Story

মেঘলা দিনে তুমি

October 12, 2026

37 views

আকাশের মুখ ভার হলে শহর ঢাকার রূপটা এক লহমায় বদলে যায়। কংক্রিটের রুক্ষতা যেন মেঘের কোমলতায় ভিজে কিছুটা নমনীয় হয়ে ওঠে, আর বাতাসের বুকে ভাসে এক অদ্ভুত অচেনা সোঁদা সুবাস। যখনই মেঘের দল দলবেঁধে শহরের আকাশ দখল করে, কিংবা জীবনের কোনো একটা হিসেব মেলাতে না পেরে মনের ভেতর ধূসর ধোঁয়াটে একাকীত্ব জমে ওঠে, মুশফিকের পা দুটো অবচেতনভাবেই একটা নির্দিষ্ট ঠিকানার দিকে চলতে শুরু করে।

ধানমন্ডি লেকের বত্রিশ নম্বরের ঠিক উল্টো পাশটা। সেখানে লেকের পাড় ঘেঁষে জলের ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন হিজল গাছ। বর্ষা এলে গাছটার নিচে লালচে-গোলাপি ফুলের নরম রেণু ঝরে পড়ে ঘাসের ওপর এক অপার্থিব বিছানা পেতে দেয়। লেকের জলে মৃদু ঢেউ ওঠে, দূর থেকে ভেসে আসে গাছের পাতায় বাতাসের দোলা খাওয়ার একটানা মর্মর ধ্বনি। শহরের তুমুল যানজট, মানুষের অন্তহীন তাড়াহুড়ো আর কোলাহল যেন এই গাছটার নিচে এসে অদৃশ্য কোনো জাদুমন্ত্রে থেমে যায়।

মুশফিক পেশায় আর্কিটেক্ট। মানুষের জন্য সুরম্য অট্টালিকা, আলো-বাতাস খেলার পরিপাটি ঘরের নকশা আঁকা যার কাজ, সে নিজেই কখনো কখনো নিজের ভেতর একচিলতে খোলা বারান্দা খুঁজে পায় না। কর্পোরেট ক্লায়েন্টের অযৌক্তিক চাহিদা, ড্রয়িং বোর্ডের ওপর অবিশ্রান্ত মেপে চলা স্কেল, আর মধ্যবিত্ত জীবনের অনুচ্চারিত প্রত্যাশার চাপে যখন দম বন্ধ হয়ে আসে, তখনই সে এই হিজলতলায় এসে আশ্রয় নেয়। ঘাসের ওপর পা ঝুলিয়ে লেকের কালচে সবুজ জলের দিকে তাকিয়ে বসে থাকা, এটাই তার একমাত্র উপশম। হাতে থাকে মাটির ভাঁড়ের লিকার চা, আর কাঁধের ঝোলা ব্যাগে পুরোনো একটা স্কেচবুক।

সেদিনও আকাশটা সকাল থেকেই ছিল মেঘলা। শ্রাবণের মেঘ যেন শহরের মাথার ওপর কালো চাদর বিছিয়ে বসে ছিল, নামব নামব করেও বৃষ্টি নামছিল না। একটা থমথমে, গম্ভীর আবহাওয়া। মুশফিকের মেজাজটা সকাল থেকেই খিটখিটে ছিল। তার ডিজাইন করা একটা ড্রিম প্রজেক্টকে এক ক্ষমতাবান ক্লায়েন্ট সামান্য খরচের অছিলায় সাধারণ ইট-পাথরের বাণিজ্যিক খাঁচায় রূপান্তর করার নির্দেশ দিয়েছে। আর্কিটেকচারের যে নান্দনিকতা নিয়ে সে স্বপ্ন দেখত, তা যেন সস্তা সিমেন্টের নিচে চাপা পড়ে গেছে। 

অফিস থেকে লাঞ্চের বিরতিতে বের হয়ে সে আর ফিরে যায়নি। সোজা চলে এসেছিল বত্রিশের এই ঘাটে।

