শহরের এক কোণে পুরোনো রজনীগন্ধার ডাটাগুলো ফুলদানিতে শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে। ক্যালেন্ডারের পাতার হিসেবে মধ্য-অক্টোবর। হেমন্তের হিমেল হাওয়া জানালার গ্রিল ভেদ করে যখন ভেতরের পর্দাটাকে তিরতির করে কাঁপিয়ে দেয়, ঘরের আলো-আঁধারিতে ছায়াগুলো লম্বা হয়ে দেয়ালে গিয়ে আছড়ে পড়ে। শামস টেবিলের ওপর রাখা ধুলো জমা ফাইলগুলোর নিচে হাতড়াতে গিয়ে একটি অতি পরিচিত খাম খুঁজে পেল। ফিকে নীল রঙের চিঠি, যার ভাঁজে একসময় বুনো হাসনাহেনার সুবাস মাখানো থাকত। বছর পাঁচেক আগের এক কার্তিক পূর্ণিমায় লেখা। চিঠির ওপরে কাঁপাকাঁপা অক্ষরে লেখা শিরোনাম ‘একদা নিশিথে তোমার মোহ’।
চিঠির নিচে নাম লেখা ছিল: পহেলি।
পহেলি নামের ভেতরেই কেমন যেন এক হেঁয়ালি ছিল। সে যেন এক পাহাড়ি নদীর ছলছল জলতরঙ্গ, যাকে অঞ্জলি ভরে পান করা যায়, কিন্তু ধরে রাখার সাধ্য কোনো অঞ্জলির নেই। শামস চিঠিটা খুলল না। সে তো ভালো করেই জানে, ভাঁজ করা কাগজের ভেতরে লেখা প্রতিটা শব্দের ক্ষতচিহ্ন তার নিজের রক্তনালীতে খোদাই করা আছে। সে চোখ বুজল। অন্ধকার ঘরে ঘড়ির কাঁটার একঘেয়ে টিকটিক শব্দের পেছনে ধীরে ধীরে জেগে উঠতে লাগল একটি চেনা মুখ, দুটো বিষাদময় চোখের মায়া, আর সেই ভয়ংকর রাত—যে রাতে শামস চিরতরে হারিয়েছিল তার সর্বস্ব।
শামস ছিল আর্ট ইনস্টিটিউটের ভাস্কর্য বিভাগের শান্ত স্বভাবের এক তরুণ। পাথর আর পোড়ামাটিতে জীবন খোঁজা ছাড়া তার আর কোনো সংসার ছিল না। পার্থিব কোনো আড়ম্বরে তার মন বসত না। আর পহেলি? পহেলি ছিল ছায়ানটের শাস্ত্রীয় সংগীতের ছাত্রী। একহারা চিবুক, ঘন কালো মেঘের মতো চুল আর সেই চুলে গোঁজা একটা নীল অপরাজিতা, এই ছিল তার পরিচয়। তাদের প্রথম দেখা বিশ্ববিদ্যালয়ের বকুলতলায়। বসন্তের শেষ বিকেলের এক আসরে পহেলি গাইছিল রাগ ইমন। হারমোনিয়ামের রিডে তার আঙুলগুলোর ওঠানামা দেখতে দেখতে শামসের মনে হয়েছিল, মানুষ মাটির মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বৃথা করে; আসল প্রাণ তো লুকিয়ে থাকে সুরের সেই অনন্ত অতলে, যেখানে পৌঁছাতে পারলে কোনো এক অচেনা তৃষ্ণায় বুক শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়।
গান শেষে যখন চারপাশের শ্রোতারা করতালিতে ফেটে পড়ল, পহেলি শুধু এক পলকের জন্য ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা শামসের সঙ্গে চোখ মেলাল। সেই চাহনিতেই ঘটে গেল এক অদ্ভুত বিস্ফোরণ। যেন শত জনমের চেনা কোনো পথিক দীর্ঘ পথ হেঁটে এসে ছায়ায় দাঁড়াল। দিন কয়েক পর লাইব্রেরির পেছনের লাল মাটির রাস্তায় শামসকে থামিয়ে পহেলি বলেছিল, "আপনি তো মাটির মানুষ বানান, তাই না?"
