লালচে মাটির সোঁদা গন্ধ কালামের নাকে লেগে ছিল বহু বছর আগে। সেই গন্ধ এখন আর তার স্মৃতির কোটরে ভাসে না; এখন তার নাকে কেবলই ভাসে ধোঁয়াটে জীবনের শূন্যতা আর পথের ধুলো। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সের কালামের শরীরের চামড়ায় বয়সের আগেই ভাঁজ পড়েছে। অযত্নে বাড়া তামাটে দাঁড়ি, রুক্ষ চুল আর রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে যাওয়া চামড়া নিয়ে সে এক ছন্নছাড়া মানুষ। দুনিয়ায় আপন বলতে তার কেউ নেই। বাপ মরেছিল সেই কবে, কালামের বয়স যখন মোটে সাত কি আট। মা কোনোমতে মানুষের বাড়ি ধান ভেনে, চাল কুটে তাকে গাঁয়ের এক হাফিজি মাদ্রাসায় দিয়েছিল। আশা ছিল ছেলে বড় আলেম হবে, গরিবের ঘরের দুঃখ ঘুচবে। কিন্তু কোরআনের গোটা দশেক পারা মুখস্থ হতেই মা-ও একদিন কলেরায় ভুগে চোখ বুজল। এতিম কালামের আর পড়ালেখা হলো না। পেটের দায়ে মাদ্রাসা ছেড়ে পালাল সে। তারপর কত ঘাট, কত স্টেশন, কত মানুষের লাথি-ঝাঁটা খেয়ে যে তার যৌবন পার হয়েছে, তার কোনো লেখাজোখা নেই।
কখনও বাসের হেলপার, কখনও মাজারের খাদেমের পিছে পিছে গাঁজার কল্কিতে ফুঁ দেওয়া, আবার কখনও স্রেফ ভিক্ষে করে দিন গুজরান। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ভবঘুরে জীবনেও এক চরম বিতৃষ্ণা এসে ধরেছিল তাকে। বয়সের ভারে শরীর আর আগের মতো খাটতে পারে না। উদোম পায়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে পেট চালানো এখন যেন এক দুর্বিষহ বোঝা।
ঘুরতে ঘুরতে কালাম একদিন এসে পৌঁছাল পদ্মাপাড়ের জেলা ফরিদপুরে। ফরিদপুরের মাটিতে পা রাখার পর থেকেই কালামের চতুর চোখে এক অদ্ভুত দৃশ্য ধরা পড়তে লাগল। এই অঞ্চলের নদীমাতৃক শ্যামল প্রকৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন এক অদ্ভুত বিশ্বাস খেলা করে। এখানে মেঠোপথের বাঁকে বাঁকে কোনো না কোনো পীরের মাজার, লাল কাপড়ে মোড়ানো খুঁটি, আর দরগায় মানুষের উপচে পড়া ভিড়। মানুষ বড় বেশি ভক্তিপ্রবণ, অন্ধ ভক্তিতে তারা জমিজমা, গরু-বাছুর পর্যন্ত পীরের চরণে সঁপে দেয় নিঃসংকোচে।
কালাম একদিন কানাইপুরের এক মাজারের গাছের তলায় বসে মানুষের এই ব্যাকুল ভক্তি দেখছিল। এক ধনী গৃহস্থ এসে পীরের পায়ে লুটিয়ে পড়ে কান্নাকাটি করছে, আর পীর কেবল চোখ বুজে হাত বুলিয়ে দিয়ে এক মুঠো বাতাস ফুঁকে দিচ্ছে তার মাথায়। বিনিময়ে গৃহস্থের হাত থেকে মাজারের সিন্দুকে জমা পড়ছে কড়কড়ে টাকার বান্ডিল। কালামের বুকের ভেতর এক তীব্র কামড় দিল। সে মনে মনে হাসল,‘আরে বেকুবের দল! মানুষের ভক্তি তো দেখি সবচেয়ে বড় ব্যবসা! মেহনত নাই, রোদে পোড়া নাই, খালি মুখের বোল আর সাজপোশাক!’
