Story

ক্লিওপেট্রা ও এপিটাফ

October 8, 2026

46 views

আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশের উপপরিচালক তানভীর আহমেদের টেবিলে যখন ড্রইং টিউবটা এসে পৌঁছাল, তখন বাইরে অগ্রহায়ণের ধূসর গোধূলি নামছে। কুয়াশার পাতলা চাদরে জড়িয়ে আছে শের-ই-বাংলা নগরের পুরোনো সেগুন গাছগুলো। টেবিল ল্যাম্পের তলায় রাখা নথিপত্র সরিয়ে তানভীর টিউবের মুখটা খুলল। ভেতর থেকে বের হয়ে এলো এক টুকরো বিবর্ণ, বাদামি পার্চমেন্ট কাগজ বা হয়তো চামড়ার মতো দেখতে কোনো পুরোনো উদ্ভিজ্জ পাতা। কাগজের ওপর অদ্ভুত গ্রিক হরফে টানা টানা কিছু লেখা, আর নিচে প্রাচীন ব্রাহ্মী ও প্রাকৃত ভাষার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। তবে পাতার একদম কেন্দ্রে আঁকা ছিল একটি মিশরীয় পদ্মফুলের চিহ্ন, যাকে ঘিরে কুণ্ডলী পাকিয়ে রয়েছে একটি বিষধর সাপের রেখাচিত্র,প্রাচীন আস্প সাপের প্রতীক।

নথির সাথে কোনো প্রেরকের নাম ছিল না। ছিল কেবল একটি আধুনিক কম্পিউটারে টাইপ করা চিরকুট:

“পদ্মাপাড়ের প্রাচীন উয়ারী-বটেশ্বর কিংবা মহাস্থানগড়ে যে ইতিহাস মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছে, তার চেয়েও গভীর কোনো গোপন সত্য লুকিয়ে আছে নওগাঁর এক বিস্মৃত ভাঙা জমিদারের মহলে। যার সমাধিফলকে রোমান অক্ষরে লেখা আছে একটি মাত্র নাম,'ক্লিওপেট্রা'। আপনি কি সত্যের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত, তানভীর সাহেব?”

তানভীরের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠার কথা ছিল। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে চাকরি করার সুবাদে এমন কত উদ্ভট চিরকুট আর ভুয়া গুপ্তধনের নকশা তার হাতে এসেছে। কিন্তু এই পার্চমেন্টের কালির গন্ধটা শুঁকতেই তার মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা এক স্রোত বয়ে গেল। গন্ধটা কোনো আধুনিক সিন্থেটিক কালির নয়; এতে মিশে আছে পাম তেলের পোড়া গন্ধ, বাবলা আঠা আর সীসার অক্সাইড,যা অন্তত দুই হাজার বছর আগের হস্তলিপি সংরক্ষণে ব্যবহৃত হতো। আরও একটি বিষয় তানভীরের চোখ এড়াল না। পাতার এক কোণে খুব ছোট করে পেন্সিলে আঁকা একটি স্কেচ,এক নারীর মুখ। তার ঘাড় পর্যন্ত ছাঁটা চুল, তীক্ষ্ণ নাসিকা, আর চোখের মণির ভেতর এক সর্বগ্রাসী বিষণ্ণতা। তানভীরের মস্তিষ্ক বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো কেঁপে উঠল। এই মুখ... এই মুখ তো তার অজানা নয়। এই অবিকল মুখটি সে শেষবার দেখেছিল চার বছর আগে, কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রাচীন সিলমোহর গবেষণাগারে। জারা।