শামস থমকে দাঁড়িয়েছিল, "হ্যাঁ, চেষ্টা করি।"
"পাথর দিয়ে কি কোনোদিন বিরহ বানাতে পেরেছেন শামস ভাই? এমন এক রূপ, যা ছুঁলে মনে হবে বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ হচ্ছে?" পহেলির ঠোঁটে লেগে ছিল ম্লান এক চিলতে হাসি, যার অর্থ তখন শামস বুঝতে পারেনি।
শামস মুগ্ধ হয়ে বলেছিল, "পাথরে প্রাণ দেওয়া কঠিন পহেলি। তবে তোমার চোখ দুটো ধার দিলে হয়তো বিরহের মূর্তিটা নিখুঁত হতে পারে।"
পহেলি চমকে তাকাল। তারপর এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, "চোখ ধার নিতে নেই শামস। দৃষ্টিতে মায়া জড়ালে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়।"
সেই শুরু। এরপর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কাঁচামাটির পথ, কার্জন হলের লাল ইটের অলিন্দ, আর বুড়িগঙ্গার তীরের নির্জন ঘাটগুলো একের পর এক সাক্ষী হতে লাগল তাদের অসমাপ্ত আলাপের। শামসের কাঠখোট্টা জীবনে পহেলি এনে দিল আলোর বন্যা। শামস শিখল, ভালোবাসার কোনো ব্যাখ্যা নেই; ভালোবাসা হলো কারো শূন্যতায় নিঃশ্বাস নিতে না পারা।
ভালোবাসা যখন পূর্ণতার দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই শামসের মনে হলো—পহেলি তার খুব কাছে থেকেও যেন অনেক দূরে। কোনো এক অদৃশ্য প্রাচীর সে নিজের চারধারে গড়ে রেখেছে, যার সীমানা পেরোনোর সাধ্য শামসের নেই। মাঝে মাঝেই পহেলি কথা বলতে বলতে অন্যমনস্ক হয়ে যেত। তার চোখের কোণে হঠাৎ জমাট বাঁধত গাঢ় মেঘ।
"কী ভাবছ পহেলি?" কোনো এক বিকেলে শামস জিজ্ঞেস করেছিল।
"ভাবছি, মানুষ কেন বাঁধে? নদী তো কোনোদিন কূলকে ধরে রাখতে পারে না। তবুও কূল কেন নদীর ভেঙে যাওয়ার শব্দে হাহাকার করে?"
"তুমি এমন অদ্ভুত কথা কেন বলো? আমি তো তোমাকে কোনো খাঁচায় বাঁধতে চাইনি। আমি শুধু সারাজীবন তোমার ছায়া হয়ে থাকতে চেয়েছি।"
পহেলি শামসের বুকে হাত রাখল। তার হাতটা ছিল অদ্ভুত বরফের মতো ঠান্ডা। "ছায়া তো আলো ফুরিয়ে গেলে হারিয়ে যায় শামস। যদি কোনোদিন রাত এমন ঘন হয়ে আসে যে আর সকাল না হয়? তখন এই ছায়াকে কোথায় খুঁজবে?"
শামস হেসে তার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল, "আমি নিজের বুক চিরে আলো জ্বালাব। অন্ধকারের সাধ্য নেই তোমাকে আমার থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার।" কিন্তু নিয়তি হয়তো সেদিন অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে এক ব্যঙ্গাত্মক হাসি হেসেছিল। মানুষ যা দৃঢ়ভাবে আগলে ধরতে চায়, বিধাতা সবার আগে সেই বাঁধনটিই আলগা করে দেন।
পহেলির পরিবার ছিল এক অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত, আভিজাত্যে অন্ধ এক বংশ। তাদের চোখে শিল্পীর হাত ছিল ভিক্ষুকের হাতের সমতুল্য। শামসের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার আর অনিশ্চিত শিল্পজীবন তাদের সামাজিক সম্মানের মাপকাঠিতে এক মুহূর্তও টিকতে পারেনি। বিশেষ করে পহেলির বাবা, ব্যুরোক্র্যাট খন্দকার সাহেব, মেয়েকে নিয়ে দেখেছিলেন এক বিলাসী স্বপ্নের বিস্তার। লন্ডনের এক ধনী শিল্পপতির ছেলের সাথে পহেলির সম্বন্ধ ঠিক হয়েছিল অনেক আগেই, যে সম্পর্কের ভেতর কোনো অনুরাগের স্থান ছিল না, ছিল শুধু বৈষয়িক দেনা-পাওনা।
