ডেন্টিস্টের চেম্বার
ডেন্টিস্টের চেম্বারের ওয়েটিং রুমে বইসা যদি আপনের মাথা ব্যথা উঠে তাইলে আপনে কী করবেন! পত্রিকাগুলার লাইফস্টাইল পেইজে কি কোনদিন এই ধরনের সলিউশন ছাপা হয়!
সানজানা ভাবতেছে মনে মনে। সে টের পাইতেছে একটা অস্থির আর জান্তব মাথা ব্যথা তার মগজের সেলগুলার মধ্যে ছড়াইয়া পড়তেছে, যেমনভাবে পানির মধ্যে দ্রবীভুত হয় চিনি কিম্বা লবণ।
সে ভাবতেছে বাইরে গিয়া কিছু খায়া আসবে নাকি! কিন্তু বাইরে গিয়া খাবারের দোকান খুঁইজা বাইর কইরা খায়া, তাতে কাজ না হইলে ওষুধের দোকান খুঁইজা বাইর কইরা পেইন কিলার খায়া, ফিরা আসতে আসতে তার সিরিয়াল চইলা যাইতে পারে।
সে এখন কী করবে?
সানজানা চেষ্টা করলো মাথাব্যথার কথা বেশি বেশি ভাবতে। যেন এই দুনিয়াতে ওর মাথা আর সেই মাথার মধ্যে মগজের সেলগুলা আর দ্রুত গতিতে ছড়াইয়া যাওয়া মাথাব্যথা ছাড়া আর কোন সমস্যা নাই।
ছোটবেলা থিকাই শুইনা আসছে ব্যথাটার কথা ভুইলা যাইতে হবে, ভুইলা থাকতে হবে। যেটা ভুইলা যাইতে চাওয়া যায় সেইটা ভুলতে পারা কঠিন। কাজেই উল্টা করলে কাজ হইতে পারে। মনে করতে করতে, রাখতে রাখতে এক সময় নাই হয়া যাইতে পারে।
এ ছাড়া কনসেনট্রেশনটাও কাজে দিতে পারে।
ব্রেইনের কথা ভাবতে গিয়া সানজানা একটা কিলবিলা জিনিস দেখতে পাইলো। মানুষের মগজের ছবি। এই ছবি আগে খালি বায়োলজি বইয়ে দেখা যাইতো, এখন পথেঘাটে দেখা যায়। এমনকি সিগারেটের প্যাকেটেও থাকে।
একটা সিগারেট খায়া দেখা যাইতে পারে।
মগজ থিকা এইভাবে ছিটকাইয়া পড়ল সানজানার চিন্তা। সে চেয়ার থিকা উইঠা দাঁড়াইলো।
এই জায়গার বাথরুম যথেষ্ট সুন্দর। পাবলিক প্লেসের বাথরুম হিসাবে অনেক পরিষ্কারও। এতই পরিষ্কার যে এইখানে একটা আস্ত সিগারেট খায়া ফেলা সম্ভব।
বাথরুমে পাশাপাশি দুইটা জিনিস। একটা কমোড আরেকটা প্যান। এই দুইটা পাড় হইয়া একটু জায়গা আছে, সেখানে জানালাও আছে, তবে সেটা বন্ধ। বন্ধ হইলেও কাঁচ দিয়া দিনের আলো দেখা যাইতেছে। রোদ এখনও মরে নাই।
সানজানা সিগারেট ধরাইলো। এইখানে একটা হাইটুল টাইপের কিছু থাকলে মজাই হইতো- ভাবলো সে। কিম্বা প্যানটা ওইপাশে হইয়া কমোডটা এই পাশে হইলে কমোডের ঢাকনি বন্ধ কইরা তার উপরে বইসা আরামে সিগারেটটা শেষ করা যাইতো।