জারা ইশরাক,আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এপিগ্রাফিস্ট এবং প্রাচীন ভাষার গবেষক। যার সাথে তানভীরের জীবনের সবচেয়ে তীব্র, সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক প্রেম আর বিরহের স্মৃতিগুলো জড়িয়ে আছে। এবং যে নারী চার বছর আগে আলেকজান্দ্রিয়ার উপকূলে এক ঝোড়ো রাতে সমুদ্রের অতল গভীরে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। সরকারি খাতায় যার নামের পাশে সিলমোহর পড়েছিল,‘মৃত’। নওগাঁর আত্রাই নদীর এক পরিত্যক্ত শাখা খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘নীলকর রায়বাহাদুর অট্টালিকা’। স্থানীয় মানুষ একে বলে ‘সাপের বাড়ি’। আঠারো শতকের গোড়ার দিকে এক খেয়ালি জমিদার এই প্রাসাদ গড়ে তুলেছিলেন প্রাচীন বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষের ওপর। লোকশ্রুতি আছে, সেই জমিদার ছিলেন প্রত্নবস্তুর নেশাগ্রস্ত সংগ্রাহক। দেশ-বিদেশের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের পাথর এনে তিনি নাকি নিজের এই জলটুঙ্গিতে জড়ো করতেন।

তানভীর যখন সেখানে পৌঁছাল, তখন মধ্যদুপুর। চরাচরে জনমানুষের সাড়াশব্দ নেই। মেঠোপথের ধারে কাশবন শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে গেছে।cবাড়িটির তোরণ ভেঙে পড়েছে বহু যুগ আগে। পোড়ামাটির ইটের খাঁজে খাঁজে গজিয়ে উঠেছে অশ্বত্থ আর বটের শিকড়, যা দেওয়ালগুলোকে অজগরের মতো পেঁচিয়ে রেখেছে। তানভীরের কাঁধে ভারী ব্যাকপ্যাক, হাতে শক্তিশালী এলইডি টর্চ আর ক্যামেরা। ভাঙা সিংহদ্বার পেরিয়ে উঠোনে ঢুকতেই চমকে উঠল তানভীর। উঠোনের ঝরা পাতার ওপর বুটজুতোর তাজা ছাপ। কেউ একজন সম্প্রতি এখানে হেঁটে গেছে। খুব সতর্ক পায়ে সে ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে অন্দরমহলের দিকে পা বাড়াল।

ভেতরের বাতাস ভারী, স্যাঁতসেঁতে বাদুড়ের বিষ্ঠা আর চুন-সুরকির গুঁড়োয় নিঃশ্বাস নেওয়া দায়। দেওয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ে প্রাচীন ইটগুলো কঙ্কালের পাঁজরের মতো বেরিয়ে আছে। তানভীরের নজর গেল উত্তর কোণের একটি অন্ধকার কুঠুরির দিকে। সেখানে মেঝের কাঠ ভেঙে নিচে নেমে গেছে এক সংকীর্ণ পাথুরে সিঁড়ি,গুপ্ত ভূগর্ভস্থ কক্ষ বা তহখানা। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই তানভীরের টর্চের আলো গিয়ে আছড়ে পড়ল এক অলৌকিক দৃশ্যের ওপর। ধুলো আর অন্ধকারের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে কালো ব্যাসল্ট পাথরের এক বিশাল সমাধিফলক বা এপিটাফ। বাংলার মধ্যযুগীয় কোনো স্থাপত্যের সাথে এর দূরতম কোনো মিল নেই। এর গঠন নিখুঁত গ্রিক-রোমান ঘরানার। এপিটাফের উপরিভাগে খোদাই করা এক রূপসী নারীর শায়িত প্রতিকৃতি, যার মুকুটে সূর্যের চাকতি আর ইউরিয়াসের (সর্পদেবী) অলংকরণ। আর সেই পাথরের বুক চিরে গ্রিক এবং লাতিন মিশ্রিত হরফে খোদাই করা এপিটাফ:

"Hic iacet umbra reginae, non ossa.

Cleopatra,non Nili, sed oblivionis filia."

(এখানে রানীর ছায়া শায়িত, অস্থি নয়। ক্লিওপেট্রা,নীলনদের নয়, বিস্মৃতির কন্যা।)

"অনুবাদটা নিখুঁত করতে পারলে না, তাই না তানভীর?"

