ইউফ্রেটিস নদীর বুক চিরে ভেসে আসা বাতাসটা রাতের আঁধারে ঠান্ডা হয়ে জমে আসছিল। ইরাকের হিল্লাহ শহরের প্রান্তে যখন জাবির আল-মুনসিরের জিপের ইঞ্জিনটা হঠাৎ গোঙানি দিয়ে থেমে গেল, দিগন্তে তখন এক ফোঁটাও চাঁদের আলো ছিল না। ধুলোমাখা বাতাসের মাঝে মিশে ছিল অদ্ভুত এক ভেজা গন্ধ, শতবর্ষ প্রাচীন পচা পাতা, জমাট রক্ত আর গুমোট নোনা মাটির মিশ্রণ। জাবির কোনো সাধারণ পর্যটক বা শৌখিন প্রত্নতাত্ত্বিক নন। বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতার গবেষক তিনি। কিন্তু একাডেমিয়ার চেনা গণ্ডির বাইরে তাঁর গোপন এক তৃষ্ণা ছিল, যে সত্য ইতিহাস বইয়ের পাতা থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে দেওয়া হয়েছে, সেই অন্ধকারে হাত বাড়ানো। গত দশ বছর ধরে তিনি একটাই মিথের পেছনে তাড়া করে ফিরেছেন: খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে সম্রাট দ্বিতীয় নেবুচাদনেজারের তৈরি ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান । আধুনিক ইতিহাসবিদরা বলেন, উদ্যানটির কোনো সুনির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই; কেউ বলেন ওটা ছিল নিনেভেতে, কেউবা নিছক রূপকথা বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু জাবির ইস্তাম্বুলের এক চোরাবাজার থেকে উদ্ধার করা একটি কিউনিফর্ম মাটির ফলকের পাঠোদ্ধার করেছিলেন। ফলকের পোড়া কাদামাটির ওপর খোদাই করা ছিল ভয়াল এক সতর্কবার্তা:
“সম্রাট তাঁর প্রিয়তমা রানি আমিতিসের জন্য পাহাড়ি বাগান বানাননি, বানিয়েছিলেন এক জীবন্ত ক্ষুধা শান্ত করতে। শূন্যে ঝুলন্ত পাথরের বুক চিরে যে শিকড় নেমেছিল, তা জল পান করেনি, করেছিল মাংস আর আত্মার নির্যাস। যা মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকার কথা ছিল, তাকে তিনি আকাশে তুলে ধরেছিলেন।”
সেই ফলকের স্থানাঙ্ক মিলিয়েই জাবির আজ এই নিষিদ্ধ বালিয়াড়িতে এসে পৌঁছেছেন। গাড়ির হেডলাইট নিভিয়ে জাবির হ্যালোজেন টর্চটা হাতে নিলেন। তাঁর পিঠে ভারী ব্যাকপ্যাক, কোমরে নাইন এমএম পিস্তল আর প্রাচীন কিউনিফর্ম লিপির ডিকোড করা নোটবুক। গাড়ি থেকে নেমে কয়েক পা ফেলতেই তাঁর মনে হলো, চারপাশের বাতাস হঠাৎ করেই স্থির হয়ে গেছে। কোনো রাতজাগা পোকার ডাক নেই, নেই দূর মরুভূমির শেয়ালের ডাক। কেবল শূন্যতা। এক বধির করে দেওয়া পিনপতন নীরবতা। সামনে বালির একটা বিশাল ঢিবি। সাধারণ চোখে মনে হবে কয়েক হাজার বছরের ক্ষয়ে যাওয়া মাটির টিলা। কিন্তু জাবির মেটাল ডিটেক্টর আর গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডার নিয়ে এসেছিলেন। যন্ত্রটা চালু করতেই স্ক্রিনের ওপর তরঙ্গগুলো অস্বাভাবিকভাবে কাঁপতে লাগল। রাডার স্পষ্ট দেখাচ্ছে, বালির ঠিক পনেরো মিটার নিচে কোনো ফাঁপা স্থাপত্য রয়েছে। এবং তার আকৃতি জ্যামিতিক, স্তরবিশিষ্ট।
