Story

বাধাহীন দিগন্ত

October 18, 2026

Original Author মোঃ আবু হানিফ

234 views

প্রেমের দায়ে ঘর ছাড়িলাম, ছাড়লাম আপনজন-এক অলীক মোহের টানে, ভালোবাসার এক মায়াবী ভ্রমের পেছনে ছুটে একদিন চেনা ঘর, চেনা আঙিনা আর রক্তের সম্পর্কের মানুষগুলোকে অবলীলায় পেছনে ফেলে আসা হয়েছিল। মনে হয়েছিল, এই প্রেমের স্বর্গেই বুঝি লুকিয়ে আছে জীবনের পরম সার্থকতা। কিন্তু নিয়তির পরিহাস বড় নিষ্ঠুর। সেই মোহের মোহনায় পৌঁছে দেখা গেল চারদিকে কেবল ছলনা আর শূন্যতার বালুচর। যার জন্য সবকিছু ত্যাগ করা হলো, সে-ই একদিন মুখ ফিরিয়ে নিল। মায়ার সেই হাটে নিজের সমস্ত আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে, সংসারের চেনা কূল হারিয়ে আজ শুধু এক বুক হাহাকারই অবশিষ্ট। পেছনের দিনগুলোর দিকে তাকালে এক তীব্র অনুশোচনা বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। স্মৃতির পাতায় ধুলো জমা সেই শুরুর দিনগুলো ছিল বড্ড চঞ্চল। যে আভিজাত্য আর সামাজিক পরিচয় মানুষের অহংকার, তা হারিয়ে আজ জীবনের শেষ খেয়ায় কেবল চোখের জলই পরম সঙ্গী।

চারিদিকে এত কোলাহল, এত মানুষ, অথচ এই বিশাল পৃথিবীটা কেমন যেন রিক্তহস্ত শূন্য। মনের দুঃখ ভারী পাথরের ন্যায় বুকে চেপে শুধু এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটে ঘুরে বেড়ানো। লোকচক্ষুর সামনে সম্মানের শেষ খড়কুটোটুকুও যখন ভেসে যায়, তখন নিভৃত রাতের অন্ধকারে আকাশের নক্ষত্রদের সাক্ষী রেখে শুধু নিজের ভাগ্যকেই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়।

কত দ্রুত কেটে গেল জীবনের সোনালি বসন্তগুলো! অহংকার আর রূপের দম্ভে একসময় পা দুটো মাটিতে পড়তে চাইত না। "দেশ বিদেশে ঘুরলাম কত লইয়া ভরা যৌবন"—পৃথিবীর কত রঙ, কত রূপ, কত পসার চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল। ভেবেছিলাম, এই যৌবনের জোর, এই রূপের আকর্ষণ বুঝি চিরকাল উজান খালের মতো বয়ে যাবে। কিন্তু সময়ের এক একটি ফুঁৎকারে আজ জীবনের সেই সোনালী শিখা নিভে ছাই হয়ে গেছে। কত মানুষের সাথে মেলামেশা হলো, কত জনার সাথে সখ্য হলো, অথচ শেষ বিচারে দেখা গেল কেউই অন্তরের মানুষ হয়ে আপন হয়ে উঠতে পারেনি। ভেতরের সমস্ত আবেগ, ভালোবাসা আর অনুভূতিগুলো ছাইয়ের মতো উড়ে গেছে, কিন্তু কেউ এসে সেই শূন্যতার বুকে একটুখানি স্নেহের প্রলেপ দেয়নি।

আজ জীবনের এই গোধূলিলগ্নে সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো—বুকের ভেতর জমে থাকা এই বেদনার পাহাড় হালকা করার মতো কেউ পাশে নেই। বলবার কোনো মানুষও  নেই।  কেউ নেই, যাকে ডেকে বলা যায় যে মনের ভেতর কতটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। চারপাশের মানুষ শুধু বাইরের ক্ষয়ে যাওয়া অবয়বটাই দেখে, ভেতরের পুড়ে ছাই হওয়া অন্তরটা দেখার চোখ কারও নেই।

আকাশে যখন রাতের প্রথম তারাটি জ্বলে ওঠে, চারপাশ যখন নিস্তব্ধতায় ডুবে যায়, তখন এই নিঃসঙ্গ সত্ত্বাটি মহাবিশ্বের অনন্ত শূন্যতার দিকে তাকিয়ে থাকে। এই একাকীত্ব, এই ঘরহীন পথিকের ক্রন্দন কোনো একজন ব্যক্তির নয়—এ হলো পৃথিবীর সমস্ত মোহগ্রস্ত মানুষের জীবনের শেষ পরিণতি। যতক্ষণ এই দেহরূপ খাঁচায় প্রাণ থাকে, ততক্ষণ মানুষ মরীচিকার পেছনে ছোটে, আর যখন ভুল ভাঙে, তখন কেবল একলা বসে অনন্ত আকাশের দিকে চেয়ে গুনগুন করা ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না- "চন্দ্র সূর্য যত বড়, আমার দুঃখ তার সমান।"

মোঃ আবু হানিফ
০৩ কার্তিক ১৪৩৩

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login