১
মোবারক খুব নিপুণ হাতে মুরগীর পালকটার দুদিক হতে পালকগুলো ছিঁড়ে নিল। এখন শুধু পালকটার একেবারে শেষ মাথায় কিছু পালক আছে। এবার পালকটাকে কানের ভেতর নিয়ে দু আংগুলে পালকটা ঘুরিয়ে কান চুলকাতে লাগলো। আবেশে একটা চোখ বন্ধ হয়ে গেল তার। দরজার চৌকাঠে বসে দরজার পাল্লায় হেলান দিয়ে সে কান চুলকাতে চুলকাতে উঠোনে তার বউ নাহারের দিকে তাকিয়ে আছে। নাহার উঠোন ঝাড়ু দিচ্ছে। কেন যেন নাহারকে কিছুটা উবু হয়ে ঝাড়ু দিতে দেখে তার মনটা খুশী খুশী হয়ে গেল। আর বেশী দিন না, আর মাত্র কয়েক মাস।
বিয়ের ছয় বছরের মাথায় নাহার মা হতে চলেছে।
মোবারকের মনে অন্যরকম আনন্দ। যেদিন সে এ খবরটা পেয়েছে, সেদিন হতেই তার মনে একটা বেহেশতি আনন্দ। ঢাকায় সি এন জি চালাতো মোবারক। খবরটা পাবার পরদিনই সে গ্রামে চলে এসেছে। সে ঠিক করেছে, সন্তানের জন্ম পর্যন্ত সে বাড়িতেই থাকবে। জীবনে অনেক রকম দিন আসবে, কিন্তু এরকম দিন আর আসবে না। নাহারের মা হবার এ দিনগুলো তার কাছে স্বপ্নের মতো লাগছে।
এমনিতেই বাড়িতে নাহার যে খুব একটা শান্তিতে আছে, তা নয়। নাহারের পেটে বাচ্চা আসার খবরটার আগেরদিন পর্যন্ত শ্বাশুড়ির কথার অত্যাচারের বৃষ্টি সহ্য করে গেছে সে। কথায় কথায় প্রতিদিন তাকে বাঁজা গালিও শুনতে হয়েছে। মোবারককে আবার বিয়ে দিয়ে বংশের বাতি আনার কথাও বলেছে মোবারকের মা। মোবারকের হয়েছে আরেক জ্বালা। বাড়ি আসলেই মায়ের কাছ হতে আবার বিয়ের কথা শুনতে হয়। রাগে মাঝে মাঝে বাড়ি আসা বন্ধ করে দেয়। তখন আবার নাহারের উপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়ে। মাঝে মাঝে কোন কারণ ছাড়াই মোবারকের মা বিলাপ করে কান্না শুরু করে। কোথা থেকে এই ছোটলোকের বেটি আসলো এই সংসারে! এই সংসারকে নির্বংশ করে দিল এই টা। নাহার ঘরের ভেতর দাঁতে দাঁত চেপে কান্না আটকে রাখে। কান্নার আওয়াজ শুনলে বুড়িটা আরো জোরে জোরে বিলাপ করবে, আশেপাশের কয়েক বাড়ি অব্দি সেই বিলাপের কান্না শোনা যাবে।
মোবারক কান হতে মুরগীর পালকটা বের করে ঘরের বেড়ার মধ্যে গুঁজে রেখে ডাক দিল,
-নাহার, এই নাহার।
- জ্বী, বলেন।
- ঝাড়ু রেখে এদিকে আসো।
- আরেকটু বাকী আছে। শেষ করে আসি।
হাতের কাজটা রেখে আসবে না নাহার, জানত মোবারক। তবু ডাক দিলো। নাহারের কথার আওয়াজ শোনার জন্যেই ডেকেছিল।
২
দুপুরে ভাত খেতে বসেছে মোবারক। খেতে খেতে নাহারকে জিজ্ঞেস করল,
- মা কই? মা খেতে আসবে না?
