আমি তিনবার ভিড়ে ছিলাম। একবার বাড়ির সামনে, একবার ক্লিনিকের গলিতে, আর একবার হাসপাতালের বারান্দায়। তিনবারই আমার হাতে ফোন ছিল। কথাটা আগে বলি নাই। আগে শুধু বলতাম, আমি পিছনে ছিলাম।
সেই সন্ধ্যায় বাজারের চায়ের দোকানে একটা অডিও ছড়াল। এক মিনিট সাতাশ সেকেন্ড। কে তুলছে, কে ছাড়ছে, কেউ বলতে পারল না। দোকানে পাঁচজন বসে ছিলাম; কিছুক্ষণের মধ্যে চারজনের ফোনে ফাইলটা চলে এল। একজন শব্দ বাড়িয়ে শোনাতে গেলে দোকানদার বলল, আস্তে। তারপর নিজেই চুলার আগুন কমিয়ে কান পাতল।
আমি পুরোটা শুনি নাই। প্রথম কয়েক সেকেন্ডের পর পাশের লোকের কথায় মন চলে গিয়েছিল। পরে একজন জিজ্ঞেস করল, শুনছেন তো? আমি মাথা নাড়লাম। কী শুনছি, সেই প্রশ্ন কেউ করে নাই।
রাতে ঘরে ফিরে দেখি, পাড়ার ছেলেদের গ্রুপে সাতাশটা মেসেজ। কারও লেখা—চলেন। কারও—আজ একটা ব্যবস্থা হওয়া দরকার। একজন শুধু হাসির ইমোজি দিছে।
যার দোকান থেকে আমি ফোনে টাকা ভরি, সেই ছেলেটা লিখল, ভাই, আপনে কই?
লিখলাম, বাসায়।
সে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল। বাইরে থেকে অনেক মানুষের গলা আসছিল। বলল, সবাই আসছে, আপনে আসেন।
মা জিজ্ঞেস করলেন, আবার কোথায় যাস?
বললাম, বাজারে।
বাজারে আমার কোনো কাজ ছিল না।
২.
বাড়িটার সামনে পৌঁছে কাউকে ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না। কয়েকজন বারান্দায় ওঠার চেষ্টা করছিল, পিছন থেকে অন্যরা ধাক্কা দিচ্ছিল। আমি রাস্তার দিকেই দাঁড়ালাম। এখান থেকে ফিরতে সুবিধা হবে—এই কথাটা মনে হয়েছিল।
বাড়িটা আমার চেনা। এক বর্ষায় ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় বৃষ্টি ধরেছিল। বারান্দায় উঠতে সংকোচ করছিলাম; ভিতর থেকে মানুষটা বলছিল, দাঁড়ান, ভিজবেন কেন। আমি আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম। একবার বারান্দা থেকে নামতে গেলে তিনি বলেছিলেন, আরেকটু থাকেন, কমুক।
সেই সন্ধ্যায় বারান্দার শেষ মাথার দরজাটা বন্ধ ছিল। বাইরে কয়েক জোড়া জুতা। একটা স্যান্ডেল সিঁড়ির নিচে উল্টে পড়ে ছিল; ওঠার সময় একজন সেটার ওপর পা দিল।
কে প্রথম দরজায় লাথি দিল, আমি দেখি নাই। তার আগে অনেক কথা শুনছিলাম। একজন অডিওর কথা বলছিল, আরেকজন বলছিল, অডিও লাগবে কেন, এলাকার সবাই জানে। পিছন থেকে কেউ জিজ্ঞেস করল, কী জানে? উত্তরটা শোনা গেল না। সামনে তখন দরজা খোলার শব্দ।
তাঁকে টেনে আনার সময় শার্টের একটা হাতা কনুই পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। তিনি কারও দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, কাদের ভাই, আপনে একটু বলেন।
কাদের ভাইকে আমি দেখলাম না। শুধু দেখলাম, সামনের সারির একজন মুখ ঘুরিয়ে নিল।
আমি ক্যামেরা খুললাম। দুই সেকেন্ড পর বন্ধ করলাম। পর্দায় মানুষের পিঠ ছাড়া কিছু আসছিল না। একটু সরে দাঁড়ালে দেখা যেত; আমি সরি নাই। তখনও মনে হচ্ছিল, আমি পিছনে দূরে আছি।
পুলিশ ঢোকার সময় কয়েকজন সরে গেল, কয়েকজন আরও কাছে এল। যাদের হাতে লাঠি ছিল, তারা হাত নামিয়ে রাখল। একজন পুলিশ দুহাত ছড়িয়ে জায়গা চাইছিলেন। গাড়ির দরজা খোলা, কিন্তু মাঝখানে মানুষ।
পাশের লোকটা আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলল, একটু চাপেন।
পিছনে একটু ফাঁকা ছিল। আমি সরলাম না; সামনের লোকটার পিঠে হাত রেখে ভার সামলালাম। গাড়িতে তোলার সময় তাঁর মাথাটা একবার দেখা গেল। ঠোঁটের নিচে রক্ত, চশমা ছিল না।
গাড়ি চলে গেলে ফোনের দোকানের ছেলেটা আমার কাছে এল। তার পরনে সবুজ গেঞ্জি, গলার কাছে ঘামে ভিজে গাঢ় হয়ে আছে। ফোনে কারও সঙ্গে কথা শেষ করে বলল, ক্লিনিকে নিছে। চলেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম না, সেখানে আমাদের কী কাজ।
৩.