পহেলি তার বাবার পা জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিল। বলেছিল, "বাবা, আমি তো কিছু চাইনি। শুধু শামসের ভাঙা ঘরের চালের নিচে বসে সুর সাধতে চেয়েছি। আমাকে বিক্রি কোরো না।" বাবার কঠোর উত্তর ছিল, "আমাদের বংশের ইজ্জতের চেয়ে বড় কোনো সুর নেই। যদি বাড়াবাড়ি করো, তবে ওই অখ্যাত ছেলেটার জীবন কীভাবে শেষ হবে, তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।"
অসহায় পহেলি একা হয়ে পড়ল। একদিকে তার পিতার অন্ধ অহংকার ও সামাজিক আভিজাত্যের হুমকি, অন্যদিকে শামসের জীবন বাঁচানোর তাগিদ। পহেলি জানত, শামসের ভেতর এক দুর্নিবার অভিমান আছে; সে সমাজের সাথে লড়াই করতে গিয়ে নিজেকে ভেঙে চুরমার করে দেবে, কিন্তু মাথা নত করবে না। সেই ভাঙন থেকে শামসকে বাঁচানোর এক নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত সে নিজের ভেতরেই গোপনে এঁকে ফেলল।
কার্তিক মাসের সেই অভিশপ্ত পূর্ণিমার রাত। কুয়াশায় ঢেকে গিয়েছিল শহরের অলিগলি। রাত বারোটায় শামসের মুঠোফোনে একটা বার্তা এল "ধানমন্ডি লেকের রবীন্দ্র সরোবরের কাঠের সাঁকোটার কাছে একবার আসবে শামস? শেষবারের মতো তোমার মোহ আমাকে ছুঁতে দাও।" শামসের বুকটা ধক করে উঠেছিল। পাগলের মতো ছুটে গেল সে। শীতে কাঁপতে থাকা শহরের বুক চিরে সে যখন লেকের পাড়ে পৌঁছাল, চারপাশ নিঝুম, থমথমে। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো জলের ওপর পড়ে কাঁপছে।
সাঁকোর রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছিল পহেলি। পরনে আসমানি রঙের একটি জামদানি শাড়ি, কপালে কালো টিপ, কিন্তু মুখটা সাদা ফ্যাকাশে। বাতাসে তার অবিন্যস্ত আঁচল উড়ছিল।
"পহেলি!" শামস হাঁপাতে হাঁপাতে এগিয়ে গেল।
পহেলি পেছন ফিরে তাকাল। তার চোখে জল ছিল না; সেখানে জ্বলছিল এক আত্মঘাতী শান্ত আলো।
"তুমি এসেছ শামস? আমি জানতাম তুমি আসবে।" পহেলির কণ্ঠস্বর অদ্ভুত খাদের ভেতর থেকে ভেসে এল।
"কী হয়েছে তোমার? এই মাঝরাতে আমাকে এখানে ডাকলে কেন? তোমার চোখ দুটো এমন দেখাচ্ছে কেন পহেলি? চলো, চলো আমার সাথে। আজই আমরা কোথাও চলে যাব—যেখানে তোমার বাবার কোনো মানুষ আমাদের খুঁজে পাবে না।" শামস ব্যাকুল হয়ে পহেলির হাত চেপে ধরতে চাইল।
কিন্তু পহেলি এক পা পিছিয়ে গেল। তার সেই দূরত্ব শামসের বুকের ভেতর তীরের মতো বিঁধল। "কোথায় যাবে শামস? সমাজ থেকে পালাবে? দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করতে করতে যে সুর একদিন তোমাকে ভালোবেসেছিল, সে সুর তো অভাবের তাপে মরে যাবে। তুমি কি চাও আমাদের ভালোবাসা প্রতিদিন একটু একটু করে অপমানে মরুক?"
"তুমি এসব কী বলছ? ভালোবাসা কি এতই ঠুনকো? তুমি তো বলেছিলে আমার কুঁড়েঘরে তোমার স্বর্গের চেয়েও বেশি শান্তি!"
