ছোট্ট একটা আলনা। থরে থরে সাজানো শাড়ি। আমার জন্য একপাশে কিছু হ্যাংগার। তাতে ঝুলছে সপ্তাহের সব ময়লা কাপড়। আলনার একদম নিচে জুতোর বক্স স্তুপ হয়ে আছে। বেড়াতে যাওয়া ছাড়া এই বক্স গুলো তেমন খোলা হয় না। আলনার পাশেই জানালা। উত্তর দিকের জানালা। জানালায় একটা সস্তা আয়না। বউ চোখে কাজল দেওয়ার সময় ছাড়া এই আয়নার আর কোন কাজ নেই লোহার গ্রিলে ঝুলে থাকা ছাড়া। জানালার ডান পাশেই একটা ড্রেসিং টেবিল। এখানের আয়না দিয়েই আমার কাজ চলে যায়। অফিস যাওয়ার আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্যান্টের ভিতরে শার্ট গোজা। আর হাঁটু খানিক ভাঁজ করে আয়নার সামনে ঝুকে চুল আচড়ানো। বউ এভাবে চুল আঁচড়াতে দেখে হেসে বলতো- "আহারে! ড্রেসিং টেবিলটা একটু বড় হলো না কেন।"
আয়নায় চুল আঁচড়ানোর সময় প্রায় দেখি কপালে টিপ। বউ টিপ গুলো আয়নায় লাগিয়ে রাখতো। ড্রেসিং টেবিলের উপরে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা কোরআন শরীফ। আমি তেমন পড়ি না। কিন্তু বউয়ের রোজ সকালে তেলোয়াত শুনেই আমার ঘুম ভাংতো। এই ঘরে যদি আল্লাহ্র কোন রহমত থাকে সে আমার বউ।
ক্যালেন্ডারের পাতাটা মাস চারেক আগে শেষবার উল্টানো হয়েছিলো। পৃথিবীতে অনেকটা সময় গড়িয়ে গেছে। দেয়াল ঘড়ির কাঁটাও থেমে আছে ছয়ের ঘরে। এই ঘরের সবকিছুই কেমন যেন থমকে আছে। রান্নাঘরে হাড়িপাতিলের শব্দ নেই। হাত মুছতে মুছতে কেউ এসে বলে না- "চা খাওয়া হয়েছে। এক প্যাকেট গরম মশল্লা এনে দাও না।"
বউয়ের ঘুমন্তু মুখ দেখে একাবারো মনে হয়নি ও আর আমার কাছে নাই। ওর মাথার কাছে নিশ্চুপ বসে ছিলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম। কিন্তু যখন পেছন থেকে মাজেদ চাচা বলল- "বাবা লাশ দাফন করা লাগে এখন।"
লাশ। আমার বউ লাশ হয়ে গেছে। বুকের ভিতরে চুড়মার করে উঠলো। পৃথিবীকে দুমড়ে মুচরে দিতে ইচ্ছে হলো। ওরা আমার বউকে আমার সামনে থেকে খাটিয়ায় করে নিয়ে গেল। আমি ওর শাড়িতে মুখ গুঁজে ওর গায়ের গন্ধ নিতে চাইলাম। পারলাম না। পারলাম না। আমার সবকিছু ভেংগে চুড়মার হয়ে যাচ্ছে। বুকটা এতো ভারি হয়ে আছে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
চার মাস পরে আজ আবার ঢাকায় এলাম আমাদের দুই কামড়ার ছোট্ট ঘরটায়। এই ঘরের প্রতিটি ইঞ্চিতে আমার বউয়ের স্মৃতি জমে আছে। সবকিছু আগের মতোই গুছানো। কেবল ধুলির কিছু আস্তরণ। আমি শার্টটা খুলে ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা মুছতে গেলাম অমনি বুকের ভিতর থেকে বউ বলে উঠলো- "আহ কি করছো? দাঁড়াও ন্যাকরা নিয়ে আসি। এতো অগোছালো কেন তুমি। তোমাকে নিয়ে যে কই যাবো। আমাকে ছাড়া তো তোমার চলবেই না দেখছি। আমি বাবার বাড়ি গেলে তো ঘর পলাশির ময়দান বানিয়ে ফেলবে।"