অঝোর বৃষ্টিতে ভিজছে ঢাকার ধানমন্ডির এক ক্যাফের কাচের জানালা। ভেতরে লালচে আলোর উষ্ণতা, স্পিকারে মৃদু বাজছে কোনো বিষণ্ণ বেহালার সুর।
আরিয়ান আর মেধা মুখোমুখি বসে আছে। মাঝের টেবিলে দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি, যা বহুক্ষণ হলো জুড়িয়ে গেছে।
গত পাঁচ বছর ধরে তারা একে অপরকে চেনে। কিন্তু গল্পটা সাধারণ দশটা সম্পর্কের মতো ছিল না। মেধা একজন অন্ধ চিত্রশিল্পী, অন্তত আরিয়ান তাকে সেভাবেই জেনে এসেছে। পাঁচ বছর আগে এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে এই ক্যাফেই তাদের প্রথম দেখা। প্রথম দিনই আরিয়ান হাঁ হয়ে দেখেছিল, চোখে আলো না থেকেও কীভাবে ক্যানভাসে রঙের এমন মায়াবী খেলা ফুটিয়ে তোলে একটা মেয়ে! সে এ মেয়ের ছবি দেখেছিল নিউজপেপারে।
আরিয়ানের ভালোবাসার শুরুটা হয়েছিল মেধার সেই অন্ধত্ব আর তার ভেতর লুকিয়ে থাকা অদম্য জীবনবোধকে কেন্দ্র করে। বিগত পাঁচটা বছর আরিয়ান ছায়ার মতো জড়িয়ে ছিল মেধার সঙ্গে। মেঝের কোথায় সিঁড়ি, রাস্তার কোথায় গর্ত, সব জায়গায় আরিয়ানই হয়ে উঠেছিল মেধার ‘চোখ’। রাস্তা পার হওয়ার সময় আরিয়ানের শক্ত হাতে মেধা যখন আলতো করে আঙুল ছুঁয়ে দিত, আরিয়ানের মনে হতো পৃথিবীর সব দায়িত্ব যেন তার কাঁধে।
আজ তাদের পঞ্চম সাক্ষাৎ বার্ষিকী। আরিয়ান মেধার সামনে একটি ছোট মখমলের লাল বাক্স রাখল। বাক্সের ডালা খুলতেই ভেতরে চকচক করে উঠল একটা হীরার আংটি।
মেধার কাঁপতে থাকা হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরল আরিয়ান। গাঢ় কণ্ঠে বলল,
মেধা, এই পাঁচটা বছর আমি তোমার অন্ধকারের সঙ্গী ছিলাম। আমি সারাজীবন তোমার এই নিঃশব্দ পৃথিবীর আলো হয়ে থাকতে চাই। আমাকে কি তোমার জীবনসঙ্গী করবে?
মেধার চোখ বেয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে মৃদু হেসে বলল,
আরিয়ান, তুমি আমাকে রোজ বলতে না এই পৃথিবীটা কত সুন্দর? কিন্তু তুমি কি জানো, আমার কাছে জগতের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য কোনটা?
কোনটা? আরিয়ান প্রশ্ন করল।
মেধা ধীরহাতে চোখের কালচে রোদচশমাটা খুলে ফেলল। তারপর সরাসরি আরিয়ানের চোখের দিকে তাকাল, নিখুঁত, প্রখর দৃষ্টিতে আরিয়ানের চোখের মনি দুটো পর্যবেক্ষণ করে খুব শান্ত গলায় বলল,
আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হলো তোমার এই চোখের দৃষ্টি, আরিয়ান। বিশেষ করে যখন তুমি আমার দিকে এভাবে আকুল হয়ে তাকিয়ে থাকো।
আরিয়ান থমকে গেল। এক মুহূর্তে তার বুকের রক্ত যেন হিম হয়ে এল। তোতলাতে তোতলাতে বলল,
মে... মেধা! তুমি... দেখতে পাচ্ছো? কিন্তু তুমি না বলেছিলে, ডাক্তার বলেছিল তোমার অপটিক নার্ভ...
