জীবনের রেলগাড়িটা চলে বড়ই এক অদ্ভুত নিয়মে; থামতে হয় বিচিত্র সব স্টেশনে। কোনো কোনো স্টেশনে হয়তো ক্ষণিকের জন্য নামা, গড়ে ওঠে সম্পর্ক, জন্ম নেয় মায়া—তারপর আবার ছুটে চলা। এই চলার যেন কোনো শেষ নেই; শুধু পিছনে পড়ে থাকে দীর্ঘশ্বাস, মায়াময় কিছু সম্পর্ক আর নতুন কোনো স্টেশনের হাতছানি। অথচ প্রতিটি স্টেশনই তো চলমান যাত্রার একটি সাময়িক বিরতি মাত্র। এই জীবন সংসার এমনেই এক রেলগাড়ী যার প্রতিটা স্টপেজেই রয়েছে হাসি-কান্না, মায়া-মমতা আর সুখ-দুঃখের রেড়াজালে আবদ্ধ এক বৈচিত্রময় জীবনযাত্রা।
ঋতু বদলায়, ক্যালেন্ডারের পাতা ওড়ে, চেনা মানুষগুলো সময়ের নিষ্ঠুর স্রোতে একেকজন জীবন্ত লাশ হয়ে অচেনা স্টপেজে পাড়ি জমায়। তবুও মানুষ কেন এত তীব্রভাবে আঁকড়ে ধরতে চায়? কেন একমুঠো ধূলিকণা আর ক্ষণস্থায়ী কিছু মুহূর্তের জন্য এত ব্যাকুলতা? যখন বিচ্ছেদের শেষ ঘণ্টাটা বাজে, তখন হৃদয়ের অতল থেকে একটা আর্তনাদ দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে নিজের বুকেই আছড়ে পড়ে— যদি চলে যেতেই হয়, তবে সৃষ্টির শুরুতে বিধাতা মানুষের বুকে এত মায়ার জন্ম দিলেন কেন? আপনার কি মনে পড়ে না সেইসব বিনিদ্র রাতের কথা? যখন সমস্ত শহর নিথর ঘুমে মগ্ন, আর আপনি বুকের ভেতর এক দুনিয়া একাকীত্ব নিয়ে চেনা কোনো মানুষের ফেলে যাওয়া কণ্ঠস্বর কিংবা চ্যাটবক্সের পুরনো বার্তার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলেছিলেন? সেই অশ্রু তো কোনো তরল পদার্থ ছিল না, ওটা ছিল আপনার আত্মার ভেতরের নিংড়ানো রক্তক্ষরণ। মায়া তো কোনো আগাম নোটিশ দিয়ে আসে না। ও আসে বসন্তের প্রথম বাতাসের মতো অলক্ষ্যে, আর বিদায় নেওয়ার সময় বুকটা একবারে মরুভূমি করে দিয়ে যায়।
নিয়তির আঁধারে অচেনা এক জগৎ খেলা করে, তা আসলে আমাদের ভেতরেরই এক সুপ্ত সত্ত্বা বা নিয়তির এক মায়াবী থিয়েটার। জীবনের চরম আঘাতের মুহূর্তে যখন অহংকার চূর্ণ হয়ে যায়, তখনই মানুষ সেই আধ্যাত্মিক জগতের মুখোমুখি দাঁড়ায় এবং আবিষ্কার করে নিজের আসল রূপ। কোনো এক অচেনা বাঁকে হঠাৎই তার যাত্রা থেমে যায়; অথচ আমাদের রেলগাড়ি তখনও ছুটতে থাকে। জানালার পাশে বসে আমরা শুধু তাকিয়ে থাকি পিছনে পড়ে যাওয়া সেই স্টেশনের দিকে। দূরত্ব বাড়তে থাকে, দৃশ্যগুলো ঝাপসা হয়ে আসে, তবুও মনে হয়—এই তো, আরেকটু পরেই হয়তো ফিরে আসবে সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর, সেই চেনা ডাক, সেই আপন উপস্থিতি। কিন্তু রেলগাড়ি থামে না; জীবনও কারও জন্য থেমে থাকে না।
