ড্রামের ঢাকনা সরাতেই তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
ড্রামের ভেতর সাজানো রয়েছে শত শত কোটি টাকার অবৈধ অস্ত্র, একে-৪৭, সামরিক গ্রেডের স্নাইপার রাইফেল, বিদেশি পিস্তল এবং হাজার হাজার রাউন্ড তাজা গুলি! আর অন্য একটি কেসের ভেতর স্তূপ করে রাখা রয়েছে খাঁটি সোনার বার এবং উচ্চমূল্যের নিষিদ্ধ ড্রাগসের প্যাকেট!
"পদ্মার এই জলসীমা হলো তিন জেলার আন্তর্জাতিক চোরাচালানের ট্রানজিট রুট," আশফাক সাহেবের চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বের হলো। "কাটাখালির চরের এই কুঠি হলো চোরাকারবারীদের মূল গোপন গুদামঘর! আর এই গুদামঘরকে মানুষের চোখ থেকে পাহারা দেওয়ার জন্য তারা তৈরি করেছে ‘সাদা ঘোড়া আর লাল ভূতের’ এই মহাকাব্যিক রূপকথা! যাতে ভয়ের চোটে কোনো পুলিশ, কোনো রাখাল বা কোনো সাধারণ মানুষ এই চরের পাঁচ মাইলের মধ্যে পা না রাখে!"
ঠিক সেই মুহূর্তে,কুঠির বাইরে শুকনো পাতার ওপর দিয়ে ভারী বুটের মচমচ শব্দ শোনা গেল।
"চমৎকার বিশ্লেষণ প্রফেসর! আপনার মাথায় দেখছি শুধু মাটির নিচের পুরোনো হাঁড়িপাতিল ছাড়াও বেশ ভালো বুদ্ধি আছে!"
দরজার ভাঙা খিলানে এসে দাঁড়াল এক দীর্ঘদেহী মানুষ। তার পরনে জলপাই রঙের আধুনিক কমব্যাট ট্রাউজার্স আর জ্যাকেট। কিন্তু তার মুখটা দেখে তৌকিরের হৃৎপিণ্ড যেন আবার লাফিয়ে উঠল। লোকটি আর কেউ নয়,ঘাটের সেই নিরীহ নৌকা মাঝি শুকুর আলী!
তবে শুকুর আলীর চেহারায় এখন আর সেই গ্রামীণ দীনতা নেই। তার একহাতে ঝুলছে একটি সাইলেন্সার লাগানো অত্যাধুনিক অটোমেটিক পিস্তল, আর চোখেমুখে ফুটে উঠেছে এক নিষ্ঠুর, হিংস্র হাসি।
তার পেছনে কুঠির চত্বরে দাঁড়িয়ে আছে চারজন ভারী অস্ত্রধারী লোক। আর তাদের একপাশে বাঁধা রয়েছে এক সুবিশাল, পেশিবহুল সাদা জাতের আরবি ঘোড়া! দিনের আলোতেও ঘোড়াটির গায়ের শুভ্র রূপ যেন চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। তার জিন আর পিঠের সাজ রক্তবর্ণ চামড়ায় বাঁধানো।
"শুকুর মাঝি!" তৌকির রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল।
শুকুর মাঝি এক পা এগিয়ে এসে এক খসখসে অট্টহাসি দিল। "শুকুর মাঝি তো দিনের বেলার রূপ রে খোকা। রাতে এই কাটাখালির বাদশাহ রক্তিম সিংয়ের রক্ত আমার শরীরে বইয়া যায়! আমার প্রপিতামহ ছিল সেই রক্তিম সিং। মানুষ গল্প বানাইছে তারে কুপাইয়া মারছে, কিন্তু ইতিহাস জানে না রক্তিম সিংয়ের বংশধরেরা এই পদ্মার চর কোনোদিন ছাড়ে নাই।"
শুকুর মাঝি পিস্তলের নল আশফাক সাহেবের কপাল বরাবর স্থির করল। "দেড়শো বছর আগে আমার পূর্বপুরুষ ইংরেজদের নীলের ব্যবসা পাহারা দিত এই ঘোড়ায় চইড়া। আর আজ আমরা এই চরে পাহারা দেই আন্তর্জাতিক অস্ত্রের চালান। কত বড় বড় ডাকাত আর পুলিশ এই চরে আইসা লাল ভূতের ডরে প্রস্রাব কইরা পালাইছে! আর তোরা দুইটা পুঁচকে বই-পড়া পোকা আইসা আমার কোটি টাকার ডেরা ফাঁসায়ে দিবি?"