জাবির তাঁর ভাঁজ করা ছোট বেলচা নিয়ে নেমে পড়লেন। প্রাচীন সুরঙ্গের মুখটা পেতে তাঁকে খুব বেশি বেগ পেতে হলো না। কয়েক শতাব্দী আগের এক ভূমিকম্পে হয়তো ছাদের একটা অংশ ধসে পড়েছিল, যা পরে বালিতে ঢাকা পড়ে যায়। প্রায় দু’ঘণ্টা একটানা খোঁড়াখুঁড়ির পর তাঁর বেলচার ফলা সশব্দে কোনো শক্ত পাথরে আঘাত করল। পাথর নয়, পোড়ামাটির বিশাল ইট। তাতে টার (বিটুমেন) দিয়ে জলরোধক প্রলেপ দেওয়া। সেই প্রাচীন ব্যাবিলনীয় প্রযুক্তির স্পষ্ট ছাপ। ইটগুলো আলগা করে জাবির যে গহ্বর তৈরি করলেন, তা দিয়ে একজন মানুষ কোনোমতে গলে যেতে পারে।
টর্চের আলো ফেলতেই জাবিরের বুকের স্পন্দন থমকে গেল। গহ্বরের নিচে অনন্ত অন্ধকার। আর সেখান থেকে উঠে আসছে অদ্ভুত এক গন্ধ, তা পচা মাটির নয়, বরং তীব্র সুবাসিত কোনো ভেষজ আর কাঁচা মাংসের পচনের মিশ্রণ। যেন কোনো সুরভিত শবদেহ ধীরে ধীরে গলছে।
জাবির নিজের মুখে ফিল্টার মাস্ক এঁটে নিলেন। তারপর নাইলনের দড়ি শক্ত করে বেঁধে নেমে গেলেন পাতালে। পা মাটিতে ঠেকতেই তিনি চারপাশে আলো ফেললেন। যা দেখলেন, তাতে তাঁর ধমনীতে রক্ত চলাচল কয়েক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। তিনি কোনো সাধারণ কবরে নামেননি। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন এক অবিশ্বাস্য মহাপ্রাসাদের তোরণদ্বারে। চারপাশের খিলানগুলো বিশাল বিশাল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মেসোপটেমিয়ার সেই বিখ্যাত নীল চকচকে ইটের ওপর ড্রাগন আর ষাঁড়ের প্রতিকৃতি। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, পাথরের প্রতিটি জোড় বেয়ে নেমে এসেছে অতিপ্রাকৃতিক আকারের কিছু কালো লতা। লতাগুলো মানুষের ঊরুর মতো মোটা, আর তাদের গা দিয়ে চুইয়ে পড়ছে কালচে লাল রঙের পিচ্ছিল তরল।
সবচেয়ে অস্বাভাবিক ব্যাপার, লতাগুলো জীবিত। কোনো মাটির সংস্পর্শ ছাড়াই তারা পাথরের বুক চিরে গজিয়ে উঠেছে। জাবির টর্চের আলো স্থির করতেই স্পষ্ট দেখতে পেলেন, লতার গায়ের সূক্ষ্ম শিরা-উপশিরাগুলো রক্তের স্পন্দনের মতো ধীরে ধীরে স্পন্দিত হচ্ছে।
“অসম্ভব...” জাবিরের মুখ থেকে অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এলো।
তিনি সামনের দিকে এগোলেন। খিলানের পর খিলান পেরিয়ে পথটা ওপরের দিকে উঠে গেছে। সিঁড়িগুলো স্তরে স্তরে সাজানো। ঠিক যেমনটা প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ স্ট্রাবো বর্ণনা করেছিলেন, একটি পিরামিডাকার ছাদবাগান, যার প্রতিটি স্তর দাঁড়িয়ে আছে বিশাল ভল্টের ওপর। কিন্তু এটা বাগান নয়। এটা এক নরককুণ্ড। প্রথম স্তরের চাতালে পা রাখতেই জাবিরের বুটের তলায় মট করে কিছু ভেঙে গেল। টর্চ নামিয়ে তিনি শিউরে উঠলেন। ওটা মানুষের মাথার খুলি। শুধু একটা নয়, মেঝেতে ছড়িয়ে আছে শত শত কঙ্কাল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে থাকা নরকঙ্কালের স্তূপ। প্রতিটি কঙ্কালের হাড়ের ভেতর দিয়ে পেঁচিয়ে ঢুকে গেছে সেই অদ্ভুত উদ্ভিদের কালো শিকড়। যেন হাড়ের মজ্জা শুষে নিয়ে বেঁচে আছে এই বাগান।
হঠাৎ জাবিরের কানের কাছে এক ফিসফিসানি ভেসে এলো। কোনো অশরীরী ভাষার সুর। শব্দগুলো চেনা নয়, কিন্তু মেসোপটেমীয় প্রাচীন আক্কাদীয় ভাষার স্বরভঙ্গির সাথে অদ্ভুত মিল।
“...ইশতার... নারগাল... তাম্মুজ...”