পহেলি এক নির্মম হাসি হাসল। সে জানত, নিজেকে যদি শামসের চোখে ঘৃণ্য না করে তোলে, তবে শামস কোনোদিন তাকে ভুলতে পারবে না; তার জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে। সেই চরম অভিনয়টুকু তাকে করতেই হলো।
"মিথ্যে বলেছিলাম শামস। মোহ ছিল ওটা। একদা নিশিথে তৈরি হওয়া ক্ষণিক মোহ। বাস্তবে আমি তোমার ওই এক কামরার স্যাঁতসেঁতে ঘরে কাটাতে পারব না। আমি আভিজাত্য ভালোবাসি, আমি স্বাচ্ছন্দ্য ভালোবাসি। পরশু আমার ফ্লাইট, লন্ডনে। আমি বিয়েতে রাজি হয়েছি।"
শামসের পায়ের নিচের মাটি যেন অতলে তলিয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল পহেলির দিকে। "তুমি... তুমি মিথ্যে বলছ। তোমার চোখ অন্য কথা বলছে পহেলি। তাকাও আমার দিকে!"
"আমার চোখে আর তাকাবে না শামস!" পহেলি চিৎকার করে উঠল, কিন্তু তার ভেতরের ভাঙন সে লুকাতে পারল না। কণ্ঠ কেঁপে উঠল তার, "ভুলে যাও আমাকে। যে মানুষটা তোমার ছিল না, তাকে আঁকড়ে ধরে পাথর কেটে জীবন পার কোরো না। এই চিঠিটা রাখো। তোমার মোহের সমাধি দিলাম আজ।"
পহেলি নীল খামটা শামসের পায়ের কাছে ছুড়ে দিল। তারপর আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দ্রুত পায়ে হেঁটে মিলিয়ে গেল কুয়াশার চাদরে। শামস নড়তে পারল না। সে শুধু দেখল, একটি আসমানি রঙের ছায়া ধীরে ধীরে অন্ধকারের গহ্বরে হারিয়ে গেল। লেকের স্থির জলে তখন এক টুকরো ভাঙা চাঁদ দুলছিল। বাতাস হঠাৎ থেমে গিয়ে এক জমাট হাহাকার ছড়িয়ে পড়ল বুনো পাতায়। শামস মাটির ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার পাথুরে হাত দুটো বালির ওপর আছড়ে পড়ল, কিন্তু তার চোখ দিয়ে কোনো জল বেরোল না। চরম আঘাতে কান্নাও পাথর হয়ে যায়।
পরের তিন বছর শামস কীভাবে কাটিয়েছে, তার কোনো হিসেব নেই। সে কথা বলা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল। আর্ট ইনস্টিটিউটের পড়া ছেড়ে দিয়ে সে নিজেকে বন্দি করে নিয়েছিল এক নির্জন স্টুডিওতে। দিনরাত সে কেবল পাথর খোদাই করত। পাথরের বুকে সে এক বিষাদময় নারীর অবয়ব ফুটিয়ে তুলত, যার চোখ দুটো অপলক চেয়ে থাকে এক শূন্য আকাশের দিকে। সবাই ভাবত, শামস পাগল হয়ে গেছে। সে শুধু জানত, পহেলি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। বিলাসের মোহে সে শামসের আত্মাকে হত্যা করে চলে গেছে। ঘৃণায়, যন্ত্রণায় সেই নীল চিঠিটা সে কোনোদিন খুলেও দেখেনি। ওটা পড়ে ছিল পুরোনো ড্রয়ারের নিচে, এক জীর্ণ পাপের দলিলের মতো।
কিন্তু সত্য চিরকাল ছাইচাপা থাকে না। আজ বিকেলে ছায়ানটের এক পুরোনো বন্ধু, অভীক, এসেছিল শামসের স্টুডিওতে। অভীক ছিল পহেলিরও সহপাঠী। শামসের এলোমেলো চুল, কোটরে ঢোকা চোখ আর হাতের আঙুলে পাথরের ঘর্ষণে জমে থাকা ক্ষতের দাগ দেখে অভীক আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না।
"আর কতদিন শামস? আর কতদিন নিজেকে এই জীবন্ত নরকে জ্বালিয়ে মারবি?" অভীক টেবিলে রাখা ছেনিকাঠ সরিয়ে চেঁচিয়ে উঠল। শামস ক্লান্ত চোখে তাকাল, "যাকে মারার কথা সে তো অনেক আগেই মরে গেছে অভীক। পাথর কাটি, কারণ পাথরের কোনো মন থাকে না, ব্যথা পাওয়ার ভয় থাকে না।"
অভীক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখ ভিজে উঠল জলে। "তুই সত্যিই অন্ধ শামস। তুই শিল্পী হতে পারিস, কিন্তু মানুষের হৃদয় পড়তে তুই কোনোদিন শিখিসনি। পহেলিকে তুই বিশ্বাসঘাতক ভেবে আজও নিজের জীবন শেষ করছিস, অথচ পহেলি তোর জন্যই..."