আশফাক সাহেব ভাঙা পায়ে ভর দিয়ে কোনোমতে সোজা হয়ে বসলেন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তার কণ্ঠে কোনো দ্বিধা বা কাঁপুনি ছিল না।
"তুমি বিজ্ঞানের অপব্যবহার করে মানুষকে ধোঁকা দিয়েছ শুকুর," আশফাক সাহেব শান্ত গলায় বললেন। "ইনফ্রাসাউন্ড প্রজেক্টর, ফসফরাস অ্যারোসল, আর লাল রঙের ছদ্মবেশ দিয়ে হয়তো সাধারণ সরল চাষিদের বোকা বানানো যায়, কিন্তু সত্যের আলো যখন পড়ে, তখন সব ভূতের ভণ্ডামি চূর্ণ হয়ে যায়।"
শুকুর মাঝি দাঁতে দাঁত পিষল। "সত্যের আলো দেখার জন্য তোরা কেউ জ্যান্ত থাকবি না প্রফেসর! তোদের লাশ যখন পদ্মার চরে শেয়াল-শকুনে খুবলে খাবে, তখন লোকে বলবে,লাল ভূতের অভিশাপে তাদের জান গেছে!"
শুকুর মাঝি তার পিস্তলের ট্রিগারে আঙুলের চাপ বাড়াল।খটাশ! কিন্তু কোনো বুলেটের শব্দ হলো না। তার আগেই কুঠির পেছনের জঙ্গল আর নদীর দিক থেকে একসঙ্গে ফেটে পড়ল কানফাটানো সাইরেন আর আধুনিক রাইফেলের গর্জন! দাঁড়াঁড়াঁড়াঁ!
"বাংলাদেশ পুলিশ অ্যান্ড কোস্ট গার্ড! চারদিক ঘেরাও করা হয়েছে! অস্ত্র ফেলে হাত তোলো!"
মেগাফোনের বজ্রকণ্ঠ কুয়াশা ভেদ করে চত্বরে আছড়ে পড়ল। শুকুর মাঝি চমকে পেছনে তাকাতেই দেখল, কুঠির চারপাশের ঝোপঝাড় চিরে বেরিয়ে এসেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং কোস্ট গার্ডের কমান্ডো দল! তাদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের লাল লেজার সাইট শুকুর মাঝি ও তার দলের বুকের ওপর স্থির হয়ে গেছে।
"ফাঁদ!" শুকুর মাঝি চিৎকার করে পিস্তল তুলতে গেল। ঠাঁই! কোস্ট গার্ডের এক নিখুঁত স্নাইপার শটে শুকুর মাঝির ডান হাতের পিস্তল ছিটকে পড়ে গেল, তার কবজি চিরে রক্ত ঝরে পড়ল মেঝের ধূলিকণায়। বাকি চারজন চোরাকারবারী প্রতিরোধের কোনো সুযোগই পেল না; তারা হাঁটু গেড়ে হাত মাথার ওপর তুলে নিল। কমান্ডোরা চোখের পলকে কুঠির ভেতর ঢুকে শুকুর মাঝিকে মাটিতে চেপে ধরে শক্ত ইস্পাতের হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিল।
অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামান সাহেব। তিনি ভেতরে ঢুকে আশফাক সাহেবকে দেখেই এগিয়ে এলেন। "আশফাক ভাই! আপনি ঠিক আছেন? আমরা নদীর ওপার থেকেই সিগন্যাল ট্র্যাক করছিলাম!" তৌকির হতবাক হয়ে আশফাক সাহেবের দিকে তাকাল। "স্যার! পুলিশ এলো কোথা থেকে?"
আশফাক সাহেব মৃদু হাসলেন। তিনি পকেট থেকে তার ছোট্ট জিপিএস ট্র্যাকার ও এসওএস স্যাটেলাইট ফোনটি বের করলেন, যা তিনি কুষ্টিয়া থেকেই পুলিশের সাইবার ক্রাইম ও ট্র্যাকিং ইউনিটের সাথে যুক্ত করে এসেছিলেন।
"তৌকির, আমি প্রত্নতত্ত্ববিদ হতে পারি, কিন্তু অন্ধ নই," আশফাক সাহেব বললেন। "কুষ্টিয়ার এক পুরনো নথিতে আমি এই চরে বারবার সন্দেহভাজন ট্রলারের আনাগোনার তথ্য পেয়েছিলাম। আর শুকুর মাঝির নৌকায় ওঠার সময়ই আমি খেয়াল করেছিলাম তার নৌকার পাটাতনের নিচে পোড়া ফসফরাস আর আল্ট্রাসনিক ব্যাটারির প্যাক লুকানো ছিল। তখনই আমি জামান সাহেবকে কো-অর্ডিনেটস পাঠিয়ে ব্যাকআপ প্রস্তুত রাখতে বলেছিলাম। রাতের সেই ম্যাগনেশিয়াম ফ্লেয়ারটা শুধু আত্মরক্ষা ছিল না, ওটা ছিল পুলিশের জন্য চূড়ান্ত ভিজ্যুয়াল সিগন্যাল!"
