আবারো দেখা হবে
অচেনা কোনো শহরের নীরব সড়কে,
যেখানে বিকেল গড়িয়ে পড়বে
রোদমাখা অশ্বথ গাছের ছায়ায়,
আর হঠাৎ করে উড়ে যাবে এক জোড়া পাখি,
ঠিক সেই মুহূর্তেই তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে আমার সম্মুখে।
আবারো দেখা হবে
কোনো একদিন, অচেনা কোনো শহরের
ব্যস্ত পথের কিনারায়,
যেখানে মানুষের ভিড়েও
আমাদের দৃষ্টির স্পর্শ চিনে নেবে একে অন্যকে।
তখন আমাদের মাঝে কথা নয়,
চোখে চোখ রেখে চিনে নেওয়া হবে,,
হয়তো জিজ্ঞেস করবো না, তবুও জেনে যাবো
কেমন আছো, কোথায় গেলে, কেন গেলে, আর কেন সেইদিন…
সে প্রশ্নগুলো হারিয়ে যাবে অতীতের কোনো সন্ধ্যায়,
যেখানে আমি ছিলাম, তবুও ছিলাম না।
তখন হয়তো সন্ধ্যা নামবে ধীরে,
আকাশ রঙিন হবে কুয়াশার ধোঁয়াটে পর্দায়,
আমরা হেঁটে যাবো পাশাপাশি
নীরবতা আমাদের ভাষা হয়ে উঠবে।
আমরা হেঁটে যাবো পাশাপাশি,
যেমন হেঁটেছিল ইলোরা আর অজন্তার
গুহা-চিত্রে আঁকা প্রাচীন যুগলেরা,
তাদেরও ভালোবাসা ছিল স্থির, অথচ স্থায়ী নয়
পাথরের দেওয়ালে গাঁথা ভালোবাসার আখ্যানের মতোই।
আমরা হেঁটে যাবো নদীর ধারে,
যেমন জহিরউদ্দিন মোহাম্মদের অশ্রুভেজা চোখে
গড়ে উঠেছিল বাবরি মসজিদের দেয়াল,
আর একদিন সেই দেয়াল ভেঙে পড়ে গিয়েছিল
ঠিক তেমন ভেঙেযাবে আমাদের নীরবতা
শব্দহীন, অথচ প্রচণ্ড কোলাহলে।
আমরা হয়তো পা রাখবো সেই নদীতে,
যেখানে একদিন শকুন্তলা প্রতীক্ষা করেছিল দুষ্মন্তকের,
চুপ করে বসে থাকবে আমাদের হৃদয়ের পাঁজর জুড়ে জমে থাকা কথা,
ভুলে থাকা অভিযোগ,
আদরে ঢাকা অনাদর, আর বৃষ্টি না-পাওয়া প্রেমের ছায়া।
সময়ের দীর্ঘ স্রোত পেরিয়ে,
নদীর ধারে বসবো আমরা,
চুপিচুপি নামিয়ে দেবো পা সেই অনন্ত ধারায়।
জমে থাকা অব্যক্ত বেদনা,
অনুচ্চারিত অভিমান আর অপ্রকাশিত প্রেম
ধুয়ে যাবে শান্ত জলের নিচে।
আমরা দাঁড়াবো সেই জঙ্গলের প্রান্তে,
যেখানে কোনোদিন মেঘনাদ নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করেনি,
তবুও প্রেমে পড়েছিল প্রাণনাশকারী এক যুদ্ধের মতো।
ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা নিঃশব্দ মূর্তিগুলো আমাদের দেখবে
তাদের পাথুরে চোখে একরাশ সহানুভূতি,
যেমন দেখেছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা রমেশ আর সুচরিতার নিঃসীম নীরবতা।
প্রকৃতির প্রতিটি পাতার কাঁপনে যেন একেকটি কবিতা,
যেখানে লেখা আছে আমাদের গল্প,
একটি অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি,
যার পাতায় পাতায় লেখা রক্তমাখা প্রেম আর প্রতারণার নাম।
আমরা আবারও দেখবো একে অপরকে,
ঠিক যেমন দেখা হয়েছিল রাধা আর কৃষ্ণের
প্রেম ছিল পূর্ণ, তবুও মিলন অসম্ভব।
অথবা যেমন মহাকাব্যের দ্রৌপদী দাঁড়িয়েছিল,
পাঁচ প্রেমের মাঝেও একাকীত্বের অগ্নিতে দগ্ধ হয়ে।
আমাদের দেখা হবে, হ্যাঁ
যেমন দেখা হয়েছিল ওথেলো ও ডেসডিমোনার,
প্রেমে ডুবে ছিল তারা,
তবুও শেষ দৃশ্যে ছিল বিষাদ ও ভুল বোঝাবুঝির বিষাক্ত ছায়া।
আর আমাদের সময় হবে দীর্ঘ
যেমন চিত্রলেখার চিত্রপট বিস্তৃত হয় শতকে শতকে,
আমাদের কথাগুলো হবে উঁচু পাহাড়ের মতো,
যেখানে দাঁড়ালে মেঘেরা নিচে চলে যায়
তুমি আর আমি,
দুই মেঘের মতই হয়তো একবার ছুঁয়ে যাবো
আরও একবার হারিয়ে যাবো।
আমরা হয়তো বসবো কোনো চায়ের দোকানে,
যেখানে বয়সী লোকেরা বলবে
"দেখেছো, এ দুজন কত শান্ত,
যেন অনেক কথা জমে আছে ওদের মধ্যে!"
আর আমরা মুখে কিছু বলবো না,
তবুও চারপাশে ছড়িয়ে যাবে এক অদৃশ্য আবেগ,
যার কোনো ব্যাখ্যা নেই,
যার ব্যাকরণ কেবল হৃদয়ের ভাষায় লেখা।
সেই মুহূর্তে, প্রকৃতি আমাদের চিনে নেবে
পাতার ফাঁকে ফাঁকে বাতাস হয়ে গুনগুনাবে পুরোনো গান,
হয়তো শুনবো হেমন্তের সুর,
"এই পথ যদি না শেষ হয়…"
তুমি বলবে,
“এই তো, এত দিন পরে এসে দাঁড়িয়েছি,
তবুও মনে হয়, আমরা কখনো আলাদা হইনি।”
আমি হাসবো
তবুও চোখে জমে উঠবে জল।
আমাদের দেখা হবে আবারো,
যেমন দেখা হয়েছিল লাইলি-মজনুর কবরের
পাশে দুটি গোলাপ ফুলের,
তারা কথা বলেনি, তবুও গন্ধে মিলেমিশে ছিল।
শেষে সূর্য অস্ত যাবে ধীরে,
আমরা দুজন হাত ছুঁয়ে নয়
হৃদয় ছুঁয়ে বিদায় নেবো,
কারণ জানি,
আমাদের এই দেখা শেষ নয়,
এ কেবল আরেক নতুন প্রেক্ষাপটের সূচনা।
আমরা আবারো দেখা করবো…
হয়তো আরেক জন্মে,
হয়তো অন্য কোনো কাব্যের পঙ্ক্তিতে,
হয়তো কোনো কবির কলমে…