Story

জ্যান্ত ভুতের পাঠশালা

October 12, 2026

23 views

শহরের ধুলোবালি আর পরীক্ষার দীর্ঘ ক্লান্তি পেছনে ফেলে অনেক দিন বাদে ফরিদপুরের নিঝুম পল্লীগ্রামে দাদাবাড়ি এলো জাবির। উঠোনে পা রাখা মাত্রই দাদি আবেগে জড়িয়ে ধরলেন তার নাতিকে। জাবির শুধু মেধাবী ছাত্রই নয়, বিজ্ঞানের যুক্তি আর সাহসে যেকোনো রহস্যের জট খুলতে তার জুড়ি নেই। কিন্তু দাদির কাছে সে শুধুই আদরের ছোট্ট নাতিন। খাঁটি দুধের ক্ষীর, ভাপা পিঠা আর নারিকেলের নাড়ু দিয়ে দাদি যেন এক নিমেষেই শহরের সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিলেন।

বিকেলের দিকে দাদি জাবিরের হাত ধরে বললেন, "দাদুভাই, আমার বাপের বাড়ির ভিটা তো এই নদীর ওপারে রূপদাহ গ্রামে। কত বছর যাই না! তোর ছোটনানা অনেক করে খবর পাঠিয়েছে। চল, তোকে নিয়ে দু'দিনের জন্য আমার বাপের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি।" জাবির এক কথায় রাজি। পরদিন ভোরে নৌকায় নদী পার হয়ে তারা গিয়ে পৌঁছাল রূপদাহ গ্রামে। তবে রূপদাহে পা দিয়েই জাবির লক্ষ করল এক অদ্ভুত থমথমে পরিবেশ। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই গ্রামের মেঠোপথগুলো যেন জনমানবহীন হয়ে পড়ছে। মানুষের চোখেমুখে এক অজানা ত্রাস।

বড় নানার পুরোনো আমলের চুনসুরকির বিশাল বাড়ির বারান্দায় বসতেই ছোটনানা আক্ষেপ করে বললেন, "বুবু, তোমরা এই সময়ে না এলেই পারতে। আমাদের গ্রামে যে ঘোর বিপদ নেমে এসেছে! গ্রামের পেছনের ভাঙা পাঠশালাটায় এখন সন্ধ্যার পর জ্যান্ত ভূতের আড্ডা বসে!"

দাদি চমকে উঠলেন, "বলিস কী রে ছোটন! পাঠশালায় ভূত?"

"হ্যাঁ বুবু," ছোটনানা নিচু গলায় বলতে লাগলেন। "বছর পাঁচেক আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই মাটির দেওয়াল আর টিনের চালার পাঠশালাটায় গভীর রাতে আলো জ্বলে। ভেতর থেকে ক্যাটক্যাটে গলায় ধারাপাত পড়ার আওয়াজ আসে—'এক্কে এক, দুইয়ে দুই, মানুষের রক্ত চুষে তুই!' যারা ভুল করে ওই পথ দিয়ে গেছে, তারাই নীলচে ধোঁয়া আর অশরীরী ছায়া দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। পরদিন দেখা গেছে তাদের রক্তচাপ কমে শরীর নীল হয়ে গেছে। কেউ ওমুখো হয় না এখন!" জাবির চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কান খাড়া করে শুনছিল। ভূতের মুখে ধারাপাত পড়া আর মানুষের শরীর নীল হয়ে যাওয়া? তার অনুসন্ধিৎসু বৈজ্ঞানিক মস্তিষ্ক মুহূর্তেই সতর্ক হয়ে উঠল।

রাত তখন গভীর। রূপদাহ গ্রামের নিস্তব্ধতা চিরে মাঝেমধ্যে কেবল দূরবর্তী শিয়ালের ডাক আর বাঁশঝাড়ের পাতার শনশন শব্দ ভেসে আসছিল। দাদি পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন, কিন্তু জাবিরের চোখে ঘুম নেই। তার পরনে রাতের গাঢ় পোশাক, কোমরে গোঁজা ট্যাকটিক্যাল মাল্টি-টুল আর জ্যাকেটের গোপন পকেটে শক্তিশালী আল্ট্রা-লুমেন ফ্ল্যাশলাইট ও মিনি আরএফ (RF) ফ্রিকোয়েন্সি স্ক্যানার। হঠাৎ করেই বাতাসে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এলো। জানালার ফাঁক গলে নোনা কুয়াশার সাথে ভেসে এলো ঝাঁঝালো এক গন্ধ—ঠিক যেন পোড়া অ্যামোনিয়া আর ফসফরাসের কটূ বাষ্প।আর তার পরপরই দূর থেকে ভেসে এলো সেই আওয়াজ:

খটাস... খটাস... খটাং!

