সাহিত্যের কাঠগড়ায় রাজনীতি: মতাদর্শ, মেরুকরণ ও ভিন্নমতের নির্বাসন
মানুষ যে সমাজে বাস করে, তার ক্ষমতাকাঠামো, বৈষম্য, সংঘাত ও স্বপ্ন থেকে সাহিত্য নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখতে পারে না। সাহিত্য ও রাজনীতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য—অন্তত এই অর্থে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন রাজনৈতিক অবস্থান সাহিত্যের বিষয় হয়ে থাকার বদলে সাহিত্যের বিচারক হয়ে ওঠে; যখন লেখার মূল্য নির্ধারিত হয় তার শিল্পগুণে নয়, লেখক কোন মতাদর্শের পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন, তা দিয়ে।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যপরিসরে রাজনৈতিক বিভাজন নতুন নয়। ইতিহাস, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ক্ষমতার বাস্তবতা দুই অঞ্চলে এক নয়; তবু একটি প্রবণতায় তাদের মিল খুঁজে পাওয়া যায়—লেখকের রাজনৈতিক পরিচয় অনেক সময় তাঁর রচনার আগেই পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে একটা লেখা পড়ার আগেই সেটার মূল্যায়ন তৈরি হয়ে যায়। নিজের শিবিরের লেখকের দুর্বল রচনাও তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, আর বিপরীত শিবিরের শক্তিশালী রচনাও সন্দেহের চোখে দেখা হয়। সাহিত্যবিচারের বদলে লেখককে দিতে হয় আনুগত্যের পরীক্ষা।
মতাদর্শের প্রভাব সাহিত্যে থাকবেই। কোনো লেখক তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে লিখবেন, অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন, প্রচলিত ক্ষমতাকে প্রশ্ন করবেন—এতে আপত্তির কিছু নেই। বরং এমন অবস্থান থেকেই বহু গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে।
সাহিত্যে রাজনৈতিক বিভাজন বিপজ্জনক হয়ে ওঠে যখন সমালোচনা যুক্তির পথ ছেড়ে আক্রমণের ভাষা নেয়। ভিন্নমতকে খণ্ডন করার বদলে লেখককে অপমান করা হয়, তাঁর চরিত্র নিয়ে কুৎসা ছড়ানো হয়, সামাজিক পরিসরে তাঁকে একঘরে করার চেষ্টা চলে। দলবদ্ধ আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ ও অনলাইন হেনস্তাকে তখন কখনো ‘প্রতিবাদ’, কখনো ‘সাহিত্যিক অবস্থান’ বলে চালানো হয়। অথচ যুক্তিনিষ্ঠ সমালোচনা এবং সংঘবদ্ধ হেনস্তার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। প্রথমটি লেখাকে প্রশ্ন করে; দ্বিতীয়টি লেখককে শাস্তি দিতে চায়।
এখানে একটি আত্মপ্রবঞ্চনাও কাজ করে। আমরা নিজেদের পক্ষের আক্রমণকে ন্যায্য প্রতিবাদ এবং বিপক্ষের প্রতিবাদকে অসহিষ্ণুতা বলে চিহ্নিত করি। নিজের শিবিরের লেখক ভুল করলে তার প্রেক্ষাপট খুঁজি, অন্য শিবিরের লেখক ভুল করলে তার চরিত্রে দোষ খুঁজি। একই আচরণের জন্য দুই রকম নৈতিক মানদণ্ড তৈরি হয়। এভাবে মতাদর্শ সত্য অনুসন্ধানের হাতিয়ার না থেকে আত্মপক্ষসমর্থনের ঢাল হয়ে ওঠে। যে বুদ্ধিবৃত্তিক সততা নিজের পক্ষকেও প্রশ্ন করতে পারে না, তা শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষেরই প্রকৃত মঙ্গল করে না।
এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাহিত্যের ভবিষ্যতে। লেখক যখন দেখেন, রচনার গুণের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য বেশি নিরাপদ আশ্রয় দেয়, তখন তাঁর সামনে এক বিপজ্জনক শিক্ষা খুলে যায়। লেখক তখন নিজের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণের চেয়ে সঠিক শিবির বেছে নেওয়াকে জরুরি মনে করেন। স্বাধীন চিন্তার জায়গায় আসে আত্মসেন্সরশিপ; জটিল বাস্তবতাকে বোঝার বদলে লেখক শিখতে থাকেন নিজের গোষ্ঠীর প্রত্যাশামতো কথা বলতে। সাহিত্য তখন জীবনের বহুস্বর ধারণ না করে রাজনৈতিক স্লোগানের প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে পড়ে।
অবশ্য কোনো লেখককে রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য প্রশ্ন করা যাবে না—এমন দাবি করছি না। লেখকের বক্তব্য, তাঁর অবস্থান, এমনকি তাঁর নীরবতাও সমালোচনার বিষয় হতে পারে। কিন্তু সে সমালোচনা হতে হবে যুক্তি ও বিশ্লেষণে; সামাজিক নির্বাসন, ব্যক্তিগত অপমান কিংবা সংগঠিত হেনস্তায় নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে সমালোচনা থেকে অব্যাহতি নয়, আবার সমালোচনার অধিকার মানে কাউকে হেয় বা নিশ্চিহ্ন করার অধিকারও নয়।
সাহিত্যের প্রয়োজন এমন এক পরিসর, যেখানে মতাদর্শ থাকবে, বিতর্ক থাকবে, তীব্র বিরোধিতাও থাকবে—কিন্তু কোনো রাজনৈতিক শিবির সাহিত্যের প্রবেশদ্বারে প্রহরী হয়ে দাঁড়াবে না। লেখককে তাঁর বিশ্বাসের জন্য নয়, তাঁর বিশ্বাসকে তিনি কীভাবে ভাষা, অভিজ্ঞতা ও শিল্পে রূপ দিয়েছেন, তার ভিত্তিতে বিচার করার সক্ষমতা আমাদের অর্জন করতে হবে। নিজের পক্ষের দুর্বলতা স্বীকার করা এবং প্রতিপক্ষের শক্তি চিনতে পারাও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার পরীক্ষা।
আগের পর্বে আমরা দেখেছি, কীভাবে গোষ্ঠী স্বীকৃতি বণ্টনের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে পারে। রাজনৈতিক মেরুকরণ সেই গোষ্ঠীকেই আরও কঠিন মতাদর্শিক শিবিরে পরিণত করে—যেখানে আনুগত্যই যোগ্যতার প্রমাণ, আর ভিন্নমত প্রায় অপরাধ। এই বৃত্ত ভাঙতে না পারলে সাহিত্য স্বাধীন চিন্তার ক্ষেত্র না হয়ে পরিচয় ও আনুগত্যের আদালতে বন্দি থাকবে।
সাহিত্যের কাজ কোনো শিবিরের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া নয়; মানুষের জটিল সত্যকে উন্মোচন করা। যে সাহিত্যপরিসর ভিন্নমত সহ্য করতে পারে না, সে শেষ পর্যন্ত নিজের সত্যকেও চিনতে পারে না।