তার শৈশবের মাদ্রাসার স্মৃতির পাতাগুলো হঠাৎ করে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এলো। মুখস্থ করা কিছু আরবি সুর, দোয়া-দরুদ, আর হাদিসের টুকরো টুকরো বয়ান এখনো তার মাথার কোথাও জমা হয়ে আছে। সে সিদ্ধান্ত নিল, ভবঘুরে কালামের এই জীর্ণ জীবনের এখানেই ইতি টানবে সে। এবার সে খেলবে বিশ্বাসের খেলা। মেহেরপুরের এক পরিচিত সুতারের দোকান থেকে ভিক্ষে করে জমানো শেষ কয়টা টাকায় কালাম কিনল ধবধবে সাদা থান কাপড়। এক দর্জিকে দিয়ে বানিয়ে নিল পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঝুলওয়ালা এক ঢিলেঢালা আলখেল্লা। মাথা মুড়িয়ে রেখে দিল কানের পাশ দিয়ে ঝুলে থাকা সাদাটে চুলের বাবরি। চোখের নিচে সুরমা লাগানোর কায়দা সে বহু মাজারে দেখেছে। দাঁড়িগুলোকে বেশ তেল দিয়ে আঁচড়ে এক প্রবীণ, নূরানী রূপ দেওয়ার চেষ্টা করল। মুখের ভাষা থেকে মেহেরপুরের আঞ্চলিক টান ঝেড়ে ফেলে সে রপ্ত করল কিছুটা শান্ত, ভারী আর কেতাবি উচ্চারণ।
এখন শুধু চাই এক মোক্ষম জায়গা,যেখানে মানুষের সরলতার মাটিতে তার এই বিষবৃক্ষের শিকড় সহজে ঢুকে যেতে পারে।
ফরিদপুর জেলা শহর থেকে অনেকখানি পথ পেরিয়ে, কুমার নদের শাখা পেরিয়ে কালাম এসে ঢুকল সালথা থানার প্রত্যন্ত অঞ্চল সিংহপ্রতাপ গ্রামে। সিংহপ্রতাপ যেন পৃথিবীর এক বিচ্ছিন্ন কোণা। চারিদিকে দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ, পাট আর ধানের গন্ধমাখা মেঠোপথ, আর সহজ-সরল খেটে খাওয়া মানুষ। আধুনিকতার ছোঁয়া এখানে তেমন লাগেনি। এক হেমন্তের রক্তিম সন্ধ্যায় কালাম সিংহপ্রতাপ গ্রামের উত্তর পাড়ার বিশাল প্রাচীন বটগাছটার নিচে এসে দাঁড়াল। বটগাছটি বহু কালের পুরোনো। তার ঝুরিগুলো মাটি ছুঁয়ে যেন অজস্র থাম তৈরি করেছে। আশপাশে ঘন বাঁশঝাড়, আর দূরে কিছু কাঁচা মাটির বাড়ি। জায়গাটা বেশ সুনসান, কিছুটা গা-ছমছমে।
কালাম আলখেল্লাটা টেনেটুনে ঠিক করল। কোমরের ঝুলি থেকে বের করল এক পুরোনো তসবিহ। বটের এক চওড়া শিকড়ের ওপর মেরুদণ্ড সোজা করে বসল সে। পা দুটো জড়িয়ে নিয়ে পদ্মাসনের মতো ভঙ্গি করল, আর মাথাটা সামান্য হেলিয়ে চোখ দুটো বুজে ফেলল এমনভাবে,যেন এই মায়াবী ধরাধামের কোনো কোলাহল তার কানে পৌঁছায় না। ভেতরে ভেতরে সে জপতে লাগল মেহেরপুরের পুরোনো স্মৃতি আর খাবারের চিন্তা, কিন্তু মুখের ঠোঁট দুটো দ্রুত নড়তে লাগল সুরা ফাতেহার সুরের ছন্দে।
পরদিন ভোরে যখন কুয়াশার চাদর ফুঁড়ে প্রথম সূর্যের আলো বটপাতার ফাঁক দিয়ে ঠিকরে পড়ল, গ্রামের চাষিরা লাঙল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে মাঠে নামল। প্রথমেই চোখে পড়ল জব্বার মাতব্বরের।
জব্বার মাতব্বর মাঠের দিকে যেতে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। বটের তলায় কুয়াশার চাদরে ঢাকা এ কে? এক প্রকাণ্ড নূরানী চেহারা! ধবধবে সাদা আলখেল্লা পরা, বুকের ওপর লম্বা সাদাটে দাঁড়ি এলিয়ে আছে, আর চোখ বন্ধ করে একধ্যানে তসবিহ ঘুরিয়ে চলেছে। মুখ দিয়ে অনর্গল বের হচ্ছে এক অশ্রুতপূর্ব সুর,'আল্লাহু... আল্লাহু... লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ...'
জব্বার মাতব্বর ভক্তি আর ভয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। তার হাত থেকে প্রায় লাঙল খসে পড়ার উপক্রম। সে দৌড়ে গেল পাশের বাড়ির সোলেমান আর মোবারকের কাছে।
"ও মোবারক! ও সোলেমান! দেইখা যা রে ভাই! আমাগো সিংহপ্রতাপের বটের তলে আসমান থেইকা ফেরেস্তা নাইমা আইছে রে!"
মুহূর্তের মধ্যে খবর রটে গেল পুরো গ্রামে। সকাল আটটা বাজতে না বাজতে বটগাছের চারপাশ লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠল। গ্রামের নারী, পুরুষ, আবালবৃদ্ধবণিতা দূর থেকে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল সেই ধ্যানমগ্ন 'বুজুর্গ' মানুষটিকে। কেউ সাহস পাচ্ছে না কাছে গিয়ে ডাকার। কালাম কিন্তু ভেতর ভেতর সব শুনছিল। মানুষের পায়ের আওয়াজ, ফিসফিসানি আর তাদের আতঙ্কের সাথে মেশা ভক্তি তার অন্তরে এক পৈশাচিক আনন্দের জোয়ার বইয়ে দিচ্ছিল।
বেলা যখন দুপুর ছুঁইছুঁই, কালাম খুব ধীরে ধীরে, যেন অনন্তকাল পর মর্ত্যের পৃথিবীতে চোখ মেলছে,এমন ভঙ্গিতে চোখের পাতা সামান্য ফাঁক করল। তারপর এক সুগভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকাল।
গ্রামের জব্বার মাতব্বর আর কাসেম মৌলভী ভয়ে ভয়ে এগিয়ে এলো। জব্বার কাঁচুমাচু হয়ে বলল, "হুজুর... ও বাবা হুজুর! আপনে কে বাবা? কোত্থেকে আইলেন আমাগো এই গরিবের গাঁয়ে?"