যেন কাঠের বেঞ্চিতে রুল দিয়ে সজোরে আঘাত করা হচ্ছে। তারপরই ক্যাটক্যাটে, গমগমে সমবেত গলায় শিশুদের মতো বিকট এক সুর ভেসে এলো বাতাসে:

"একে একে দুই, দুইয়ে দুইয়ে চার—

এই পাঠশালায় ঢুকলে পরে খুলবে মাথার ঘিলু আর হাড়!

জাবির বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। শব্দের গতিপ্রকৃতি ও সুরের ওঠানামা শুনে সে বুঝতে পারল, এটা কোনো প্রাকৃতিক প্রতিধ্বনি নয়। সুরটি নিখুঁত এক ইলেকট্রনিক লুপের মতো প্রতি তিন মিনিট অন্তর একই ছন্দে ফিরে আসছে। দাদির ঘুম না ভাঙিয়ে জাবির নিঃশব্দে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। শিশিরভেজা ঘাস আর ঘন কলাবাগানের আড়াল দিয়ে পা টিপে টিপে সে এগোতে লাগল সেই পোড়ো পাঠশালার দিকে।

পাঠশালাটি গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে, এক বিশাল বটগাছের তলে পরিত্যক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে। মাটির দেওয়ালের অনেকখানি ধসে গেছে, মরিচা ধরা টিনের চালার ওপরে লতাপাতার জঙ্গল।পাঠশালার জানালার ভাঙা ফাঁক দিয়ে এক অপার্থিব, বরফশীতল নিওন-সবুজ আলো ঠিকরে বের হচ্ছিল।

জাবির মাটির দেওয়ালের ছায়ায় শরীর মিশিয়ে জানালার ফাটল দিয়ে ভেতরে চোখ রাখল। ভেতরের দৃশ্যটি যেকোনো সাধারণ মানুষের রক্ত হিম করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট! ঘরের মেঝের ওপর সারিবদ্ধভাবে রাখা কাঠের ভাঙা বেঞ্চিতে বসে আছে চার-পাঁচটি ছায়ামূর্তি। তাদের পরনে ছেঁড়া সাদা কাফনের মতো কাপড়, মুখগুলো অস্বাভাবিক লম্বা এবং কোটর থেকে জ্বলছে রক্তবর্ণ লাল চোখ! আর ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘদেহী শুভ্র অবয়ব—তার পায়ের পাতা উল্টো দিকে ঘোরানো, হাতে একটি লম্বা চকচকে লাঠি। সে লাঠি দিয়ে বোর্ডে আঘাত করছে আর মুখ দিয়ে উগড়ে দিচ্ছে নীলচে ধোঁয়া! সেই ধোঁয়া ঘরের ভেতরে কুণ্ডলী পাকিয়ে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ তৈরি করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যেখানে ভয়ে মূর্ছা যেত, জাবির সেখানে খুঁজতে লাগল বৈজ্ঞানিক অসঙ্গতি।

সে তার পকেট থেকে আরএফ স্ক্যানারটি অন করতেই স্ক্রিনে স্পষ্ট ধরা পড়ল একটি স্থানীয় ওয়াই-ফাই মেশ নেটওয়ার্ক এবং আল্ট্রাসনিক সাউন্ড বিমের শক্তিশালী সিগন্যাল। জাবিরের তীক্ষ্ণ চোখ এবার লক্ষ করল—বোর্ডের সামনে দাঁড়ানো সেই 'মাস্টার ভূতের' মাথার ঠিক ওপর দিয়ে চালার টিনের সাথে যুক্ত রয়েছে একটি অতি-সূক্ষ্ম স্টিলের ক্যাবল, যার ওপর ভর করে শরীরটা শূন্যে ভাসছে! আর বেঞ্চিতে বসে থাকা মূর্তিগুলো কোনো জীবন্ত প্রেতাত্মা নয়; ওগুলো অত্যন্ত নিপুণভাবে তৈরি হালকা ফাইবারগ্লাসের স্বয়ংক্রিয় পুতুল বা রোবোটিক অ্যানিমেট্রনিক্স! তাদের লাল চোখগুলো ছিল ক্ষুদ্র এলইডি লাইট, যা রিমোট কন্ট্রোলে জ্বলছিল ও নিভছিল।