মেধা মুচকি হেসে আরিয়ানের হাত থেকে আংটিটা তুলে নিয়ে নিজের আঙুলে গলে দিল। তারপর অসম্ভব সহজ গলায় বলল,
আমার চোখে কোনোদিনই কোনো সমস্যা ছিল না, আরিয়ান। আমার দৃষ্টিশক্তি একদম সিক্স বাই সিক্স।
আরিয়ানের পুরো পৃথিবী যেন চোখের সামনে দুলে উঠল। সে নিষ্পলক তাকিয়ে রইল।
মেধা কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলতে লাগল,
পাঁচ বছর আগে এই ক্যাফেতেই আমি তোমাকে প্রথম দেখি। প্রথম দর্শনেই ভালো লেগে গিয়েছিল। কিন্তু খেয়াল করলাম, তুমি ভীষণ লাজুক, নিজেকে নিয়ে গুটিয়ে থাকা এক অদ্ভুত মানুষ। সাধারণ কোনো মেয়ের সঙ্গে যেচে কথা বলার মতো সাহস তোমার ছিল না। বুঝেছিলাম, স্বাভাবিক পথে তোমাকে পাওয়া সম্ভব নয়।
মেধা একটু ঝুঁকে আরিয়ানের গালে আলতো হাত রাখল,
তাই এই অন্ধত্বের নাটকটা সাজাতে হয়েছিল। আমি জানতাম, কোনো অসহায় মানুষকে আগলে রাখার সুযোগ পেলে তোমার ভেতরের সবটুকু ভালোবাসা উপচে পড়বে। আমি চেয়েছিলাম তুমি আমাকে সামলাও, আর সেই ফাঁকেই যেন তোমার বুকের ভেতরে আমার স্থায়ী ঠাঁই হয়ে যায়।
মেধা মিষ্টি হেসে যোগ করল,
গত পাঁচ বছর ধরে তোমার প্রতিটি যত্ন, প্রতিটি ব্যাকুল দৃষ্টি আমি ধরে রেখেছি আমার এই চোখে। আজ এই নাটকের ইতি টানলাম, কারণ আমি জানি, তুমি এখন আমাকে ছাড়া আর বাঁচতে পারবে না।
আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। যাকে এতদিন এক অসহায় পাখি ভেবে ডানার নিচে আগলে রেখেছে, সেই মেয়েটি আসলে বিগত পাঁচ বছর ধরে তাকে এক অদৃশ্য সুতোয় নাচিয়ে এসেছে!
মেধা আবার মুচকি হেসে আরিয়ানের হাত থেকে আংটিটা পুরোপুরি টেনে নিতে চাইল। কিন্তু তার আঙুল স্পর্শ করার আগেই আরিয়ান খুব শান্ত ও নির্ভাবনায় আংটির বাক্সটা সরিয়ে এনে পকেটে পুরে ফেলল।
মেধার মুখের হাসিটা মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। সে ভ্রূ কুঁচকে বলল,
আরিয়ান?
আরিয়ান হেলান দিয়ে বসল চেয়ারে। তার চোখে মুখে কিছুক্ষণ আগের সেই দ্বিধা, ভালোবাসা কিংবা আকুলতার লেশমাত্র নেই। সেখানে ফুটে উঠেছে এক বিষাক্ত, শীতল ও প্রখর আত্মবিশ্বাসের হাসি। ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া কফির কাপটা তুলে নিয়ে সে একচুমুক চুমুক দিল।
দুর্দান্ত অভিনয়, মেধা! টানা পাঁচ বছর ধরে একজন দৃষ্টিহীনের চরিত্র নিখুঁতভাবে অভিনয় করে যাওয়া, আমাকে মানতেই হয়, তুমি খুব ভালো অভিনয় কর।
আরিয়ানের গলায় এখন লাজুকতার কোনো চিহ্ন নেই, শব্দগুলো ধারালো চাবুকের মতো শোনালো।
মেধা কিছুটা অস্বস্তি চেপে বলল,
তুমি রাগ করছ কেন আরিয়ান? আমি তো শুধু তোমাকে পাওয়ার জন্যই...