কালাম গম্ভীর, গম্ভীর এক গভীর খাদে নামা গলায় বলল, "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা... বান্দা আমি আল্লাহর। দুনিয়ার কোনো দেশ নাই আমার। মদিনার রওজার হাওয়া খাইতে খাইতে রুহ আমার ভাইসা বেড়ায়। কাল সন্ধ্যায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় দেখলাম,এই সিংহপ্রতাপের মাটিতে আল্লাহর বড় রহমত নাজিল হইব। তাই আসমানি ইশারায় এই বটের তলে কদম রাখলাম।"
কালামের কণ্ঠের সেই ভারী কেতাবি সুর আর ভাবলেশহীন চাউনি এক লহমায় গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোর কলিজা নাড়িয়ে দিল।
"আল্লাহু আকবার!" ভিড়ের ভেতর থেকে কেউ একজন সমস্বরে চিৎকার করে উঠল।
মুহূর্তের মধ্যে গ্রামের মানুষের মাঝে বিশ্বাস জন্মাল,এ কোনো সাধারণ মানুষ নয়, এ সাক্ষাৎ আল্লাহর ওলি!
সেই দুপুরেই কালামের জন্য খাবার এলো সাত বাড়ি থেকে। গরম পোলাও, খাসির মাংসের ঝোল, খাঁটি গোরুর দুধ আর গুড়ের পায়েস। যে কালাম গত চল্লিশ বছর শুকনো রুটি আর পচা ভাতের জন্য মার খেয়েছে, সে আজ রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে সেই খাবারের সুবাস নিল। অল্প একটু মুখে দিয়ে বাকিটা 'তবারক' হিসেবে বিলিয়ে দিল উপস্থিত জনতার মাঝে। মানুষ সেই এঁটো প্রসাদ পাওয়ার জন্য কাড়াকাড়ি শুরু করে দিল। কালাম মনে মনে হাসল,সিংহপ্রতাপের মাটি বড়ই উর্বর। এখানে ভন্ডামির বীজ একবার বুনলে সোনার ফসল ফলতে দেরি হয় না।
সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই বটগাছের পাশে গ্রামের মানুষ চাঁদা তুলে এক চমৎকার ছনের ছাউনি দেওয়া মাটির বড় ঘর তুলে দিল। বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেওয়া হলো চারিদিক। ঘরের মেঝেতে বিছিয়ে দেওয়া হলো লাল শালুর চাদর। ঘরের এক কোণে দিনরাত জ্বলতে লাগল আগরবাতি আর লোবান। ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন সেই কুঠুরিতে কালামকে দেখতে মনে হতো যেন কোনো অলৌকিক জগতের বাসিন্দা।
কালাম এবার পুরোদস্তুর 'কালাম শাহ পীর' বা 'বটতলার বাবা' হিসেবে খ্যাতি পেয়ে গেল। পীর হলে কিছু চ্যালাচামুণ্ডার দরকার হয়, যারা সমাজে ভয় আর ভক্তির বিজ্ঞাপন বিলি করবে। সিংহপ্রতাপ গ্রামের দুই অলস, বদমাশ যুবক,রহমত আর কদু মিয়া, দ্রুতই পীরের প্রধান খাদেম বনে গেল। রহমত ছিল গাঁয়ের ধূর্ত ফন্দিবাজ, আর কালীর কাজ ছিল লাঠিসোঁটা চালানো। কালাম তাদের চিনে নিতে ভুল করেনি। তবারকের সেরা অংশ আর ভক্তদের দেওয়া নজরানার টাকার একটা গোপন ভাগ সে রহমত আর কদুকে দিতে শুরু করল। বিনিময়ে তারা পুরো অঞ্চলে কালামের অলৌকিক ক্ষমতার মিথ্যা গল্প ফাঁদতে লাগল।
রহমত হাটে গিয়ে গলা ফাটিয়ে বলত, "আরে ভাই, আমাগো পীর বাবার কেরামতি চোখে না দেখলে বিশ্বাস করবেন না! কাল রাতে দেখলাম বাবা জায়নামাজে বইসা মাটির দুই হাত ওপরে ভাইসা রইছেন! আর তাঁর শরীর দিয়া এমন খুশবু বাইর হয়, যা এই দুনিয়ার কোনো আতরে নাই!"
কদু যোগ করত, "বাবার মুখের ফুঁয়ে কত পাগল ভালো হইয়া গেল! যার পোলা হয় না, বাবার এক ফুঁয়ে তার কোল জোড়া মানিক আইব!"
কালাম প্রতিদিন আসরের পর মাটির ঘরের বারান্দায় বসে ভক্তদের উদ্দেশে বয়ান করত। তার পরনে থাকত সেই সফেদ আলখেল্লা, গলায় বড় বড় কাঠের তসবিহ। সে চোখ বুজে হাত নেড়ে নেড়ে বলত:
"ওহে মায়াধর্মী মানুষেরা! এই দুনিয়া তো দুই দিনের মুসাফিরখানা। কিচ্ছু সাথে যাইব না। ধন-দৌলত, জমি-জিরাত সব পইড়া রইব মাটির নিচে। কিন্তু যে জন পীরের খেদমত করব, পীরের চরণে নিজের জান-মাল সঁপে দিব,রোজ হাশরের ময়দানে তার কোনো ডর নাই। বেহেশতের আটটা দরজায় তার জন্য অপেক্ষা করতাছে হুর আর গিলমান। আর জান্নাতে ঢুকতেই নাকের ভেতর আইসা লাগব মেশক আম্বরের সুবাস! এমন সুবাস, যা দুনিয়ার কোনো আতরদানিতে নাই! পীরের খেদমত করলেই সেই মেশক আম্বরের ঘ্রাণ পাইবা, কলিজা জুড়াইয়া যাইব!"
