Article

নোবেল লরিয়েট অ্যান কারসন ও আমাদের সেলিম আল দীন

October 8, 2026

63 views

অ্যান কারসন প্রাচীন গ্রিসের ধুলো মুছে তাকে আধুনিক মানুষের হৃদয়ের আয়নায় তুলে ধরেছেন। তিনি এবার সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ পেলেন।

অ্যান কারসন (Anne Carson) ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেলজয়ী কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ধ্রুপদি সাহিত্যের পণ্ডিত। ১৯৫০ সালে টরন্টোতে জন্ম নেওয়া কারসনের লেখায় প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য, পুরাণ ও দর্শনের সঙ্গে আধুনিক মানুষের প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, বিচ্ছেদ ও নিঃসঙ্গতার এক অভিনব সংলাপ তৈরি হয়েছে। Eros the Bittersweet, Autobiography of Red এবং The Beauty of the Husband তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। তাঁর কবিতা প্রচলিত কবিতার সীমানা ভেঙে কবিতা, গদ্য, অনুবাদ, গবেষণা ও নাট্যভাষাকে একসঙ্গে মিশিয়েছে। সুইডিশ একাডেমি তাঁকে পুরস্কৃত করেছে 'bold and inventive oeuvre'-এর জন্য; যেখানে ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপের মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যের নতুন রূপ সৃষ্টি হয়েছে।

নোবেল কমিটির ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক উদ্ধৃতিটি হলো: 'for her bold and inventive oeuvre that, in playful dialogue with the classical tradition, has created new forms for contemporary literature. (ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে খেলাচ্ছলে সংলাপের মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যের নতুন নতুন রূপ সৃষ্টি করা তাঁর সাহসী ও উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্মের জন্য)'।

অর্থাৎ, নোবেল কমিটি মূলত তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে -সাহসী সৃজনশীলতা, ধ্রুপদি সাহিত্যের সঙ্গে নতুন ধরনের সংলাপ এবং সমকালীন সাহিত্যের নতুন আঙ্গিক নির্মাণ। কারসনের বিশেষত্ব হলো কবিতা, গদ্য, নাটক, অনুবাদ ও গবেষণার প্রচলিত সীমারেখাকে একে অন্যের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া।

এইটুকু পাঠ করবার পর এক সেকেন্ডে বাংলা নাট্যসাহিত্যের দিকপাল আমাদের শিক্ষাগুরু নাট্যাচার্য ড. সেলিম আল দীনের নাম মাথায় আসে। কারসনের একই কাজ তো সেলিম আল দীন অনেক আগেই করে গেছেন।

দুজনের সাহিত্যভুবন এক নয়; তারপরও ধারার সীমানা ভেঙে নতুন আঙ্গিক নির্মাণের প্রবণতায় তাঁদের মধ্যে একটি আকর্ষণীয় সাদৃশ্য আছে।

সেলিম আল দীনের নাটকে নাট্য, উপন্যাস, গল্প, কবিতা, লোকআখ্যান, পুরাণ ও ইতিহাস -এসবের উপাদান পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়। বিশেষ করে তাঁর ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘হাত হদাই’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘হরগজ’ কিংবা ‘চাকা’-তে প্রচলিত পাশ্চাত্য নাট্যকাঠামোর বাইরে প্রাচ্য পুরাণ, বাংলা লোকজ আখ্যান ও কথনরীতির এক স্বতন্ত্র রূপ দেখা যায়।

তাই অ্যান কারসনের নোবেল উদ্ধৃতির সঙ্গে সেলিম আল দীনের কাজকে পাশাপাশি রেখে বলা যায়—

অ্যান কারসন যেমন ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপ করে সমকালীন সাহিত্যের নতুন রূপ নির্মাণ করেছেন, সেলিম আল দীনও তেমনি বাংলা লোকঐতিহ্য, আখ্যান, কবিতা, সংগীত ও নাট্যরীতিকে একীভূত করে বাংলা নাটকের প্রচলিত সীমানা অতিক্রম করেছিলেন। তাঁর নাটক শুধু মঞ্চের জন্য লেখা নাটক নয় -তার ভেতরে একই সঙ্গে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, লোককথা ও মহাকাব্যিক আখ্যানের স্বাদ মেলে।

অ্যান কারসন ও সেলিম আল দীনের সাহিত্যভুবন দুই ভিন্ন ভূগোল, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থেকে উঠে এলেও তাঁদের সৃষ্টিশীলতার ভেতরে একটি চমৎকার মিল আছে- দুজনেই সাহিত্যের প্রচলিত সীমানাকে অস্বীকার করে নতুন ফর্ম নির্মাণ করেছেন। ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেলজয়ী অ্যান কারসন ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপের মধ্য দিয়ে কবিতা, গদ্য, পুরাণ, দর্শন ও আখ্যানকে মিলিয়ে সমকালীন সাহিত্যের নতুন ভাষা তৈরি করেছেন; আর বাংলাদেশের নাট্যকার সেলিম আল দীন বাংলা লোকঐতিহ্য, মিথ, ইতিহাস, গান, কবিতা ও আখ্যানকে নাটকের শরীরে এমনভাবে মিশিয়েছেন যে তাঁর নাটক একই সঙ্গে গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও মহাকাব্যের স্বাদ দেয়। নোবেল কমিটি কারসনের কাজকে যে 'new forms for contemporary literature' -সৃষ্টির জন্য প্রশংসা করেছে, সেলিম আল দীনের নাট্যচর্চার দিকে তাকালে মনে হয় -বাংলা ভাষায় তিনিও বহু আগেই নিজস্ব এক নতুন নাট্যভাষা ও আঙ্গিক নির্মাণের দুঃসাহসী অভিযাত্রায় নেমেছিলেন।

আফসোস আমার শিক্ষক সেলিম আল দীনের জীবদ্দশায় তাঁর নাট্যসাহিত্যের ভালো কোনো ইংরেজি অনুবাদ হয়নি। আর সেই অনুবাদ নোবেল কমিটির কাছে কেউ পৌঁছায়ওনি। কে জানে নোবেল সাহিত্য কমিটি যদি সেলিম আল দীনকে রিড করতে পারত -বাংলা ভাষার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর আরেকবার এই বাংলা হয়ত সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের স্পর্শ পেত।

অভিনন্দন অ্যান কারসন। আপনাকে আমরা পড়তে চাই। আপনাকে অনুধাবন করতে করতেই আমার শিক্ষক সেলিম আল দীনকেও স্মরণের সুবর্ণ পাতায় যত্ন করে রাখতে চাই।

লেখক: সাংবাদিক

৯ অক্টোবর ২০২৬

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim