মেয়েটি বাঁচতে চেয়েছিল,
চেয়েছিল নিজের সম্ভ্রম বাঁচাতে।
নিজেকে রক্ষায় ধান ক্ষেতে এদিক ওদিক ছুটেছে।কিন্তু অসভ্য হায়েনার হাত থেকে মুক্তি মেলেনি।এই মধ্য রাতে তার গগনবিদারী আত্ম চিৎকার ফিরে এসেছে তার কাছেই।কেউ শুনেনি,সাহায্যের জন্য এগিয়ে ও আসে নি।বলছি কুমিল্লার তাজমিন নামের অভাগা কিশোরীর কথা।
রাত বারোটার দিকে মেয়েটি যখন কুমিল্লার বিশ্বরোড পদুয়ার বাজারে বাস থেকে নেমেছিল,তখন কি ভেবেছিল সামনে বিপদ অপেক্ষা করছে, তার প্রাণ হারানোর সংশয় আছে?আছে সম্ভ্রম হারানোর!সে চেয়েছিল আট কিলোমিটার দূরে নিজ বাড়িতে যেতে। রাতটা স্টেশনে কাটিয়ে দিতে পারতো। নিরাপদ মনে করেনি।সে নিরাপদ ও বিশ্বাস করেছিল ঘাতক সিএনজি চালক সুমন মিয়াকে।আর সেই মানুষ নামের দুই পা ওয়ালা জানোয়ারটা মেয়েটাকে সিএনজি তে তুলেই ফন্দি আঁটে শিকারের তাড়নায়।নির্ধারিত পথে না গিয়ে উল্টো পথে সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালিয়ে মেয়েটিকে নিয়ে চলে নির্জন গন্তব্যে। আসলে আমরা সিএনজি বা অটো চালকদের খুব সাধারণ মানুষ ভাবি।সমাজের একটু নিম্ন স্তরের স্বাভাবিক মানুষ ভাবি। এই ভাবনা কতটুকু সঠিক? পরিসংখ্যান দেখেন গত কয়েক বছরে অটো চালকদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় কতজন মেয়ে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। শুধু মেয়ে নয় পুরুষ হত্যা,অপহরণ,গুম এর ক্ষেত্রে কোন না কোনভাবে অটো, অটো চালক জড়িত থাকার খবর প্রায় সময়েই দৈনিক গুলোর মফস্বল পেজে স্থান পেয়েছে।
তাজমীন প্রসঙ্গে আসি। মেয়েটা তখন ঘোর বিপদে।বাবাকে তার আইফোন থেকে লোকেশন পাঠায়। বাবা দিনে চাকরি করে রাতে ক্লান্ত শরীরে নিশ্চিন্তে গুমাচ্ছেন । একটা পনের বছর বয়সী কিশোরী মেয়ে বাড়ির বাহিরে তিন থেকে চার দিন। তার জন্য চিন্তা হয় না।তার খোঁজে থানায় একটা জিডি হয়না। মেয়ে কোথায় যায়, বন্ধু-বান্ধব কারা, এসব বিষয়ে বাবার খেয়াল নেই। সে দিনরাত ব্যস্ত ঔষধ কোম্পানির চাকরি নিয়ে। অন্য দিকে মেয়েকে আইফোন কিনে দিয়ে মেয়ের শখ, আহ্লাদ ঠিকই মিটাচ্ছেন!যত দায়িত্ব মায়ের।মেয়ের চলাফেরা,বন্ধু বান্ধব নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। মতি-গতি ভালো না লাগায় ছয় মাস স্কুলে যাওয়া থেকে বিরত রাখেন।কোথায় যায়,এখনো আসলো না কেনো এসব নিয়ে চিন্তিত থাকেন।তবে এই বিষয়টা ও চিন্তার,চোদ্দ পনেরো বছর বয়সী সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া একটা মেয়ে এত ডেসপারেট হয় কীভাবে? আজ ব্রাহ্মণবাড়িয়া তো কাল কুমিল্লা ফিরে,পরশু সতেরো দিনের পরিচিত ফেসবুক ফ্রেন্ড এর আহবানে কক্সবাজার। কক্সবাজার এক রাত কাটিয়ে পরদিন রাত বারোটায় কুমিল্লা পদুয়ার বাজার বাসস্ট্যান্ড!এই অস্থির এবং কিছুটা অবাধ্য ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাবা মা করবে টা কি?অল্পবয়সী ছেলে মেয়েদের কাছে বাবা মা জিম্মি হয়ে গেলে, সেই অসহায় বাবা মার বেশি কিছু করার থাকে না, নিজেদের গুটিয়ে নেয়া ছাড়া। রাষ্ট্রযন্ত্র, পুলিশ প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দোষারূপ করে কিছুটা আত্নতুষ্টি আমরা পেতে পারি। যেমন হাইওয়েতে রাতের টহল বাড়ানো, চেকিং বা নজরদারি নেই কেনো ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু একজন অটো চালক ,যে নাকি সাধারণ বেশে রাত্রি বেলা বাস স্টেশনে যাত্রীর অপেক্ষায়, তাকে ওই ভাবে কেউ কি নজরদারিতে রাখে? এক্ষেত্রে প্রত্যেক থানা একটা কাজ করতে পারে ,বেশি রাত করে যেসব চালক অটো চালায় তাদের একটা লিস্ট করে রাখতে পারে। এরা কারা , আগে কোনো ক্রাইমের সাথে জড়িত ছিল কিনা, এমন কি বহু বিবাহ,নেশা বা কোনো গ্যাং এর সদস্য কিনা এসব খতিয়ে দেখতে পারে। তাতে অপরাধ কিছুটা কমতে পারে।শেষে এটাই বলবো,আর কোনো তাজমীণ যেনো মায়ের কোল খালি করে নির্মম ভাবে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ না করে। যে ফুল না ফুটতেই পাষণ্ডের নির্মম আঘাতের বলিদান হয় তার জন্য আমাদের দুঃখ গাঁথা ছাড়া আর কী ই বা করার আছে?