ক্লিনিকের গলির মুখে এসে থেমেছিলাম। ভিতরে ঢোকার জায়গা কম, দুই পাশে মোটরসাইকেল। একটা রিকশা বের হতে পারছিল না। রিকশায় বসা বয়স্ক মহিলা বারবার বলছিলেন, বাবা, একটু সরে দাঁড়াও। তাঁর পাশের লোকটা একটা টেস্টের খাম দুই হাতে ধরে রাখছিল।
আমি ফিরতে ঘুরেছি, এমন সময় সবুজ গেঞ্জির ছেলেটা বলল, আপনে থাকেন, আপনার ফোনে ছবি পরিষ্কার আসে।
ফোনটা তখন পকেটেই ছিল। আমি বের করলাম।
গলির ভিতরে একজন লাইভ করছিল। নিজের মুখ দেখিয়ে বলছিল, আমরা আছি, ভাইরা, আপনেরাও আসেন। মাঝে মাঝে ফোন ঘুরিয়ে ক্লিনিকের দরজা দেখাচ্ছিল। আমি তার পাশ কাটিয়ে দেয়ালের কাছে দাঁড়ালাম। এখান থেকে দরজাটা দেখা যায়।
একজন লোকের হাতে রশি ছিল। সে রশিটা খুঁটির সঙ্গে পেঁচাচ্ছিল, আবার খুলছিল। লোকটাকে আমি চিনি। বাজারে তার সঙ্গে চা খাইছি; একদিন আমার কাছে খুচরা টাকা চাইছিল। সেই রাতেও একবার চোখাচোখি হলো। সে এমনভাবে মাথা নাড়ল, যেন কোনো দোকানের সামনে দেখা হইছে।
ক্লিনিকের এক কর্মচারী বের হয়ে বললেন, অন্য রোগী আছে, আপনারা বাইরে যান।
কেউ সরে গেল না। একজন উল্টো তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ভিতরে কী করতেছেন?
লোকটা উত্তর দেওয়ার আগেই আরও দুজন প্রশ্ন করতে লাগল। তিনি দরজার দিকে ফিরছিলেন; রশিওয়ালা লোকটা খুঁটি ছেড়ে তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল। রশি তখনও তার হাতে।
আমি ফোন তুললাম। স্ক্রিনে দুজনের মুখই পরিষ্কার আসছিল।
সবুজ গেঞ্জির ছেলেটা আমার কাঁধের ওপর দিয়ে দেখে বলল, এইটা গ্রুপে দেন।
রেকর্ড চালু করলাম। কর্মচারীটি তখনও দরজায় পৌঁছাতে পারেন নাই। একবার আমাদের দিকে তাকালেন; স্ক্রিনে তাঁর মুখটা ছোট দেখাচ্ছিল। আমি দুই আঙুলে ছবিটা বড় করে নিলাম।
কিছুক্ষণ পর ভিতর থেকে স্ট্রেচার এল। একজন বললেন, এখানে হবে না, হাসপাতালে নিতে হবে। গাড়ি কাছে আনার জন্য আবার জায়গা চাওয়া হলো, আবার মানুষ সরতে দেরি করল।
এবার আমি দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালাম। আমার সামনে একটু ফাঁক হলো। পিছন থেকে দুজন সেই ফাঁকে ঢুকে পড়ল।
৪.
হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় পাশের ওষুধের দোকানের ঘড়িতে দশটা চার। দোকানদার দরজার একটা পাল্লা টেনে দিয়েছিলেন, অন্যটা খোলা। আমরা ঢোকার পর তিনি বেরিয়ে বারান্দার দিকে তাকালেন।
এখানে কিছু মানুষ আগেই এসে দাঁড়িয়েছিল। ক্লিনিক থেকে আমাদের সঙ্গে আসা লোকজন তাদের সঙ্গে মিশে গেল। একজন ফোনে বলছিল, সামনের গেট বন্ধ, পাশ দিয়া আসেন।
জরুরি বিভাগের দরজার কাছে এক তরুণী বাচ্চা কোলে বসেছিল। সঙ্গে একটা ব্যাগ, ব্যাগের ওপর হাসপাতালের কাগজ। সে উঠে কাউকে জিজ্ঞেস করল, আমার আব্বারে এখন দেখবে না?
কেউ উত্তর দিল না। ধাক্কা বাড়লে সে বেঞ্চ ছেড়ে দেয়ালের দিকে সরে গেল। বাচ্চাটা প্রতিবার চিৎকার শুনে চমকে উঠছিল; সে শিশুটির মাথায় হাত রেখে নিজের কাঁধের দিকে মুখ ঘুরিয়ে দিচ্ছিল।
একজন কর্মচারী দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সবুজ গেঞ্জির ছেলেটা তাঁকে ঠেলে ভিতরে ঢুকল। আরও কয়েকজন গেল তার পিছনে। বাইরে থেকে একজন বলল, ছাড়বেন না কিন্তু। কথাটা বলার সময় সে আমার দিকে তাকিয়েছিল।
আমি তখন আবার ফোন তুলেছি।
ভিতরে কী হচ্ছিল, পুরোটা দেখা যাচ্ছিল না। মানুষ আর দরজার পাল্লার ফাঁকে কখনও একটা হাত, কখনও কারও কাঁধ। ভিতরে কিছু একটা উল্টে পড়ে মেঝেতে ঘষটে গেল। তারপর একজন বলল, পা সরান। আমার পাশের লোকটা ভালো করে দেখার জন্য পায়ের আঙুলে ভর দিল।
কর্মচারীটি বাইরে এসে বললেন, একটু সাহায্য করেন, এদের বের করেন।
তিনি আমার দিকেও তাকালেন। সবুজ গেঞ্জির ছেলেটার নাম আমি জানতাম। চাইলে নাম ধরে ডাকতে পারতাম।
আমি বললাম, আমি তো সঙ্গে না।
কথাটা শুনে তিনি অন্যদিকে গেলেন। আমি ফোন নামালাম না।
৫.
সেই রাতে বাড়ি ফেরার পথে চায়ের দোকানে থামলাম। দোকানদার জিজ্ঞেস করল, হাসপাতাল থেকে আসলেন?
বললাম, ওই দিকে ছিলাম।
সে চা ঢালতে ঢালতে বলল, খুব মারছে শুনলাম।
আমি কাপের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তার হাতের বুড়ো আঙুলে পুরনো পোড়া দাগ। কাপটা ধরার সময় দাগের ওপর আমার আঙুল লাগল।
বাড়ি ফিরলে মা দরজা খুললেন। জিজ্ঞেস করলেন, এত রাত হলো কেন?
বললাম, বাজারে লোকজন ছিল।
সকালে মৃত্যুর খবর পেলাম। কে প্রথম বলল, মনে নাই। গ্রুপে ঢুকে দেখি, রাতের কয়েকটা মেসেজ মুছে ফেলা হইছে। হাসির ইমোজিটা ছিল। তার নিচে একজন লিখছে, কেউ কোনো ভিডিও শেয়ার করবেন না।
সাত দিন পরে একই দোকানে একজন বলল, আমরা তো কিছু করি নাই।
আমি চায়ে চুমুক দিলাম। এতক্ষণ কাপটা ধরে রেখেছিলাম, খেয়াল ছিল না।
রশিওয়ালা লোকটা তখন দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে বিড়ি ধরাচ্ছিল। আমাদের কথা শুনে সে ভিতরে তাকাল, তারপর রাস্তার দিকে ঘুরে গেল।
৬.