সিগারেট শেষ কইরা প্যাকেটটা ব্যাগে রাখতে গিয়া তার চোখে পড়ল মানুষের কুৎসিত মগজের ছবি। রক্তপাত হইতেছে এমন একটা মগজ। মাথাব্যথায় যে ফিলিংটা হয়, যন্ত্রণায় রক্তপাত হইতেছে বইলা মনে হয়- এরকম একটা ছবি।
এই ছবিতে অবশ্য ইমেজ খুবই লুথা। এত দুর্বল ইমেজ যে ঘিনঘিন ভাবটা বেশি হয়। রক্তপাতের মধ্যেও বীভৎসতা নাই, কেমন জানি নোংরা নোংরা।
মাথাব্যথা বাইড়াই যাইতেছে।
সানজানা ওয়েটিং রুমে ফিরা আসলো। পা তুইলা একটা চেয়ারে বইসা দুই হাঁটুর মধ্যে রাখলো মাথাটা, চোখ বন্ধ কইরা আবারও মাথাব্যথার কথা ভাবতে শুরু করলো। এই ভাবনাটা বেশি জমতেছে না। মাথার মধ্যে মগজের কথা ভাবতে গেলেই বিবমিষা তৈরি হইতেছে। বরং আরও ডিটেইলে ভাবা যাইতে পারে।
ভাবা যাক মগজটা একটা কলোনি, সেলগুলা এক একটা মানুষ। নিওরোন সেলের গঠনটা ভাবা যাইতে পারে। সেইটা তুলনামূলকভাবে সুন্দর। অনেকটা গাছের মতন দেখতে, আবার মানুষের মতনও। মাথা আছে, নিউক্লিয়াসটা সেইখানে থাকে, সেইটাই আসলে বডি। আর গাছের কাণ্ডের মতন অংশটাকে মনে হয় অ্যাক্সন বলে।
বাহ, নামটাও তো কত ভালো!
নামের উপরে অনেক কিছু ডিপেন্ড করে আসলে। কলেজে পড়ার সময় এক পোলায় কইছিলো, সানজানা নাম শুনলেই তার নাকি রেইপ করতে ইচ্ছা করে। ওই সময় এই নিয়া ভাবার অবকাশ হয় নাই। এখন ভাবা যাইতে পারে।
এইভাবে সানজানা আরও একবার ছিটকাইয়া পইড়া গেলো, নিওরোন থিকা।
ছিটকায় পইড়া সে ভাবলো সে এখন সানজানা নামটা নিয়া ভাববে। হিন্দি সিনামায় এই নাম খুব শোনা যায়। নায়িকার নাম থাকে সানজানা। কাজলের নাম ছিল কোন একটা সিনামায়। আরও অনেকের নামই ছিল নিশ্চয়ই। কিন্তু সানজানা নামের কোন নায়িকা নাই রিয়েল লাইফে। ওরা শুধু ক্যারেক্টার।
হিন্দি সিনামার নায়িকা ক্যারেক্টারগুলা কি রেইপড হওয়ার জন্যেই জন্মায় নাকি!
বাঁচাও! বাঁচাও! – এই চিৎকার কি রেপিস্ট আর হিরো, দুই ধরণের পুরুষেরই ইগো স্যাটিসফায়েড করে! নাইলে সানজানা নাম শুনলেই রেইপ করতে ইচ্ছা হবে ক্যান! রেইপ পুরুষরে কী দ্যায়! আধিপত্য কিম্বা হিরোইজম! শক্তিমান হওয়ার আত্মপ্রসাদ! আনন্দ! সুখ!
ভাইবা পায় না সানজানা।
কিন্তু একটা সিদ্ধান্তে তো আসতে হবে। আসতেই হবে এমন কোন কথা আসলে নাই। কিন্তু তার ইচ্ছা করে। একটা সিদ্ধান্তে আসতে।
একটা সিদ্ধান্তে সে আসতে পারে, সেইটা হইলো রেইপ কেইস আদতে খুব মজার জিনিস!
