বাথরুম
পিছন থাইকা, কামুক পুরুষের মতন ঝাঁপাইয়া পড়লো ঠাণ্ডা পানি, মনে হইলো, ধারালো কোন অস্ত্র, রোমকুপের ভিত্রে পর্যন্ত জইমা যাবে। কী হইলো বিষয়টা? শাওয়ারটা আপনা আপনি চললো ক্যামনে? সানজানার কয়েক মুহূর্ত লাগলো বুঝতে, পেছন ফিরা তাকাইয়া বুঝতে পারলো, শাওয়ারের নবের উপ্রে ভারী টাওয়েল রাখার দরুন সেটা ঘুইরা গিয়ে চালু হইয়া গেছে, টাওয়েলটাও নিচে পইড়া গেছে। ঘটনাটা কয়েক সেকেন্ডের – কিন্তু তাতেই তার জামাকাপড় ভিজ্জা একশা হইছে- এমনকি আন্ডার গার্মেন্টসগুলাও একটু একটু।
হাত বাড়াইয়া শাওয়ার বন্ধ করলো সানজানা। আস্তে ধীরে জামাকাপড় ছাড়লো। তারপর চোখ ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া বাথরুমটা দেখতে শুরু করলো। বাথরুমটা দেখার মতনই- ছোট্ট, সুন্দর, পরিচ্ছন্ন। সবচেয়ে বড় কথা একটা বড় জানালা আছে। জানলায় একটা সুন্দর পর্দা, কিন্তু সেটা প্যাচাইয়া গুটায় রাখা। জানলার গ্রিলে অনেকগুলা স্যাকুলেন্টের টব ঝুলতেছে। টবগুলাও সুন্দর, এক একটা এক এক রকম। গাছগুলা ভীষণ সতেজ, এত সুন্দরভাবে জীবন্ত যে প্রত্যেকটা পাতা ছুঁইয়া দেখতে ইচ্ছা করে, আদর করতে মন চায়।
সানজানা কমোডের সিট কভার নামাইয়া তার উপ্রে বসলো, একটা সিগারেট ধরাইলো। সানজানার কোন তাড়া নাই। সে জানলায় ঝুলতে থাকা স্যাকুলেন্টগুলা মন দিয়া দেখতে শুরু করলো। বাথরুমের বাইরেটা ফাঁকা- মেলা দূর পর্যন্ত কোন বাড়ীঘর নাই। যেখানে আছে সেইখানটা এতই দূরে যে মানুষগুলা পুতুলের মতন ছোট ছোট দেখায়। দোতলা একটা বাড়ীর ছাদে কাপড় শুকাইতেছে, বাচ্চারা খেলতেছে। শেষ বিকালের রোদ পইড়া ছাদটাকে মনে হইতেছে উঠান।
পর্যায়ক্রমে দুই চোখ এক একবার খুইলা আর বন্ধ কইরা ফোকাস শিফট করতে করতে সে অদ্ভুত একটা স্যাকুলেন্টের পাতার সাথে ছাদটাকে একটা ফ্রেমে আনার চেষ্টা করলো। পাতাগুলার বিন্যাস অনেকটা গোলাপফুলের মতন।পাথরকুচির মতন মোটা পাতা, কালচে সবুজ রং- প্রান্তগুলা খাঁজকাটা। এক একটা ডালের চারপাশে পাতাগুলা উপর থাইকা নিচে ক্রমান্বয়ে বড় হইতে হইতে নামছে, নিচে নাইমা সংখ্যায় কমছে। বাচ্চারা যখন গোলাপ ফুল আঁকতে শিখে, তখন কেউ কেউ এরকম আঁকে।
