Article

পুরস্কারকেন্দ্রিক সাহিত্যবোধ ও সম্মিলিত আত্মপ্রবঞ্চনা-দ্বিতীয় পর্ব (খ)

October 13, 2026

31 views

বিশ্বমানের লেখক তৈরির সুলুক সন্ধান

জন্মগত প্রতিভাকে সাহিত্যিক হয়ে ওঠার পূর্বশর্তের রোমান্টিক কল্পনায় আটকে থাকা বাঙালী লেখকদের দৃষ্টি যতক্ষণ না বিশ্বসাহিত্যের দিকে স্বচ্ছতার সাথে প্রসারিত হচ্ছে ততক্ষণ বিশ্বমানের সাহিত্য সৃষ্টির মুসাবিদাটাও হবে না। সাম্প্রতিক দশকের নোবেল ও বিশ্বখ্যাত পুরস্কার জয়ীদের জীবনপাঠ আমরা একটু খোলা চেখে দেখি।

২০১৭ থেকে ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেলজয়ীদের তালিকার দিকে তাকালে দেখা যায়, দশজনের মধ্যে সাতজনই সাহিত্য বা তার সমগোত্রীয় বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। কাজুও ইশিগুরো ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়ায় ইংরেজি ও দর্শন নিয়ে পড়ার পর সৃজনশীল লেখালেখিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি শেষে সেখানে অধ্যাপনায় যুক্ত হন আবদুলরাজাক গুরনাহ। আধুনিক সাহিত্য নিয়ে উচ্চশিক্ষার পর শিক্ষকতার যোগ্যতা অর্জন করেন অ্যানি এর্নো। ইয়োন ফসে পড়েছেন তুলনামূলক সাহিত্য, হান কাং কোরীয় সাহিত্য এবং লাসলো ক্রাসনাহোরকাই হাঙ্গেরীয় ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে। অন্যদিকে, ধ্রুপদি সাহিত্য নিয়ে পিএইচডি করা অ্যান কার্সনের বিদগ্ধ পরিচয়ের স্বীকৃতি মিলেছে নোবেল কমিটির প্রশস্তিতেও—প্রাচীন সাহিত্য-ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপে কীভাবে সমকালীন সাহিত্যের নতুন রূপ নির্মাণ করা যায়, তাঁর কাজ তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। লক্ষণীয়, এই লেখকদের কয়েকজন শিক্ষকতা ও সাহিত্যশিক্ষার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ, তাঁদের কাছে শিক্ষা নিছক সনদ অর্জন নয়; পাঠ, চিন্তা ও সাহিত্যচর্চার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত এক জীবনপ্রক্রিয়া।

না, এখানে বলা হচ্ছে না উচ্চ শিক্ষাই একমাত্র সফলতার শর্ত। সাহিত্যের ইতিহাসে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থেকেও বহু মহৎ লেখক জন্মেছেন। কিন্তু ব্যতিক্রমকে নিয়মের বিকল্প বানিয়ে ফেলা আরেক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা। প্রশ্নটি তাই ডিগ্রি থাকা বা না-থাকার নয়; প্রশ্ন হলো, লেখক হিসেবে নিজেকে নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় পাঠ, অনুশীলন, সমালোচনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপের সাথে কতটা লেখক নিজেকে যুক্ত করতে পারছেন। এটা জরুরি শর্ত।

