জান্নাত কোথায় আছে কন তো?
নিজেরে দেখায়ে ফকির বলতেছেন, এই এইহানে।
তা অস্বীকার করে শাহাদাত আঙ্গুল উপরে তুলে মওলানা বলতেছেন, না, জান্নাত উপরে
কীসের উপরে?
আমি দলিল দিতে চাই।
না, না, না।
তর্ক শেষ না করেই মওলানা কথা ঘুরায় ঠিক সেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ'র লালসালু উপন্যাসের মজিদের মতো, ওই মিয়া তোমার দাড়ি কই?
এইখানে মওলানা ফকিরের দাড়ি মুছ দেখায়ে বলতেছেন, নবী করিম (সা.) বলছেন, এইগুলা পরিষ্কার করতে হয়।
: কীসের পরিষ্কার? তোমরা হাদিস বুঝ না। পরিষ্কার রাসুলের ঈমানের অঙ্গ। পরিষ্কার থাইহা সুদ, ঘুষ, চুরি, চাপ্টা, বদমায়েশি সবকিছু কইরা খাবান্নাগছে। এইটা কীসের আবার ইসলামের অঙ্গ?
মুছ খালি আমার না? যার পড়া পড়, যার মুছ আছে হিসাব কইরা দেহ, হেই পড়াই সারাবিশ্ব পড়া নাগে। নয়ত পড়াই হয় না। কবি নজরুল ইসলাম, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর -আরো বহুত আছে কবি।
রবীন্দ্রনাথের নাম শুনে মওলানা সাহেব তেতে উঠলেন।
: না, না, রবীন্দ্রনাথ তো হিন্দু, হ্যার কথা ইয়ানো আইব ক্যা?
: কীসের হিন্দু? তার কথা হইল শিক্ষাদাতা। মানুষ কোনো হিন্দু-বৌদ্ধ নাই। মানুষ একজাত। মানুষ একজাত। সর্বশ্রেষ্ঠ জাতই হইল মানুষ।
: তার মানে সেও কি জান্নাতে যাইব?
: সে জান্নাতের আশা করে না।
এরপর ছন্দ শুনায়ে দেন ফকির:
পাগলবৃন্দ হয় গোণাহগার
চায়না বেহেশত চায়না দোজখ
চায় শুধু তোমার
তোমার সাথে প্রেম পীরিতি ভালোবাসা আদায় হলে
তোমার মেহমান হয়া গেলে
তুমি কোথায় জায়গা দিবা তোমার ব্যাপার।
আল্লাহ্'র কাছে চাওয়া যাবে না, চাইলে ভুল হবে।
এইবার মওলানা কহেন, আল্লাহ্ তায়ালার জান্নাতে যাইতে হলে তো তার কথা মানতে হবে তাই না?
: জান্নাতেই তো আছি। আবার কী জান্নাত চাব। কানারা তো দেহে না তাই। এই দুনিয়াটাই অরিজিনাল জান্নাত। জান্নাতুল ফেরদাউস -সর্বশ্রেষ্ঠ জান্নাত দুনিয়া। এইডা চিনে না মানুষ তাই। জান্নাতেই আমরা আছি। সত্য সাধনা বলে মানুষ রূপে আসছি। জান্নাত বাস কইরা যাইতেছি। এই মানুষই দোজখ বেহেশত চিনে, আল্লাহ্-রসুল চিনে-আর কেহই চিনে না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির এই অংশটুকুই আমরা দেখেছি। মওলানা ও ফকিরের মধ্যে এর আগে-পরে আরও অনেক কথা হয়ে থাকতে পারে, যা আমাদের দেখা হয়নি। তাই কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও দেখে তাঁদের সম্পূর্ণ বিশ্বাস, দর্শন কিংবা ধর্মীয় অবস্থান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক হবে না।
তবে এই সংক্ষিপ্ত বাহাসের মধ্যেই বাংলার লোকায়ত আধ্যাত্মিকতার একটি পরিচিত প্রবণতা চোখে পড়ে -ধর্মকে কেবল বাহ্যিক পরিচয়, পোশাক, আচার কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক বিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের ভেতরের জগৎ, প্রেম, সাধনা ও মানবসত্তার মধ্যে খুঁজে দেখা।
বাংলার বাউল-ফকির ধারাকে কোনো একক ধর্মমত হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এর ভেতরে সুফি, বৈষ্ণব, সহজিয়া, নাথসহ নানা আধ্যাত্মিক ও লোকায়ত ঐতিহ্যের দীর্ঘ পারস্পরিক প্রভাব রয়েছে। বিভিন্ন সাধক ও গোষ্ঠীর বিশ্বাস ও সাধনপদ্ধতিতেও পার্থক্য আছে। কিন্তু একটি সাধারণ প্রবণতা বহু বাউল-ফকিরের গানে ও সাধনায় লক্ষ করা যায় -বাহিরের পরিচয়ের চেয়ে ভেতরের মানুষকে চেনা।
