Story

ডিভোর্স ক্যানসেল!

October 7, 2026

101 views

ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে হাজার হাজার গাড়ি চলে, শফিকের প্রেমের গাড়িটাও গিয়ে ঠিক সেখানেই থেমেছে।

দিয়া আর শফিকের বিয়ের বয়স তিন বছর। প্রথম বছরটা গিয়েছে হাওয়ার ওপর দিয়ে। চট্টগ্রামে বসে শফিক আর ঢাকায় বসে দিয়া দিনে অন্তত দেড় হাজার মেসেজ আদান প্রদান করতো। এত মেসেজ আদান-প্রদান হতো যে, মোবাইল অপারেটরও মাঝেমধ্যে ভাবত, এই দুইজন মানুষ নাকি একসঙ্গে সংসার না করে আমাদের ডেটা প্যাকের সংসার চালাচ্ছে!

বৃহস্পতিবার রাতে শফিক ইউনিক বাসে চড়ে ঢাকায় চলে আসত। ভালোবাসা তখন ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের তেলের চেয়েও মসৃণ ছিল।

তখন শফিকের কাছে ২৫০ কিলোমিটার পথও ২৫০ মিটার মনে হতো। এখন ৫০০ মিটার হাঁটতেও সে গুগল ম্যাপে শর্টকাট খোঁজে।

বিপত্তি বাঁধাল দ্বিতীয় বছর। বিয়ের বয়স দু'বছর হতে না হতেই ভালোবাসার রুটিন ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের মেগা প্রজেক্টের মতো ধীরগতির হয়ে গেল।

শফিক বুঝল, সপ্তাহজুড়ে চাটগাঁর অফিসে খাটুনি শেষে শুক্রবার সকালে বাস বা ট্রেনের ঝাঁকুনি সহ্য করে ঢাকায় এসে প্রেম করা আর ডিফেন্সের ট্রেনিং নেওয়া একই কথা।

পার্থক্য শুধু একটাই ডিফেন্সের ট্রেনিং শেষে অন্তত কেউ একটা চাকরি পাওয়া দেয়। শফিক শুক্রবারের বাসযাত্রা শেষে শুধু কোমর ব্যথা আর দাম্পত্য ঝগড়ার সার্টিফিকেট পায়।

একটা সময় শরীর ভালোবাসার চেয়ে বিছানার আরাম আর এসির বাতাস বেশি দাবি করতে শুরু করল।

আগে দিয়া ফোন দিলে শফিক বলত, 'বলো জান।'

এখন ফোন বাজলে প্রথমে দেখে, দিয়া নাকি অফিস।

দিয়া হলে বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বের হয়, আর অফিস হলে বলে, 'জ্বি স্যার, এখনই পাঠাচ্ছি!'

যাওয়ার ফ্রিকোয়েন্সি মাসে চারবার থেকে কমে দাঁড়াল মাসে দুইবার, তারপর দু'মাসে একবার।

'তোমার কাছে আমার চেয়ে চট্টগ্রামের মেজবানি মাংস আর শুঁটকি ভুনা বেশি প্রিয় হয়ে গেল, তাই না?' -ঢাকা থেকে দিয়ার দীর্ঘশ্বাস উড়ে আসত ফোনে।

'দিয়া, তুমি বুঝছ না, শুক্রবার সকালে ঢাকায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে ৮টা। একটু আদর সোহাগ ভালোবাসার পরিবর্তে আমার ঘুমাতে খুব ভালো লাগে। তারপর উঠে তোমার সাথে পাঁচ মিনিট ঝগড়া করতেই তো দেখা যায় আবার শনিবার রাতের ট্রেনের টিকিট কাটতে হচ্ছে!'

শফিকের ক্লান্ত উত্তর শুনে দিয়া বলত, 'তাহলে সব জেনেও আমাকে বিয়ে করলে কেন?'

শফিক বলত, 'তখন তো জানতাম না ঢাকা- চট্টগ্রাম হাইওয়ের সঙ্গে আমার যৌথ জীবন শুরু হবে। আর মাঝে মাঝে দাউদকান্দির জ্যাম জীবন তছনছ করে দিবে।'

দূরত্ব যখন উইকেন্ডের বাসের দূরত্বের চেয়েও বেশি ভারী হয়ে উঠল, তখন দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নিল- আর না।

এভাবে লং ডিস্ট্যান্স রিলেশনশিপ চালিয়ে আর শরীরের চৌদ্দটা বাজানো সম্ভব না। বিচ্ছেদই সই!