অন্ধকারের ভেতর থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বরটি শুনে তানভীরের হাতের টর্চটা প্রায় খসে পড়ে যাচ্ছিল। পাথুরে দেওয়ালের ছায়া ভেদ করে এক নারীমূর্তি ধীরপায়ে আলোর বৃত্তে এসে দাঁড়াল। পরনে কালচে খাকি রঙের ট্রেকিং জ্যাকেট, মাথায় উলের টুপি থেকে বেরিয়ে আসা কয়েক গোছা অবাধ্য কালো চুল। তীক্ষ্ণ সেই চিবুক, রক্তহীন পাতলা ঠোঁট, আর সেই মায়াবী চোখের মণি,যার ভেতর অতল সমুদ্রের গভীরতা লুকিয়ে থাকত।

"জারা..." তানভীরের গলা দিয়ে শব্দটা বের হতে গিয়ে আটকে গেল। বুকটা এমনভাবে দুমড়ে উঠল যেন সেখানে কোনো হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে।

চার বছর ধরে যার ছবি বুকে চেপে তানভীর প্রতি রাতে মরেছে, যাকে কবরে না পেয়ে সে নিজের স্মৃতির কফিনে সমাহিত করে রেখেছিল,সে রক্তমাংসের শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই নরকের মতো অন্ধকার পাতালঘরে।

"তুমি বেঁচে আছো?" তানভীরের চোখ ফেটে তপ্ত জল নেমে এলো। সে এক পা এগিয়ে যেতে চাইল।

জারা তার ডান হাত তুলে তানভীরকে থামিয়ে দিল। জারার চোখে কোনো পুনর্মিলনের আবেগ ছিল না; ছিল এক পাথুরে, ক্লান্ত সতর্কতা। তার ডান হাতের আঙুলগুলো কাঁপছিল।

"আমি চার বছর আগেই মরে গেছি তানভীর। আলেকজান্দ্রিয়ার সাগরে যে জারা ডুবেছিল, সে বেঁচে ফিরলে আন্তর্জাতিক স্মাগলার চক্র আর প্রত্নতত্ত্বের মাফিয়ারা তাকে এক নিমেষে শেষ করে দিত। আমি শুধু আমার কাজটা শেষ করার জন্য নিজের অস্তিত্ব লুকিয়ে রেখেছি।"

"কী কাজ জারা? কিসের এত দাম যে তার জন্য আমাদের প্রেম, আমাদের সমস্ত জীবন তুমি ধুলোয় মিশিয়ে দিলে?" তানভীরের কণ্ঠ রুদ্ধ কান্নায় ফেটে পড়ল।

জারা এপিটাফের কালো পাথরের ওপর আলতো করে নিজের হাত রাখল। "এই এপিটাফের সত্য উন্মোচন করার জন্য। এই যে দেখছ,'ক্লিওপেট্রা'। তুমি কি সত্যিই জানো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মিথ্যা কোনটা?"

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রহস্যাবৃত ট্র্যাজেডিগুলোর একটি হলো রানী সপ্তম ক্লিওপেট্রার মৃত্যু। খ্রিস্টপূর্ব ৩০ অব্দে রোমান সেনাপতি অক্টাভিয়ানের (পরবর্তীতে সম্রাট অগাস্টাস) হাতে মিশরের পতনের পর ক্লিওপেট্রা বিষাক্ত সাপের দংশনে আত্মহত্যা করেছিলেন,এটাই প্রচলিত ইতিহাস। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় যে প্রশ্নটি আজও অনুচ্চারিত,তাঁর মরদেহ কোথায় সমাহিত করা হয়েছিল? আলেকজান্দ্রিয়ার সেই বিখ্যাত সমাধিসৌধ রোমানরা কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করেনি।