আর সেই নীলচে বিষাক্ত ধোঁয়া? জাবির মেঝের এক কোণে দেখতে পেল একটি লুকানো মিনি স্মোক-জেনারেটর, যা থেকে ফসফরাস ও ক্লোরোপিকরিনের নিয়ন্ত্রিত বাষ্প ছাড়া হচ্ছে। এই রাসায়নিক বাষ্প সামান্য শ্বাসে ঢুকলেই মানুষের চোখে দৃষ্টিভ্রম ঘটে এবং স্নায়ুতন্ত্র অবশ হয়ে শরীর নীলচে দেখায়। "ভূতের পাঠশালা সাজিয়ে গ্রামের মানুষকে গ্রামছাড়া করার এই আয়োজন কার?" জাবির মনে মনে ভাবল।

ঠিক তখনই পাঠশালার পেছনের মেঝের একটি গোপন কাঠের পাটাতন খুলে গেল। নিচ থেকে উঠে এলো কালো হুডি পরা দুজন শক্তপোক্ত মানুষ। তাদের একজনের হাতে আধুনিক মেটাল ডিটেক্টর আর অন্যজনের হাতে ভারী একটি প্লাস্টিকের ড্রিলিং মেশিন।

"উস্তাদ! মাটির তলার কম্পাস সিগন্যাল স্ট্রং হচ্ছে!" একজন নিচু গলায় বলল। "এই পাঠশালার মাটির ঠিক দশ ফুট নিচেই সেই ব্রিটিশ আমলের নীলকর সাহেবদের লুকানো রূপার সিন্দুক আর প্রাচীন অষ্টধাতুর সিলমোহর আছে। ভূত দেখে গ্রামের কেউ এই সীমানায় ঘেঁষার সাহস পায় না। আর দুই রাত ড্রিল করলেই পুরো মাল তুলে নিয়ে আমরা বর্ডার পার হয়ে যাব!"

"সাবাশ," দ্বিতীয়জন হেসে উঠল। "ধারাপাতের অডিওর ভলিউম বাড়িয়ে দে। গ্রামের মূর্খগুলো ভাবুক প্রেতাত্মারা নামতা শিখছে!"

সব রহস্য এবার জাবিরের কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গেল। প্রত্নতাত্ত্বিক চোরাচালানকারী চক্র এই প্রাচীন মাটির নিচে লুকানো সম্পদ লুট করতে ভূতের পাঠশালার এই নিখুঁত সাইবার ও রাসায়নিক ফাঁদ পেতেছে। জাবির আর সময় নষ্ট করল না। সে পিছু হটে নিরাপদ দূরত্বে এসে তার মোবাইল ফোনে জরুরি কল দিল নিকটস্থ পুলিশ ফাঁড়ির ওসির কাছে। জাবির তার পরিচিতি ও রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের রেফারেন্স দিয়ে সংক্ষেপে পরিস্থিতি ও সুনির্দিষ্ট জিপিএস লোকেশন বুঝিয়ে দিল। পুলিশ ফোর্স রওনা হতে বিশ মিনিট সময় চাইল।

কিন্তু সেই বিশ মিনিট হাত গুটিয়ে বসে থাকার পাত্র জাবির নয়। সে জানত, ড্রিলিং প্রায় শেষ পর্যায়ে; এখনই ওদের মনোযোগ নষ্ট না করলে ওরা মালামাল নিয়ে সুড়ঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। জাবির তার ব্যাকপ্যাক থেকে বের করল তার শক্তিশালী আল্ট্রা-লুমেন ট্যাকটিক্যাল ফ্ল্যাশলাইট আর স্কাউট মেটাল হুইসল।