- আপনে ডাক দেন। আমি ডাকলে বাড়িতে আবার আগুন লাগবে।
মোবারক কিছু বলল না। কিছুক্ষণ আগেই বাড়িতে এক পশলা ঝড় তুফান হয়ে গেছে। কোন কারণ ছাড়াই ঘর থেকে বেরিয়ে মোবারকের মা এসে মোবারককে গালীগালাজ করা শুরু করল। বউ এর পেটে বাচ্চা আসার খবরে মোবারক বাড়িতে এসে মায়ের দিকে খেয়াল রাখছে না, মায়ের সাথে কথাও নাকি বলছে না ঠিকমতো- এটাই অভিযোগ।
মোবারক যখন বলে উঠলো, সকালেই তো আপনের সাথে কথা বলে আপনার পান সুপারী কিনে আনলাম। ক্যামনে কন, আপনের সাথে কথা বলতেছি না?
ব্যাস, আগুনে যেন আরো কেরোসিন ঢালা হয়ে গেল।
- ঐ ___ তোরে চিনি পড়া খাওয়াইছে, তোরে তাবিজ করছে, তুই এখন ঐ ছোট লোকের মাইয়ার কথায় উঠস বহস।
মোবারক একসময় সহ্য করতে না পেরে বলল, দুনিয়ার কোন কিছুতে আপনের শোকর নাই। নিজের পোলার সংসারে শান্তি দেখলেও আপনের গা জ্বলে।
এরপর আর দিপাক্ষিক কোন কথা থাকলো না, যা বলার মোবারকের মা'ই বলতে থাকল। একসময় অসহ্য লেগে গেল। মনে হলো আরো কয়েকটা কথা শুনিয়ে দেবে কিনা! থাক, মুরুব্বী মানুষ। আর কোন কথা না বলে মোবারক চুপ করেই রইল। কিছুক্ষণ পর আশ্চর্য হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল সে। ঝগড়া বা গালীগালাজ করার জন্য এত শক্তি পায় কোথা থেকে এই বয়সে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার চুপ করে রইল সে।
মোবারক মাকে আর ডাকলো না। চুপচাপ ভাত খেতে থাকল। খাবারের মাঝপথে কি মনে করে নাহারকে বলল,
- তুমি খেয়ে নাও।
- না, আমি আম্মার সাথেই খাব। এখন আপনের সাথে খেয়ে ফেললে, আজ বাড়িতে আরো অশান্তি শুরু হবে।
মোবারকের মন খারাপ হয়ে গেল। এটা কিসের মধ্যে বউটাকে রেখেছে সে! নাহার বোধহয় মাঝে মাঝে মোবারকের মনের কথা বুঝে ফেলে। সে বলল,
- শুনেন, এইসব নিয়ে আপনে মন খারাপ কইরেন না। আমিতো এইখানে থাকি, এইগুলা আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। আপনে হঠাৎ হঠাৎ আসেন, একদিন দুইদিন থাইকা চইলা যান। এইবারে আপনে লম্বা দিন থাকতাছেন, তাই আপনের কাছে এইরকম খারাপ লাগতাছে। আর কয়দিন গেলে সহ্য হইয়া যাইব।
মোবারক কিছু না বলে নাহারের দিকে তাকিয়ে রইল। নাহারের সহ্যশক্তি তো ভয়ানক! তার নিজেরই মাঝে মাঝে রাগে মাথায় খুন চেপে যাচ্ছিল আর একটু হলেই। প্রতিদিনই কোন না কোন বাহানায় এরকম ঘটছেই। অসহ্য!
৩
- বুঝলা নাহার, ঢাকা থেকে মহাজন ফোন করছে কয়েকবার। ঢাকায় যাইতে বলতেছে।
- আপনে এতদিন বইসা রইলেন বাড়িতে, আমারই তো মাঝে মাঝে অবাক লাগছে।
- যাইতে ইচ্ছা করতেছে না।
- না যাইয়া আপনের উপায় আছে? এখন কি বইসা থাকার উপায় আছে? সামনে তো খরচ আছে মেলা।
- ঠিক কইছ, বউ। কালকা ঢাকায় যাই। কয়েকদিন গাড়ি চালাইয়া আসি। হাত খালী হইয়া যাইতাছে। তুমি শুইবানা?