'মেশক আম্বর',এই শব্দটা কালাম এমন এক মায়াবী সুরে উচ্চারণ করত যে গ্রামের খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষগুলোর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ত। তারা দিনরাত রোদে পুড়ে মাঠে খাটে, ঘামের নোনা গন্ধে যাদের জীবন অভ্যস্ত, তাদের কাছে জান্নাতের সেই কাল্পনিক সুবাস এক পরম পাওয়া মনে হতো। মানুষ রোগমুক্তির আশায়, মামলার রায় জেতার লোভে, কিংবা নিঃসন্তান কোলে সন্তানের কামনায় কালামের ডেরায় লাইন দিতে লাগল। চালের বস্তা, খাঁটি সরিষার তেল, দেশি মুরগি আর খাসি আসতে লাগল স্রোতের মতো। কালাম চতুরতার সাথে কিছু ঝাঁড়ফুঁক দিত, তাবিজে মাটি ভরে দিত, আর মাঝে মাঝে কারও ভাগ্যক্রমে কিছু মিলে গেলে তার নাম আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ত।
ভবঘুরে কালাম এখন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। মানুষ তার দিকে চোখ তুলে তাকাতে ভয় পায়, তার মুখের একটা থুতু নেওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কিন্তু মানুষের ভক্তি আর ধনদৌলত যখন হাতের মুঠোয় এলো, তখন কালামের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা অন্য এক আদিম পশু ধীরে ধীরে চোখ মেলতে শুরু করল।
সিংহপ্রতাপ গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায় কুমার নদের এক ভাঙনের মুখে বাস করত রহিম মিয়া। রহিম মিয়া এক নিতান্তই দরিদ্র, সহজ-সরল বর্গাচাষি। নিজের বলতে ভিটেমাটি ছাড়া আর কিছু নেই। অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে কোনোমতে তার সংসার চলে। ঘরে এক অসুস্থ স্ত্রী, আর এক অষ্টাদশী কন্যা,মরিয়ম। মরিয়ম যেন এই মেঠোপথের ধুলোয় ফোটা এক পদ্মফুল। ডাগর ডাগর কালো চোখ, একঢাল ঘন কালো চুল, আর টানা টানা মায়াবী মুখাবয়ব। শরীরে তার দারিদ্র্যের ছাপ থাকলেও যৌবনের সতেজতা যেন ফেটে পড়ত। গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে যখন সে কলসি কাঁখে ঘাটের দিকে যেত, গ্রামের যুবকদের বুক কেঁপে উঠত। কিন্তু মরিয়ম ছিল বড়ই শান্ত আর লাজুক স্বভাবের।
তার অন্তরে বাস করত গ্রামেরই এক দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই,মনির। মনির ছিল এক সৎ, প্রতিবাদী ও সাহসী যুবক। সে নিজে কৃষিকাজ করত, কিন্তু গ্রামে কোনো অন্যায় দেখলে মাথা নত করত না। মনিরের সাথে মরিয়মের ভালোবাসার কথা গ্রামের বাতাসে গোপনে ভাসত। মনির রহিম মিয়াকে কথা দিয়েছিল, আগামী বৈশাখে ধানের ভালো দাম পেলেই সে কাজি ডেকে মরিয়মকে নিজের ঘরে তুলে নেবে। রহিম মিয়াও মনিরকে ভালোবাসত, কারণ এমন সৎ ছেলে এই তল্লাটে মেলা ভার।
কিন্তু নিয়তির চাকা ঘুরল এক অমাবস্যার মতো দিনে। রহিম মিয়ার স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে বিছানায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে ছিল। কবিরাজি ওষুধে কোনো কাজ হচ্ছিল না। গ্রামের মানুষের বুদ্ধিতে একদিন বাধ্য হয়ে রহিম মিয়া তার মেয়ে মরিয়মকে সাথে নিয়ে হাজির হলো কালাম পীরের ডেরায়। সেদিন বিকেলে আসরের নামাজের পর ভিড় একটু কম ছিল। রহিম মিয়া পীরের দরবারে এসে মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে কাঁদতে লাগল, "বাবা হুজুর! আমার মাগীটারে একটু ভালো কইরা দ্যান বাবা! কত ডাক্তার-বদ্যি দেখাইলাম, কেউ পারল না। আপনের এক ফুঁয়ে নাকি মরা মানুষ জ্যান্ত হয়!"
কালাম তখন চোখ বুজে তসবিহ ঘুরানোর ভান করছিল। কিন্তু চোখ সামান্য ফাঁক করতেই তার দৃষ্টি গিয়ে থমকে দাঁড়াল রহিম মিয়ার পেছনে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মরিয়মের ওপর। মুহূর্তের মধ্যে কালামের বুকের ভেতর এক অচেনা রক্তক্ষরণ হলো। সাদা সুতির শাড়িতে ঘোমটা দেওয়া সেই মেয়েটির ডাগর চোখের নিষ্পাপ চাহনি আর মায়াবী রূপ দেখে কালামের সমস্ত ধ্যান, কপট ভক্তি আর নূরানী খোলস এক সেকেন্ডে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। পঁয়তাল্লিশ বছরের তৃষ্ণার্ত, লালসাময় মনটা যেন এক হিংস্র হায়েনার মতো জেগে উঠল।
কালাম খুব সাবধানে নিজের মুখের ভাব পরিবর্তন করল। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখ চকচক করে উঠলেও সে অত্যন্ত সংযত গলায় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "আস্তাগফিরুল্লাহ... আস্তাগফিরুল্লাহ..." কালাম ভারী গলায় বলল, "রহিম মিয়া, তোমার ঘরে বড় কঠিন মুসিবত। তোমার স্ত্রীর শরীরে আসমানি জিনের আছর পড়ছে। সাধারণ ফু-ফাকারে এই জিন যাইব না।" রহিম মিয়া আঁতকে উঠে পীরের পা চেপে ধরল, "বাবা! রক্ষা করেন বাবা! আমার সংসার ভাইসা গেল!"
