বিজয় সৌদী আরব থেকে ফিরলো তাও অন্ধ হয়ে। কারেন্ট এর কাজ করার সময় হঠাৎ লাইন ব্লাস্ট হয়। তখনই তার চোখদুটো নষ্ট হয়ে যায়। কম্পানি তাকে কাজ থেকে বাতিল করে দেয়। তাই বিজয় বাংলাদেশে নিজ গ্রামে ফিরে এলো।
বিজয়ের কাধে ব্যাগ চোখে কালো চমশা, হাতে একটা লাঠি। আজকাল লাঠি ছাড়া হাটা মুশকিল। বিজয় গাড়ি থেকে নেমে তার ২তলা পাকা বাড়ির কাছে আসতেই প্রথমে তাকে দেখলো তার মা। আবেগি মা বিজয়কে দেখে দৌড়ে এসে কান্না করে দিল। তারপর জড়িয়ে ধরে দু গালে চুমু দিল।
মা বললেন, বাবা। তোর খবর শুনলাম। ভালো হয়েছে দেশে ফিরে আসলি।
এদিকে বিজয়ের মনটা খারাপ। কারন এখন বিজয় কাজ করতে পারবে না। বেকার হলে ঘুরতে হলে অন্ধ মানুষকে কেউ পছন্দ করে না। পরিবারের প্রতি একটা বোঝা হয়ে যায়।
সোফা রুমে বসলো বিজয়। তখনই শব্দ শুনলো কে যেন এই রুমে এসেছে। আতরের ঘ্রানে চিনে ফেলল তার বাবা।
বিজয় বলল, ভালো আছো বাবা?
বাবা তখন রেগে বললেন, ঠিক মতো কাজ করতে পারিস না? সামান্য একটা তার জোড়া লাগাবি আর ব্লাস্ট হবে কেন?
বিজয় মাথা নিচু করে বলল, আমি তো কাজ শিখছিলাম। তখনই এই ঘটনা ঘটে।
বাবা মুখে পান দিয়ে বিরক্ত স্বরে বললেন, তাই তো দেখসি ৩মাস ও হলো না বিদেশ যেতে আবার ফেরত এসে পড়েছিস। তোর বাপের তো অনেক সম্পদ। এবার বসে বসে খা।
বিজয় বুঝে তাকে টিটকারি করা হচ্ছে। তবে এখন অন্ধ মানুষ। তাই এসবের জবাব দিল না। তাছাড়া বাবা বুড়ো হয়েছেন। এখন মুখে মুখে তর্ক করলে উনি কষ্ট পাবেন। কোনদিন মারা যায়। তা তো বলা যায় না। এমনিতেও উনার বয়স হয়েছে। তাই বিজয় চুপ থাকে।
হঠাৎ কিশোরী সাইদা এসে বলল, ভাইয়া আমার জন্য কি এনেছিস?
বাবা বললেন, কি আনবে তোর জন্য? হু?
বিজয় ব্যাগ থেকে একটা ল্যবটপ বের করে টেবিলে রাখে।
বিজয় বলে, এটা তোর জন্য।
অবাক হয়ে টেবিল থেকে ল্যবটপ তুলে নেয় হাতে সাইদা।
সাইদা সন্দেহ চোখে বলে, ভাইয়া তোর নাকি চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। তাহলে সব কাজ এতো নরমাল মানুষের মতো কিভাবে করসিস? এই যে ব্যাগের চেইন খুললি। একটুও ভুল হলো না।
ঢেউক গিলল বিজয়। বিজয় বলল, আমার সিক্স সেন্স খুব প্রবল। আমি সবকিছু কল্পনা করে ফেলি। আর চোখে দেখি না তবে অন্তর দেখি ভালোই দেখি সবকিছু। আজকাল তো অন্যদের অন্তরের কথাও পড়তে পারছি।
কথাটা যেন বাবাকে ঈঙ্গিত করেই বলল বিজয়। তারপর নিজের রুমে চলে আসলো৷
গোসলখানায় ঢুকে বিজয় আয়নার সামনে হাসতে লাগলো। তারপর চমশা খুলে। চোখের থেকে সাদা লেন্স দুটো খুলে ফেলল।
বিজয় বলল, ভালোই অন্ধের অভিনয় করলাম যে নিজের পরিবারও ধরতে পারলো না৷ শুধু সাইদার থেকে সাবধান হতে হবে। বিদেশে থাকতে কার ভালোলাগে? বোরিং। ফ্যমিলি নাই, বন্ধু নাই। এজন্য এইসব কারেন্ট এর নাটক বানালাম। তো আমি চালাক।
তারপর আয়নার নিজেকে চুমু দেয় বিজয়।
হঠাৎ অদ্ভুদ শব্দে রাত ২টায় বিজয়ের ঘুম ভাঙ্গে টয়লেটে চাপ দেয়। কালো চশমাটা পড়ে নেয় বিজয়। তারপর অন্ধের ভান করে নিজের রুম থেকে বের হয়। তাদের টয়লেট বাড়ির পেছনে গ্রামে এটাই নরমাল। আর টয়লেটে যেতে হলে সোফা রুম পাড় করে যেতে হয়।
বিজয় যখন সোফা রুমে আসলো তখন দেখলো। একটা লোক তার মায়ের গলায় চাপাতি ধরে আছে। লোকটার মুখে গামছা পেচানো। বিজয় বোঝার চেষ্টা করলো। এটা ডাকাত? তার মানে তার বাসায় ডাকাতি হচ্ছে। বাবা কোথায়? সাইদা কই?
বিজয় নিজেকে বলল, এতো প্যনিক করলে চলবে না। শান্ত থাকতে হবে।
লোকটা ওর মায়ের কানের কাছে বলল, আমরা জানি তোর ছেলে অন্ধ হয়ে গেছে। সব খোজখবর নিয়েই আমরা ৩জন ডাকাতি করতে আসছি। তুই চুপ থাকবি। ও হয়তো টয়লেট যাবে এখন। তারপর আবার নিজের রুমে ঘুমিয়ে পড়বে। তোর স্বামী ও মেয়েকে তো কুপিয়ে দিলাম চেচামেচি করেছে তাই। এবার আমরা চাই না তোকে ও তোর ছেলেকে কোপাতে তাই চুপ করে থাক।
ভয়ে ঘামছেন মা। বিজয় দেখলো ডাকাতটা তার মায়ের গলার সোনার চেইন খুলে নিয়ে নিচ্ছে৷ বিজয় শান্ত পায়ে অন্ধের ভান করে ঘর থেকে বের হলো। দরজার বাইরে দেখলো আরেকজন ডাকাত দাড়িয়ে আছে। তার হাতে ছুড়ি। তবে বিজয়কে দেখে আক্রমন করলো না। কারন এরা জানে বিজয় অন্ধ।
বাথরুমের দরজার কাছে আসতেই বিজয় দেখলো সাইদা দেহ পড়ে আছে। তার গলায় ও পেটে কাটার দাগ। নিজের ইমোশনকে কন্ট্রোল করলো বিজয়। এই সাইদা তাকে ভাইয়া ভাইয়া বলতো। ছোটবেলা থেকে মানুষ করেছে। কাধে নিয়ে মেলায় যেত। আইসক্রিম খেতে চাইলে খেতে চাইলো। এখন কে তার কাছে বলবে ভাইয়া আইসক্রিম খাবো? বিজয়ের মনটাই ভেঙ্গে গেল।
#অন্ধত্ব
#রুদ্র_সিয়াম