লেখক কি জন্মান, নাকি তৈরি হন?
প্রতিভা আর অনুশীলনের যে চিরায়ত দ্বন্দ্ব, তা বাংলা সাহিত্যচর্চার আঙিনায় এক অমোঘ কৌতূহল। আমাদের এখানে একটি ধারণা শিকড় গেড়ে বসেছে—ভালো লেখার পেছনে কেবলই কাজ করে অলৌকিক প্রতিভা। যিনি প্রতিভাবান, তিনি লিখবেন; আর যার সেই জন্মগত প্রতিভা নেই, তিনি লিখতে পারবেন না। আপাতদৃষ্টিতে কথাটি নির্দোষ মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মস্ত এক বিভ্রান্তি। এই ভ্রান্তির চাদরে ঢাকা পড়ে যায় লেখকের দীর্ঘদিনের শ্রম, নির্ঘুম রাতের সাধনা, পাঠের গভীরতা এবং নিজেকে ভাঙা-গড়ার নীরব লড়াই।
বিষয়টা তো এত সরল নয়। কেবল ভাষা ব্যবহার করতে পারলেই কি কেউ ভাষার শিল্পী হয়ে ওঠেন? অনুভূতিপ্রবণ হওয়াই যদি কবি হওয়ার একমাত্র শর্ত হতো, তবে অনুভবে আলোড়িত প্রতিটি মানুষই তো সাহিত্যিক হতে পারতেন। বস্তুত সাহিত্য কেবল হৃদয়ের কথা উগরে দেওয়া নয়; অনুভূতিকে শিল্পে রূপান্তরের এক সূক্ষ্ম ও নান্দনিক প্রকৌশলও বটে। সেখানে আছে শব্দের নিখুঁত বিন্যাস, বাক্যের প্রচ্ছন্ন ছন্দ, আখ্যানের স্থাপত্য এবং চিত্রকল্পের নীরব ক্যানভাস। সহজাত অনুভূতি হয়তো অনুভূতির জন্ম দেয়, কিন্তু সেই কাঁচামালকে শানিত অলঙ্কারে রূপ দিতে প্রয়োজন অর্জিত দক্ষতা।
এই দক্ষতা কোনো অলৌকিক আশীর্বাদ নয়, এটি কঠোর অনুশীলনের ফসল। একবুক তৃষ্ণা নিয়ে পড়া, নিরন্তর লেখা, ভুল শুধরে নেওয়া, এমনকি বুকচাপা কষ্টে নিজের প্রিয় বাক্যটি কেটে ফেলার নির্মম সাহস অর্জনের মধ্য দিয়েই একজন লেখকের জন্ম হয়। যে বাক্যটিকে প্রথম খসড়ায় মনে হয়েছিল অপূর্ব, সম্পাদনার টেবিলে নির্দয়ভাবে তাকেই হয়তো অপ্রয়োজনীয় বলে বর্জন করতে হয়। প্রথম খসড়ার অগোছালো রূপটি কয়েক দফা পুনর্লিখনের পর তবেই শিল্পিত অবয়ব পায়। অর্থাৎ, মনোগত তাগিদ থেকে লেখার সূচনা হলেও, একটি সার্থক সাহিত্য নির্মাণের জন্য প্রয়োজন সচেতন ও একনিষ্ঠ শিল্পচর্চা।
অথচ আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে এই কারিগরি ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিকটি নিয়ে কথা হয় বড্ড কম। কোনো লেখককে নিয়ে আলোচনার টেবিলে আমরা তাঁর মেধা, কল্পনাশক্তি বা জীবনবোধের স্তুতি গাই; কিন্তু তাঁর শৈল্পিক গঠনকৌশল, ভাষা ব্যবহারের বিশেষত্ব কিংবা পূর্বসূরিদের থেকে নিজেকে আলাদা করার লড়াইটি অলক্ষ্যেই থেকে যায়। এতে লেখালেখিকে ঘিরে এক রহস্যময় আবছায়া তৈরি হয়। মনে হতে থাকে, লেখকের ভেতরে কোনো অজ্ঞাত ঈশ্বর বাস করেন, যিনি সময়ে-অসময়ে কলমের ডগায় ভর করেন। একজন কবিকে তো দেখলাম ঘোষণাই দিতে যে, নবুওত না পেলে যেমন নবী হওয়া যায় না তেমনি কবুওত না পেলেও কবি হওয়া যায় না!
এই অলৌকিকত্বের মোড়ক নতুন লেখকদের সামনে এক গভীর অন্ধকার তৈরি করে। তাঁরা বুঝতে পারেন না কীভাবে একটি চরিত্রের মনস্তত্ত্ব বুনতে হয়, কীভাবে বর্ণনার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, কিংবা আখ্যানকে অপ্রয়োজনীয় শব্দের চর্বি থেকে মুক্ত করতে হয়। 'বেশি বেশি লিখুন'—এই প্রথাগত ও একরৈখিক উপদেশের চত্বরে দাঁড়িয়ে তরুণ লেখকেরা তাই পথ হারান। আত্মবিশ্লেষণ ছাড়া বারবার ভুল করে যাওয়া তো আর দক্ষতা বাড়ায় না, বরং তা ভুলকেই অভ্যাসে পরিণত করে।
এর মানে অবশ্য এই নয় যে সাহিত্যকে কোনো কারখানার ছাঁচে ঢেলে উৎপাদন করা সম্ভব, কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি থাকলেই কালজয়ী সাহিত্য রচনা সম্ভব। মহৎ সৃষ্টির কোনো বাঁধাধরা সূত্র হয় না; ইতিহাস সাক্ষী, বহু কালজয়ী লেখক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজের পথ তৈরি করে নিয়েছেন। কিন্তু ব্যতিক্রম কখনো সাধারণ নিয়ম হতে পারে না। বিশ্বসাহিত্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, মহান লেখকেরা কেবল ভেতরের আলোর ওপর ভর করে পথ হাঁটেননি। তাঁরা পড়েছেন, সমকালের সাথে সংলাপে বসেছেন, পূর্বসূরিদের ধারাকে আত্মস্থ করে আবার তাকে ভেঙে নতুন রীতির জন্ম দিয়েছেন।
অতএব, প্রতিভা হয়তো পথের সূচনা মাত্র; কিন্তু সেই প্রতিভাকে বিকশিত করা, সীমানা অতিক্রম করা এবং ভাষার বুকে নতুন ফলনের দায় বা উপায় অনুশীলনের। লেখক একা সৃষ্টি করেন সত্য, কিন্তু তাঁর পূর্ণ বিকাশ ঘটে একটি সুসংগঠিত সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচর্যার ভেতর। আজ যখন আমরা বিশ্বমঞ্চে বাংলা সাহিত্যের অবস্থান কিংবা নোবেল না পাওয়ার আক্ষেপ নিয়ে ব্যাকুল হই, তখন শুধু লেখকের ব্যক্তিগত মেধার দিকে না তাকিয়ে আমাদের সাহিত্যিক পরিবেশ, গঠনমূলক সমালোচনার অভাব এবং লেখক গড়ার কাঠামোর দিকেও চোখ ফেরাতে হবে। একজন সম্ভাবনাময় লেখককে তাঁর সর্বোচ্চ প্রকাশের দিগন্তে পৌঁছে দিতে আমরা কতটা পথ তৈরি করছি—সেই অনুসন্ধানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।
(আগামী পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ। দ্বিতীয় পর্বের ’খ’ অংশে আমরা বিশ্বসাহিত্য থেকে কিছু সাহিত্যিকদের জীবনপথ পর্যালোচনা করবো।)