জাবির থমকে দাঁড়িয়ে পিস্তল বের করলেন। “কে? কে ওখানে?”
তাঁর কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি চারপাশের পাথুরে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে বিকৃত হয়ে ফিরে এলো। কেউ উত্তর দিল না। কেবল দেওয়ালের ওপর ঝুলন্ত লতাগুলো যেন একটু নড়ে উঠল। জাবিরের মনে হলো, অন্ধকার থেকে শত শত অদৃশ্য চোখ তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ্য করছে।
তিনি দ্রুত পা চালিয়ে দ্বিতীয় স্তরে উঠলেন। সেখানে পৌঁছাতেই দৃশ্যপট আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। এই স্তরের মাঝখানে একটি বিশাল জলাশয় ছিল এককালে। মেসোপটেমিয়ার ইতিহাস বলে, ইউফ্রেটিস নদী থেকে স্ক্রু-পাম্প দিয়ে জল তুলে বাগানের শীর্ষে নেওয়া হতো। কিন্তু এখন সেই জলাধারের তলদেশে কোনো জল নেই। সেখানে জমে আছে গাঢ়, আলকাতরার মতো ঘন এক তরল। সেই তরলের মাঝখান থেকে জেগে উঠেছে একটি বিশাল ব্রোঞ্জের মূর্তি। মূর্তিটি কোনো নারীর। মুখাবয়ব নিখুঁত, কিন্তু চোখ দুটোর জায়গায় কেবল দুটি শূন্য অন্ধকার গহ্বর। জাবির বুঝতে পারলেন, এটি রানি আমিতিসের মূর্তি নয়। এটি পাতালপুরীর দেবী এরেশকিগালের ভয়াল প্রতিমূর্তি।
মূর্তিটির বুকের ঠিক মাঝখান থেকে ফেটে বেরিয়েছে বাগানের মূল কাণ্ডটি। এক দানবীয় বৃক্ষ, যার ডালপালা পুরো ছাদজুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বৃক্ষের পাতাগুলো কুচকুচে কালো, আর তার ফুলগুলো দেখতে মানুষের বিকৃত মুখমণ্ডলের মতো। ফুলগুলোর পাপড়ির ফাঁক থেকে রক্তবর্ণের পরাগরেণু ঝরে পড়ছে। জাবির যখন সেই অতিপ্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা বের করলেন, ঠিক তখনই পাথরের মেঝেতে এক ভারী পতনের শব্দ হলো। ধপ! জাবির বিদ্যুতবেগে টর্চ ঘোরালেন। কয়েক গজ দূরে, ছাদের অন্ধকার থেকে খসে পড়েছে একটি দেহ। জাবির সতর্ক পায়ে এগিয়ে গেলেন। টর্চের আলো পড়তেই তাঁর হৃৎপিণ্ড যেন গলায় উঠে এলো। ওটা কোনো প্রাচীন মমি নয়। পরনে আধুনিক সামরিক পোশাক। পোশাকে ইরাকি সেনাবাহিনীর ব্যাজ। দেহটি খুব বেশি পুরোনো নয়, হয়তো কয়েক মাসের। কিন্তু দেহের অবস্থা দেখে জাবিরের পাকস্থলী মুচড়ে উঠল।