"তানভীর," জারা খুব নিচু স্বরে বলতে শুরু করল, তার কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল মাটির নিচে, "ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর পর অক্টাভিয়ান ক্লিওপেট্রার সন্তানদের হত্যা করতে চেয়েছিল। সিজারিয়ানকে হত্যা করা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ক্লিওপেট্রার বিশ্বস্ত রক্ষী আর আলেক্সান্দ্রিয়ার একদল গুপ্ত পণ্ডিত রানীর মৃতদেহ নিয়ে পালিয়ে যায়। তারা জানত, মিশরে বা রোমান সাম্রাজ্যের সীমানায় রানীর দেহ থাকলে তা ধ্বংস করে রোমানদের বিজয়ের স্মারক বানানো হবে।"

তানভীর স্তব্ধ হয়ে শুনছিল। "কিন্তু মিশর থেকে বাংলা? এটা পাগলামি জারা! এর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।"  "ভিত্তি আছে," জারা তীব্র চোখে তাকাল। "তুমি ভুলে যাচ্ছ খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী থেকেই রোমানদের সাথে এই প্রাচ্যের,বিশেষ করে গঙ্গাঋদ্ধি এবং বঙ্গোপসাগরীয় বন্দরগুলোর সরাসরি নৌবাণিজ্য ছিল। তাম্রলিপ্ত আর উয়ারী-বটেশ্বর ছিল সেই বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল। সিল্ক রুট কেবল স্থলেই ছিল না, জলপথেও ছিল। ক্লিওপেট্রার একান্ত অনুগতদের একটি জাহাজ লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এই বঙ্গোপসাগরের মোহনায় এসে পৌঁছেছিল। রানীর মূল দেহ মিশরীয় বালিতেই লুকিয়ে রাখা হয়েছিল হয়তো, কিন্তু তাঁর শেষ স্মৃতিচিহ্ন, তাঁর রাজকীয় রাজদণ্ড এবং তাঁর হৃদপিণ্ড মমিকৃত করে এই এপিটাফের ভেতর গোপন কুঠুরিতে সিল করে রাখা হয়েছিল।"

"আর এই অট্টালিকা?"

"এই নীলকর জমিদার রায়বাহাদুর নরেন্দ্রনারায়ণ ছিলেন সেই প্রাচীন সিক্রেট অর্ডারের বংশধর, যাদের দায়িত্ব ছিল এই নিদর্শন রক্ষা করা। আঠারো শতকে যখন ব্রিটিশরা বাংলায় জেঁকে বসল, তখন নরেন্দ্রনারায়ণ প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ থেকে এই সমাধিফলক তুলে এনে নিজের এই গুপ্ত কক্ষে স্থাপন করেন, যাতে ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিকরা এর সন্ধান না পায়।"

তানভীর জারার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে এক জ্বলন্ত উন্মাদনা। এই সেই জারা, যে ইতিহাসের এক একটি ভাঙা লিপির জন্য নিজের আহার-নিদ্রা ত্যাগ করতে পারত। কায়রোতে যখন তারা প্রথম প্রেমে পড়েছিল, তখন নীল নদের পাড়ে বসে জারা বলত,“তানভীর, ভালোবাসার চেয়েও সত্য হলো মৃত্যু। আর মৃত্যুর চেয়েও বড় হলো সেই এপিটাফ, যা মানুষকে মৃত্যুর পরেও বাঁচিয়ে রাখে।” সেদিন তানভীর জারার কথার গভীরতা বোঝেনি। আজ এই পাতালঘরে দাঁড়িয়ে সে বুঝল,জারা নিজেই এক জীবন্ত এপিটাফ হয়ে উঠেছে।

"তুমি আমাকে এখানে ডেকেছ কেন জারা?" তানভীর প্রশ্ন করল।

জারার মুখমণ্ডল এক অদ্ভুত বেদনায় ছেয়ে গেল। "কারণ আমি একা এটি খুলতে পারছি না। এই এপিটাফের লিপিগুলোতে এমন এক দ্বিমুখী এনক্রিপশন আছে, যা একমাত্র তুমি আর আমি মিলেই সমাধান করতে পারি। এবং... কারণ আমি জানি, ওরা আমার পেছনে লেগেছে।"

"কারা?"

