Essay

একটুকরো হাড় ও কিছু মানুষের গল্প

October 13, 2026

167 views

সেদিন ছিল গরমের দিন। রাউজান যাওয়ার পথে চন্দ্রঘোনা লিচুবাগান এলাকায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে চিংম্রংয়ের একটি ঝিলে নৌকায় চড়েছিলাম। চারপাশের মনোরম পাহাড়ি ঝিল এর দৃশ্য দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখ পড়ল একটি কুকুরের দিকে।

কুকুরটি ঝিলের পানিতে নেমেছে। পানি তার প্রায় বুকসমান। কাঠফাঁটা রোদে প্রচন্ড তৃষ্ণা পেয়েছে বোধ হয়। কিন্তু মুখে তার একখানা হাড়—কুকুরের বড় প্রিয় জিনিস।

সমস্যাটা হলো, পানি খেতে গেলে হাড়টা কোথায় রাখবে?

কুকুরটি একবার এদিকে তাকায়, আরেকবার ওদিকে। মুখের হাড়টা ছাড়তেও যেন মন সায় দেয় না, আবার পানি না খেলেও চলে না। বেশ কিছুক্ষণ তার এই দ্বিধা লক্ষ করলাম। ছোট্ট প্রাণীটির সামনে তখন খুব সাধারণ অথচ জরুরি একটি সিদ্ধান্ত—হাড়টাকে কোথাও রেখে পানি খাবে, নাকি অন্য কোনো উপায় বের করবে?

শেষ পর্যন্ত সে বোধ হয় একটা বুদ্ধি বের করল। পানির মধ্যেই হাড়টা রেখে পানি খাবে, তারপর আবার মুখে তুলে নেবে। ঝিলের পানি স্বচ্ছ। তলদেশের ঢালও প্রায় পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি কোণে নেমে গেছে। কুকুরটি হয়তো ভেবেছিল, হাড়টা পানিতে থাকলেও নাগালের মধ্যেই থাকবে।

কিন্তু সব হিসাব বাস্তবের সঙ্গে মেলে না।

হাড়টা ছেড়ে পানি খেতে শুরু করল সে। আর সেই ফাঁকেই হাড়টি গড়িয়ে চলে গেল পানির নিচে, ঢাল বেয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল।

পানি খাওয়া শেষ করে কুকুরটি মুখ তুলল। তারপর হাড় খুঁজতে শুরু করল। যেখানে রেখেছিল, সেখানে খুঁজল। আশপাশে খুঁজল। পানির মধ্যে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াল। কিন্তু হাড়টির আর কোনো সন্ধান পেল না।

অনেকক্ষণ ধরে খোঁজাখুঁজির পর একসময় তার চেষ্টা থেমে গেল। তাকে তখন বেশ হতাশ দেখাচ্ছিল। চারদিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ—যেন হারিয়ে যাওয়া জিনিসটি ফিরে পাওয়ার কোনো শেষ সম্ভাবনা খুঁজছে। তারপর আর কোনো উপায় না দেখে ধীরে ধীরে সেখান থেকে চলে গেল।

নৌকা এগিয়ে চলল। দৃশ্যটিও পেছনে পড়ে রইল। কিন্তু ছোট্ট ঘটনাটি মনে একটা প্রশ্ন রেখে গেল।

মানুষও কি কখনো এমন করে না?

কোনো কিছু ধরে রাখতে গিয়ে অন্য কিছু হারিয়ে ফেলে। সিদ্ধান্তহীনতায় সময় নষ্ট করে, তারপর এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয়, যার পরিণতি আগে থেকে বুঝতে পারে না। কখনো সামান্য সুবিধার আশায় প্রিয় সম্পদটি এমন জায়গায় রেখে আসে, যেখান থেকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। আবার কখনো নিজের হাতে ছেড়ে দেওয়া জিনিসটির জন্যই পরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, খোঁজে, আফসোস করে।

অথচ হারানোর আগে হয়তো তার মনে হয়েছিল, সবকিছু আবার ঠিকঠাক ফিরে পাবে।

জীবনের অনেক ভুলও বোধ হয় এমনই। ভুলটা সব সময় লোভ থেকে আসে না; কখনো আসে অসতর্কতা থেকে, কখনো দ্বিধা থেকে, কখনো মুহূর্তের সুবিধাকে নিশ্চিত ভেবে নেওয়া থেকে। আর কিছু হারিয়ে যাওয়ার পর আমরা অনেকক্ষণ ধরে চারপাশে খুঁজি—যেন আগের জায়গাটিতে ফিরে গেলেই সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যাবে।

কিন্তু নদী, ঝিল কিংবা জীবনের ঢাল বেয়ে একবার কিছু গড়িয়ে গেলে, তা সব সময় আর আগের জায়গায় ফিরে আসে না।

সেদিন একটি কুকুর তার প্রিয় হাড়টি হারিয়েছিল। আর নৌকায় বসে আমার মনে হয়েছিল, মানুষের জীবনেও এমন কত সুযোগ হারিয়ে যায়—যার মূল্য সে বোঝে ঠিক তখনই, যখন আর খুঁজে পাওয়ার কোনো উপায় থাকে না।

Picked up where you left off

Comments

Shakil Rony was this story’s first reader

+40 XP

    Please login to post comment. Login

  • Shakil Rony 1 week ago First reader

    যতটা না ঘটনার বর্ণনা আছে ততটা গল্প নেই। এক সময় রাঙ্গুনিয়া ছিলাম। তাই শুরুটা পড়ে আগ্রহ হয়েছিলো। এতটা বর্ণনামূলক না করে আরেকটু গভীরে গেলে ভালো হতো মনে হয়। দোয়া রইলো আপনার জন্য।

    • নীলোৎপলের কাব্য 1 week ago

      ভাইয়া এটা Essay Category দিসি আমি। গল্প নয়তো।

    • Shakil Rony 1 week ago

      ওকে ভাই। আমি হয়তো বুঝতে ভুল করেছি তাহলে৷ লেখা চলতে থাকুক আপন গতিতে।

  • Borhan Mahmud 3 weeks ago

    মানুষও বহু কিছু হারিয়ে ফেলে, যখন বোঝে কী হারিয়েছে; তখন স্রেফ এক শূন্যতার অনুভূতি। ভালো লেগেছে আপনার লেখাটি। আসসালামু আলাইকুম।

    • নীলোৎপলের কাব্য 2 weeks ago

      ওয়ালাইকুম আসসালাম, আপনার কথাটিই ঠিক। আসলে তখন শূন্যতার অনুভূতি ছাড়া কিছুই করার থাকেনা।