লোকটির সারা শরীরে মাংসের নিচে চামড়া ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে সরু সরু সবুজ ও কালো শিকড়। চোখ দুটো উপড়ে ফেলে সেখানে ফুটে উঠেছে ছোট ছোট রক্তিম ফুল। লোকটির বুকটা হঠাৎ করে একবার ওঠানামা করল! জাবির পিছপা হলেন। মৃতদেহটি বেঁচে নেই, কিন্তু তার ভেতরে থাকা উদ্ভিদটি শরীরটাকে এক পুতুলের মতো ব্যবহার করছে। হঠাৎ সেই মৃতদেহের চোয়ালটি অস্বাভাবিক কোণে খুলে গেল। এক অমানুষিক, ধাতব কর্কশ শব্দে বাতাস কেঁপে উঠল:
“যে মাংস নিয়ে আসে... সে মাংস হয়ে যায়...”
জাবিরের স্নায়ু আর সহ্য করতে পারল না। তিনি ব্যাকপ্যাক ফেলে রেখে পাগলের মতো পেছনের সিঁড়ির দিকে দৌড়াতে লাগলেন। কিন্তু ততক্ষণে বাগানটি সম্পূর্ণ জেগে উঠেছে।
চারপাশের দেওয়াল থেকে খসখস শব্দে নেমে আসতে লাগল হাজার হাজার কালো লতা। তারা সাপের মতো মসৃণ গতিতে মেঝের ওপর কিলবিল করতে লাগল। বাতাস ভরে গেল এক বিষাক্ত, তীব্র মিষ্ট গন্ধে—যা মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করামাত্র চেতনাকে অসাড় করে দেয়। জাবির টের পেলেন, তাঁর মাথা ঘুরছে। পা দুটি ভারী হয়ে আসছে, যেন মাটিতে শিকড় গজিয়ে যাচ্ছে।
“না! এটা হতে পারে না!” জাবির নিজের উরুতে চিমটি কেটে চেতনা ধরে রাখার চেষ্টা করলেন।
একটি লতা হঠাৎ চাবুকের মতো এসে তাঁর ডান পায়ে জড়িয়ে ধরল। টান মেরে তাঁকে ফেলে দেওয়া হলো শক্ত পাথুরে মেঝেতে। ব্যথায় চিৎকার করে উঠলেন জাবির। লতাটি বরফের মতো ঠান্ডা, কিন্তু তার গায়ে থাকা কাঁটাগুলো মুহূর্তেই জাবিরের ট্রাউজার ভেদ করে মাংসের গভীরে বসে গেল। তিনি অনুভব করলেন, কাঁটাগুলো দিয়ে কিছু একটা তাঁর রক্তে প্রবেশ করছে, এক অবশকারী বিষ।
জাবির পিস্তল তাক করে লতাটির ওপর পর পর তিনটি গুলি চালালেন।গুড়ুম! গুড়ুম! গুড়ুম!