হিজল গাছটার নিচে বসে সে আনমনে ঘাসের পাতা ছিঁড়ছিল। লেকের জলে তখন মেঘের ঘন কালো ছায়া দুলছে। বাতাসে ভিজে ঠান্ডা একটা স্পর্শ। ঠিক তখনই প্রথম ফোঁটাটা তার কপালে এসে পড়ল। তারপর আরেকটা, আরেকটা।

মুশফিক নড়েচড়ে বসল না। বৃষ্টিতে ভিজতে তার ভালোই লাগে, অন্তত চোখের কোনো গোপন আর্দ্রতা থাকলে তা বৃষ্টির জলের সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়। কেউ প্রশ্ন করার সুযোগ পায় না।

"ভিজলে কিন্তু নিউমোনিয়া হবে, আর এই অসময়ে ঠান্ডা লাগলে ওষুধ খেয়েও কাজ হয় না।"

খুব নরম, অথচ স্পষ্ট একটা কণ্ঠস্বর বৃষ্টির শব্দের ভেতর দিয়ে তার কানের পর্দায় এসে ঠেকল। মুশফিক চমকে পাশে তাকাল।

তার মাথার ওপর তখন একটা গাঢ় নীল রঙের ছাতা ধরা। আর ছাতার হাতলটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী। পরনে মেটে রঙের সুতির কুর্তি, গলায় কালো ওড়না আলগা করে জড়ানো। কাঁধের ওপর নেমে আসা অবাধ্য কিছু চুল বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে কপালে লেপ্টে আছে। তার মুখের গড়ন সাধারণ হলেও একজোড়া চোখের দৃষ্টি ছিল অসম্ভব গভীর ও মায়াবী। সেই চোখে কোনো চপলতা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত শান্ত পর্যবেক্ষণ। মুশফিক একটু অপ্রস্তুত হয়ে নিজেকে সামলে নিল। "না মানে... আমি বৃষ্টি দেখতেই এখানে বসি।"

মেয়েটি একটু হাসল। ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম এক বক্ররেখা ফুটে উঠল। সে ছাতাটা সামান্য নামিয়ে মুশফিকের আরেকটু কাছে এনে ধরল, যাতে বৃষ্টির জলের ছাঁট ছেলেটার কাঁধে না লাগে।

"বৃষ্টি দেখতে বসা আর নিজেকে শাস্তি দেওয়ার মধ্যে কিন্তু একটা সূক্ষ্ম তফাত আছে," মেয়েটি বলল। "গত আধঘণ্টা ধরে আমি ওই উল্টোদিকের কাঠের বেঞ্চে বসে আপনাকে দেখছি। আপনি যেভাবে জলের দিকে তাকিয়ে আছেন, মনে হচ্ছিল এই লেকটা শুকিয়ে গেলেই বুঝি আপনার মুক্তি!"

মুশফিকের অস্বস্তি এবার বিস্ময়ে রূপ নিল। এই শহরে কেউ কাউকে এত গভীরভাবে লক্ষ্য করে না। সবাই যার যার মোবাইল স্ক্রিনে অথবা নিজের ধান্দায় ব্যস্ত। সে ভুরু কুঁচকে বলল, "আপনি আমাকে লক্ষ্য করছিলেন?"

"উপায় ছিল না," মেয়েটি কাঁধ ঝাঁকাল। "আমি এখানে স্কেচ করতে এসেছিলাম। আর আমার ল্যান্ডস্কেপের ফ্রেমের ঠিক মাঝখানে একটা মানুষ এমন একাকী মূর্তির মতো বসে থাকলে তাকে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।"

মেয়েটির কাঁধে ঝোলানো ক্যানভাস ব্যাগটার দিকে এবার মুশফিকের নজর গেল। ব্যাগের মুখ দিয়ে উঁকি মারছে তুলি আর চারকোল পেন্সিলের ডগা। মুশফিক কিছু বলার আগেই মেয়েটি তার পাশে ভেজা ঘাসের ওপর ছাতাটা আরেকটু হেলিয়ে দিয়ে বসে পড়ল। কোনো দ্বিধা নেই, কোনো আগ বাড়িয়ে ভাব জমানোর চেষ্টা নেই,একেবারে সহজ, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে।

"আমি মেঘলা," সে হাত বাড়িয়ে দিল না, শুধু নিজের পরিচয়টা ভাসিয়ে দিল বাতাসে।

মুশফিক তার ভেজা হাতটা প্যান্টে মুছে নিয়ে বলল, "মুশফিক।"

"মুশফিক ভাইয়া, আপনার এই হিজল গাছটা কিন্তু ভারী চমৎকার," মেঘলা লেকের দিকে চোখ রেখে বলল। "অন্যান্য গাছের মতো এতো উদ্ধত নয়। কেমন জলের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন লেকের সাথে কোনো গোপন ফিসফিসানি চলছে।"

মুশফিক স্তব্ধ হয়ে গেল। ঠিক এই ভাবনাটাই তার মাথায় কতবার এসেছে! সে কতদিন ভেবেছে, এই গাছটা যেন তার মতোই এক নিঃসঙ্গ পাহারাওয়ালা, যে নিজের বিষাদ লেকের বুক ছাড়া আর কাউকে বলতে পারে না। অথচ সে কখনো কাউকে এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করে বলেনি। এই অচেনা মেয়েটি এক মুহূর্তে কীভাবে তার মনের ভাবটা এমন অবিকল বলে ফেলল?

বৃষ্টির বেগ তখন বাড়ল। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি আছড়ে পড়তে লাগল ধানমন্ডির লেকের শান্ত জলে। চারপাশের সানবাঁধানো ওয়াকওয়ে ফাঁকা হয়ে গেছে। চা-ওয়ালারা পলিথিন মুড়ি দিয়ে টিনের ঝাঁপ ফেলে দিয়েছে। শুধু এই নীল ছাতার নিচে বসে রইল দুটি অচেনা মানুষ।

মেঘলা তার ব্যাগ থেকে দুটো কাঁচের বয়ামে রাখা মুড়ি আর চানাচুর বের করল। "শেয়ার করবেন? বৃষ্টিতে লেকের পাড়ে বসে চানাচুর-মুড়ি খাওয়ার আনন্দ কোনো ফাইভ-স্টার ক্যাফেতে পাওয়া যায় না।" মুশফিক না করতে পারল না। সে হাত পাতল। সেই বৃষ্টিভেজা মেঘলা দুপুরে, হিজলতলার আশ্রয়ে শুরু হলো তাদের অসমাপ্ত এক কথোপকথন। কোনো ভারী তত্ত্ব নয়, কোনো পরিচয়ের জটিল আনুষ্ঠানিকতা নয়। মেঘলা চারুকলায় মাস্টার্স করছে, জলরং তার ভালোবাসা। আর মুশফিক আর্কিটেক্ট,ইট-কাঠের কাঠামোর ভেতর প্রাণের সঞ্চার করাই যার স্বপ্ন ছিল। কথা বলতে বলতে মুশফিক লক্ষ্য করল, তার ভেতরের সেই জমটবাঁধা অন্ধকার মেঘগুলো কোথায় যেন ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। এই মেয়েটির কথার ভেতর এমন এক অনায়াস সারল্য ছিল, যা মানুষের ভেতরের সমস্ত জটিলতাকে খুব সহজে ধুয়ে দিতে পারে।

বৃষ্টি থামল প্রায় ঘণ্টাখানেক পর। শহরের আলো তখন ফিকে হয়ে আসছে। মেঘলা উঠে দাঁড়াল। ছাতাটা বন্ধ করে কয়েকবার ঝাঁকুনি দিয়ে পানি ঝরিয়ে নিল।

"আমার যাওয়ার সময় হলো," মেঘলা হাসল। "ধন্যবাদ মুশফিক সাহেব, আমার ড্রয়িংয়ের ফ্রেমটা নষ্ট না করে উল্টো সুন্দর একটা গল্প যোগ করে দেওয়ার জন্য।"

"আবার কি দেখা হবে?" মুশফিকের মুখ দিয়ে কথাটা নিজের অজান্তেই ফসকে বের হয়ে গেল। বলেই সে একটু লজ্জিত হলো।

মেঘলা পেছন ফিরে তাকাল। তার চোখের কোণে খেলে গেল এক চিলতে রহস্যময় দীপ্তি। "যদি আপনার মন খারাপ হয়, আর আকাশটা এমন মেঘলা থাকে... তবে এই হিজল গাছ তো এখানেই থাকবে, তাই না?"

সে আর দাঁড়াল না। হালকা পদক্ষেপে ভিজে পিচঢালা পথ ধরে হেঁটে চলে গেল ধানমন্ডি সাত নম্বরের দিকে। মুশফিক একদৃষ্টে চেয়ে রইল সেই চলে যাওয়ার পথের পানে। তার হাতের তালুতে তখনো মুড়ির সামান্য গন্ধ, আর বুকের ভেতর এক অচেনা, মিষ্টি সুরের রেশ। এরপর থেকে মুশফিকের জীবনটা কেমন যেন একটা নতুন ছন্দে বাঁধা পড়ল। আগে মন খারাপ হলে সে হিজলতলায় আসত বিষাদের ভার কমাতে। আর এখন সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে,কখন মেঘ জমবে? কখন দুপুরের রোদ ম্লান হয়ে এসে বাতাসটা ভারী হবে?

সপ্তাহে অন্তত এক বা দুদিন তাদের দেখা হতে লাগল। ঠিক সেই একই জায়গায়। কখনো মেঘলা এসে দেখত মুশফিক আগেই বসে আছে, আবার কখনো মুশফিক এসে দেখত মেঘলা গাছের ডালে হেলান দিয়ে বসে খাতায় স্কেচ আঁকছে। তাদের মধ্যে কোনো ফোন নম্বর বিনিময় হয়নি। কোনো ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়ার সংযোগ ছিল না। একবিংশ শতাব্দীর এই অতি-সংযুক্ত যুগে তাদের সম্পর্কটা যেন দাঁড়িয়ে ছিল ষাটের দশকের কোনো রোমান্টিক চিঠির মতো এক অদ্ভুত বিশ্বাস আর প্রতীক্ষার ওপর। মুশফিক জানত না মেঘলা কোথায় থাকে, তার পরিবারে কে কে আছে। মেঘলাও মুশফিকের স্যালারি, ফ্ল্যাট বা ক্যারিয়ার নিয়ে কখনো কোনো কৌতূহল দেখায়নি। তারা যখন হিজলতলায় বসত, তারা হয়ে উঠত সমাজ ও বাস্তবতার শৃঙ্খলমুক্ত দুটি বিশুদ্ধ প্রাণ।

"মুশফিক," একদিন বিকেলে মেঘলা হঠাৎ বলল। সেদিনও আকাশটা ছিল ধোঁয়াটে ধূসর। "তুমি কখনো ভেবে দেখেছ, মানুষ কেন কিছু জায়গায় বারবার ফিরে আসে?"

মুশফিক মাটির কাপে চায়ের চুমুক দিয়ে বলল, "হয়তো শান্তির খোঁজে। যে জায়গাটা মানুষকে বিচার করে না, কোনো প্রত্যাশা চাপিয়ে দেয় না, সেখানে মানুষ বারবার ফেরে।"

"না," মেঘলা মাথা নাড়ল। তার চুলগুলো বাতাসে সামান্য উড়ছিল। "মানুষ আসলে কোনো জায়গার প্রেমে পড়ে না। মানুষ প্রেমে পড়ে সেই অনুভূতিটার, যা সে ওই নির্দিষ্ট জায়গায় বসে নিজের ভেতর আবিষ্কার করে। তুমি এই হিজল গাছটাকে ভালোবাসো না মুশফিক; তুমি ভালোবাসো সেই মুশফিককে, যে এই গাছের নিচে এসে নিজের সমস্ত অহংকার আর ক্লান্তি ভুলে একেবারে নগ্ন সত্যের মুখোমুখি হতে পারে।"

মুশফিক মুগ্ধ চোখে মেঘলার মুখের দিকে চাইল। এত কম বয়সে একটা মানুষের ভেতর এমন জীবনদর্শন কোথা থেকে আসে? মেঘলার বয়স খুব বেশি হলে চব্বিশ বা পঁচিশ। কিন্তু তার চোখের গভীরতায় তাকালে মনে হয়, সে যেন শতবর্ষের কোনো শান্ত নদীর মতো সবকিছু দেখেছে এবং ক্ষমা করে দিয়েছে।

"তুমি ছবি আঁকো কেন মেঘলা?" মুশফিক জিজ্ঞেস করল।

মেঘলা তার স্কেচবুকের পাতা ওল্টাল। সেখানে লেকের জলের বিভিন্ন রূপ ধরা পড়েছে কাঠকয়লা আর পেনসিলের আঁচড়ে। "কারণ শব্দ কখনো কখনো বড় বেশি কৃত্রিম হয়ে যায় মুশফিক। ভালোবাসা, কষ্ট, একাকীত্ব,এগুলো শব্দ দিয়ে প্রকাশ করতে গেলে কেমন যেন সস্তা শোনায়। কিন্তু রঙ আর রেখায় কোনো মিথ্যা থাকে না। রঙের কোনো ব্যাকরণ নেই, কেবল অনুভূতি আছে।"

মুশফিক দেখল, মেঘলার স্কেচবুকের শেষ পাতায় একটি মানুষের অবয়ব আঁকা। হিজল গাছের নিচে বসে থাকা এক চওড়া কাঁধের যুবক, যে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। ছবিটির নিচে খুব ছোট করে পেন্সিলে লেখা,‘মেঘলা দিনের সঙ্গী’।

মুশফিকের বুকের ভেতর এক প্রবল রক্তক্ষরণ হলো, তবে সে রক্তক্ষরণে কোনো যন্ত্রণা ছিল না; ছিল এক স্বর্গীয় ভালোলাগার তীব্র আলোড়ন। সে আলতো করে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল। ঘাসের ওপর রাখা মেঘলার ডান হাতের নরম আঙুলগুলোর ওপর নিজের আঙুল রাখল।

মেঘলা হাত সরিয়ে নিল না। সে শুধু মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে তখন লেকের জলের মতোই এক স্থির, গভীর সমর্পণ। কোনো কথা হলো না। দুজনের আঙুলগুলো নিঃশব্দে একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। সেই প্রথম স্পর্শ। শহরের যান্ত্রিক বাতাসে তখন হাজারটা গাড়ির হর্ন বাজছিল, কিন্তু সেই হিজলতলার একচিলতে জমিনে নেমে এসেছিল এক আদিম ও চিরন্তন নিস্তব্ধতা। যেখানে ভাষা স্তব্ধ হয়ে যায়, আর হৃদস্পন্দন কথা বলতে শুরু করে।

কিন্তু জীবন কখনো এক সরলরেখায় চলে না। নিয়তি বড় অদ্ভুত নাট্যকার; সে আনন্দের চরম মুহূর্তেও এক চিমটে বিষাদ মিশিয়ে দিতে ভালোবাসে। ভাদ্রের মাঝামাঝি সময়ে হুট করেই মেঘলা আসা বন্ধ হয়ে গেল।