শামস বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো সোজা হয়ে বসল। "পহেলির নাম নিবি না আমার সামনে! সে তার ধনবান স্বামীর সাথে লন্ডনে রাজপ্রাসাদে সুখে আছে। আমার মতো কাঙালের খোঁজ নেওয়ার সময় তার নেই!"
অভীক একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। বিষাদমাখা এক নিষ্ঠুর হাসি। "রাজপ্রাসাদ? স্বামী? হা খোদা! তুই এখনও কিছুই জানিস না শামস? পহেলি লন্ডনে যায়নি। সে কোনোদিন কারও ঘরণী হয়নি।"
শামসের হাত থেকে বাটালিটা সশব্দে মাটিতে পড়ে গেল। পাথরের মেঝেতে তার তীক্ষ্ণ প্রতিধ্বনি উঠল। "মানে? তুই কী বলছিস অভীক?"
"পহেলির ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়েছিল ওদের সম্বন্ধ ঠিক হওয়ারও আগে, শামস। থার্ড স্টেজ। ডাক্তাররা ওকে মাত্র ছ'মাসের সময় দিয়েছিল। ওর পরিবার ওকে লন্ডনে নিয়ে যেতে চেয়েছিল চিকিৎসার জন্য, কিন্তু ও জানত কোনো লাভ নেই। ও তোকে এই তিলে তিলে মৃত্যুর দৃশ্য দেখাতে চায়নি। ও জানত, তোকে সত্যিটা বললে তুই তোর ভিটেমাটি সব বিক্রি করে পথে বসে যাবি, ওকে বাঁচাতে গিয়ে শেষ হয়ে যাবি। তাই ও একটা মিথ্যে নাটকের আশ্রয় নিয়েছিল। তোকে বাঁচানোর জন্য ও নিজের বুকে পাথর বেঁধে তোকে আঘাত করেছিল, যাতে তুই ওকে ভুলে বাঁচতে পারিস।"
শামসের চারপাশের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে এল। তার নিঃশ্বাস আটকে যেতে লাগল। "কোথায় ও?" শামস ফিসফিস করে উঠল। তার কণ্ঠনালী শুকিয়ে গেছে।
"তিন বছর আগে, সেই কার্তিক মাসের শেষ রাতে, ধানমন্ডি লেকে তোর সাথে দেখা করার মাত্র বারো দিন পর পিজি হাসপাতালের কেবিনে ও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত ও তোর নাম ধরে কাঁদছিল শামস। কিন্তু তোকে খবর দিতে দেয়নি। ও বলেছিল 'শামসের বুক পাথর হয়ে যাক, কিন্তু ওর তুলি যেন না থামে।' ও তোর জীবন চেয়েছিল, শামস!"