গুলির আঘাতে লতাটি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল এবং সেখান থেকে ছিটকে এলো ঘন, কালো তরল—যা জাবিরের জ্যাকেটে পড়তেই অ্যাসিডের মতো ধোঁয়া উঠতে লাগল। লতাটি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে তাঁকে ছেড়ে দিল। জাবির কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে আবার ছুটলেন। কিন্তু নিচের স্তরে নামার সিঁড়িটি ততক্ষণে লতার জালে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। শিকড়গুলো দেওয়ালের মতো পুরু হয়ে প্রবেশপথ ঢেকে ফেলেছে।
তিনি আটকা পড়েছেন। ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের ক্ষুধা মেটানোর জন্য নতুন এক শিকার হিসেবে তিনি বন্দি। একমাত্র পথ এখন ওপরের দিকে। ছাদের উন্মুক্ত চাতাল, যেখান থেকে তিনি নিচে নেমেছিলেন। জাবির দাঁতে দাঁত চেপে তৃতীয় স্তরের দিকে উঠতে লাগলেন। প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল নরকযন্ত্রণা। তাঁর ডান পা তখন বিষে অবশ হয়ে আসছে, কালচে হয়ে ফুলে উঠছে মাংস।
তৃতীয় স্তরে পৌঁছাতেই বাতাস কিছুটা ঠান্ডা ঠেকল। কিন্তু এই স্তরের মাঝখানে যা ছিল, তা দেখে জাবিরের শেষ আশাটুকুও ধূলিসাৎ হয়ে গেল। এখানে একটি পাথরের বেদি। আর সেই বেদির ওপর শায়িত একটি অবয়ব। কাছে যেতেই জাবির দেখলেন, সেটি একজন নারীর মৃতদেহ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আড়াই হাজার বছর পরও দেহটিতে পচনের কোনো চিহ্ন নেই। ত্বক ফ্যাকাশে শ্বেতপাথরের মতো মসৃণ। সোনালি সুতোয় বোনা প্রাচীন রাজকীয় মিডিয়ান পোশাক তাঁর পরনে। রানি আমিতিস!
কিন্তু তিনি মৃত নন, আবার জীবিতও নন। তাঁর উন্মুক্ত বুকের মাঝখানে হৃদপিণ্ডের জায়গায় প্রোথিত হয়ে আছে মূল রক্তবৃক্ষের একটি বিশাল মূল। সেই শিকড়টি রানির হৃদস্পন্দনের সাথে তাল মিলিয়ে ওঠানামা করছে। আর রানির কপালের চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে এসেছে দুটি শাখা, যা পেঁচিয়ে তৈরি করেছে এক বীভৎস প্রাকৃতিক মুকুট।
হঠাৎ আমিতিসের চোখ খুলে গেল। সেই চোখে কোনো মণি ছিল না। কেবল ঘন, অতল এক সবুজ আভা। সেই চোখের দিকে তাকানো মাত্রই জাবিরের মস্তিষ্ক জুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল হাজার হাজার আর্তনাদ। তিনি শুনতে পেলেন হাজার হাজার ক্রীতদাসের চিৎকার, যাদের রক্ত দিয়ে এই বাগানের মাটি তৈরি হয়েছিল। তিনি দেখলেন সম্রাট নেবুচাদনেজারের উন্মাদ চোখ, যিনি তাঁর সাম্রাজ্যকে অমর করতে গিয়ে পাতালে থাকা এক আদিম অপদেবতাকে ডেকে এনেছিলেন এই বাগানের রূপে। এই বাগান কোনো প্রেমের নিদর্শন ছিল না; এটি ছিল এক জীবন্ত পরজীবী দেবতা, যা মানুষের প্রাণের বিনিময়ে রাজাকে দিয়েছিল অপরিসীম ক্ষমতা।
রানির ঠোঁট দুটো ধীরে ধীরে নড়ে উঠল। শব্দহীন হলেও জাবিরের মনের ভেতর সেই কণ্ঠ করাত দিয়ে কাটার মতো বিঁধতে লাগল:
“তুমি আমাদের খুঁজতে এসেছিলে, পর্যটক? তুমি কি জানো না, ব্যাবিলন কখনো ধ্বংস হয়নি? ব্যাবিলন কেবল ঘুমিয়ে ছিল... মাটির নিচে... ক্ষুধার্ত হয়ে।”
চারপাশ থেকে লতাগুলো দেওয়াল বেয়ে উঠে এসে আমিতিসের বেদির চারপাশে এক মঞ্চ তৈরি করল। জাবিরের পায়ের তলার মেঝে কাঁপতে লাগল। তিনি দেখলেন, তাঁর চারপাশে শত শত কঙ্কাল ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াচ্ছে। লতাগুলো কঙ্কালের হাড়ের জোড়গুলোকে সুতোর মতো টেনে ধরে তাদের দাঁড় করাচ্ছে। মৃত সৈনিক, দাস, পুরোহিত, সবার হাড়ের ভেতর দিয়ে স্পন্দিত হচ্ছে সেই একই রক্তিম তরল।
তারা বৃত্তাকারে জাবিরকে ঘিরে ফেলতে লাগল। জাবিরের পিস্তলে আর মাত্র দুটি গুলি অবশিষ্ট ছিল। তিনি জানতেন, এই দানবদের বিরুদ্ধে গুলি চালানো অর্থহীন। তাঁর দৃষ্টি গেল নিজের ব্যাকপ্যাকের দিকে, যা তিনি সিঁড়ির মুখে ফেলে এসেছিলেন। সেখানে ছিল তিনটি ফসফরাস ফ্ল্যাশ-গ্রেনেড আর জরুরি সিগন্যাল ফ্লেয়ার, যা তিনি সুরঙ্গের ভেতরে আলোর জন্য এনেছিলেন। কিন্তু ব্যাকপ্যাক তো নিচে! না, তাঁর জ্যাকেটের ভেতরের পকেটে ছিল একটি জরুরি ম্যাগনেসিয়াম ফ্লেয়ার।
জীবনের শেষ বাজি ধরার সময় এসে গেছে। জাবির ভালো করেই জানেন, ম্যাগনেসিয়ামের আগুন সাধারণ আগুনে নেভে না। এটি হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে জ্বলে। আর উদ্ভিদ, তা যতই অতিপ্রাকৃতিক হোক না কেন, আগুনের বিরুদ্ধে চিরকালই দুর্বল। কঙ্কালের দল যখন তাঁর থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে, জাবির পকেট থেকে ফ্লেয়ারটি বের করলেন। আমিতিসের ফ্যাকাশে মুখে যেন এক মুহূর্তের জন্য ভীতির ছায়া পড়ল। তিনি হিসহিসিয়ে উঠলেন: “থামো! তুমি আমাদের অমরত্বের অংশ হতে পারতে... তুমি হবে আমাদের প্রথম বীজ, যে এই অন্ধকার থেকে পৃথিবীর আলোয় ছড়িয়ে পড়বে...”
“নরকে যাও তুমি আর তোমার বাগান!” জাবির চিৎকার করে উঠলেন।
তিনি ফ্লেয়ারের পিন টেনে বের করলেন এবং সজোরে আঘাত করলেন বেদির ঠিক পেছনে থাকা মূল বৃক্ষের কাণ্ডে।মুহূর্তের মধ্যে এক অন্ধ করে দেওয়া সাদা আলোয় পুরো পাতালপুরী আলোকিত হয়ে উঠল। ম্যাগ নেসিয়ামের তীব্র নীলচে-সাদা শিখা স্পর্শ করামাত্র বৃক্ষের গায়ের সেই বিটুমেন এবং রজনযুক্ত তেল দাউদাউ করে জ্বলে উঠল।
এক অবর্ণনীয়, মহাজাগতিক চিৎকারে কেঁপে উঠল মাটির নিচের বাগান। সে চিৎকার কোনো মানুষের নয়, কোনো পশুরও নয়, যেন আস্ত একটা বনভূমি জীবন্ত পুড়ে যাওয়ার আর্তনাদ। আগুন অবিশ্বাস্য গতিতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল লতাগুলোর শিরা বেয়ে। যেখানে যেখানে কালো রক্ত বইছিল, সেখানেই আগুন বিস্ফোরিত হতে লাগল বারুদের মতো। কঙ্কালগুলো আগুনের শিখায় জড়িয়ে পড়ে একে একে ভেঙে ধুলোয় মিশে যেতে লাগল।