কত ধরণের রেইপ কেইস যে আছে দুনিয়ায়! ভাবে সানজানা।
রেইপ কইরা কাইটা টুকরা টুকরা কইরা ছড়ায় দেওয়া, যোনীতে লোহার রড ঢুকায় দেওয়া, গলায় কুত্তার বেল্ট বাইন্ধা পায়ুপথে সঙ্গম করা, চলন্ত বাসে, পাহাড়ে, ঘরে, বাইরে- ভেরিয়েশনের অভাব নাই।
পুরুষদের কেন এত ভেরিয়েশন দরকার পড়ে! ভাবে সানজানা।
ভেরিয়েশন অবশ্যই মানব জীবনের একটা অত্যাবশ্যকীয় চাহিদা। বৈচিত্র না থাকলে তো বাঁইচা থাকাই মুশকিল আসলে। সেই সত্য তো অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু এই যে রেপিস্টরা, আইন কানুন আর শাস্তির ভয় জয় কইরা রেইপ কইরা ফেলায়, তাদের ব্রেইন সেল কিভাবে কাজ করে! একটা ব্রেইন সেল কি আরেকটা ব্রেইন সেলরে বলে, চলো, এইটারে খাই, কী আছে জীবনে!
সানজানা ভাবতেই থাকে। যদিও সে ভাবতে চায় না। কিন্তু সে আটকাইয়া যায়। নিওরোন সেলগুলা মানুষের মতন আকার নেয় তার ভাবনার স্ক্রিনে। প্রত্যেকটা সেল যেন এক একটা পুরুষ। তাদের নুনু আছে। তারা রেইপ করতে চায়। সবাই মিলা, ভাই ভাই একটা ফিলিংস!
নুনুওয়ালা অ্যাক্সনগুলা নাচতে থাকে সানজানার মাথার মধ্যে। হিন্দি সিনামার এক্সট্রাদের মতন। বেশিক্ষন সহ্য করা যায় না। আবার ছিটকাইয়া পড়তে চায় সে।
কিন্তু এইবার সে আর পারে না, ছিটকাইয়া পড়তে। যেহেতু সে চাইতেছে। সানজানার নিওরোন তার সাথে বিট্রে করে। তারা নুনুওয়ালা অ্যাক্সনের ছবি দেখাইতে থাকে। শিশুর কান্না কিম্বা দুধ পোড়া গন্ধের মতন অসহ্য বোধ হয়- সেই ছবি। নিওরোনগুলা তো আর ছাড়ে না, তারা তখন মজা পায়া গেছে, সানজানারে জ্বালাইতে। অসহায় লাগে তার। এই কী? নিজেরই শরীর তো এইটা! নাকি!
এক সময় সানজানার ডাক আসে। ডেন্টিস্টের চেম্বারে। সে টলতে টলতে রওয়ানা দেয়, মাথাব্যাথায় পর্যুদস্ত অবস্থায়।
ডেন্টিস্টের অ্যাসিসটেন্ট মেয়েটা খুব সুন্দর দেখতে, শ্যামলা গায়ের রং, দাঁতগুলা সব ঝকঝক করতেছে। নীল আর হলুদ কম্বিনেশনের একটা সালোয়ার কামিজ পরা, টাইডাই এর। শ্যামলা রং আর উজ্জ্বল পোশাক তার যৌবনরে অন্য লেভেলে নিয়া গেছে।
ওর নিশ্চয়ই দাঁতের সমস্যা নাই- ভাবে সানজানা। কোন দুঃখে সে দাঁতের ডাক্তারের অ্যাসিসটেন্ট হইতে আসছে! সে তো কোন কর্পোরেট অফিসের রিসেপশনিস্টও হইতে পারতো। কিম্বা হইতে পারতো কোন একটা হৃদয়বান পুরুষের বৌ, দুইটা লক্ষ্মী বাচ্চার মা। সে কেন প্রতিদিন বিভিন্ন মানুষের অসুস্থ দাঁত দেইখা দিন কাটাবে!
ভাইবা পায় না সানজানা। বেশিক্ষণ ভাবার চান্সও পাওয়া যায় না অবশ্য, নিজেকে আবিষ্কার করতে হয় একটা চেয়ারে। সামনে ডেন্টিস্ট, হাসি হাসি মুখ, সমস্যা না জিগাইয়া সে জিগায়, ভালো আছেন!
সানজানা টের পায়, মাথাব্যথাটা আর নাই, কখন জানি চইলা গেছে!