দুই মাস পার হইছে। গতকাল ফোনের গ্যালারি খুলে ভিডিওগুলো আবার দেখলাম। ক্লিনিকের গলিতে কয়েকটা ছোট ফাইল, শেষে হাসপাতালের বারান্দায় প্রায় কুড়ি মিনিট। কোনোটা কাউকে পাঠাই নাই।
সবচেয়ে দীর্ঘ ফাইলটায় প্রথমে মেঝে দেখা যায়। তারপর ছবিটা ওপরে সরে, দরজা আসে। কেউ একটা নাম ধরে ডাকে। পর্দার বাইরে থেকে সবুজ গেঞ্জির ছেলেটার গলা শোনা যায়; আমি তাকে সঙ্গে সঙ্গেই চিনলাম।
কর্মচারীটির সাহায্য চাওয়াও আছে।
আমি তো সঙ্গে না।
নিজের গলা শুনে শব্দ কমালাম। একটু পরে আবার বাড়ালাম। ঘরে কেউ ছিল না, তবু দরজার দিকে তাকাতে হলো।
ফাইলটা মুছতে গিয়ে আঙুল থেমে থাকল। এতদিন নিজেকে বলছি, রেখে দিছি সাক্ষ্য হিসেবে। কিন্তু কাউকে তো দেখাই নাই। কারও নামও বলি নাই। ফোনের জায়গা খালি করার সময় কত ছবি মুছছি, এইগুলো রেখে দিছি।
সেই সন্ধ্যার অডিওটা এখন আর খুঁজে পাই না। এক মিনিট সাতাশ সেকেন্ডের ফাইল। তখন যার ফোনে চাইতাম, পাওয়া যেত। এখন চাইলে আমাকে জিজ্ঞেস করবে, কী দরকার?
ভিডিওটা চালু রেখেই ফোন টেবিলে রাখলাম। ছবিতে দরজা কাঁপছিল। ফোন থেকে কিছু দূরে বসে নিজের শ্বাস শুনছিলাম। এত কাছে আর কারও গলা ছিল না।
৭.
আজ সকালে বাজারে যাওয়ার সময় বাড়িটার সামনে দিয়ে গেলাম। বারান্দায় কেউ ছিল না। দরজার পাশে দুটো স্যান্ডেল; একটা সোজা, একটা উল্টা। সেদিনের জোড়াটাই কি না, বলতে পারব না। এতদিন ধরে ভাবছি একই জোড়া, অথচ রঙটাও ঠিক মনে নাই।
গতি কমিয়েছিলাম। দাঁড়াই নাই।
চায়ের দোকানে সবুজ গেঞ্জির ছেলেটা বসেছিল। আজ তার পরনে অন্য জামা। আমাকে দেখে জায়গা করে দিল, বলল, বসেন ভাই।
আমি বললাম, কাজ আছে।
বাসায় ফিরে খাতা খুললাম। প্রথমে লিখলাম, আমি তিনবার ভিড়ে ছিলাম। তারপর কলম থামিয়ে রাখলাম। ওই শব্দটা লিখলে এখনও মনে হয়, হাটে গিয়েছিলাম, বাসের জন্য দাঁড়িয়েছিলাম, কিংবা বৃষ্টির মধ্যে কোনো দোকানের ছাউনিতে আশ্রয় নিছিলাম।
ভিড়ের মধ্যে থেকে যে ছেলেটা আমাকে ডাকছিল, তার নাম জানি। রশি হাতে লোকটাকে চিনি। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে যে বলছিল ছাড়বেন না, তাকে আবার দেখলে চিনতে পারব।
আর কর্মচারীটিকে আমি কী বলছিলাম, সেটাও ফোনে আছে।
পাতার ওপরে লিখলাম, ঘাতক জনতার হাত। নিচে নিজের নাম লিখতে গিয়ে কলমটা আবার থামল। অনেকক্ষণ পরে নামটা লিখলাম, তারপর খাতা বন্ধ করে ড্রয়ারে রাখলাম।
মা রান্নাঘর থেকে বললেন, পানি ফুটছে, চা দিবি?
চুলার সামনে দাঁড়িয়ে কাপ নামালাম। ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে কাপের কিনারা ঘষে দেখলাম পরিষ্কার আছে কি না। আঙুলে চায়ের পুরনো দাগ লেগে রইল।
আমি চা বানাই। আমার হাতটাও সেই একই হাত।