কালাম তার লালসার দৃষ্টি মরিয়মের মুখ থেকে না সরিয়েই গম্ভীর সুরে বলল, "উপায় আছে। তবে তার জন্য অনেক বড় কুরবানি দেওয়া লাগব। রহমত, এদের তবারক দিয়া বিদায় দে। রহিম মিয়া, কাইল সন্ধ্যায় তুমি একলা আইসো। তোমার তকদির নিয়া আমি ধ্যানে বসব।"
মরিয়ম বাবার হাত ধরে যখন দরবার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, তার কেমন যেন গা শিউরে উঠল। পীরের সেই রক্তাভ চোখ দুটোর চাহনি তার কাছে কোনো দরবেশের মনে হয়নি; মনে হয়েছিল ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোনো শিকারি শেয়ালের চোখ।
সেদিন রাতেই কালাম তার খাস কামরায় ডাকল রহমত আর কদুকে। দরজার খিল তুলে দিয়ে কালাম তার আলখেল্লার পকেট থেকে বেশ কিছু কড়কড়ে টাকার নোট বের করে রহমতের হাতে দিল।
"রহমত, কাজ একটা করতে হইব।" কালামের গলার আওয়াজ এবার আর সেই বুজুর্গ পীরের মতো ভারী নয়; মেহেরপুরের সেই ধূর্ত, লম্পট ভবঘুরের আদিম কর্কশ কণ্ঠ বেরিয়ে এলো।
রহমত টাকার দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করল, "আদেশ করেন বাবা! আপনার লাইগা জান দিয়া দিমু।"
"আজ আসরে রহিম চাষির সাথে যে মাইয়াটা আসছিল... দেখছস তারে?" কালাম একদৃষ্টে মাটির প্রদীপের শিখার দিকে তাকিয়ে রইল। রহমত আর কালী একে অপরের দিকে তাকিয়ে এক পৈশাচিক হাসি দিল। তারা তো পীরের মনের তল আগেই বুঝেছে।
কালী দাঁত কেলিয়ে বলল, "হ বাবা! রহিম্যার মাইয়া মরিয়ম। খাসা চিজ! গাঁয়ের সব ছোকরা ওর পিছে ঘুরে।"
কালাম টেবিলের ওপর একটা থাবা বসিয়ে হিসহিসিয়ে উঠল, "ওই মাইয়া আমার চাই। যেকোনো মূল্যে। আমার এই ডেরায় তার কদম পড়তে হইব আমার বিবি হইয়া। যদি তারে পাই, তোদের দুজনের নামে সালথার বাজারের দুইটা পাকা দোকান লেইখা দিমু। কিন্তু যদি কোনো গোলমাল হয়, তোদের দুইটারেও কিন্তু এই গাঁ থেইকা খেদাইয়া দিমু!"
রহমত হাত কচলাতে কচলাতে বলল, "বাবা, আপনে কোনো চিন্তা কইরেন না। রহিম্যা তো একটা ভিখারি চাষা। তারে বাগে আনা কোনো ব্যাপারই না। কিন্তু একটা ঝামেলা আছে।"
"কীসের ঝামেলা?" কালাম ভ্রু কুঁচকাল।
"গ্রামের এক ছোকরা আছে,মনির। রহিম্যার দূর সম্পর্কের ভাইপো। শুনছি মরিয়মের লগে মনিরের তলে তলে খাতির। মনির আবার এই পীর-ফকিরি একদম মানে না। ও যদি জানতে পারে, গ্যাঞ্জাম লাগাইব।"
কালামের চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বের হলো। "মনির? একটা পুঁচকে চাষার পোলা আমার সামনে দাঁড়াইব? কালী, মনিরের ওপর নজর রাখবি। দরকার হইলে তারে এমন ফাঁদে ফেলবি যেন গাঁয়ের মানুষ তারে গ্রামছাড়া করে। আর রহিম মিয়াকে কাল সন্ধ্যায় এমন দাওয়াই দিবি, যাতে সে নিজের পায়ে কুড়াল মারতে এক পায়ে খাড়া হয়!"
পরদিন সন্ধ্যায় রহিম মিয়া কালামের ডেরায় এলো। কালাম তখন লাল শালুর বিছানায় বসে একমনে তসবিহ জপছে। ঘরে ধূপের কড়া ধোঁয়া। রহিম মিয়া ভয়ে ভয়ে এসে কদমবুসি করল। কালাম চোখ মেলে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "রহিম মিয়া, গত রাতে ধ্যানে আমি সাত আসমান পার হইয়া দেখলাম,তোমার পরিবার বড় এক অভিশাপের মুখে। তোমার স্ত্রীর প্রাণ যায় যায়, আর তোমার মেয়ে মরিয়ম... আহা রে! তার কপালে এক অপমৃত্যুর দাগ লাইগা আছে। অল্প বয়সেই বিধবা হইয়া রক্ত বমি কইরা মরব সে!"