নোবেলের বাইরে তাকালেও একই ধরন চোখে পড়ে। হান কাং, ক্রাসনাহোরকাই ও তোকারচুক নোবেলের আগেই আন্তর্জাতিক বুকার (বা তার পূর্বসূরি ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল) পেয়েছেন। তিনজনই বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য বা মনোবিজ্ঞান পড়া মানুষ। জে. এম. কুটসি (নোবেল ২০০৩, বুকার দুবার) গণিত ও ইংরেজি পড়ে টেক্সাস থেকে পিএইচডি করেছেন এবং দীর্ঘকাল সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। হিলারি ম্যান্টেল (বুকার ২০০৯ ও ২০১২) আইন পড়েছেন। ইতিহাসের তথ্যনিষ্ঠ গবেষণার যে শৃঙ্খলা তাঁর উপন্যাসকে আলাদা করেছে, তার ভিত্তি এই প্রশিক্ষণ। অরুন্ধতী রায় (বুকার ১৯৯৭) স্থাপত্য পড়েছেন। স্থান ও কাঠামো নিয়ে তাঁর সংবেদনশীলতা 'দ্য গড অব স্মল থিংস'-এ স্পষ্ট। জর্জ সন্ডার্স (বুকার ২০১৭) প্রথমে ভূ-পদার্থবিদ্যায় প্রকৌশলী ছিলেন, পরে সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃজনশীল লেখার স্নাতকোত্তর করেন এবং সেখানেই পড়ান। বার্নার্ডিন ইভারিস্টো (বুকার ২০১৯) সৃজনশীল লেখার অধ্যাপক। ঝুম্পা লাহিড়ী পুলিৎজার পাওয়ার আগে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রেনেসাঁ স্টাডিজে পিএইচডি করেছেন।

তবে শিক্ষা বলতেই যে চারদেয়ালের শ্রেণীকক্ষকে বোঝায় না, তার প্রমাণ ইতিহাসেই ছড়িয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্কুলের প্রথাগত গণ্ডি পেরিয়ে ঠাকুরবাড়ির পরিমণ্ডল, গৃহশিক্ষক, বিশাল গ্রন্থাগার ও দেশ-বিদেশ ভ্রমণের মধ্য দিয়ে নিজের মনন তৈরি করেছিলেন। ডরিস লেসিং চৌদ্দ বছর বয়সে স্কুল ছাড়লেও আজীবনের স্বাচ্ছন্দ্যময় পাঠাভ্যাস তাঁকে নোবেল এনে দিয়েছিল। মো ইয়ান কিংবা গাব্রিয়েল গালসিয়া মার্কেস—উভয়েই প্রথাগত পড়াশোনার গণ্ডি অসম্পূর্ণ রেখেও অবিরাম পাঠ, সাংবাদিকতা, অনুকরণ ও শব্দ নিয়ে নিরলস অনুশীলনের মাধ্যমে পৌঁছাতে পেরেছিলেন সাহিত্যের চূড়ায়। প্রথাগত প্রতিষ্ঠানের ছাপ না থাকলেও নিবিড় পাঠ ও অনুশীলনের এই স্বশিক্ষাই ছিল তাঁদের আসল বিদ্যালয়।

বিভিন্ন লেখকদের উদাহরণ এখানে টানার কারণ তাই শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া নয়, বরং লেখালেখিতে শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য - তা সেটা প্রাতিষ্ঠানিক হোক বা অ-প্রাতিষ্ঠানেক হোক। শিক্ষা প্রধানত কয়েকটি উপায়ে একজন লেখককে সহায়তা দেয়:

  1. ঐতিহ্যের সজ্ঞান ব্যবহার: ধ্রুপদী সাহিত্য না জানলে ঐতিহ্যকে ভেঙে নতুন কিছু গড়া অসম্ভব।

  2. পদ্ধতি ও শৃঙ্খলা: ঐতিহাসিক বা অনুসন্ধানী গদ্যে তথ্য যাচাই ও নিখুঁত কাঠামো গড়ার দক্ষতা যোগায় শিক্ষা।

  3. বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি: জ্ঞানজগতের অন্যান্য শাখা লেখককে জীবন ও জগতকে নতুন কোণ থেকে দেখতে শেখায়।

  4. সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা: সাহিত্য কর্মশালা ও শিক্ষকের নির্মোহ প্রতিক্রিয়া লেখককে স্বীয় রচনার কঠোর বিচারক হতে সাহায্য করে।