প্রথম দিন মুশফিক এসে বসে রইল বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল, কিন্তু নীল ছাতাটা এলো না। মুশফিক ভাবল, হয়তো কোনো ব্যস্ততা ছিল, হয়তো চারুকলার কোনো প্রদর্শনী চলছে। পরের দিনও সে এলো। আকাশ মেঘলা ছিল না, কড়া রোদ ছিল। কিন্তু মুশফিক বসে রইল। মেঘলা এলো না।

তৃতীয় দিন, চতুর্থ দিন, এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ...মুশফিকের অফিসের কাজকর্মে মন বসল না। সে প্রায় উন্মাদ হয়ে উঠল। যে মেয়েটির কোনো ফোন নম্বর নেই, কোনো ঠিকানা নেই, তাকে এই দুই কোটি মানুষের ইট-পাথরের ঢাকা শহরে কীভাবে খুঁজে পাবে সে? সে চারুকলা অনুষদে গিয়ে পাগলের মতো ঘুরেছে। কিন্তু শুধু ‘মেঘলা’ নাম দিয়ে মাস্টার্সের শত শত ছাত্রীর ভিড়ে তাকে খুঁজে পাওয়া ছিল খড়ের গাদায় সুই খোঁজার মতো অসম্ভব। কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারল না এই মেঘলা আসলে কোন ব্যাচের বা কোন ডিপার্টমেন্টের।

মুশফিকের মনে হতে লাগল, মেঘলা কি তবে কোনো বাস্তব মানবী ছিল না? সে কি কেবল এই ধানমন্ডি লেকের মেঘলা দিনের কোনো মায়াবিনী ছায়া? কোনো জলপরী, যে তার একাকীত্বের হাহাকার দেখে কিছুদিনের জন্য রক্ত-মাংসের রূপ নিয়ে ধরা দিয়েছিল, তারপর আবার এই লেকের অতল জলে মিলিয়ে গেছে?

মুশফিকের ভেতরের সেই পুরোনো অবসাদ এবার দ্বিগুণ শক্তিতে ফিরে এলো। কিন্তু এবার আর শুধু একাকীত্ব নয়, তার সাথে যোগ হলো এক তীব্র বিরহের দহন। যে হিজল গাছটা ছিল তার শান্তির আশ্রয়, আজ সেই গাছটার নিচে এলে তার মনে হয় প্রতিটি পাতা যেন বিদ্রূপের হাসি হাসছে। প্রতিটি বাতাস যেন হাহাকার করে উঠছে। প্রায় এক মাস পর। আশ্বিনের এক বিদায়ী বিকেলে আকাশটা আবার সেই আষাঢ়ের মতো কালো হয়ে এলো। শ্রাবণের মেঘের মতো ভারী হয়ে নামল আঁধার। বাতাস বইতে শুরু করল উন্মত্ত বেগে। মুশফিক অফিস থেকে ছুটি নিয়ে আবার এলো সেই হিজলতলায়। আজ তার চোখ দিয়ে আর কোনো আর্দ্রতা লুকানোর চেষ্টা নেই। সে বসে রইল শূন্য দৃষ্টিতে। আকাশ ডাকল গুরুগুরু রবে। বৃষ্টি নামল,মুহূর্তের ভেতর মুষলধারে ধুয়ে দিল সমস্ত শহর।

মুশফিক ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। তার শার্ট ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে, কপাল বেয়ে জলের ধারা নেমে চোখ ঝাপসা করে দিচ্ছে। সে নড়ল না। তার মনে হচ্ছিল, এই বৃষ্টি যদি তাকে ধুয়েমুছে এই লেকের জলের সাথে চিরতরে মিশিয়ে দিত, তবে হয়তো এই বুকের ভেতর চেপে থাকা পাথরটা নেমে যেত।

"আমি কি বলিনি, ভিজলে নিউমোনিয়া হবে? মানুষের এত অবাধ্য হতে নেই মুশফিক।"

বৃষ্টির তীব্র শব্দের ভেতর দিয়েও সেই অতি পরিচিত, বাঁশির মতো সুরেলা কণ্ঠটি তার কানে আছড়ে পড়ল।