সে পাঠশালার ঠিক প্রধান দরজার মুখে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর মেটাল হুইসলে ফুঁ দিল এক কান ফাটানো কম্পাঙ্কে—টিইইইইট! একই সাথে সে ফ্ল্যাশলাইটের ডিফেন্সিভ 'স্ট্রোব মোড' অন করে সরাসরি ছুড়ে দিল ঘরের ভেতর। প্রতি সেকেন্ডে বিশটি অতি-উজ্জ্বল সাদা আলোর ঝলকানি মুহূর্তের মধ্যে পাঠশালার ভুতুড়ে সবুজ আলোকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল।

"কে ওখানে?" ভেতরে থাকা দুই পাচারকারী আকস্মিক এই তীব্র আলোয় অন্ধের মতো চিৎকার করে উঠল।জাবির ভেতরে ঢুকেই তার হাতের মাল্টি-টুলের করাত ব্লেড দিয়ে সেই স্মোক-জেনারেটরের মূল পাওয়ার ক্যাবল এবং সাউন্ড সিস্টেমের তার এক ঝটকায় কেটে দিল। মুহূর্তের মধ্যে সেই বিকট ভুতুড়ে ধারাপাত আর নীলচে ধোঁয়া বন্ধ হয়ে গেল। থেমে গেল অ্যানিমেট্রনিক পুতুলগুলোর নড়াচড়া।

একজন পাচারকারী ধাতব রড তুলে জাবিরের দিকে তেড়ে এলো, "পুঁচকে টিকটিকি! তোর এত বড় সাহস!" কিন্তু জাবির পিছলে সরে গিয়ে মেঝের ড্রিলিং মেশিনের মোটা তার টেনে লোকটির পায়ে জড়িয়ে দিল। ভারসাম্য হারিয়ে লোকটি সশব্দে মেঝের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ল। দ্বিতীয়জন পিস্তল বের করতে গেল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে পাঠশালার চারপাশ ঘিরে ফেলল পুলিশের দল।

দাঁড়াঁড়াঁড়াঁ!

"হ্যান্ডস আপ! পুলিশ! কেউ নড়বেন না!"

ফাঁড়ির ইনস্পেক্টরের নেতৃত্বে পুলিশের চৌকস দল ঘরে ঢুকে মুহূর্তের মধ্যে দুই পাচারকারীকে হাতকড়া পরিয়ে ফেলল।

সকালের সোনাঝরা রোদ যখন রূপদাহ গ্রামের বাঁশঝাড় ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ল, তখন পাঠশালার প্রাঙ্গণে শয়ে শয়ে গ্রামবাসী ভিড় জমিয়েছে। পুলিশের গাড়ি থেকে নামিয়ে আনা হলো ভূতের পাঠশালার সেই অ্যানিমেট্রনিক পুতুল, স্মোক মেশিন, স্পিকার আর মাটির তলা থেকে সদ্য উদ্ধার হওয়া ব্রিটিশ আমলের শতবর্ষী রূপার মুদ্রাভর্তি প্রাচীন তামার সিন্দুক।

দাদি আর ছোটনানা ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। দাদি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাঁর নাতির দিকে তাকালেন। যে ভূত নিয়ে পুরো গ্রাম আতঙ্কে কাঁপছিল, এক রাতের মধ্যে সেই ভয়ের কঙ্কাল ভেঙে বের করে আনা হয়েছে জ্যান্ত চোরদের!

ছোটনানা জাবিরের মাথায় হাত রেখে গদগদ গলায় বললেন, "দাদুভাই, তুমি তো সাক্ষাৎ বাঘের বাচ্চা! গ্রামের মানুষ ভেবেছিল এটা অপদেবতার অভিশাপ, আর তুমি প্রমাণ করে দিলে এটা ছিল মানুষেরই শয়তানি!"

জাবির হেসে দাদির হাত ধরে বলল, "দাদু, ভূত বলে কিছু নেই। যেখানেই ভয় আর কুসংস্কার থাকে, সেখানেই খারাপ মানুষরা বিজ্ঞানের অপব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে। আলো ফেললেই অন্ধকারের ভূত পালিয়ে যায়।" দাদি পরম স্নেহে জাবিরের কপালে চুমু খেলেন। রূপদাহ গ্রামের সেই প্রাচীন পাঠশালায় তখন প্রভাতী সূর্যের আলোয় পাখিরা কিচিরমিচির করে গান গাইছিল, আর গ্রামের মানুষের চোখেমুখে দীর্ঘদিন বাদে ফিরে এসেছিল একরাশ শান্তির হাসি।

 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+35 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login