প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের নিজস্ব শাস্ত্র, বিধান, আচার ও সামাজিক কাঠামো থাকে। ইসলাম, হিন্দুধর্ম কিংবা অন্য ধর্মীয় ঐতিহ্যেও এসব বাহ্যিক অনুশীলনের পাশাপাশি গভীর আধ্যাত্মিক ও অন্তর্দর্শনের ধারা রয়েছে। ফলে বিষয়টিকে শুধু 'বাহ্যিক ধর্ম বনাম অভ্যন্তরীণ সাধনা' হিসেবে দেখলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
বরং বাউল-ফকির সাধনায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, গুরু, গান, দেহতত্ত্ব, প্রেম, আত্মঅনুসন্ধান এবং ‘সহজ মানুষ’-এর সন্ধানবিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। 'যা আছে ভাণ্ডে, তাই আছে ব্রহ্মাণ্ডে' -এই বহুল পরিচিত ভাবনাটি দেহকে কেবল জৈবিক শরীর হিসেবে নয়, সাধনা ও আত্মউপলব্ধির ক্ষেত্র হিসেবেও দেখতে শেখায়।
এই কারণেই বাউল-ফকিরের কাছে মসজিদ, মন্দির, তীর্থ কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে কখনো কখনো মানুষের দেহ ও অন্তর্জগতই হয়ে ওঠে অনুসন্ধানের প্রধান ক্ষেত্র। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব বাউল মসজিদ-মন্দির বা প্রচলিত ধর্মীয় অনুশীলনকে অস্বীকার করেন। বাউল-ফকির জগতটি নিজেই বহুস্বরিক।
লালন সাঁইয়ের বিখ্যাত প্রশ্ন—
'সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে
লালন কয় জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে।:
এই প্রশ্নের মধ্যেই জাত-ধর্মের বাহ্যিক পরিচয় অতিক্রম করে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাউল দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘সহজ মানুষ’-এর অনুসন্ধান। এখানে পরম সত্য কোনো দূরবর্তী আকাশে কিংবা কেবল কোনো নির্দিষ্ট পবিত্র স্থানে সীমাবদ্ধ নয়; সাধকের নিজের অস্তিত্ব, দেহ, মন, প্রেম ও সম্পর্কের মধ্যেও তার অনুসন্ধান চলে। তাই 'জান্নাত কোথায়?' -এই প্রশ্নের জবাবে ফকিরের নিজের দিকে ইঙ্গিত করা নিছক কৌতুক নয়; এর মধ্যে একটি লোকায়ত আধ্যাত্মিক দর্শনের ইঙ্গিত রয়েছে।
বাউল-ফকিরের কাছে গানও নিছক বিনোদন নয়।তত্ত্বগান, গুরুগান ও সাধনসংগীত তাদের ভাবপ্রকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। একতারা, দোতারা, খমক, বাঁশি কিংবা অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে গান তাদের দর্শন, দেহতত্ত্ব, প্রেম ও আত্মঅনুসন্ধানের কথা বহন করে। গান কখনো তাদের কাছে স্মরণ, সাধনা ও আত্মসংলাপের মাধ্যম হয়ে ওঠে।
এই সাধনার মধ্যে দেহতত্ত্ব ও কায়াসাধনার কথাও আসে। তবে এসবকে কেবল 'শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম' বা কোনো একক পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ করা যায় না। বিভিন্ন বাউল-সহজিয়া ধারায় দেহ, শ্বাস, ইন্দ্রিয়, যৌগিক সাধনা, গুরু-নির্দেশ এবং প্রতীকী ভাষার নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। এসবের অনেকটাই গুরুমুখী ও অন্তর্গত সাধনার বিষয়।
এখানেই বাউল-ফকিরের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় কর্তৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ টানাপোড়েন দেখা যায়। শাস্ত্রের ব্যাখ্যা কে করবে, ধর্মীয় সত্যের অধিকার কার, ঈশ্বরকে জানার জন্য মধ্যস্থতার প্রয়োজন আছে কি না -এসব প্রশ্ন বাংলার লোকায়ত সাধকদের গান ও কথায় বারবার ফিরে এসেছে।
