বিয়ের সময় জামিলা জানতো,লোকটার আরেকটা বিয়ে হয়েছিল। সঙ্গে এটা ও জেনে ছিল মানুষটা ভালো মানুষ। রাতদিন স্কুল নিয়ে পড়ে থাকে। তাই দ্বিতীয় বিয়ে জেনেও এ নিয়ে আপত্তি করেনি। তাছাড়া জামিলার ওজোর আপত্তি ভাইয়ের সংসারে ভাই-ভাবি মেনে নিতো না। নাইন ক্লাস পর্যন্ত পড়ার পরে জামিলার আগ্রহ ছিলো, লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার। ভাবির জন্য হয়নি। ভাবির কথা - যথেষ্ট পড়ছো বাপু। বাকিটা স্বামীর ঘরে যাইয়া পইড়।এহন সংসারে আমার সাথে কাজ কাম করো। পরের বাড়ী গেলিওতো সেই চুলা ই ঠেলন লাগবো।"
জামিলা দেখতে সুন্দর। এক হারা গড়ন। পরের বাড়ির চুলা ঠেলার জন্য বেশিদিন বাপের বাড়িতে অপেক্ষা করতে হয়নি।
পরদিন সকালে বৃষ্টির মধ্যে ছাতা মাথায় নিয়ে রিপন মাস্টার উপজিলা সদরে রওয়ানা হয়। জামিলা বলে,এই বৃষ্টির মধ্যে না গেলে পারতেন না?" মাস্টারের বৌয়ের কথা শুনার সময় নাই।সে ছুটছে তার গন্তব্যে। শাশুড়ি জামিলা কে পাকঘরে ডেকে এনে পাশে বসায়।চুলায় গরম ডালে বাগার দিতে দিতে বলে, শোনো হিজলার মাউন তলায় একজন ফকিরের সন্ধান পাইছি। পরতেক মঙ্গলবার পানিপড়া,কালিজিরা তৈল পড়া আর তাবিজ দেয়। এইগুলা ব্যবহার কইরা অনেকে উপকার পাইছে।আল্লাহপাক এই উছিলায় নিঃসন্তান রে সন্তান দিছে। তোমার যাইতে অইবো।"
জামিলা এতক্ষণ মন দিয়া শাশুড়ি ছালেহা খাতুনের কথা শুনে। তারপর বলে, বুঝলাম আম্মা। কিন্তু মাউনতলা তো ম্যালা দূর। লাল খারাবাদ পর্যন্ত না হয় রিক্সায় গেলাম। হের পর নৌকায় ওইপার যাইতে আধা ঘণ্টার ও বেশি। তাছাড়া জাইমু কার লগে? আমনের ছেলে যাইতে রাজি অইবো না।"
ছালেহা খাতুন বললো, এত প্যাচাল পিটো না । আমার ছেলে যাইতে চাইবো না ঠিক কইছ। হের স্কুল নিয়া ম্যালা দৌর ঝাঁপ।তয় কারে দিয়া তোমারে পাঠাইমু আমি মনে মনে ঠিক কইরা রাখছি।"
কার লগে পাঠাইবেন আম্মা?
পাশের বাড়ির সিরাজে রে তোমার লগে দিমু। পোলাডা একটু বোকা বোকা, তয় ভালো। আইজকা দুধ রোজ দিতে আইলে কমু।
আম্মা অন্য একটা পোলার লগে এত দূরে পাঠাইবেন ? হেরতোন ছোট আপারে খবর দিলে ভালো ঐতো না।
শাশুড়ি একটু রাগত গলায় বলল, নিজের তো হয়না। পড়ের ডা নষ্ট করার তালে আছে। নূরজাহানের যে বাচ্চা অইবো খেয়াল আছে?তাছাড়া সিরাজ তো এই মুন্সী বংশের পোলা। ওর বাপে আলাদা বাড়ী করছে।সম্পর্কে তো আমাগো ভাতিজা। দূরের তো কেওনা।
জামিলা মুখটা ভার করে গরম ডালের পাতিল নিয়ে ছালেহা খাতুনের সামনে থেকে সরে পড়ে। জামিলা জানে,শাশুড়ি একবার যখন বলছে তাহলে করে ছাড়বে।
দুপুরে মেঘ সরে বৃষ্টিটা কমে আসে।মিষ্টি একটা রোদের দেখা মেলে। জামিলা বাড়ির উঠানে সকালের বাসি কাপড় চোপড় ধুয়ে শুকাতে দেয়।এমন সময় পাশের বাড়ির সিরাজ কোমড়ে গামছা পেঁচিয়ে সিলভারের জগে দুধ নিয়ে আসে। গ্লাসে করে দুইবার দুই গ্লাস মেপে ছালেহা খাতুনের হাতে দেয়। তখন কথাটা বলে, আমার বৌমারে নিয়া মাউনতলা জামাল কবিরাজের কাছে যাইতে পারবি?
কবে?
এই মঙ্গলবার।
সিরাজ মাথা চুলকিয়ে একটু ভাবছে।এটা দেখে ছালেহা বেগম বলে, এই ছেমরা কি চিন্তা করছ। পারবি না যাইতে?
চাচী আমনের কথা কহনো ফালাইছি। এই মঙ্গলবার হইলে পারুম। আগামী সপ্তাহে একবার ঢাকা যাইতে অইবো। সৌদির ভিসা রেডি হইয়া গেছে। যাওয়ার দিন তারিখ ঠিক করুম।
কচ্ কি,কবে ঠিক হইলো!তাইলে আমারে দুধ রোজ দিব কে?
শাশুড়ি ও সিরাজের এইসব কথা ঘরের কোন দাঁড়িয়ে থেকে জামিলা সব ই শুনে। সিরাজের সাথে এত দূরে, নদী ভাইঙ্গা যাইতে তার প্রথমে একটু খটকা লাগছে সত্যি।তবে শাশুড়ি যখন বলছে,রিপন মাস্টার মায়ের কথায় অরাজি হইবো না। তাছাড়া সিরাজ পোলাডা বয়সে জামিলার চেয়ে কিছুটা বড় হইলে ও বড় গলায় ভাবি ভাবি বলে ডাকে। সন্মান করে।কথা বার্তায় প্যাচগোছ নাই। বিশ্বাস করণ যায়। জামিলা ঘরে গিয়ে খাটের এককোণে বসে এসব ভাবে।(চলবে)