পরম শান্তিতে আলাদা হয়ে ঘুমাবে শফিক।

দুজনেরই ধারণা ছিল, ডিভোর্স হয়ে গেলে অন্তত শুক্রবারে কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করবে না, 'কোথায়?'

আইনজীবীর মাধ্যমে ডিভোর্সের যাবতীয় কাগজ তৈরি করা হলো। শুধু একটাই শর্ত- দুজনের উপস্থিতিতে একসাথে বসে সই করতে হবে।

অগত্যা শফিককে আবার ঢাকায় আসতে হলো।

এই যাত্রায় অবশ্য শফিক বাসে ওঠার আগে একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, 'হে আল্লাহ, এটাই যেন ঢাকা আসার শেষ সফর হয়।এ জার্নি আর নিতে পারছি না।'

ঢাকার কাজি অফিসে বসে দুজনের মুখই থমথমে।

কাজি সাহেব চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, 'সিদ্ধান্ত নেওয়র আগে, ভালো করে ভেবে দেখেছ? তিন বছরের সংসার, ঝগড়া তো হতেই পারে!'

দিয়া বলল, 'কাজি সাহেব, দূরত্ব জিনিসটা আপনি বুঝবেন না। ভালোবাসার চেয়ে বাস জার্নিতে বেশি কষ্ট মনে করলে, সংসার টিকে না।'

শফিক সায় দিয়ে বলল, 'হ্যাঁ কাজী সাহেব। আমার মেরুদণ্ড অলরেডি এল-ফোর, এল-ফাইভ ডিস্ক ডিসপ্লেসমেন্টের পথে। প্রেম বিয়ে বাঁচাতে গিয়ে পঙ্গু হতে পারব না।'

কাজি সাহেব শফিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'বাবা, তুমি ডিভোর্স করতে এসেছ, না অর্থোপেডিক ডাক্তার দেখাতে?'

শফিক বলল, 'দুটোই দরকার মনে হচ্ছে।'

কাজি সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে শেষ কাগজের পাতাটা উল্টালেন।

বিষন্ন চেহারা নিয়ে বললেন, 'ঠিক আছে, এই যে লাল দাগ দেওয়া জায়গাটা, এখানে দুজনের শেষ সইটা লাগবে।'

কলমটা হাতে নিয়ে দিয়া হঠাৎ থামল।

শফিকের দিকে তাকিয়ে খুব নরম সুরে বলল, 'শোনো, বিচ্ছেদ তো হয়েই যাচ্ছে। একটা কথা জিজ্ঞেস করি? তুমি কি সত্যি আর আমাকে ভালোবাসো না, নাকি শুধু এই যাতায়াতের অলসতার জন্য ডিভোর্স দিচ্ছ?'

শফিক চোখ ছোট ছোট করে বলল, 'অলসতা মানে? তুমি কখনো শুক্রবারে চার ঘণ্টার জ্যামে বসে লালবাগ ফ্লাইওভারের নিচে আটকে থেকেছ? প্রেম শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় সেখানে!'

দিয়া কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, 'তো আমি কি চট্টগ্রাম যেতে পারতাম না? তুমি তো একবারও বললে না যে, 'দিয়া, তুমি চলে আসো!' তুমি সবসময় একা একা শহীদ হওয়ার ভং ধরো।'

শফিক এক মুহূর্ত থমকে গেল।

'তুমি আসতে? তুমি না বলতে চট্টগ্রামের আর্দ্রতায় তোমার হেয়ার স্ট্রেটনিং নষ্ট হয়ে যায়?'

দিয়া বলল, 'আরে বোকা! হেয়ার স্ট্রেটনিংয়ের চেয়ে তোমার ওই ক্লান্ত মুখটা দেখা বেশি জরুরি ছিল না?'

