মৃণালি বলল, বাসা থেকে আমাকে বিয়ের চাপ দিচ্ছে।
আকাশের দিকে তাকালো দীপ্ত। সেখানে পাখিরা উড়ে যাচ্ছে। ওই যে পার্কের কোনায় শাড়ি পড়া পাঞ্জাবি পড়া এক দম্পতি হাত ধরে হেটে যাচ্ছে। গাছের কাছে একলোক লুঙি উচু করে কাজ সারছে। দীপ্ত সেগুলো দেখছিল।
মৃণালি বিরক্ত হয়ে বলল, তুমি দেখি আমার কথার কোন গুরুত্ব নাই। বুঝবা, বুঝবা যখন হারাই ফেলবা তখন বুঝবা।
দীপ্ত গম্ভীর হয়ে বলল, আমার যে আফসোস বলতে কিছু নেই মায়াবতী।
দীপ্ত জানে সে মিথ্যা বলেছে। সবচেয়ে বেশি আফসোস তার নিজেরই। তবে দীপ্ত হচ্ছে সেই ধরনের পুরুষ। যারা ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারে না।
মৃণালি বলল, তুমি একটা ছোটখাটো কাজ করো। যেমন ধরো একটা শপিংমলে কাজ করো বা তো মানুষ তো রিকশাও চালায়।
অবাক হয়ে তাকায় দীপ্ত। হেসে ফেলে বলে, আমি তো টিউশনি করি। তো কাজ তো করছি।
মৃণালি বলল, সেগুলোর টাকার তো তোমারই চলতে অসুবিধে হয়। মাস শেষ হওয়ার আগে আমার থেকে ঋণ নিয়ে চলো।
দীপ্ত বলে, তুমি কি তাহলে খোঁটা দিচ্ছো?
মৃণালি বলে, উফ। সবসময় ভুল বুঝে। মোটেও না। আমি চাই আমরা দুজন এক হই। দরকার হলে আমি একটা জব করি। না হয় আমি সংসার চালালাম।
দীপ্ত মিথ্যে হাসিতে বলে, যে মেয়ে দিনের ১২টা বাজে উঠে। যার ঘরে কাজ করার জন্য ৩,৪ টে বুয়া। সে নাকি আমার জন্য কাজ করবে।
মৃণালি জোর দিয়ে বলে, করতেই পারি। আমি চাই আমাদের ভালোবাসার পূর্ণতা পাক।
দীপ্ত হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলে, আমি কি চাই। সেটা জানতে চাও না?
মৃণালি ভয় পেয়ে যায়। তবুও বলে, কি চাও?
দীপ্ত বলে, আমি চাই পড়াশোনা শেষ করে বড়কিছু হতে। তারপর একটা ফ্লাট কিনবো। গ্রাম থেকে বাবা, মা কে নিয়ে আসবো। ছোটবোনটাকে বিয়ে দিতে হবে। সব দ্বায়িত্ব আমার। শুধু নিজের সুখের কথা চিন্তা করলে হবে না মৃণালি।
মৃণালি তার হ্যন্ডব্যাগ কাধে ঝুলিয়ে উঠে দাড়ায়।
মৃণালি খানিকটা অভিমানে বলে, তার মানে তুমি আমাকে চাও না?
দীপ্ত বলল, অবশ্যই চাই।।তবে বাস্তবতা জানি আমি। তোমাকে বিয়ে করলে আমার ক্যরিয়ার এর কি হবে?
ঠাস করে একটা থাপ্পড় লাগায় মৃণালিনী। তারপর তার নিজের চোখ দিয়েই জল পড়তে থাকে।
থাপ্পড় খেয়েও শান্ত থাকে দীপ্ত। জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।
মৃণালি রেগে বলে, তুই তোর ক্যরিয়ার নিয়ে থাক। আর কোন দিন আমাকে ফোন দিবি না। যোগাযোগ রাখবি না।
দীপ্ত নিজের আত্মসম্মান এর কথা ভেবে বলে, ঠিক আছে। তবে আমি চাইবো তোমার ভালো ঘরে বিয়ে হোক। তুমি খুশি হও।
আরেকটা থাপ্পড় লাগায় মৃণালি। তার চোখ দিয়ে এখনও অশ্রু পড়ছে। যেন নিজেও আহত তার মন।
মৃণালি বলে, আমি তো সুখ চাইনি তোকে চেয়েছিলাম। এটা কি খুব বেশি কিছু? অন্যায় কিছু চেয়েছিলাম।
দীপ্ত বলে, আমি জানি না। মৃণালি।
তারপর দীপ্ত উঠে দাড়ায় পার্কের বেন্চ থেকে। সোজা হাটতে থাকে। কখনও পেছন ফিরে তাকায় না।
একটা দোকানে এসে সিগারেট ধরায়। তখনই তার আম্মু কল দেয়।
আম্মু বলে, কেমন আসিস? দুপুরে খেয়েছিস?
