চিরচেনা শহর একেবারে শান্ত, ঘড়ির কাঁটা রাত দুটো ছুঁইছুঁই। একাকীত্ব আর নিস্তব্ধতার বেড়াজালে ঘেরা চারপাশ। রাতের এই স্তব্ধতায় দিনের চেনা শহরটাকেও কখনও কখনও বড় অচেনা মনে হয়। দিনের ব্যস্ততা, গাড়ির হর্ন আর মানুষের কোলাহল এখন এক মায়াবী নীরবতার চাদরে ঢাকা পড়েছে। রাস্তার ধারের নিয়ন আলোটা অবহেলায় জ্বলছে আর নিভছে, যেন ক্লান্ত কোনো প্রহরীর শেষ প্রহরে ধীরে ধীরে নেমে আসছে চোখের পাতা। চারপাশ এতটাই নিস্তব্ধ যে, নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দও নিজের কানে ভারী শোনায়। এই গভীর রাতে পুরো পৃথিবী যেন এক প্রাচীন ক্যানভাস—যেখানে কোনো রং নেই, আছে কেবল আলো-ছায়ার এক রহস্যময় খেলা।
একাকীত্ব মানুষকে গ্রাস করে, আর নিস্তব্ধতা তাকে দাঁড় করিয়ে দেয় নিজেরই মুখোমুখি। এই নিঝুম রাত যেন আমাদের এক পুরনো আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখানে যান্ত্রিক জীবনের আড়ালে ধূসর হয়ে যাওয়া কিছু স্মৃতি হঠাৎ নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। ব্যস্ত জীবনের স্রোতে মানুষ প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেকেই হারিয়ে ফেলে। ফাইলপত্রের স্তূপ, কাজের তাড়া আর যান্ত্রিক ক্লান্তির আড়ালে যে একান্ত নিজস্ব একটি জগৎ ছিল, তার কথাও একসময় ভুলে যায়। অথচ রাতের এই নিস্তব্ধতা হঠাৎ করেই সেই অবিরাম ব্যস্ততায় যতি টেনে দেয়। আর তখন, বাধ্য হয়েই যখন কেউ জানালার গ্রিলে হাত রেখে দাঁড়ায়, চারপাশের নৈঃশব্দ্য তাকে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত মায়ার ভেতর জড়িয়ে নেয়।
পরিশ্রান্ত শরীরে হঠাৎ হালকা ঠান্ডা হাওয়া এসে ছুঁয়ে গেলে চোখ দুটো আপনাআপনি বুজে আসে। সেই বাতাসে যেন লুকিয়ে থাকে কোনো এক চেনা সুবাস। মনে পড়ে যায় ফেলে আসা শৈশবের দিনগুলোর কথা—যখন গভীর রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যেত, আর চারপাশের আম-কাঁঠালের বাগান থেকে ভেসে আসত ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক। বাঁশঝাড়ের মাথার ওপর দিয়ে জোনাকির দল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলো জ্বেলে ঘুরে বেড়াত। সেই রাতগুলোতে কোনো কৃত্রিম কোলাহল ছিল না, ছিল এক অমলিন শান্তি। আর আজ, ইট-পাথরের এই খাঁচায় বসে যখন মানুষ সেই হারানো শান্তির সন্ধান করে, তখন অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ আর নস্টালজিয়া বুকের ভেতর নিঃশব্দে মোচড় দিয়ে ওঠে। শহরের এই নিস্তব্ধতা অবশ্য কেবল শান্ত নয়; এর ভেতর আছে গাম্ভীর্য, রহস্য আর এক তীব্র রোমাঞ্চ। দূরে কোথাও নিশাচর কোনো পাখির ডাক, কিংবা বহুদূর থেকে