মুশফিক চমকে মুখ তুলল। তার হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য যেন স্পন্দন ভুলে গেল।

তার মাথার ওপর সেই গাঢ় নীল ছাতা। কিন্তু ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে মুশফিকের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।

মেঘলা দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এ কোন মেঘলা? তার পরনে আগের মতোই সাধারণ সুতির কুর্তি, কিন্তু তার মুখটি অসম্ভব ফ্যাকাসে, শীর্ণ। চোখের নিচে গভীর কালচে দাগ, গাল দুটো ভেঙে গেছে। আর সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য,তার মাথার সেই সুন্দর, কাঁধ পর্যন্ত নামা রেশমি চুলগুলো আর নেই। তার মাথায় জড়িয়ে রাখা একটি সাধারণ সুতির স্কার্ফ। মুশফিক উঠে দাঁড়াল। তার পা কাঁপছিল।

"মেঘলা..." মুশফিকের গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হতে চাইল না।

মেঘলার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা, ম্লান কিন্তু অমলিন হাসিটি ফুটে উঠল। তার চোখে চিকচিক করছে জল।

"আমার কেমোথেরাপির সাইকেলগুলো শেষ হতে একটু বেশি সময় লেগে গেল মুশফিক। ডাক্তাররা কিছুতেই আমাকে হাসপাতালে থেকে বের হতে দিচ্ছিল না। কিন্তু আজ সকালে যখন রেডিওতে শুনলাম ঢাকা শহরে ভারী বর্ষণ হবে, তখন আমার মনে হলো,আমার এই অবাধ্য মানুষটা নিশ্চয়ই ওই বোকার মতো হিজল গাছের নিচে বসে ভিজছে।"

মুশফিকের মাথায় যেন একসাথে হাজারটা বজ্রপাত হলো। কেমোথেরাপি? ক্যান্সার? এই কথাগুলোর অর্থ তার মস্তিষ্কে পৌঁছাতে কয়েক মুহূর্ত সময় নিল।সে মেঘলার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখ দুটো তখনো সেই একই আলোয় উজ্জ্বল, যে আলো সে প্রথম দিন দেখেছিল। যে মেয়েটি মৃত্যুকে এত কাছ থেকে দেখে এসেছে, যে মেয়েটি প্রতিদিন যন্ত্রণার নরক পেরিয়ে এসেছে,সে আজও এই দুর্যোগের দিনে তার জন্য একচিলতে ছাতা নিয়ে ছুটে এসেছে!

মুশফিকের ভেতরের সমস্ত অহংকার, সমস্ত যুক্তি, সমস্ত দ্বিধা এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে আর এক মুহূর্তও ভাবল না। ছাতাটার পরোয়া করল না। সে দুই পা এগিয়ে গিয়ে মেঘলাকে নিজের দুই বাহুর শক্ত বাঁধনে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল।

ছাতাটা মেঘলার হাত থেকে খসে পড়ে গেল ঘাসের ওপর। মুশফিক পরম মমতায়, নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে মেঘলাকে আগলে নিল। সে অনুভব করল মেঘলার শীর্ণ শরীরটা কাঁপছে। মেঘলার ঠান্ডায় নীল হয়ে যাওয়া হাত দুটো ধীরে ধীরে উঠে এসে মুশফিকের পিঠ জড়িয়ে ধরল। বৃষ্টির জল আর তাদের দুজনের চোখের জল একাকার হয়ে ঝরে পড়তে লাগল।

"কেন বলোনি মেঘলা? কেন আমাকে একা ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলে?" মুশফিকের কণ্ঠ কান্নায় রুদ্ধ হয়ে এলো। সে মেঘলার স্কার্ফঢাকা মাথায় নিজের থুতনি ঠেকিয়ে রাখল।