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ওপরের ভাঙা সিঁড়িতে ভারী বুটের কর্কশ শব্দ পাওয়া গেল। একই সাথে ধাতব অস্ত্রের মৃদু খটখট আওয়াজ। সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে তিনটি দীর্ঘ ছায়া। তাদের হাতে আধুনিক সাব-মেশিনগান।

নেতৃত্বে থাকা মানুষটি এগিয়ে এলো। দীর্ঘদেহী, সোনালী চুল আর বরফের মতো নীল চোখ। পিটার ভ্যান ডার বার্গ,আন্তর্জাতিক ব্ল্যাক মার্কেট অ্যান্টিকস সিন্ডিকেটের অন্যতম শীর্ষ পাচারকারী। কায়রোতে জারার নিখোঁজ হওয়ার পেছনে যার নাম প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে ছিল।

"ওয়েল, ওয়েল... ডক্টর জারা ইশরাক," পিটার এক বিকৃত তৃপ্তির হাসি হাসল। তার ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে এক নারকীয় শীতলতা। "চার বছর ধরে তুমি আমাদের ধোঁকা দিয়ে ভূতের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছ। আমরা ভেবেছিলাম তুমি আলেকজান্দ্রিয়ার জলেই মিশে গেছ। কিন্তু তোমার প্রাক্তন প্রেমিকের ডিপার্টমেন্টের মেইলে তোমার সামান্য নজরদারি আমাদের এই নরকের দরজায় টেনে নিয়ে এলো।"

তানভীরের ভেতরটা অপরাধবোধে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। সেই ড্রইং টিউব... সেই পার্চমেন্ট! তানভীরের সরকারি মেলে জারা যে সতর্কবার্তা পাঠাতে চেয়েছিল, তা হ্যাক করেছিল এই চক্রটি। তানভীর অজান্তেই কালান্তক ব্যাধের পথপ্রদর্শক হয়ে এসেছে। "পিটার, এই এপিটাফ কোনো নিলামের পণ্য নয়," জারা কঠিন গলায় বলল। তার মুখে ভয়ের লেশমাত্র নেই। "এটা মানব ইতিহাসের এক পরম ট্র্যাজেডির দলিল। তোমরা এটা বিক্রি করতে পারবে না।" ইতিহাসের দলিল?" পিটার উপহাসের সুরে হাসল। "তুমি জানো এই ব্ল্যাক ব্যাসল্ট আর প্রাচীন টলেমীয় রাজদণ্ডের মূল্য কালোবাজারে কত? লন্ডনের এক প্রাইভেট কালেক্টর এর জন্য পঁচিশ মিলিয়ন ডলার অফার করেছে। সরো ওখান থেকে জারা। ফলকটি খোলার কোডটা বলো।"

পিটার তার বন্দুকের নল জারার কপাল বরাবর তাক করল। তানভীর এক মুহূর্তও ভাবল না। সে নিজের সমস্ত শরীর দিয়ে জারার সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াল। "ওকে স্পর্শ করার আগে আমার লাশের ওপর দিয়ে যেতে হবে পিটার।"

পিটার ক্লান্ত ভঙ্গিতে হাসল। "খুব রোমান্টিক। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিকরা বড্ড বেশি অবাস্তববাদী হয়।" পিটার তার সহচরকে ইশারা করল। চোখের পলকে পিটারের সাথের এক দানবাকৃতির লোক তানভীরের চোয়ালে রাইফেলের বাট দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত করল। আঘাতের তীব্রতায় তানভীর ছিটকে গিয়ে পাথরের মেঝেতে আছড়ে পড়ল। তার মাথা ফেটে উষ্ণ রক্তের ধারা নেমে এলো চোখের ওপর। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো। অন্ধকারের ভেতর সে শুধু দেখতে পেল,জারা চিৎকার করে তার দিকে ছুটে আসতে চাইছে, কিন্তু অন্য একজন তাকে চেপে ধরেছে।

