সাহিত্যে গোষ্ঠী-সংস্কৃতি, স্বীকৃতির রাজনীতি ও পারস্পরিক পিঠচাপড়ানি
সাহিত্য ব্যক্তির নিঃসঙ্গ সৃষ্টি, অথচ তার স্বীকৃতি নির্ধারিত হয় সামাজিক দরবারে। লেখক একা লেখেন, কিন্তু একা একা প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন না। পাঠক, সম্পাদক, সমালোচক, প্রকাশক ও পুরস্কার-সমিতির সূক্ষ্ম বিচার-বিবেচনার পথ পেরিয়েই একটি লেখা জনপরিসরে পৌঁছায়। গোলমেলে ব্যাপারটি ঘটে তখনই, যখন এই স্বীকৃতি অর্জনের প্রক্রিয়ায় নান্দনিক মানদণ্ডের চেয়ে অনুষঙ্গিক হিসাব-নিকাশ প্রধান হয়ে ওঠে। সাহিত্যবিচার তখন আর নিরপেক্ষ থাকে না; রূপ নেয় স্বার্থের সমীকরণে।
সাহিত্যিক আড্ডা বা গোষ্ঠী গড়ে ওঠা অসংগত নয়। সমমনোভাবাপন্ন ও সমরুচির মানুষেরা একত্র হবেন, ভাব বিনিময় করবেন, পরস্পরের কাজ নিয়ে ভাববেন—এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। নতুন সাহিত্য-আন্দোলনের জন্মও এই সম্মিলিত ভাবনা থেকেই। কিন্তু সমস্যা বাঁধে তখন, যখন এই গোষ্ঠী সৃষ্টিশীল আলাপ-আলোচনার মুক্তাঙ্গন না হয়ে স্রেফ 'স্বীকৃতি বণ্টনের আখড়া'য় পরিণত হয়। সেখানে তখন টেক্সটের চেয়ে লেখকের ফেসভ্যালু, রচনার চেয়ে রচয়িতার নৈকট্য, আর সাহিত্যিক মূল্যায়নের চেয়ে শক্ত হয়ে ওঠে শিবিরের আনুগত্য।
এই অসুস্থ সংস্কৃতির সবচেয়ে দৃশ্যমান লক্ষণ হলো 'পারস্পরিক পিঠচাপড়ানি'। একদল লেখক নিজেদের মধ্যে প্রশংসার সস্তা আদান-প্রদান করেন। তারা নিজেদের বলয়ে এক কৃত্রিম স্বীকৃতির আবহ তৈরি করে রাখেন। বন্ধুত্ব বা প্রশংসা অন্যায় নয়; কিন্তু প্রশংসার আতিশয্য যখন নিরপেক্ষ বিচারবোধকে নির্বাসনে পাঠায় এবং মাঝারি মানের লেখাকেও 'কালজয়ী' বলে চালানোর চেষ্টা করে, তখন তা সাহিত্যের কোনো উপকার করে না—শুধু লেখকের অহংকে তোষণ করে। এই ব্যবস্থায় সবাই সবাইকে তোষামোদ করেন, ফলে লেখার আসল জোর আর দুর্বলতা নিয়ে কথা বলার মতো স্পষ্টভাষী মানুষের আকাল দেখা দেয়।
এর সঙ্গেই যুক্ত হয় দৃশ্যমানতা ও যোগাযোগের নেটওয়ার্ক। কার লেখা কোন হাই-প্রোফাইল সাময়িকীতে ছাপা হচ্ছে, কার বই আলোড়ন সৃষ্টিকারী প্রকাশক নিচ্ছেন, কারা সাহিত্যসভার মঞ্চ আলো করছেন—এসবই লেখকের প্রচারের আলো বাড়িয়ে দেয়। প্রচার হয়তো অপরাধ নয়, বিশেষতঃ এই প্রচারনির্ভর সময়ে। কিন্তু এই দৃশ্যমানতাকেই যদি সাহিত্যিক যোগ্যতার শেষ কথা ধরে নেওয়া হয়, তবে নীরব ও নির্জন সাধনায় মগ্ন লেখক অলক্ষ্যেই থেকে যান। আর বিপরীত দিকে, ক্ষমতার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে দুর্বল লেখাও পেয়ে যায় উপচে পড়া মনোযোগ।
এখানে আত্মপ্রবঞ্চনার খেলাটি ভারি সূক্ষ্ম। আমরা প্রায়শই নিজেদের ব্যক্তিগত ভালোলাগাকে সাহিত্যের সার্বজনীন মানদণ্ড বলে গুলিয়ে ফেলি। নিজের বলয়ের লেখককে মহান মনে হয়, কারণ তাঁর সঙ্গে চা পানের স্মৃতি আছে, তাঁর সাফল্যের আলোয় নিজেদেরও কিছুটা আলোকিত মনে হয়। অন্যদিকে, বলয়ের বাইরের বা ভিন্ন ঘরানার প্রভাবশালী লেখাকেও আমরা অবলীলায় উপেক্ষা করি। ব্যক্তিগত পছন্দকে সাহিত্যিক সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করার এই প্রবণতা পাঠক, সমালোচক কিংবা প্রতিষ্ঠান—সবার মধ্যে একসময় সংক্রামক ব্যাধির রূপ নেয়। আর সাহিত্যপরিসরে তৈরি হয় এক রুদ্ধ প্রতিধ্বনি কক্ষ (Echo Chamber)—যেখানে নিজেদের চেনা সুরটাই বারবার প্রতিধ্বনিত হয় এবং নিজেদের দেওয়া সনদকেই সবাই সাহিত্যের শেষ সত্য বলে ধরে নেয়।