তুমি ভেবেছিলে খেলাটা তোমার নিয়ন্ত্রণে ছিল, তাই তো? আরিয়ান কথা কেড়ে নিয়ে হাসল। তারপর বলল,
তুমি ভেবেছিলে আমার এই লাজুকতা, এই জড়তা আর তোমার প্রতি অন্ধ সমর্পণ, সবটাই তোমার পাতা ফাঁদের শিকার? মেধা, তুমি বড্ড ভুল অংকে হিসাব কষেছ।
মেধার চোখের তারা কেঁপে উঠল।
আরিয়ান টেবিলে খানিকটা ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,
প্রথম দিন যেদিন এই ক্যাফেতে তোমার মুখোমুখি হই, আমার পকেটে তখন তোমার নাম-ঠিকানা আর মেডিক্যাল হিস্ট্রির পুরো ফাইলটা রাখা ছিল। আমি খুব ভালো করেই জানতাম তোমার চোখে বিন্দুমাত্র ত্রুটি নেই। এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা নিয়ে তুমি যে মিথ্যের আড়ালে বাস করছিলে, তা আমার অজানা ছিল না।
মেধার মুখ থেকে নিমেষে সব রক্ত উধাও হয়ে গেল।
চিত্রশিল্পী হিসেবে বাজারে তোমার কোনো দর ছিল না, আরিয়ান বলে চলল,
কিন্তু যেই মুহূর্তে 'অন্ধ শিল্পী'র ট্যাগটা গায়ে লাগালে, তোমার সাধারণ আঁচড়গুলোই লাখ টাকায় বিক্রি হতে শুরু করল। একটা বিশাল টাকার খেলা, আর্ট গ্যালারির প্রতারণা আর তোমার এই সাজানো অন্ধত্ব—সব ছক আমার মুখস্থ ছিল। আমি এই পাঁচটা বছর ধরে প্রেমিক সাজার অভিনয়টা করে গেছি শুধু আজকের এই মুহূর্তটার জন্য।
কিসের জন্য...? মেধার কণ্ঠ জড়িয়ে এল।
আরিয়ান পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে মেধার সামনে ধরল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে একটি ইমেইল পাঠানোর কনফার্মেশন।
গত পাঁচ বছরে তোমার ভুয়া চিকিৎসাপত্র তৈরি, গ্যালারির সঙ্গে প্রতারণা আর আজ নিজের মুখে এই অন্ধত্বের সত্য স্বীকার করার প্রতিটি সেকেন্ড রেকর্ড হচ্ছিল আমার শার্টের বোতামে লুকানো হিডেন ক্যামেরায়। আর ঠিক এক মিনিট আগে তোমার লাইভ কনফেশনের সেই ভিডিও অ্যান্টি-ফ্রড ব্যুরো আর আর্ট গ্যালারি কর্তৃপক্ষের ইমেইলে পৌঁছে গেছে।
আরিয়ান ধীরপায়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। পকেটে রাখা আংটির বাক্সে হাত বুলিয়ে বলল,
তুমি ভেবেছিলে এক সহজ-সরল ছেলেকে নিজের জালে জড়িয়েছ? সত্যিটা হলো, তুমি নিজেই গত পাঁচ বছর ধরে আমার পেতে রাখা জালে বাস করছিলে, মেধা। আংটিটা তোমার জন্য ছিল না, ওটা ছিল তোমার এই প্রতারণার নাটকে যবনিকা টানার শেষ উপহার।
বাইরে মুষলধারে বৃষ্টির মধ্য দিয়ে একটা সাইরেনের লাল-নীল আলো ক্যাফের কাচে এসে পড়ল। পুলিশ ভ্যান এসে থামছে। আরিয়ান মেধার ফ্যাকাশে, নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে শেষ একটা শীতল হাসি দিল। তারপর জ্যাকেটের কলারটা তুলে নিয়ে ক্যাফের দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেল ভেজা রাতের অন্ধকারে।
Comments
First reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.
-
-
probash khobor 9 hours ago
আরিয়ান মেধার কেমিস্ট্রি অনুযায়ী এন্ডিংটা এমন আশা করিনি।ভালো লিখেছেন।
-
গল্পটা আরো বড় হলে আরেকটু ভালো হতো। মেধা ক্যারেক্টরটা ভালো এনেছেন। গল্পের প্লটটাও ভালো লেগেছে। শুভেচ্ছা রইল, ভাই।
-
sayed mahmud 9 hours ago
ভালো লিখেছেন। শুভেচ্ছা রইল।
-
R Masud 9 hours ago
মেধা তাহলে অন্ধ নয়। অভিনয় দিয়ে সব হয় না। গল্পের এন্ডিংটা ভালো লিখেছেন।