"কোডটা বলো জারা," পিটারের কণ্ঠস্বর এবার কর্কশ। "নইলে তোমার প্রেমিকের মাথায় পরবর্তী বুলেটটা ঢুকবে।" জারা রক্তাক্ত তানভীরের দিকে তাকাল। যে চোখে চার বছর ধরে কোনো দুর্বলতা ছিল না, সেই চোখ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার চিবুক বেয়ে।

"ছেড়ে দাও ওকে," জারা ফিসফিস করে বলল। "আমি ফলক খুলে দিচ্ছি।"

জারা এপিটাফের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার দুই হাত ব্যাসল্ট পাথরের গায়ের নির্দিষ্ট কিছু খোদাই করা প্রতীকে হাত বোলাতে লাগল। সে লাতিন হরফের ভেতর লুকানো গ্রিক অক্ষরের ওপর চাপ দিল,প্রথমে 'আলফা', তারপর 'ওমেগা', এবং সবশেষে সেই সাপের চোখের মণির ওপর খোদাই করা ছোট রুবি পাথরটিতে। ক্লিক। এক প্রাচীন মেকানিজমের আর্তনাদ তুলে পাথরের ভারী ঢাকনাটি একপাশে সরে গেল। কুঠুরির ভেতর থেকে বের হয়ে এলো এক অচেনা, তীব্র সুবাস,প্রাচীন গন্ধরস, দেবদারু তেল আর শুষ্ক পদ্মের সুবাস। যা দুই হাজার বছর ধরে বাতাসের স্পর্শ পায়নি।

ভেতরে দেখা গেল একটি সোনার কারুকাজ করা ছোট আধারের ভেতর রাখা এক খণ্ড শুকনো কাঠ এবং তার ওপর সর্পাকৃতির স্বর্ণের রাজদণ্ড। পিটারের চোখ লোভে চকচক করে উঠল। "অসাধারণ! নিখুঁত!" সে জারাকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে আধারের দিকে হাত বাড়াল।

"পিটার, হাত দিয়ো না!" জারা চিৎকার করে উঠল। কিন্তু সতর্কবার্তাটি ছিল খুব দেরিতে। প্রাচীন মিশরীয়রা তাদের রানীর শেষ চিহ্নকে কখনোই সুরক্ষাহীন রেখে যায়নি। সেই স্বর্ণের রাজদণ্ডটি একটি ব্যালেন্সড স্প্রিং মেকানিজমের সাথে যুক্ত ছিল। হাত দিয়ে তা স্পর্শ করতেই পাথরের দেওয়ালের খাঁজ থেকে সশব্দে একটি প্রাচীন তামার সূঁচ ছিটকে বের হয়ে এলো।

সূঁচটি সরাসরি পিটারের তালু ভেদ করে ভেতরে ঢুকে গেল। পিটার এক তীব্র আর্তনাদ করে হাত টেনে নিল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তার চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। তার হাত বেয়ে কালো শিরাগুলো ফুটে উঠতে লাগল। সেই তামার কাঁটায় মাখানো ছিল আস্প সাপের শুকনো নির্যাস আর মারাত্মক অ্যালকালয়েড বিষ, যা দুই হাজার বছরেও নিজের প্রাণঘাতী শক্তি হারায়নি।

পিটার মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ছটফট করতে লাগল। তার মুখ দিয়ে সাদা ফেনা বের হতে শুরু করল। বাকি দুজন গার্ড এই দৃশ্য দেখে আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়ল। তারা তাদের বসের এই নারকীয় অবস্থা দেখে গুলি চালানোর সাহস হারিয়ে ফেলে এক ছুটে সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল। কুঠুরির ভেতর তখন কেবল পিটারের শেষ নিঃশ্বাসের গোঙানি, আর তারপর,এক নিশ্ছিদ্র, হিমশীতল নীরবতা।