মেঘলা মুশফিকের বুকের ওপর মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল, "কারণ আমি চেয়েছিলাম তুমি আমাকে ভালোবাসো একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে, কোনো মরণাপন্ন রোগীর করুণা হিসেবে নয়। আমি চেয়েছিলাম এই হিজলতলার স্মৃতিগুলো যেন কেবল আনন্দের হয়, কোনো ওষুধের গন্ধ যেন সেখানে না থাকে।"

"তুমি কি পাগল?" মুশফিক মেঘলার মুখটা নিজের দুই হাতের অঞ্জলিতে তুলে ধরল। তার ভিজে যাওয়া ফ্যাকাসে গালে আঙুল বুলিয়ে দিল পরম মমতায়। "তুমি কি ভাবো আমি তোমার এই শরীরটাকে ভালোবেসেছি? আমি তোমার ওই আত্মাকে ভালোবেসেছি মেঘলা, যা আমার এই পাথুরে জীবনকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। তুমি যদি একদিনের জন্যও বাঁচো, আমি সেই একদিনের প্রতিটি সেকেন্ড তোমার পাশে বসে কাটাতে চাই।"

মেঘলা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল মুশফিকের চোখের দিকে। সেই চোখে কোনো মিথ্যা ছিল না, কোনো মেকি সান্ত্বনা ছিল না; ছিল এক পাহাড়ের মতো অটল, নিঃশর্ত ভালোবাসার সংকল্প।মেঘলার চোখ দিয়ে বাঁধভাঙা অশ্রুর ধারা নেমে এলো। সে তার ভেজা মুখটি আবার গুঁজে দিল মুশফিকের চওড়া বুকে।

"ডাক্তাররা বলেছে আমার সময় খুব বেশি নেই মুশফিক... হয়তো কয়েক মাস, হয়তো এক বছর..."

"তবে ওই কয়েকটা মাসই হবে আমাদের এক অনন্ত জীবন," মুশফিক দৃঢ় গলায় বলল। "আমরা প্রতিদিন এই হিজলতলায় আসব। আমরা ছবি আঁকব, আমরা এক কাপ চা ভাগ করে খাব। আর এই পুরো ঢাকা শহর দেখবে,মৃত্যু হয়তো মানুষকে কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু ভালোবাসাকে কখনো পরাজিত করতে পারে না।"

বৃষ্টি তখন তার সমস্ত উন্মাদনা নিয়ে লেকের বুকে আছড়ে পড়ছে। বাতাসে হিজল ফুলগুলো ঝরে ঝরে ভেসে যাচ্ছে জলের ওপর। মুশফিক ঝুঁকে পড়ে মেঘলার ঠান্ডা, ভেজা কপালে একটি দীর্ঘ, পবিত্র চুম্বন এঁকে দিল।

ধানমন্ডি লেকের বত্রিশ নম্বরের উল্টো পাশের সেই প্রাচীন হিজল গাছটা তখন তার সমস্ত ডালপালা মেলে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে রইল। সাক্ষী হয়ে রইল দুটি মানুষের এক অপার্থিব মিলনের,যেখানে শোক মুছে গিয়ে জন্ম নিল এক চিরন্তন প্রেম। মুশফিক জানত, সামনের দিনগুলো হয়তো সহজ হবে না। সেখানে হয়তো অপেক্ষা করছে হাসপাতালের গন্ধ, স্যালাইনের পাইপ আর এক অবধারিত বিদায়ের ছায়া। কিন্তু তার আর কোনো ভয় নেই। কারণ সে তার জীবনের পরম অর্থ খুঁজে পেয়েছে।

আকাশের মেঘ হয়তো একসময় কেটে যাবে, রোদ উঠবে, শহর আবার তার নিজস্ব কর্কশ কোলাহলে মেতে উঠবে। কিন্তু মুশফিকের হৃদয়ের ক্যানভাসে চিরকালের জন্য আঁকা হয়ে রইল একটি নাম,‘মেঘলা দিনে তুমি’।

 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login