ভেসে আসা কোনো ট্রেনের হুইসেল—নির্জন রাতের গভীরতাকে যেন আরও খানিকটা বাড়িয়ে দেয়। আকাশের দিকে তাকালে দেখা যায়, মেঘের আড়াল থেকে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। তার ম্লান আলো এসে পড়েছে উল্টোদিকের বহুতল ভবনের ছাদে। সেখানে কেউ নেই, কিছু নেই—শুধু নিঝুম নীরবতা। দৃশ্যটি যেমন মনের ভেতর এক কোমল রোম্যান্টিক অনুভূতির জন্ম দেয়, তেমনি অজানা কোনো রহস্যের রোমাঞ্চে গা ছমছম করে ওঠে। মনে হয়, এই অন্ধকারের ওপারে হয়তো কোনো অদেখা গল্প লুকিয়ে আছে, যে গল্প দিনের তীব্র আলোয় কখনোই নিজেকে প্রকাশ করে না।
এই নিস্তব্ধতা আসলে এক ধরনের ভাবের ভাষা—যেখানে শব্দ ছাড়াই মনোজগতের অনুভূতিগুলোর আদান-প্রদান ঘটে। আমরা যখন কথা বলি, তখন শব্দের বিনিময় হয়; কিন্তু চারপাশ যখন নীরব হয়ে আসে, তখন কথা বলতে শুরু করে মন। এই নীরবতা মানুষকে তার ফেলে আসা ভুলের কথা মনে করিয়ে দেয়, আবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্নও দেখায়। বহুকাল ধরে বুকের কোনো এক গোপন কোণে ধুলোবালি মেখে পড়ে থাকা অনুভূতিগুলোকে এই নিঝুম রাত যেন আলতো করে জাগিয়ে তোলে। অন্ধকার ঘরের টেবিলে বসে যখন কেউ ডায়েরির পাতায় কলম ছোঁয়ায়, তখন মনে হয়, দীর্ঘদিনের কোনো অদৃশ্য তৃষ্ণা ধীরে ধীরে মিটে যাচ্ছে। শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে মানুষ তখন ফুটিয়ে তুলতে থাকে আলো-আঁধারি রাতের রূপ, তার রূপকথা, তার নিঃশব্দ সৌন্দর্য আর বুকের গভীরে জমে থাকা ভালোলাগার গল্পগুলো।
লিখতে লিখতে কিংবা ভাবতে ভাবতে কখন যে রাতের শেষ প্রহর ঘনিয়ে আসে, তা টেরই পাওয়া যায় না। দূরের কোনো উপাসনালয় থেকে ভেসে আসে ভোরের মৃদু ধ্বনি। নিঝুম রাতের সেই গভীর নীরবতা এবার ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করে। আকাশের কালচে নীল অন্ধকার ফিকে হয়ে আসে, পূর্ব দিগন্তে ফুটে ওঠে ভোরের হালকা আলোর আভাস। রাতের অবসান ঘটে এক দীর্ঘশ্বাসে; তবে সেই দীর্ঘশ্বাসে কোনো ক্লান্তি থাকে না, থাকে অদ্ভুত এক স্বস্তি—যেন দীর্ঘ পথ পেরিয়ে মন অবশেষে নিজের কাছেই ফিরে এসেছে। নিঝুম রাতের এই নীরবতা প্রতিদিন মানুষকে নতুন করে জীবনের অর্থ খুঁজে নিতে শেখায়। মানুষ তখন বুঝতে পারে, জীবনের আসল সুর সবসময় কোলাহলের ভেতর বাজে না; কখনও কখনও তা লুকিয়ে থাকে মনের গভীরে জমে থাকা সেই নিস্তব্ধতার রোমাঞ্চ, প্রশান্তি আর আত্মোপলব্ধির ভেতরেই। আর সেই নীরবতার আয়নাতেই হয়তো ধরা পড়ে এই অধরা জীবনের সবচেয়ে সত্য প্রতিচ্ছবি।
মোঃ আবু হানিফ
২৩ আশ্বিন ১৪৩৩
Comments
Be this story’s first reader
+25 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.