রক্তাক্ত তানভীর দেওয়ালে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। তার পুরো পৃথিবী দুলছিল। জারা দ্রুত ছুটে এসে তানভীরের শরীরটা নিজের কোলে টেনে নিল। তার নিজের জ্যাকেট খুলে তানভীরের কপালের ক্ষতস্থানে চেপে ধরল সে। "তানভীর... তানভীর, আমার দিকে তাকাও..." জারার কণ্ঠে সেই বহুদিনের হারানো ব্যাকুলতা। তার চোখের জল তানভীরের রক্তাক্ত গালে এসে টপ টপ করে পড়ছিল। তানভীর কাঁপাকাঁপা হাত তুলে জারার ভিজে যাওয়া গাল ছুঁয়ে দিল।

"জারা... তুমি ফিরে এসেছ... সত্যি ফিরে এসেছ?" তানভীরের কণ্ঠ দুর্বল, অথচ তাতে এক চরম তৃপ্তি।

জারা তার কপাল ঠেকিয়ে দিল তানভীরের কপালে। "আমি কোথাও যাইনি তানভীর। আমি এই অন্ধকারের ভেতর প্রতিদিন তোমার কথা ভেবেছি। নীল নদের তীরে কাটানো সেই বিকেলগুলোর কথা ভেবেছি। কিন্তু আমি অভিশপ্ত তানভীর। ক্লিওপেট্রার রহস্য যে স্পর্শ করে, সে নিজেই এক ট্র্যাজেডি হয়ে যায়। প্রাচীন রোমানরা রানীকে শান্তি দেয়নি, আধুনিক পৃথিবীও তাঁকে শান্তি দেবে না। এই লোভী মানুষেরা এই স্মৃতিচিহ্নকে ছিঁড়ে খাবে।"

তানভীর দেখল, জারার বাম হাতের আঙুল বেয়ে কালচে রক্ত ঝরছে। সে চমকে উঠল। "জারা! তোমার হাতে কিসের রক্ত?" জারা এক ম্লান, অপার্থিব হাসি হাসল। সে তার বাম হাতটি মেলে ধরল। পিটারের সাথে ধস্তাধস্তির সময় কিংবা ফলক খোলার মুহূর্তে সেই প্রাচীন তামার সূঁচের বিষাক্ত ডগা জারার আঙুলেও আঁচড় কেটে গেছে। বিষাক্ত নীলচে রেখা ইতিমধ্যেই তার কবজি ছাড়িয়ে বাহুর দিকে ধাবিত হচ্ছে।

"না! জারা! না!" তানভীর পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল। সে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে জারার হাতটা চেপে ধরতে চাইল, বিষ চুষে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করতে চাইল। কিন্তু জারা শান্তভাবে তানভীরকে থামিয়ে দিল। তার মুখমণ্ডলে তখন কোনো যন্ত্রণা ছিল না; ছিল এক অলৌকিক, স্বর্গীয় প্রশান্তি। ঠিক যেমন প্রশান্তি নিয়ে ক্লিওপেট্রা একদিন নিজের বুকে বিষধর সাপ চেপে ধরেছিলেন রোমানদের দাসত্ব এড়াতে। "দেরি হয়ে গেছে তানভীর," জারা ফিসফিস করে বলল। তার চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঘোলাটে হয়ে আসছিল। "এই বিষের কোনো প্রতিষেধক নেই। হয়তো এটাই আমার নিয়তি ছিল। রানীর এপিটাফের রহস্য যেন কোনোদিন এই লোভী দুনিয়ার সামনে উন্মোচিত না হয়, তার প্রহরী হিসেবে আমাকেই থেকে যেতে হবে।"

"জারা, তুমি আমাকে এভাবে ফেলে যেতে পারো না! চার বছর আমি নরকযন্ত্রণা ভোগ করেছি... আবার কেন?" তানভীরের বুক চিরে এক অমানুষিক আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। জারা তার ঠান্ডা ঠোঁটদুটো আলতো করে ছুঁয়ে দিল তানভীরের ঠোঁটে। সেই স্পর্শে ছিল এক অনন্ত বিরহের স্বাদ,রক্ত, অশ্রু আর বিষের এক চরম মহাকাব্য।

"তুমি বেঁচে থাকবে তানভীর," জারার নিশ্বাস ক্ষীণ হয়ে আসছিল। "তুমি এই পৃথিবীর আলোতে থাকবে। আর আমি থাকব এই অন্ধকারের এপিটাফে... রানীর ছায়ার পাশে। আমাকে কোনো কবরে খুঁজবে না তানভীর... আমি মিশে থাকব ইতিহাসের সেই না-বলা হরফে, যা কেউ কোনোদিন পড়তে পারবে না..."