- একটু ধৈর্য ধরেন। মশারীটা লাগাইয়া লই।
মশারীটা গুঁজে নিয়ে মোবারকের পাশে শুয়েই নাহার তার দিকে তাকিয়ে বলল,
- আপনের মাথায় চুল পাকলো ক্যামনে এই অল্প বয়সে?
- ড্রাইভারের চাকুরিটা ভাল না বউ। কত রকম প্যাসেঞ্জার, আবার মাঝে মইধ্যে সার্জেন্টরা ঝামেলা করে। সারাদিন এইগুলা সামলাইতে সামলাইতে মাথা ঠিক থাকে না। তুমি বুঝবা না বউ, সি এন জির ড্রাইভার মানে সারাদিন একটা আজাবের মধ্যে থাকা।
- আর কিছু করা যায় না?
- আর তো কিছুই জানিনা। জানলে তো এই কাম বাদ দিতাম।
বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মোবারক। মাঝে মাঝেই তার মনে হয়েছে এ কাজটা ছেড়ে দেয়, কিন্তু সাহস পায় না বলে অন্য কোন দিকে সে নজর দেয় না।
ঢাকায় সে থাকতে চায়ও না, গ্রামে ফিরে যেতে চায় সে। ভাবতে ভাবতে মোবারক বোধহয় একটু আনমনা হয়ে গিয়েছিল। ডান দিকে কাত হয়ে নাহারের দিকে পাশ ফিরে নাহারের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। নাহারের দিকে তাকাতেই অসীম মায়ায় মনটা আরো ভারী হয়ে গেল। আজ সে তার পাশে আছে বলেই সে হয়ত এরকম একটা নিশ্চিন্তির ঘুম দিতে পারছে। এখানে একটা অমানুষিক মানসিক অত্যাচারের ভেতর দিয়ে জীবন কাটাচ্ছে সে। সে নিজে বাড়িতে থাকার পরেও যদি এ অবস্থা হয়, তাহলে সে বাড়িতে না থাকলে কি যে হয়, ভাবতেও পারছে না সে। মাকেও কিছু বলার নাই। একমাত্র সন্তান সে, মাকে ফেলে রেখে নাহারকে শহরে নিয়ে যাওয়াটা মায়ের সাথে একটা মোনাফেকি হয়ে যাবে। ছোটবেলায় বাবা মারা গেলে এই মা'ইতো তাকে কষ্ট করে বড় করেছে। যে অপরিসীম কষ্ট নিয়ে তাঁকে বড় করেছে মা, তা আর বলার মতো নয়। নাহারের সাথে রাগারাগি করে তো অন্য কারণে। ছেলে মায়ের কাছ হতে দূরে সরে যাচ্ছে কিনা, সে ভয়ে। এগুলো মোবারক খুব বোঝে। মাকে আস্তে আস্তে বোঝাতে হবে। না বুঝলেও করার কিছু নাই। কাউকে ছেড়ে দেয়ার ক্ষমতা নাই তার।
নাহারের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে হঠাৎই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, সে আর ঢাকা যাবে না। বাড়ির সামনেই যে রাস্তাটা সে রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকান দেবে সে। কম বেশী যাই আয় হোক, আধবেলা খেয়েও নিজের সংসারের সাথেই থাকবে বলে ঠিক করল সে। সামনের দিনগুলোতে কি অপেক্ষা করছে, তা সে জানে না। তার একটা সন্তান আসবে। মা, নাহার, তার সন্তানসহ সবাই যেন ভাল থাকে। যে অল্প কটা দোয়া জানে, সেগুলোই পড়তে লাগলো, একমাত্র আল্লাহই তার সবকিছু সুন্দর করে গোছাতে পারেন। আল্লাহ যেন তার সবকিছু শান্তিময় করে দেন। বিড়বিড় করে আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে মোবারকের কেন যেন কান্না এসে গেল। একবার চোখ মুছতে গিয়েও মুছলো না। নিবিড় প্রার্থনায় কান্না করায় লজ্জা কিসের!
Comments
Be this story’s first reader
+35 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.