বেদির ওপর থাকা রানি আমিতিসের দেহটি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে চিৎকার করতে করতে কয়লা হয়ে যেতে লাগল। তাঁর সবুজ চোখের আভা মিলিয়ে গেল আগুনের লেলিহান শিখায়। ধোঁয়া আর বিষাক্ত গ্যাসে জাবিরের দম বন্ধ হয়ে আসছিল। বিস্ফোরণের ধাক্কায় ছাদের প্রাচীন ইটগুলো খসে পড়তে শুরু করল। পুরো কাঠামোটি ধসে পড়ছে। জাবির তাঁর অবশ পা টেনে টেনে, অমানুষিক শক্তি সঞ্চয় করে ওপরের খিলানের ভাঙা অংশের দিকে এগোতে লাগলেন। যেখানে তিনি প্রথম গর্তটি খুঁড়েছিলেন, সেখান দিয়ে রাতের ঠান্ডা বাতাস আর এক চিলতে ধুলোমাখা আকাশ দেখা যাচ্ছিল।
লতাগুলো জ্বলন্ত অবস্থাতেই জাবিরকে ধরার জন্য শেষবারের মতো হাত বাড়াল। একটি জ্বলন্ত শিকড় তাঁর পিঠে এসে চাবুকের মতো লাগল, পুড়িয়ে দিল তাঁর চামড়া। যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলেও জাবির থামলেন না। তিনি দড়িটা ধরে পাগলের মতো ওপরে উঠতে লাগলেন। পাথর খসে পড়ছে, চারপাশের দেওয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। ঠিক যে মুহূর্তে জাবির সুরঙ্গের মুখ দিয়ে মরুভূমির বালির ওপর গড়িয়ে পড়লেন, ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর পেছনের পুরো মাটি দশ মিটার নিচে বসে গেল। এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণে মাটির নিচ থেকে ধোঁয়া আর আগুনের ফুলকি আকাশে উঠে এলো, যেন এক প্রাচীন দানব মাটির নিচে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।
জাবির মরুভূমির ঠান্ডা বালির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে রইলেন।
আকাশে তখন ভোরের প্রথম আলো ফুটছে। দূর দিগন্তে ইউফ্রেটিস নদীর জল রক্তিম হয়ে উঠেছে সূর্যের আলোয়। বাতাস থেকে সেই পচা ভেষজের গন্ধ ধীরে ধীরে উবে যাচ্ছে।
জাবির বেঁচে গেছেন। তিনি চিৎ হয়ে আকাশের দিকে তাকালেন। বুক ভরে মরুভূমির মুক্ত বাতাস নিলেন। তাঁর পিঠ পুড়ে গেছে, ডান পা বিষে নীল হয়ে ফুলে আছে, সারা শরীরে ক্ষতবিক্ষত দাগ। কিন্তু তিনি জীবিত। ব্যাবিলনের অন্ধকার থেকে তিনি ফিরে এসেছেন। কয়েক ঘণ্টা পর, যখন এক বেদুইন কাফেলা তাঁকে আধমরা অবস্থায় উদ্ধার করল, জাবির তখন প্রলাপ বকছিলেন। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বেদুইনরা ভয়ে পিছিয়ে গিয়েছিল।
তাঁরা দেখেছিল, জাবিরের ক্ষতবিক্ষত ডান পায়ের নখের নিচ থেকে চামড়া চিরে বেরিয়ে আসছে অতিক্ষুদ্র, সুতোর মতো একটি কালো লতা। আর তাঁর চোখের তারায়—যেখানে মানুষের স্বাভাবিক আলো থাকার কথা, সেখানে ভোরের সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে জ্বলজ্বল করছে এক অদ্ভুত, অপার্থিব সবুজ আভা।ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান ধ্বংস হয়নি। সে তার বীজ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এক নতুন বাহক খুঁজে পেয়েছে। জাবির চোখ বন্ধ করলেন, আর তাঁর অবচেতন মস্তিষ্কে খুব মৃদু, কিন্তু নিশ্চিত এক নারীকণ্ঠ আবার ফিসফিস করে উঠল:
“আমরা আসছি...”