তবে এই প্রশ্ন তোলাকে সরাসরি নাস্তিকতা বলা যাবে না। বাউল-ফকিরের বড় অংশই কোনো না কোনোভাবে পরম সত্তা, স্রষ্টা, গুরু কিংবা আধ্যাত্মিক সত্যের অনুসন্ধান করেন। তাদের আপত্তি অনেক সময় ঈশ্বরের অস্তিত্বে নয়; বরং ঈশ্বরকে কেবল বাহ্যিক পরিচয়, প্রতিষ্ঠান কিংবা সামাজিক ক্ষমতার একচ্ছত্র সম্পত্তি বানানোর প্রবণতায়।
এখানেই এই ফকিরি বাহাসের সামাজিক তাৎপর্য।
আপনি মুসলমান -আপনার নামাজ, রোজা, হজ, কোরআন ও শরিয়ত আপনার বিশ্বাসের অংশ। কেউ হিন্দু -তার পূজা, তীর্থ, মন্দির ও ধর্মীয় ঐতিহ্য তার বিশ্বাসের অংশ। আবার কোনো বাউল বা ফকির যদি নিজেকে ‘সহজ মানুষ’ হিসেবে দেখতে চান, গুরু ও সাধনার মাধ্যমে নিজের ভেতরে পরম সত্যকে অনুসন্ধান করতে চান -তাকেও তার নিজস্ব পথ নিয়ে থাকার অধিকার দিতে হবে।
নিজের বিশ্বাস পালন করা ধর্মীয় স্বাধীনতা; অন্যের ওপর নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়া ধর্মীয় স্বাধীনতা নয়। কেউ অপরাধ না করলে, অন্যের অধিকার ও নিরাপত্তা নষ্ট না করলে, রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন না ভাঙলে -তার বিশ্বাস, দর্শন, পোশাক, সাধনা কিংবা জীবনযাপনের ধরন নিয়ে জোরজবরদস্তি করার অধিকার অন্য কারও নেই।
আপনার প্রচলিত ধর্মের কিছু টার্ম, দর্শন, ভার্স গান বা কথায় ব্যবহার করে বলেই -একজন ফকির আপনার বেহেশতে ভাগ বসাতে আসেননি। তিনি তার নিজের সাধনার পথ ধরে তার পরমসত্তাকে খুঁজছেন। তিনি জান্নাতকে যেভাবে বোঝেন, আপনি সেভাবে নাও বুঝতে পারেন। কিন্তু সেই অমিলের বিচার শেষ পর্যন্ত আপনার হাতে নয়। কার বিশ্বাস সত্য -তার চূড়ান্ত বিচার মানুষের হাতে নয়; যে যার বিশ্বাসের জবাবদিহি তার স্রষ্টার কাছেই করবে।
তাই প্রিয় মওলানা ভাইয়েরা, ফকিরকে তার মতো থাকতে দিন। আপনি আপনার বিশ্বাস নিয়ে থাকুন, তিনি তার সাধনা নিয়ে থাকুন। মতের অমিল থাকুক, বাহাস থাকুক, যুক্তি থাকুক -কিন্তু মানুষকে ছোট করার, ঘৃণা করার কিংবা জোর করে নিজের ছাঁচে ঢোকানোর প্রবণতা যেন না থাকে। ধর্মে জোরজবরদস্তির কোনো স্থান নাই।
বহুত্ববাদ মানে সবাই একই কথা বলবে -তা নয়। বহুত্ববাদ মানে ভিন্ন কথা বলার পরও পাশাপাশি বেঁচে থাকার অধিকার স্বীকার করা। আমরা সবাই আল্লাহর সৃষ্টি -যে যেভাবে তাঁকে চিনুক, শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে হবে সেই পরম সত্তার কাছেই।
হয়তো শেষ বিচারের দিন আমাদের পোশাকের চেয়ে, দাড়ির দৈর্ঘ্যের চেয়ে, জাতের পরিচয়ের চেয়ে, তর্কে কে জিতেছিল তার চেয়ে বড় হয়ে উঠবে একটি প্রশ্ন -আমরা ঈশ্বরসৃষ্ট সর্বমানুষকে কতটা ভালোবেসেছিলাম?
অহংকার ও ঘৃণা একদিন তিরোহিত হবে।
থেকে যাবে শুধু মানুষের প্রতি মানুষের সেই দিলখোলা ভালোবাসাটুকুই।
তথ্যসূত্র
১. Jeanne Openshaw, Seeking Bauls of Bengal, Cambridge University Press, 2002.
২. Asim Roy, The Islamic Syncretistic Tradition in Bengal, Princeton University Press, 1983.
৩. উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, বাংলার বাউল ও বাউল গান।
৪. লালন শাহ, ড. আবুল আহসান চৌধুরী
▪️
লেখক: সাংবাদিক
৮ অক্টোবর ২০২৬