জামাল কবিরাজের বাড়ি লোকালয় থেকে একটু ভিতরে। ঘন সুপারীর গাছের বন, তার মাঝে সরু চিকন রাস্তা এঁকে বেকে গেছে।বাড়ির পাশে মরা খাল। খালে পোলাপানের দল নেংটা হয়ে গোসল করছে।জমিলাদের এই বাড়িতে আসতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল ছুঁই ছুঁই। দুপুরে অবশ্য জামিলা খালা শাশুড়ি আছিয়া খাতুনের বাড়িতে খেয়ে নিছে। সিরাজ একটু লজ্জা পাচ্ছিল খাবার খেতে। তা দেখে খালা শাশুড়ি বললো, সিরাইজ্জা তরে তো নেংটাকাল তন চিনি। শর্মাইচ না। প্যাট ভইরা খা। জামাল কবিরাজের বাড়ি এনতন ও মাইল তিনেক। হাটন ছাড়া গতি নাই।" সিরাজ এ কথায় আরও বেশি লজ্জা পায়।
জামাল কবিরাজের বাড়ি আজ একটু লোকজন কম। ছয় সাতজন মহিলা আর দুইজন পুরুষ মানুষ আসছে। সবার বাড়ি বেশ দূরে।বেশির ভাগ আসছে সন্তান লাভের আশায়। বিশাল গোঁফওয়ালা লম্বা একটা লোক আসছে হিজলা মেমাইন্না থেকে। সবাই কানা ঘুষা করছে - লোকটা একসময় ডাকাইত ছিলো। চড়ে ধানী জমি নিয়ে বিরোধ হইলে লোকটারে মানুষ হায়ার কইরা নিত। লোকটা দিন দুপুরে মানুষ খুন কইরা ফালাইতে হাত কাপত না। লোকজনের মুখে এ কথা শুনে জামিলা একটু ভয় পায়। পরে ভাবে, ধামড়া মার্কা দেবর সঙ্গে আছে, চিন্তা কিসে।
জামিলার ডাক পড়লো চার জনের পর। কাঠের পুরনো দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করে যাকে দেখলো তাকে ঠিক কবিরাজ বলে মিলাতে জামিলার কষ্ট হলো। সে ভেবেছে ,কবিরাজ মানুষটার বড় বড় দাড়ি ঘোফ থাকবে,বয়স সত্তরের উপরে হবে। মুখে বসন্তের দাগ থাকবে। সে কিছুটা হতাশ হলো। বরং লোকটা বেশ ফর্সা। মুখে দাড়ি গোঁফ এর বালাই নাই। মাথায় অবশ্য গোল একখানা টুপি আছে। বয়স আনুমানিক ৬০ হবে।
জামিলা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে কবিরাজ বলে, "আম্মাজান সঙ্গে কেউ আসে নাই।" জামিলা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে। কবিরাজ আবার বলে, "যান ডাইক্কা আনেন।"
জামিলা হাতের ইশারায় সিরাজকে ডাকে। সিরাজ ভিতরে ঢুকলে কবিরাজ বলে, আমনে রোগীর কি অন?
সিরাজ বলে, হে আমার ভাবি লাগে।
আচ্ছা, আমনে ওই চেয়ারটায় আরাম করেন। একটু দূরে কাঠের একটা ভাঙ্গা চেয়ার দেখিয়ে বলে।
জামিলা কবিরাজের সামনে গিয়ে বসে। মাঝখানে প্লাস্টিকের ছোট্ট টেবিল। টেবিলে পানি ভর্তি বোতল। কোনো বোতলে তৈল রাখা আছে। কোনোটার ভিতরে আবার গাছের শিকড় দেখা যায়।
জামাল কবিরাজ বললো, আম্মাজান আমনের নাম?
ঝর্ণা।
মিথ্যা কইয়েন না। আসল নাম কন। মিথ্যা কইলে যেই নিয়তে আইছেন,নিয়ত পুরা হইবো না। " জামিলা চমকে যায়। সে মিথ্যা বলছে লোকটা জানলো কিভাবে? কবিরাজ আবার বলে, আমনে ভাবতেছেন , মিথ্যা কইছেন আমি জানলাম কেমনে?আসলে এইহানে আমার কোনো কেরামতি নাই। রোগীরা আসলে তাগো নাম আমার ছোট পোলা কাঠ পেনচিল দিয়া লেইখা রাখে। আমনের নাম সঙ্গের দেবর এন্টি করাইছে। বুজলেন।"
জামাল কবিরাজ একটা পান বানিয়ে মুখে দেয়।হাতে চুন নিতে নিতে বলে, বিয়া হইছে কয় দিন।
এক বছর। জামিলা আস্তে করে বলে।
জামাই কি করে।
মাস্টার।
ও পোলাপান পড়ায়। ঘরে যুবতী বৌ। সময় দেয়না,খেয়াল কম। কি ঠিক কইছি?
জমিলা অস্পষ্ট স্বরে বলে, জী।
সমস্যা তো আমনের না। সমস্যা জামাই বাবাজির। তারে নিয়া আইলে পারতেন। যাই হোক, পানি আর তেল পইড়া দিমু। পরতেক দিন সকালে স্বামী স্ত্রী খালি পেটে খাস নিয়তে খাইবেন। আর এই তেল দিমু। এইটা স্বামীর সাথে মিলনের পড়ে,গোসল করে তল পেটে মালিশ করবেন। বুঝলেন।
জামিলা লজ্জা পায়। তবু বলে,জী বুঝছি।
জামাল কবিরাজ আবার বলে, সমস্যা আমনের স্বামীর। হের লইগ্গা একটা বনাজি গাছের শিকড়ের হালুয়া আছে। বনে বাদারে ঘুইরা এইটা সংগ্রহ করতে হয়। মিলনের পূর্বে এইটা খাইলে মাস্টারের সমস্যা থাকবো না। তয় হাদিয়া একটু বেশি পড়ব।"
জামিলার মনে পড়লো, আসার সময় শাশুড়ি সালেহা খাতুন মুঠের মধ্যে অনেকগুলি টাকা গুঁজে দিয়ে বলছে, রিপনের জন্যও কিছু দিলে আইনো।
জামিলা এবার বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল, তার জন্য ও দেন। হদিয়া আছে।
জামাল কবিরাজ এক এক করে সব কবিরাজি ঔষধ গুলো একটা পলিথিনে ভরে জামিলার হাতে দেয়। দিয়ে বলে, "আল্লাহপাক এইবার তোর গর্ভে সন্তান দিবো দেখিস।"
কবিরাজের এই কথায় কালো বোরকার ভিতর থেকে ও জামিলার মুখটা উজ্জ্বল দেখায়। তখন সূর্য পশ্চিমে হেলে বিকেল জানান দিচ্ছে। জামিলাদের রওয়ানা দিতে হবে বাড়ির পথে।(চলবে)