রহিম মিয়া কান্নায় ভেঙে পড়ল, "বাবা! এ কি শুনাইলেন বাবা! আমার মরিয়মরে বাঁচান! আমার বংশ যে নির্বংশ হইয়া যাইব!"
কালাম নরম গলায় বলল, "বাঁচার একটা পথ আল্লাহ দেখাইছেন রহিম মিয়া। কিন্তু সে বড় কঠিন পরীক্ষা। তোমার মতো গরিব মানুষ কি সেই নিয়ামত সহ্য করতে পারব?"
"কী পরীক্ষা বাবা? আপনি যা কইবেন আমি তা-ই করুম! আমার জান লাগলে জান দিয়া দিমু!"
কালাম মুখটা একটু এগিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আল্লাহর তরফ থেইকা আদেশ হইছে,মরিয়মরে যদি কোনো কামেল পীরের চরণে সঁপে দেওয়া যায়, তার নিকাহ যদি কোনো ওলির সাথে হয়, তবেই তার কপালের সেই কালনাগিনী দশা কাইটা যাইব। শুধু তা-ই না, তোমার অসুস্থ স্ত্রী এক নিমেষে সুস্থ হইয়া উঠব। আর তুমি? তুমি হইবা পীরের শ্বশুর! তোমার ঘরে দিনে রাতে রহমত বরকত নাইমা আসব। তুমি পরকালে পাইবা মেশক আম্বরের সুবাস, আর এই দুনিয়ায় পাইবা বাদশাহি ইজ্জত!"
রহিম মিয়া হতভম্ব হয়ে গেল। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না তার মতো এক নিচুজাতের গরিব চাষির মেয়েকে স্বয়ং কালাম শাহ পীর নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে চাইছেন! এটা কি তার সৌভাগ্য, নাকি কোনো অলৌকিক স্বপ্ন? রহিম মিয়া কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, "বাবা... আপনে... আপনে আমার মরিয়মরে শাদি করবেন? কিন্তু বাবা, মরিয়মের মন তো মনিরের দিকে..."
কালামের মুখ এক লহমায় গম্ভীর ও কঠোর হয়ে গেল। সে রক্তচক্ষু মেলে তাকাল। "নাউজুবিল্লাহ! একটা নাফরমান, বেদ্বীন পোলা, যে পীরের শানে বেয়াদবি করে,তার লগে তোমার পবিত্র মেয়ের বিয়ে দিবা? তাইলে জাইনা রাখো রহিম মিয়া, তোমার পুরো খান্দান ধ্বংস হইয়া জাহান্নামের আগুনে পুড়ব! কাইল সকালেই তোমার বউ মইরা ভূত হইব! তুমি কি জাহান্নামের আগুনে পুড়বা, নাকি জান্নাতের মেশক আম্বরের ঘ্রাণ পাইবা,সেই ফয়সালা তোমার!" কালামের সেই রুদ্রমূর্তি আর অভিশাপের ভয়ে রহিম মিয়ার কলিজা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে কাঁপতে কাঁপতে পীরের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে বলল, "মাফ করেন বাবা! বেয়াদবি মাফ করেন! আমি রাজি বাবা! আমার মরিয়ম আপনের পায়ের দাসী হইব!"
রহিম মিয়া যখন ঘরে ফিরে এসে এই প্রস্তাবের কথা জানাল, মরিয়মের মাথায় যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো।
মরিয়ম মাটির মেঝেতে আছড়ে পড়ে কাঁদতে লাগল, "বাবা! এ তুমি কী কইতাছ? ওই পীর তো তোমার বয়সি! ওর চোখ দুইটা ভালো না বাবা, ও ভণ্ড! আমি মনিররে ভালোবাসি, মনির ছাড়া আমি অন্য কাউরে স্বামী ভাবতে পারি না বাবা!"
রহিম মিয়া রেগে গিয়ে মেয়ের গায়ে হাত তুলল, "চুপ কর হারামজাদি! পীর বাবার নামে এমন কুফরি কথা মুখে আনিস না! জবান খইসা যাইব তোর! পীর বাবার লগে তোর শাদি হইলে আমাগো সাত পুরুষের ভাগ্য খুইলা যাইব। তোর মা ভালো হইয়া যাইব। তুই জান্নাতে যাইবি!"
অসুস্থ মা বিছানায় শুয়ে শুয়ে ক্ষীণ গলায় বলল, "ওরে মরিয়মের বাপ... মাইয়াটারে জোর কইরো না... ওর মন যেখানে নাই..."
কিন্তু রহিম মিয়ার কানে তখন কেবলই পীরের দেওয়া মেশক আম্বরের লোভ আর জাহান্নামের ভয় বাজছে। সে কোনো কথা শুনতে চাইল না। সে মরিয়মকে ঘরে তালাবদ্ধ করে রেখে দিল।
পরদিন সকালে খবরটা পৌঁছাল মনিরের কানে। মনির মাঠের কাজ ফেলে ঝড়ের বেগে ছুটে এলো রহিম মিয়ার বাড়ির সামনে। কিন্তু উঠোনে পৌঁছানোর আগেই তাকে ঘিরে ধরল কদুর লাঠিয়াল বাহিনী। সাথে গ্রামের কিছু অন্ধ ভক্ত মুরুব্বি। মনির চিৎকার করে উঠল, "চাচা! ও রহিম চাচা! দরজা খোলেন! ওই ভণ্ড পীরের হাতে মরিয়মরে তুইলা দিয়েন না! ও মানুষ ভালো না, ও ধর্মের নামে ধান্দাবাজি করতাছে!"