  5. ভাষার সূক্ষ্ম সচেতনতা: শব্দের ব্যুৎপত্তি ও বাক্যের ছন্দ নিয়ে অতিসচেতনতা গদ্যকে দেয় অনন্য ধার।

একটি সত্য অপরাজেয়—নিবিড় পাঠ, ভাষার সাধনা এবং চেতনার মার্জিত প্রশিক্ষণ ছাড়া কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টি প্রায় অসম্ভব। তা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতল শ্রেণীকক্ষ থেকেই আসুক, কিংবা জীবনের ধূলোবালি মাখা দীর্ঘ পাঠশালা থেকেই আসুক। সাহিত্য কোনো আকস্মিক আলোর ঝলকানি নয়, বরং এক দীর্ঘ ও তিল তিল করে শেখার ফল। প্রতিভা যদি হয় একটি সুপ্ত বীজ, তবে শিক্ষাই হলো সেই মাটি ও জল—যার ছোঁয়ায় সেই বীজ মহীরুহে পরিণত হয়।

বিশ্বের নানা দেশে সৃজনশীল লেখালেখির পাঠক্রম, লেখক-আবাস, ফেলোশিপ, সাহিত্যকর্মশালা ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণার নানা আয়োজন রয়েছে। এসবের কোনোটিই মহৎ সাহিত্য উৎপাদনের কারখানা নয়। বরং এগুলো লেখককে সময় দেয়, নিজের লেখা নিয়ে কাজ করার সুযোগ দেয়, অন্যের চোখে নিজের দুর্বলতা দেখার অবকাশ দেয়। সাহিত্য তো কেবল যা লেখকের ভেতর থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসে, তা-ই নয়; কী বর্জন করতে হবে, কোথায় থামতে হবে, কোন প্রচলিত রীতিকে ভাঙতে হবে—সেই বোধও অর্জন করতে হয়। প্রতিভা লেখাকে শুরু করাতে পারে; কিন্তু প্রতিভার সীমা অতিক্রমের জন্য প্রয়োজন পাঠ, শ্রম ও আত্মসমালোচনা।

বাংলা সাহিত্যের দুই বাংলায় আমরা লেখককে স্বীকৃতি দিতে কতটা ব্যস্ত, আর লেখক গড়ে তোলার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় কতটা মনোযোগী? পুরস্কার, বইমেলা, প্রকাশনা ও সাহিত্যসভা আছে; কিন্তু এগুলোর পাশাপাশি কি এমন পরিসর গড়ে উঠেছে, যেখানে একজন নবীন লেখক নিয়মিতভাবে শিখতে, ভুল করতে, সমালোচনার মুখোমুখি হতে এবং নিজের লেখাকে নতুন করে নির্মাণ করতে পারেন? সাহিত্যিক গোষ্ঠীর প্রশংসা কিংবা পরিচিত মহলের স্বীকৃতি কি কখনো কখনো প্রকৃত আত্মসমালোচনার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায় না? এসব প্রশ্নের উত্তর আরামদায়ক না-ও হতে পারে। কিন্তু সত্যের মুখোমুখি না হয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা নিছক আত্মপ্রবঞ্চনা।

নোবেলজয়ী লেখকদের শিক্ষাজীবন আমাদের জন্য অনুকরণীয় কোনো ছক নয়; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুস্মারক। সাহিত্য ব্যক্তির সৃষ্টিকর্ম হলেও তার বিকাশ ঘটে বৃহত্তর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে। সেখানে থাকে পূর্বসূরিদের সঙ্গে সংলাপ, সমকালের সঙ্গে সংঘাত, নির্মম আত্মসমালোচনা এবং নতুন কিছু আবিষ্কারের স্বাধীনতা। এই পরিবেশ ছাড়া প্রতিভা জন্মাতে পারে, কিন্তু তাকে পূর্ণ বিকাশের সুযোগ দেওয়া যায় কি না, সেটিই আসল প্রশ্ন।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login