কিছু সম্পর্কের কোনো নাম হয় না, কোনো সামাজিক পরিচয়ও থাকে না; তবুও তারা জীবনের সবচেয়ে গভীর জায়গাটুকু দখল করে নেয়। কখনো একটি কথোপকথন, কখনো একটুখানি অপেক্ষা, কখনো নিঃশব্দে পাশে থাকার অভ্যাস—এসবই একসময় অদৃশ্য শেকড়ের মতো হৃদয়ের গভীরে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর মানুষটি দূরে সরে গেলে বোঝা যায়, সে শুধু একজন মানুষ ছিল না; সে ছিল আমাদের প্রতিদিনের একটি অংশ, আমাদের অভ্যাসের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক টুকরো জীবন। তবুও জীবন থেমে থাকে না। নতুন সকাল আসে, নতুন মানুষ আসে, নতুন সম্পর্কের দরজা খোলে। আমরা আবার হাসতে শিখি, কথা বলি, সংসারের ব্যস্ততায় ডুবে যাই। বাইরে থেকে মনে হয় সবকিছু আগের মতোই আছে। অথচ হৃদয়ের কোনো এক নির্জন কক্ষে কিছু দরজা আর কখনো খোলে না। সেখানে পড়ে থাকে কিছু অসমাপ্ত কথা, কিছু অপূর্ণ অপেক্ষা, কিছু স্মৃতি—যাদের বয়স বাড়ে, কিন্তু মৃত্যু হয় না।
হয়তো এটাই মায়ার নিয়তি। প্রতিটি প্রাণীই বিদায়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, বিদায়ের সুরে পা দুটো যেন মাটির সাথে লেপ্টে যেতে চায়। চারপাশের চেনা বাতাসও জাপটে ধরে বলতে চায়, ‘আর একটা দিন থেকে যাও না!’ কিন্তু নিয়তির রশি বড় শক্ত, ও আপনাকে টেনে নিয়ে যাবেই। সে মানুষকে চিরকাল কাছে রাখে না; বরং দূরে চলে যাওয়ার পরও তাকে মনে রাখার ক্ষমতা দিয়ে যায়। বিচ্ছেদই মায়ার শেষ নয়—বিচ্ছেদের পর যে শূন্যতা তৈরি হয়, সেই শূন্যতার মধ্যেই মায়া সবচেয়ে দীর্ঘজীবী হয়ে ওঠে। তাই কোনো কোনো রাতের নিস্তব্ধতায়, যখন চারপাশ ঘুমিয়ে থাকে আর হৃদয় একা জেগে থাকে, তখন অকারণেই চোখ ভিজে যায়। কোনো কান্নার শব্দ হয় না, শুধু বুকের ভেতর নিঃশব্দে একটি পুরোনো স্টেশনের কথা মনে পড়ে।
নিয়তির ডাক বড়ই নির্মম; তার আহ্বান এড়িয়ে যাওয়ার সাধ্য কারও নেই। রেলগাড়ি একদিন সবারই শেষ স্টেশনে পৌঁছাবে। তার আগে কত স্টেশন, কত পরিচয়, কত মায়া, কত বিচ্ছেদ পেরিয়ে যেতে হবে—তার হিসাব কারও জানা নেই। শুধু জানা আছে, প্রতিটি আগমনই একদিন প্রস্থানের দিকে এগিয়ে যায়। তবুও মানুষ ভালোবাসবে, মায়ায় জড়াবে, সম্পর্ক গড়বে; কারণ হয়তো চলে যাওয়াই জীবনের শেষ সত্য নয়—কাউকে হৃদয়ে রেখে যাওয়াও এক ধরনের থেকে যাওয়া। আর কোনো এক গভীর রাতে, শেষবারের মতো নিজের বুকের ভেতর তাকালে হয়তো প্রশ্নটা আবার ফি্রে আসবে— “যদি চলে যেতেই হয়, তবে এত মায়া জন্মায় কেন?”
হয়তো মায়া জন্মায়—চিরকাল পাশে থাকার জন্য নয়, চলে যাওয়ার পরও কাউকে ভালোবেসে মায়ার ফ্রেমে বেঁধে রাখার জন্য।
মোঃ আবু হানিফ
৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
Comments
Be this story’s first reader
+25 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.