তারপর একটু থেমে বলল, 'তুমি বললে তো আমি তুমি যে সপ্তাহ আসো, তার পরের উইকেন্ডে চলে আসতাম! ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে তো বিমান ছাড়লে মাত্র ৪৫ মিনিট লাগে!'

শফিকের হাত থেকে কলমটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

'মানে? তুমি ফ্লাইটে আসতে রাজি ছিলে? আমি তো ভাবতাম তোমার হাইফারফোভিয়ার কারণে উড়োজাহাজে ভয়!'

দিয়া বলল, 'ভয় ছিল, কিন্তু তোমার ওই বাসের জ্যামের বাহানা শুনতে শুনতে আমার ভয় কেটে গেছে!'

দিয়া ভেংচি কাটল।

শফিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, 'তাহলে এতদিন পর আমরা কী নিয়ে ডিভোর্স করতে বসেছি?'

দিয়া বলল, 'তোমার অলসতা।'

শফিক বলল, 'আর তোমার ভুল বোঝাবুঝি।'

দিয়া বলল, 'আর হাইওয়ের জ্যাম।'

শফিক বলল, 'আর আমাদের দুজনের বুদ্ধির জ্যাম।'

কাজি সাহেব ততক্ষণে কলমের মুখ বন্ধ করে ফেলছেন। চশমাটা মুছে আবার চোখে দিয়ে বললেন, 'তা… তোমরা কি সইটা করবে, নাকি আমি আগামী সপ্তাহের ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের দুটো টিকিট বুক করে দেব?'

দিয়া আর শফিক একে অপরের দিকে তাকাল।

তিন বছর ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের বাসের ট্রাফিক জ্যামের দোহাই দিয়ে যে এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল, তা যেন এক সেকেন্ডে ফুটো হয়ে যাওয়া বেলুনের মতো চুপসে গেল।

দিয়া হুট করে কাজি সাহেবের টেবিল থেকে কাগজগুলো টেনে নিয়ে ব্যাগে পুরে ফেলল।

কাজি সাহেব অবাক হয়ে বললেন, 'এই কী করলে?'

দিয়া গম্ভীর গলায় বলল, 'ডিভোর্স ক্যানসেল।'

শফিকের দিকে তাকিয়ে বলল, 'তবে শর্ত একটাই- আগামীকাল থেকে সব ফ্লাইটের খরচ তোমার। আর চাটগাঁ পৌঁছামাত্র আমাকে মেজবানি খাওয়াতে হবে!'

শফিক পকেট থেকে ফোন বের করে কুপন কোড খুঁজতে খুঁজতে বলল, 'ডিল ডান!'

তারপর একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, 'চল, এখন এয়ারপোর্টের দিকে যাই, জ্যাম লাগার আগেই ফ্লাইট ধরা লাগবে!'

কাজি সাহেব চশমার ওপর দিয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,

'তোমাদের ডিভোর্স না হলেও আমার আজকের কনসালটেশন ফি কিন্তু লাগবেই।'

দিয়া বলল, 'কত?'

কাজি সাহেব বললেন, 'ডিভোর্স বাঁচানোর চার্জ আলাদা।'

শফিক বলল, 'কাজি সাহেব, আপনি তো দেখি হাইওয়ের চেয়েও বেশি টোল নেন!'

কাজি সাহেব বললেন, 'বাবা, তোমাদের সংসার বাঁচাইছি! টোল না নিলে পেশার মান থাকে?'

শফিক আর দিয়া একসঙ্গে হেসে উঠল।

তারপর দুজন বেরিয়ে গেল।

ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে তখনও জ্যামে দাঁড়িয়ে।

শুধু শফিক আর দিয়ার প্রেমটা সেদিন প্রথমবারের মতো টিকেট বদলে জ্যাম ছাড়িয়ে উড়োজাহাজে উঠল কক্সবাজারের পথে।

Picked up where you left off

Comments

তারিক হোসেন was this story’s first reader

+40 XP

    Please login to post comment. Login

  • তারিক হোসেন 3 days ago First reader

    লেখাটি অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ সকলের জন্য বিশেষ করে বর্তমান সময়ে। আমার নিজেরও এরকম একটি কবিতা আছে, 'সেপারেশন'। সুন্দর লেখার জন্য শুভকামনা জানাচ্ছি।