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ—উভয় বাংলার সাহিত্যপরিসরেই আজ এই অপ্রিয় প্রশ্নটি তোলা জরুরি: আমরা কি লেখাকে তার নিজস্ব মেরুদণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে বিচার করতে পারছি? নাকি লেখকের পরিচিতি ও তাঁর চারপাশের বলয় আমাদের মগজকে আগেই প্রভাবিত করে রাখছে? কোনো লেখককে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করা যেমন তাঁর ভালো লেখাকে খাটো করার যুক্তি হতে পারে না, তেমনি ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলেই তাঁর দুর্বল রচনাকে 'মহৎ' বলে চালিয়ে দেওয়াও এক ধরনের প্রতারণা। সাহিত্যিক সততার প্রাথমিক শর্তই হলো: পরিচিতের ভালোকে নিঃসংকোচে মানা, তাঁর দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দেখানো, আর অচেনা কোনো প্রতিভা উঠে এলে নিজের গোষ্ঠীগত বলয় ভেঙে তাকে সানন্দে বরণ করে নেওয়া।
পুরস্কারের রাজনীতিতেও এই পক্ষপাত আরো প্রকট। কোনো পুরস্কারই শূন্য থেকে খসে পড়ে না; তার পেছনে থাকে বিচারকমণ্ডলী, প্রাতিষ্ঠানিক রুচি ও ক্ষমতার সমীকরণ। সব পুরস্কারই স্বজনপ্রীতি—এমন ঢালাও অভিযোগ করছি না, সেটা উচিতও নয়, আবার পুরস্কার পেলেই কোনো লেখক রাতারাতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যান না। পুরস্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি, কিন্তু সাহিত্যিক মহত্ত্বের চিরস্থায়ী সনদ নয়। কিন্তু সমাজ যখন পুরস্কারকেই সাহিত্য মাপার প্রধান ফিতে বানিয়ে ফেলে, তখন শিল্পের চেয়ে সাহিত্যকেন্দ্রিক 'ক্ষমতার রাজনীতি'ই প্রধান হয়ে ওঠে।
এর সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে উদীয়মান লেখকদের ওপর। তরুণ লেখক যখন দেখেন সাধনা ও প্রতিভার চেয়ে সুযোগসন্ধান, আনুগত্য এবং চাটুকারিতাই সাফল্যের দ্রুততম পথ—তখন তিনি নতুন ভাষা বা অভিজ্ঞতা আবিষ্কারের চেয়ে ক্ষমতাবান বলয়ে ঢোকার কায়দা-কানুন শিখতেই বেশি উৎসাহিত হন। সাহিত্য তখন আত্মানুসন্ধানের ক্ষেত্র না হয়ে পরিণত হয় প্রতিষ্ঠিত দরবারে স্থান পাওয়ার প্রতিযোগিতায়। যে সাহিত্য-সংস্কৃতি নতুন কণ্ঠকে কোনো শিবিরের দাসত্ব না করে স্বাধীনভাবে কথা বলার সাহস দিতে পারে না, তা শেষ পর্যন্ত নিজেরই জীর্ণ পুনরাবৃত্তি ঘটাতে থাকে।
সাহিত্যের প্রধান শত্রু বন্ধুত্ব নয়, আবার গোষ্ঠীহীনতাও সাহিত্যের লক্ষ্য নয়; সাহিত্যের পরম প্রয়োজন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারবোধ। এমন এক সুস্থ পরিসর আমাদের দরকার, যেখানে বন্ধুত্ব কখনো সমালোচনাকে স্তব্ধ করবে না, পরিচয় কখনো রচনার বিকল্প হবে না, আর বড় মাপের প্রতিষ্ঠিত নামের পাশাপাশি এক অনামী লেখকের শ্রেষ্ঠ কাজও সমান গুরুত্বে বিবেচিত হবে। এমন পরিবেশ গড়ে তোলা কঠিন, কারণ এর জন্য অন্যের প্রবঞ্চনা ধরে ফেলার পাশাপাশি নিজের ভেতরের আত্মপ্রবঞ্চনার মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস লাগে।
আমরা বিশ্বমানের সাহিত্যের স্বপ্ন দেখি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য হাহাকার করি, নোবেল না পাওয়ার খেদ প্রকাশ করি। কিন্তু আমাদের ঘরের ভেতরের সাহিত্য-সংস্কৃতি যদি স্বাধীন না হয়, সমালোচনা যদি ভয়হীন না হয়, আর বিচার যদি গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে না পারে—তবে আমাদের এই আকাঙ্ক্ষা কেবলই এক ফাঁপা আক্ষেপ হয়ে থাকবে।
সাহিত্য কোনো গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত জিম্মায় থাকার ক্ষেত্র নয়। গোষ্ঠী লেখককে আশ্রয় দিতে পারে, কিন্তু সাহিত্যের সার্বজনীন বিচারক হওয়ার অধিকার কোনো গোষ্ঠীরই নেই।