সানজানা এই গাছটা এর আগে দেখে নাই। শিকড়গুলাও অদ্ভুত, টবটা সম্ভবত টিনের , ফুটা ফুটা আছে গায়ে। সেই সব ফুটা দিয়া শিকড়গুলা বাইর হইয়া পড়ছে জায়গায় জায়গায়। শুকনা মরা শিকড়ের মতনই দেখতে, কিন্তু শিকড়গুলাতেও পাতা জন্মাইছে- ছোট, এতই ছোট – প্রায় দেখাই যায় না। হাইপার রিফ্রেশ টাইপ সবুজ রংটার কারণে না দেইখাও পারা যায় না। হঠাৎ কইরা দেখলে মনে হয় মরা শিকড়ের ওপর সবুজ রং এর পানি পইড়া জইমা তুষার হইয়া গেছে।
সানজানাকে বলা হইছিলো বাথরুমে গিজার আছে। গোসলে ঢোকার আগে সে দরজার বাইরে গিজারের সুইচ অন কইরা দিয়া আসছে। একটা সিগারেট শেষ হইতে হইতে পানি যথেষ্ট গরম হইয়া যাওয়া উচিৎ- ওইটুক গরমে যে কোন মানুষেরই আরামের গোসল হওয়ার কথা।তেমন শীতও পড়ে নাই এখনও। কিন্তু সানজানা আগুন গরম পানিতে গোসল করতে পছন্দ করে- গায়ে পইড়া ধোঁয়া উঠতে থাকে, দেখলে মনে হয় গায়ের চামড়া থাইকা ধোঁয়া উঠতেছে - এমন গরম!
সানজানা বাথরুমের দরজা খুইলা তার ফ্রেন্ডের নাম ধইরা ডাক দিলো। এইটা তার ফেসবুক ফ্রেন্ড, আজকেই প্রথম দেখা হইলো। কী নামে ডাকবে ভাবতে গিয়া সে ফার্স্ট নেমই চুয করলো। সে সম্ভবত রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিলো, চিল্লাইয়া জিগাইলো সানজানার কিছু লাগবে কিনা। সানজানাও চিল্লাইয়া জানাইলো, টাওয়েল পইড়া গেছে আর কাপড় সব ভিজ্জা গেছে। গা মোছার একটা কিছু আর একটা টিশার্ট আর একটা ওড়না বা গামছা লাগবে।
ওর এইসব নিয়া আসতে একটু সময় লাগার কথা। সানজানা বাথরুমের দরজা চাপাইয়া বেসিনের সামনে আইসা দাঁড়াইলো। বেসিনটা পুচকি, দেয়ালে একটা বড় আয়না লাগানো, আয়নার চারপাশে সিলভার কালারের ফ্রেম, ফ্রেমসমেত আয়নাটা দেখলে প্রথম যে কথাটা মনে হয়, সেটা হইলো আয়নাটা একটা নিখুঁত বর্গক্ষেত্র। আয়নার নিচেই বেসিন, কোন র্যাক বা শেলফ নাই। আয়নার মুখোমুখি দাঁড়াইলে বাঁ পাশেই একটা দেয়াল, তাতে একটা রট আয়রনের ছোট্ট তাক লাগানো, তাতে নানা রকম জিনিস, তেল, শ্যাম্পু, বডি ওয়াশ, কন্ডিশনার এইসব। সানজানা শ্যাম্পুর বোতলটা হাতে নিলো, এই ব্র্যান্ড সে এর আগে দেখে নাই, কমলা রং এর একটা বোতল, তাতে বড় বড় কইরা ইংরেজিতে ক্যাপিটাল হরফে লেখা, বিয়ার।