অভীক চলে গেছে অনেকক্ষণ। ঘরের ভেতরে তখন অন্ধকার আরও গাঢ় হয়েছে। বাইরে হেমন্তের হিমেল হাওয়া ডালপালাকে কাঁপিয়ে তুলছে। শামসের শরীর কাঁপছে থরথর করে। তার পায়ের তলার পৃথিবীটা যেন লক্ষ টুকরো হয়ে ভেঙে পড়েছে। সে টেবিলের দিকে এগোল। থরথর কাঁপতে থাকা আঙুল দিয়ে তুলে নিল সেই ফিকে নীল খামটি। তিন বছর ধরে যে খামটাকে সে বিষাক্ত মনে করে স্পর্শ করেনি, আজ সেই খামটি তার কাছে মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র তীর্থের শেষ স্মৃতিচিহ্ন।
কাঁপাকাঁপা হাতে সে খামের সিলগালা খুলল। হলদেটে হয়ে যাওয়া কাগজের ভাঁজ খুলতেই যেন তিন বছর আগের সেই পরিচিত বুনো হাসনাহেনার ঘ্রাণ এক নিমেষে ঘরটাকে ভরিয়ে তুলল। পহেলির মুক্তোর মতো হরফে লেখা ছিল:
শামস,
আজ যখন এই চিঠি তোমার হাতে যাবে, হয়তো তখন আমি একমুঠো ছাই অথবা মাটির নিচের শীতল আঁধার। একদা নিশিথে তোমার মোহ আমাকে ছুঁয়েছিল, আর সেই মোহের আলোতেই আমি আমার এই ক্ষুদ্র জীবনের পরম পূর্ণতা খুঁজে পেয়েছিলাম। তুমি আমাকে ক্ষমা কোরো শামস। তোমার চোখের জল আমি সহ্য করতে পারতাম না, তাই তোমাকে ঘৃণা উপহার দিয়ে গেলাম। আমার ক্ষয়ে যাওয়া শরীর, রক্তবমি আর হাসপাতালের তীব্র ওষুধের গন্ধ দিয়ে তোমার শিল্পীর শুভ্র মনটাকে আমি কলুষিত করতে চাইনি। আমি চেয়েছি তোমার হৃদয়ে আমি বেঁচে থাকি, হোক না তা এক নিষ্ঠুর অভিমানের বেশে।
পাথরে বিরহ খোদাই করতে চেয়েছিলে না? আজ দেখো, বিরহ কেমন রক্তমাংসের মানুষ হয়ে তোমাকে ছেড়ে চলে গেল। পাথরকে তুমি প্রাণ দিতে পারো শামস, কিন্তু মানুষের আয়ুকে তো বাড়ানো যায় না।
তুমি থেমো না। আমার ভালোবাসা যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে তোমার প্রতিটি মূর্তিতে, তোমার প্রতিটি বাটালির আঘাতে যেন কেবল সৌন্দর্য আর সুরের জন্ম হয়। আমি কোনোদিন লন্ডনে যাইনি শামস, আমি তোমার সেই বকুলতলাতেই মিশে আছি, যেখানে প্রথমবার তুমি আমার চোখে চোখ রেখে বলেছিলে 'মায়া জড়ালে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়।'
ইতি,
তোমার সেই ক্ষণিক মোহ
পহেলি।
চিঠিটা শামসের বুকের ওপর চেপে বসল। বাঁধভাঙা নদীর মতো তার চোখ দিয়ে নেমে এল অবাধ্য অশ্রু। গত তিন বছর ধরে যে কান্না সে বুকের গভীরে পাথর করে জমিয়ে রেখেছিল, আজ সেই পাথর গলে লাভাস্রোতের মতো বেরিয়ে এল। "পহেলি... পহেলি রে..."
শামস চিৎকার করে ডেকে উঠল। কিন্তু সেই চিৎকারের উত্তর দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। শুধু ঘরের শূন্য দেয়ালগুলো সেই হাহাকারকে ফিরিয়ে দিল তার কাছেই। শামস উন্মত্তের মতো ছুটে গেল তার অসমাপ্ত ভাস্কর্যটার কাছে। চাদর সরিয়ে উন্মোচন করল সেই পাষাণ মূর্তিকে। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল পাথুরে চোখ দুটো। আজ আর সেই পাথরে কোনো ঘৃণা নেই, কোনো অভিযোগ নেই; সেখানে কেবল ঝরে পড়ছে এক অনন্ত, আত্মত্যাগী ভালোবাসার পবিত্র অশ্রু।
শামস মূর্তির কাছে লুটিয়ে পড়ল। ঘরের জানালায় এসে লাগল মধ্যরাতের শীতল হাওয়া। সেই হাওয়ায় যেন সুরের এক অস্পষ্ট রেশ ভেসে এল, রাগ ইমনের সেই চেনা তান, আর এক অপরাজিতা পরা নারীর ফিসফিসানি:
"একদা নিশিথে তোমার মোহ..."
রাত বাড়ছে। শহর ঘুমিয়ে পড়েছে তার সমস্ত ক্লান্তি আর কোলাহল ভুলে। কেবল একটি ঘরে এক ভাস্কর তার পাথুরে ভালোবাসাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে চলেছে, আর সেই কান্নার কোনো শেষ নেই, কোনো সান্ত্বনা নেই। ভালোবাসা কোনোদিন মরে না, কিন্তু কিছু ভালোবাসাকে বেঁচে থাকতে হয় এমন এক অনন্ত বিরহের চিতা জ্বালিয়ে, যার কোনো নিবৃত্তি নেই।