পতাকার লাল রঙটা আজ ফিকে হয়ে এসেছে পুরোনো খামে,
তিনি বসে আছেন বারান্দার এক কোণে,
যেখানে রোদ এসে পৌঁছায় না ঠিকমতো।
বাইরে তখন উৎসবের সানাই বাজছে বহুদূর থেকে,
মঞ্চে নাম ঘোষণা হচ্ছে নতুন বিজয়ী পতাকাবাহীদের।
তিনি হাত দুটো কোলের ওপর স্থির রেখে শোনেন কেবল,
তাঁর চোখের কোণে কোনো স্পষ্ট অভিমান জমে না আর।
একদিন রক্ত লেগেছিল যে খাঁকি জামায়,
তা এখন কাঠের আলমারির গভীরে নীরব সাক্ষী।
কেউ আর জানতে চায় না সেই কনকনে শীতের রাতের কথা,
নদীর চরে কাটানো সেই আতঙ্কের প্রহরগুলোর প্রকৃত হিসাব।
মিছিলে মিছিলে ছেয়ে গেছে আজ গোটা শহর,
স্লোগানগুলো বড় বেশি চেনা, অথচ অদ্ভুত বিষণ্ন অচেনা।
কার যুদ্ধ কে লড়ল, আর জয়টা কার নামে লেখা হলো,
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর তিনি আর কোথাও খোঁজেন না।
দরজায় এসে দাঁড়ায় না কেউ আর কোনো জরুরি বার্তা নিয়ে,
পেনশনের মলিন খাতাটায় জমা পড়ে কিছু সামান্য অঙ্ক।
অথচ স্বাধীনতার আসল দামটা তিনি চুকিয়েছিলেন
নিজের আস্ত একটা উগ্র তরুণ বয়স নিঃশেষে দিয়ে।
এখন পথচলতি মানুষ তাঁকে দেখলে আর আলাদা করে চেনে না,
ভেবে নেয় অন্য আটদশটা সাধারণ অতিবৃদ্ধের মতোই একজন।
তিনিও চুপচাপ সরে দাঁড়ান মেহগনি দেওয়াল ঘেঁষে,
কাউকে নিজের পথ ছেড়ে দেওয়াটাই এখন তাঁর একমাত্র অভ্যাস।
সন্ধ্যে নামলে যখন পুরো শহরের আলোগুলো জ্বলে ওঠে একে একে,
তিনি নিজের পুরোনো ঘরের অন্ধকারেই বসে থাকেন একলা।
তিনি জানেন, কেবল শব্দ দিয়ে সুন্দর রূপকথা তৈরি হয় বটে,
কিন্তু সত্যিকারের ইতিহাস ঘুমিয়ে থাকে নিঃশব্দ কোনো ক্ষতের ভেতর।
তাঁর হাতের কাঠের লাঠিটা মেঝেতে পড়ে গিয়ে শব্দ তোলে সামান্য,
যে সার্বভৌম দেশটা তিনি একসময় গড়েছিলেন নিজের দুহাত দিয়ে,
আজ সেই চারপাশের দেশটাই তাঁর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
তুমি কে?
তিনি কোনো উত্তর দেন না সেই রুক্ষ প্রশ্নের,
শুধু নিঃশব্দে হেসে নিজের বুড়ো আঙুলের ছাপটুকু তুলে দেন কাগজে,
যেন এই একটা সামান্য ছাপই তাঁর বেঁচে থাকার শেষ আনুষ্ঠানিক শর্ত।
অথচ একসময় এই আঙুলগুলো চেপে ধরেছিল রাইফেলের নিখুঁত ট্রিগার,
চোখের ভেতরে জ্বলছিল একখানা পুরো স্বাধীন মানচিত্রের স্বপ্ন।
তখন তো কোনো সনদের তোয়াক্কা করেনি তরুণ রক্ত,
তাহলে আজ কেন শুধু এক টুকরো কাগজের কাছে এত দীর্ঘ দিন ভিক্ষা?
বাজারের মোড়ে আজ বিকোচ্ছে বীরত্বের রংচঙে পদক,
ভাষণ দিচ্ছেন যারা, তাঁরা অনেকেই সেদিনের আততায়ীর সারিতে ছিল।
ইতিহাসের পাতাগুলো কেমন যেন খুব সহজে বদলে যায়,
শুধু বদলায় না এই বৃদ্ধের বুকের ভেতর জমে থাকা আসল যাতনা।
তিনি কি তবে ভুল করেছিলেন সেদিন ওই উন্মুক্ত রণাঙ্গনে ছুটে গিয়ে?
নাকি ভুল ছিল এই ভেবে যে, দেশ মানে কেবল একটা নিজস্ব সীমানা?
দেশ তো আসলে মানুষের জন্য, মানুষের বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়া,
যেখানে সুবিচারের নাম করে কোনো মিথ্যা আশ্রয় পায় না।
আজকের তরুণদের হাসিমুখের ভিড় দেখলে তিনি থমকে যান,
মনে মনে বলেন, তোমরা ভালো থেকো, হে আমার পরবর্তী প্রজন্ম।
তোমাদের এই অবারিত স্বাধীনতার পেছনে লুকিয়ে আছে
কত শত না বলা নাম, কত অচেনা মানুষের আত্মদানের হিসাব।
যুদ্ধ কখনো থামে না, তা কেবল রূপ বদলায় বারবার,
আগে ছিল শত্রুর গোলার বিরুদ্ধে, এখন টিকে থাকার অবিরাম লড়াই।
যদি কখনো মনে হয় বিচার হারিয়ে যাচ্ছে এই বিভ্রান্তির ভিড়ে,
তবে জেনে রেখো, মুক্তি কোনো সস্তা উদযাপনের ঢাকঢোল নয়।
মুক্তি হলো অন্যায় দেখে চোখ না বোজার দুর্লভ সাহস,
মুক্তি হলো সত্যের পাশে এসে বুক চিতিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়ানো।
যদি সত্যি স্বাধীন হতে চাও, তবে মানচিত্রকে ভালোবাসার আগে
নিজেদের ভেতরের সেই শৃঙ্খলহীন মানুষটাকে জাগিয়ে তোলো।
খোলা জানালার বাইরে রাতের বাতাস বয়ে যায় শান্তভাবে,
বৃদ্ধের বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস মিশে যায় অসীম আকাশের পানে।
তিনি চোখ বোজেন, কিন্তু তাঁর প্রদীপের আলো নেভে না,
কারণ নীরব ইতিহাস তো বিজয়ের মিছিলে নয়, এমন বুকেই বেঁচে থাকে।