কিন্তু গ্রামের মুরুব্বিরা তেড়ে এলো মনিরের দিকে। জব্বার মাতব্বর লাঠি উঁচিয়ে বলল, "থাম বেয়াদব! পীর বাবার নামে কুৎসা রটাস? তুই নাস্তিক! কাফের! পীর বাবার সাথে আত্মীয়তা হওয়া মানে আমাগো পুরো গ্রামের ইজ্জত বাড়া! তুই এর মধ্যে নাক গলাবি তো তোরে পিটাইয়া খাল পাড় করুম!"
কদু এগিয়ে এসে মনিরের কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, "শোন ছোকরা, বাড়াবাড়ি করিস না। পীর বাবার হুকুম আছে,বেশি বাড়াবাড়ি করলে তোরে রাতের আঁধারে কুমার নদের জলে ভাসাইয়া দিমু। তোর বাপ-দাদারেও খুইজা পাওয়া যাইব না।" মনির চারদিকে তাকাল। পুরো গ্রাম যেন এক অন্ধ উন্মাদনায় ভাসছে। সেখানে যুক্তির কোনো স্থান নেই, সত্যের কোনো মূল্য নেই। এক ভণ্ডের কাল্পনিক অলৌকিকতার কাছে গোটা গ্রামের বিবেক বন্ধক পড়ে গেছে। মনির একা, সম্পূর্ণ একা। সে বুকফাটা আর্তনাদ নিয়ে মরিয়মের বন্ধ ঘরের দরজার দিকে তাকাল। ভেতর থেকে ভেসে আসছিল মরিয়মের চাপা কান্নার আওয়াজ। মনির চোখ মুছে পেছনের দিকে পা বাড়াল। তার অন্তরে তখন এক তীব্র আক্রোশ আর অসহায়ত্বের আগুন জ্বলছিল, কিন্তু সেই আগুন নেভানোর মতো কোনো শক্তি তার ছিল না।
সেই সন্ধ্যায় সিংহপ্রতাপ গ্রামে এক মহোৎসবের আয়োজন করা হলো। বটতলার মাটির ঘরটিকে সাজানো হলো রাজকীয় সাজে। চারিদিকে রঙিন কাগজের ফুল, শত শত মাটির প্রদীপ আর আগরবাতির ধোঁয়া। দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকেও শত শত ভক্ত এসে হাজির হলো 'কালাম শাহ পীরের শাদি মোবারক' দেখার জন্য। খাসি জবাই হলো, বিরিয়ানির সুবাসে চারপাশ ম-ম করতে লাগল। কালাম পরেছে এক জমকালো জরি বসানো নতুন সাদা শেরওয়ানি আর মাথায় পাগড়ি। তার মুখে সুগন্ধি আতর লাগানো। চেহারায় এক চরম বিজয়ের তৃপ্তি। তার জীবনের পঁয়তাল্লিশ বছরের সমস্ত ব্যর্থতা, ক্ষুধা আর লাঞ্ছনার যেন আজ চূড়ান্ত প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে। সে এখন আর মেহেরপুরের ভবঘুরে কালাম নয়; সে এখন এক জীবন্ত দেবতা, যার পায়ের নিচে মানুষ নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত।
রাত আটটায় পালকি করে নিয়ে আসা হলো মরিয়মকে। মরিয়মের পরনে ছিল লাল বেনারসি শাড়ি। কিন্তু তার মুখে কোনো বধূর লাজুক হাসি ছিল না। তার চোখ দুটো কেঁদে কেঁদে রক্তজবার মতো লাল হয়ে গেছে। ঘোমটার আড়ালে সে পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল। তার সমস্ত স্বপ্ন, তার মনিরের স্মৃতি, তার কৈশোরের ভালোবাসা,সবকিছু আজ ধর্মের এক নিষ্ঠুর বলির পাঁঠার মতো উৎসর্গ করা হচ্ছে এক লম্পটের বেদীতে। কাজি সাহেব এলেন। নিকাহর বয়ান পড়ানো হলো।
রহিম মিয়া গদগদ হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে রইল। সে ভাবছে, আজ থেকে সে আর সাধারণ চাষা নয়, সে স্বয়ং পীরের শ্বশুর। বেহেশতের মেশক আম্বরের ঘ্রাণ যেন এখনই তার নাকে এসে লাগছে! তিনবার কবুল বলার সময় মরিয়মের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো। তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। রহিম মিয়া পেছন থেকে মেয়ের পিঠে এক শক্ত চিমটি কেটে ফিসফিস করল, "কবুল বল হারামজাদি, নইলে তোর মায়েরে আমি বিষ খাওয়াইয়া মারুম!"
মরিয়ম চোখ বুজল। তার গাল বেয়ে নেমে এলো দুই ফোঁটা তপ্ত অশ্রু। রুদ্ধশ্বাসে, মৃত মানুষের মতো সে উচ্চারণ করল,"কবুল।" মুহূর্তের মধ্যে চারদিক থেকে উলুধ্বনি আর তকবিরের আওয়াজ উঠল,"আল্লাহু আকবার! পীর বাবার শাদি মোবারক!" কালামের মুখে এক পৈশাচিক, বিজয়ী হাসি ফুটে উঠল। সে হাত তুলে উপস্থিত জনতাকে দোয়া দিল।
"ওহে আমার মুরিদানেরা! আজ এই সিংহপ্রতাপের মাটি পবিত্র হইয়া গেল! আসমান থেইকা ফেরেস্তারা ফুল ছিটাইতাছে! তোমরা পীরের খেদমত করছ, তোমাদের ঘরে ঘরে আজ মেশক আম্বরের ঘ্রাণ পৌঁছাইয়া যাইব!"