জারার চোখের পাতা বন্ধ হয়ে এলো। তার হাতটি তানভীরের বুকের ওপর থেকে ধীরে ধীরে খসে পড়ে মেঝের ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল।

একটি দীর্ঘশ্বাস... এবং তারপর সব শান্ত।  ভূগর্ভস্থ কুঠুরির পাথুরে মেঝের ওপর পড়ে রইল ক্লিওপেট্রার দুই হাজার বছরের পুরোনো শূন্য এপিটাফ, আর তার শিয়রে শুয়ে রইল আধুনিক যুগের এক নিঃস্ব গবেষক,যে ইতিহাসের রহস্য বাঁচাতে গিয়ে নিজেই ইতিহাসের এক চিরন্তন এপিটাফে পরিণত হলো।

বাইরে তখন অগ্রহায়ণের শেষ সূর্যটা ডুবে গেছে। আত্রাই নদীর বুকে নেমে এসেছে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার।

পুলিশ এবং প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের দল যখন পরদিন সকালে সেই ভাঙা নীলকর অট্টালিকায় পৌঁছাল, তখন তারা সেখানে কাউকেই পেল না। পিটার ভ্যান ডার বার্গের বিষক্রিয়ায় নীল হয়ে যাওয়া মৃতদেহটি পড়ে ছিল সিঁড়ির গোড়ায়। কিন্তু নিচের সেই গোপন তহখানার মুখটি ডিনামাইট বা কোনো প্রাচীন মেকানিজমের তীব্র বিস্ফোরণে পুরোপুরি ধসে গেছে। শত শত টন পোড়ামাটির ইট আর পাথরের নিচে চিরদিনের জন্য চাপা পড়ে গেছে সেই ব্যাসল্ট পাথরের সমাধিফলক। কোনো ক্লিওপেট্রা নেই, কোনো স্বর্ণের রাজদণ্ড নেই। কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট নেই জারা ইশরাকের।

মাসখানেক পর। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের চাকরি ছেড়ে দিয়ে তানভীর আহমেদ এখন একাকী জীবনযাপন করছে বুড়িগঙ্গার তীরের এক শান্ত ফ্ল্যাটে। তার পড়ার ঘরের টেবিলে কোনো আধুনিক গবেষণার বই নেই। শুধু একটি পুরোনো ডায়েরির পাতায় সে কাঠকয়লা দিয়ে এঁকে রেখেছে একটি এপিটাফের ছবি। যেখানে কোনো গ্রিক বা লাতিন হরফ লেখা নেই। সেখানে কেবল দুটি বাংলা লাইন লেখা, যা তানভীর প্রতিদিন গভীর রাতে নিজের অশ্রু দিয়ে পাঠ করে:

"পাথরে খোদাই করা নাম হয়তো একদিন ধুলোয় মিশে যায়, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে যে এপিটাফ লেখা থাকে, মৃত্যুও তাকে মুছতে পারে না।"

বাইরে শীতের রাত গভীর হয়। কুয়াশার চাদর ভেদ করে দূর কোনো জাহাজের ভোঁ ভেসে আসে। তানভীর জানালার বাইরে তাকিয়ে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে কালপুরুষ নক্ষত্রমণ্ডলীর দিকে। সে জানে, এই মহাবিশ্বের কোনো এক অনন্ত নক্ষত্রবীথিতে ক্লিওপেট্রার ছায়ার সাথে মিশে জারা আজও বেঁচে আছে,প্রেম, বিরহ আর এক অপার্থিব রহস্যের অমর রানীরূপে।

 

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login