শুকুর মাঝি মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ে আক্রোশে কাঁপছিল। তার দীর্ঘদিনের অপরাজেয় 'লাল ভূতের' মিথ আজ পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়ে গেল। দুপুরের মধ্যে কাটাখালির চরের সেই প্রাচীন নীলকুঠি ঘিরে ফেলল ডজনখানেক মিডিয়ার ক্যামেরা আর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কুঠির গোপন দেয়াল ভেঙে উদ্ধার করা হলো শত শত কোটি টাকার অবৈধ আধুনিক অস্ত্র, চোরাই সোনা এবং কোটি টাকার নিষিদ্ধ রাসায়নিক ড্রাগ। উদ্ধার করা হলো শুকুর মাঝির সেই বিশেষ লাল রেশমি আলখেল্লা, যার কলারের ভেতরে লুকানো ছিল মাইক্রো-ড্রাইভার যুক্ত ইনফ্রাসাউন্ড স্পিকার, আর সেই বিশেষ গ্যাস নির্গমনকারী পোর্টেবল সিলিন্ডার।
আর সেই দুধসাদা আরবি ঘোড়াটিকে যখন কোস্ট গার্ডের একটি বোটে তোলা হচ্ছিল, তখন দুপুরের উজ্জ্বল রোদে সে তার কেশর দুলিয়ে এক শান্ত, নিষ্পাপ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। পশুর কোনো দোষ ছিল না; তাকে অন্ধকারের স্বার্থে ব্যবহার করেছিল মানুষের কুৎসিত লোভ।
নদীর পাড়ে তখন ভিড় জমিয়েছে চরের শত শত সাধারণ মানুষ। যে চরের সীমানায় তারা রাতে পা দেওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারত না, আজ সেখানে তারা দেখছে তাদের দীর্ঘদিনের সেই ভয়ের আসল রূপ। দেড়শো বছর ধরে যে ভূতের আতঙ্কে তারা থরথর করে কাঁপত, সেই ভূত এখন পুলিশের গাড়ির লোহার খাঁচায় বন্দি এক সাধারণ খুনি ও চোরাকারবারী। একটি স্পিডবোটে আশফাক সাহেবকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তোলার ব্যবস্থা করা হলো। তার পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা, কিন্তু তার চোখেমুখে খেলা করছিল এক পরম তৃপ্তির আভা।
তৌকির নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সেই প্রাচীন নীলকুঠির দিকে তাকাল। সকালের কুয়াশা পুরোপুরি কেটে গেছে। নদীর জলে সূর্যের আলো হীরার দানার মতো ঝিকমিক করছে। যে কুঠিকে কাল রাতে মনে হচ্ছিল কোনো নরকের প্রবেশদ্বার, আজ এই রোদঝলমলে দুপুরে তাকে মনে হচ্ছে শতবর্ষের নিঃসঙ্গতায় দাঁড়িয়ে থাকা এক ঐতিহাসিক স্থাপত্য,যা অবশেষে অপরাধের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছে।
আশফাক সাহেব তৌকিরের কাঁধে হাত রাখলেন।"মনে রেখো তৌকির," আশফাক সাহেব শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বললেন, "মানুষের মনে যত দিন অজ্ঞতা আর অন্ধ কুসংস্কার থাকবে, তত দিন লোভী মানুষেরা সেই ভয়ের সুযোগ নিয়ে এমন ভূতের জন্ম দিয়ে যাবে। প্রকৃতিতে কোনো ভূত থাকে না; আসল ভূত বাস করে মানুষের কুৎসিত লালসা, লোভ আর অপরাধপ্রবণ মনের গভীরে। আর সেই অন্ধকারকে দূর করার একমাত্র চাবিকাঠি হলো সত্যের সন্ধান আর বিজ্ঞানের নির্ভীক আলো।"
স্পিডবোটটি পদ্মার নীল জলরাশি চিরে তীরের দিকে ছুটে চলল। কাটাখালির চরের বাতাসে তখন আর কোনো অশরীরী লাল ভূতের দীর্ঘশ্বাস নেই; সেখানে বইছিল এক নতুন মুক্ত সকালের নির্মল, তাজা হাওয়া।