মানুষ জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল। তারা পীরের পা ছুঁয়ে সালাম করার জন্য হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। রাত তখন গভীর। উৎসবের কোলাহল থেমে গেছে। গ্রামের মানুষ খেয়েদেয়ে যে যার ঘরে ফিরে গেছে পরম তৃপ্তি নিয়ে,তারা এক পুণ্যময় কাজের সাক্ষী হয়েছে।বটতলার খাস কামরায় টিমটিম করে জ্বলছে এক পিতলের চেরাগ। ঘরের বাতাসে তখনো কড়া আগরবাতি আর লোবানের ধোঁয়া ঘুরপাক খাচ্ছে। খাটের ওপর জড়সড় হয়ে বসে আছে লাল শাড়ি পরা মরিয়ম। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। তার চোখের জল শুকিয়ে গালে দাগ পড়ে গেছে। সে কেবলই অপেক্ষা করছে এক অবধারিত নরকের জন্য।
ভারী কাঠের দরজার খিল খুলে ভেতরে ঢুকল কালাম।তার পরনের পাগড়িটা সে খুলে ছুড়ে মারল মেঝের ওপর। শেরওয়ানির বোতামগুলো খুলে ফেলল এক এক করে। তার মুখের সেই কৃত্রিম শান্ত, নূরানী ভাবটা এখন আর বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট নেই। মুখের কোণায় এক আদিম, কামুক ও নোংরা হাসি।
সে ধীরপায়ে খাটের দিকে এগিয়ে এলো। মরিয়ম ভয়ে আরও কুঁকড়ে গেল, সে দুই হাতে নিজের বুকের আঁচল শক্ত করে চেপে ধরে দেওয়ালের সাথে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করল।
"ডরাও ক্যান সুন্দরী?" কালামের গলার স্বর এবার পুরোপুরি মেহেরপুরের সেই ভবঘুরে মাতালের মতো শোনাল।
সে খাটের কিনারায় বসল। তার শরীর থেকে মদের মতো কড়া এক সস্তা আতরের গন্ধ আর তামাকের দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল। কালাম মরিয়মের ঘোমটাটা এক হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেলে দিল। মরিয়মের রূপ দেখে কালামের চোখ দুটো যেন জ্বলে উঠল। সে তার রুক্ষ, খসখসে হাতটা বাড়িয়ে দিল মরিয়মের চিবুকের দিকে।
"তোমার বাপ তোমারে আমার হাতে তুইলা দিয়া ভাবতাছে সে বেহেশতে যাইব!" কালাম এক বিকট, খসখসে অট্টহাসি দিয়ে উঠল। "আরে বোকার হদ্দ! ধর্মের নামে এই দুনিয়ার বেকুবগুলারে নাচাইতে কী যে মজা, তা যদি জানতা! পীরগিরি তো আমার পেট চালানোর ব্যবসা, আর তুমি হইলা আমার সেই ব্যবসার সবচেয়ে দামি বকশিশ!"
মরিয়ম বিস্ফারিত চোখে কালামের দিকে তাকাল। তার কান যেন নিজের কথাকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। এই তবে সেই অলৌকিক পীর? এই তার আসল রূপ? কালাম আরও কাছে ঝুঁকে এলো। তার মুখ থেকে বের হওয়া পানের পচা গন্ধ আর গরম নিঃশ্বাস মরিয়মের মুখে এসে আছড়ে পড়ল।
"কী ভাবছিলা? বেহেশতের মেশক আম্বরের ঘ্রাণ পাইবা?" কালাম ক্রূর হাসিতে মরিয়মের মুখের ওপর নিজের মুখটা নামিয়ে আনল, "এই যে দেখো... এইটাই কালাম পীরের আসল মেশক আম্বর!"
মরিয়মের সমস্ত শরীর ঘৃণায়, বিতৃষ্ণায় আর অপমানে রি-রি করে উঠল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল মনিরের সেই নিষ্পাপ, ভালোবাসাময় মুখ। তার মনে হলো, সে কোনো মানুষের সামনে বসে নেই; সে বসে আছে নরকের এক পচা, গলিত লাশের সামনে,যার শরীর থেকে কোনো স্বর্গীয় সুবাস নয়, বরং বের হচ্ছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে থাকা ভণ্ডামি, মিথ্যা আর প্রতারণার এক পৈশাচিক দুর্গন্ধ।
বাইরে তখন সিংহপ্রতাপের প্রাচীন বটগাছের ডালে এক নিশাচর পেঁচা কর্কশ গলায় ডেকে উঠল। আর রাতের অন্ধকারের বুক চিরে সেই মাটির কুঠুরি থেকে কোনো স্বর্গীয় মেশক আম্বরের সুবাস নয়, কেবল এক অসহায় নারীর নিঃশব্দ কান্নার আর্তনাদ বাতাসে মিলিয়ে যেতে লাগল,যা শোনার মতো কোনো মানুষ সেই ভক্তির মোহে অন্ধ হয়ে থাকা সিংহপ্রতাপ গ্রামে জেগে ছিল না।