দুপুরে খাওয়া হয়নি দীপ্তের। তবুও বলে, হ্যা। খেয়েছি। তোমরা ভালো আছো সবাই।
আম্মু হতাশ হয়ে বলে, ভালো কিভাবে থাকবো। তুই দূরে। তোকে দেখি না কতদিন। তোর ছোটবোন সিতারা এবার ক্লাস ৯ পড়ে। বলে টাচস্ক্রীন ফোন কিনে দিতে। ওখানে নাকি অনলাইন ক্লাস করবে।
দীপ্ত সিগারেটের ধোয়া ছেড়ে বলে, আমার যে ফোনটা আছে। এটার কি গ্রামে পাঠাই দিব?
আম্মু হঠাৎ সুর পাল্টে বলে, কি দরকার? তোর নিজের ই তো ফোন লাগে। দরকার নাই বাবা। ওই সিতারা যা পড়তে বস। সারাদিন খালি দুষ্টমি না। একটা মাইর দিমু। হ বল তারপর।
দীপ্তের নিজেকে অসহায় মনে হচ্ছে। সামান্য একটা ফোন কিনে দিবে বোনকে সেই সামর্থ্য নাই। কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। কাউকে দেখাতে পারছে না। হয়তো ছেলেরা এমনই হয় নিজের দুঃখ কষ্ট কাউকে দেখায় না।
আম্মু বলল, তোর হয়তো টাকা শেষ হচ্ছে। আচ্ছা রাখি।
দীপ্ত বলে, নিজের যত্ন নিও মা। আল্লাহ হাফেজ।
ফোন কেটে দেয় দীপ্ত। এই যে আকাশে এখন লাল। সূর্য ও তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। অন্ধকার হয়ে আসছে ঢাকাশহর।
মেসে এসে দরজার তালা খুলতে যাবে। তখনই তার প্রতিবেশি রকি এসে বলল, কি রে কই গেসিলি? তোর কাছে ৩০০টাকা হবে? একটা ইয়াবা খাবো?
এদিকে ভাত খাওয়ার মতোও টাকা নাই দীপ্তের । হোটেলে বাকি খায় সে।আজ শুক্রবার কি কারনে যেন হোটেলটা বন্ধ তাই আর খাওয়া হয়নি।
দীপ্ত ভদ্রভাবে বলল, না ভাই আমার কাছে টাকা নাই।
রেগে রকি বলে, এতো স্মার্ট ভাবে কই গেছিলি? হাতে ঘড়ি লাল শার্ট পড়ে? তোর ঘড়িটা আমাকে দে। পরে তোকে দিয়ে দিব।
দীপ্ত বলল, না। ভাই এটা একজন গিফট করছে। এটা দেওয়া যাবে না।
রকি রেগে দীপ্তের শার্টের কলার ধরে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়। সারাদিন না খেয়ে দীপ্তের প্রতিবাদ করার ক্ষমতাও থাকে না। রকি ঘড়িটা একপ্রকার ছিনিয়ে নেয় জোর করে।
রকি বলে, এটা বিক্রি করে ইয়াবা খাব। পরে টাকা দিয়ে দিব। ভালো থাকিস।
তারপর রকি চলে যায়। অসহায় হয়ে রাগে দাতে দাত চেপে রাখে দীপ্ত। তারপর ঘরের তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই ফোনে নোটিফিকেশন বেজে উঠে।
ফোনটা হাতে নিয়ে দীপ্ত দেখে মৃণালি অনেকগুলো ভয়েজ মেসেজ দিয়েছে। এগুলো এখন শুনতে ইচ্ছে করছে না দীপ্তের। খালি পেটে তো আর ভালোবাসা হয় না।
তাই ফোনটা চার্জে রেখে ওয়াশরুমে চলে যায়। এদিকে মৃণালী তাকে অডিও কল করে যাচ্ছে একটার পর একটা। টেবিলে ফোন ভাইবিসন হচ্ছে। যেন টেবিল থেকে নিচে পড়ে যাবে এমন অবস্থা।
#কত_করে_বলি_তোমাকে
#রুূদ্র_সিয়াম