সানজানা এই শ্যাম্পুটা চেনে না, এর আগে দেখে নাই। সে বোতলের মুখ খুইলা গন্ধ শুকলো।গন্ধ খুব ইম্পরট্যান্ট জিনিস। অপছন্দের গন্ধ মাথায় ঢুইকা গেলে খুব মুশকিল। আবার পছন্দের গন্ধ ঢুকলে মজা আছে। দামী পারফিউমের বোতলের মুখ খুললে যেমন গন্ধে আশপাশ মৌ মৌ করে- সেরকম কোন কোন সুন্দর গন্ধ চাইলেই রিকল করতে পারে সানজানা। একটু মন দিতে হয়, তারপর একটা মোমেন্টে ওই গন্ধটা তার মাথার ভিত্রে ম ম করতে থাকে। গন্ধে সানজানা ভাইসা যাইতে থাকে, কোন ভার্জিন ছেলের হাতের মতন গন্ধটা তার সারা শরীরে ঘুইরা বেড়াইতে থাকে।
দরজায় টোকা দিলো সানজানার ফ্রেন্ড। সে মুখ ঘুরাইয়া জানাইলো দরজা খোলা আছে, দরজা ধাক্কা দিয়া বাথরুমে ঢুইকা সানজানার ফ্রেন্ড একটু থমকাইলো কি! সানজানা যে বাথরুমের মধ্যে এরকম নিরাবরণ হইয়া দাঁড়াইয়া আছে, সেটা নিশ্চয়ই সে আশা করে নাই! সেকেন্ডের মধ্যে সে বাথরুমে ঢুইকা হাতের কাপড়গুলা টাওয়েল রিলে রাইখা একবার পূর্ণ দৃষ্টিতে সানজানার শরীরের দিকে তাকাইয়া সুন্দর কইরা হাইসা বাইর হইয়া গেলো। যাওয়ার সময় দরজা টাইনা দিয়া গেলো।
সানজানা পানির উষ্ণতা অ্যাডজাস্ট করতে গিয়া দেখলো, গরম পানির নবটা শক্ত আর ঠাণ্ডা পানিরটা অস্বাভাবিক রকমের নরম, প্রায় টাচস্ক্রিন ফোনের কাছাকাছি। এই কারণে ওই সময়ে গায়ে ঠাণ্ডা পানিটা পড়ছে।
সারা দেহে ধোঁয়া উঠাইয়া গোসল করতে করতে সানজানা হরিণের মতন চোখওয়ালা ছেলেটার গায়ের গন্ধ রিকল করা শুরু করলো। চোখ বন্ধ রাইখা শাওয়ারের দিকে পিছন কইরা দাঁড়াইয়া সে ছেলেটার মুখ আর শরীর ভাবতে শুরু করলো। শাওয়ার থাইকা পানির ধারা আইসা সানজানার ঘাড়ে পইড়া ধোঁয়া উড়াইয়া পিঠ বাইয়া নামতে থাকলো আর সানজানা চোখ বন্ধ কইরা দেখতে থাকলো ছেলেটার চোখ, চোখা নাক, রসালো ফলের মতন ঠোঁট, মণিমুক্তার মতন দাঁত, আদুরে জিভ, ত্রিভঙ্গ মুরারি দেহ।
সে গন্ধ পাইলো।
ছেলেটার গায়ে ছিলো ঘামের গন্ধ। তার কপাল আর গলা ছিলো ঘামে ভেজা। ঘামে তার টি শার্ট গায়ের সাথে চিপকায়া গেছিলো। ছেলেটা সানজানার বোতল থাইকা পানি নিয়া খাইছিলো। বইলা দিছিলো উঁচা কইরা খাইতে। উঁচা কইরা পানি খাইতে গিয়া সেই ছেলে তার নিজের বুক ভিজাইয়া ফেলছিলো।
সানজানা আরও তীব্রভাবে গন্ধ পাইলো।
ছেলেটার গায়ের ধোঁয়া ধোঁয়া গন্ধ মনে করতে করতে সানজানার গা জ্বলতে শুরু করলো। সে পানির উষ্ণতা কমাইয়া দিলো, জামাকাপড় কাচলো। তারপর গা মুইছা টি শার্ট গায়ে দিলো, গামছাটা কোমড়ের সাথে প্যাঁচ দিয়া বাইন্ধা বাথরুম থাইকা বাইর হইলো, তখন মাগরেবের আযান শোনা গেলো।