একটা ছেলে ছিল, নাম তার আরিয়ান। ছেলেটা খুব সাধারণ ছিল। বেশি কথা বলত না, নিজের কষ্ট কাউকে বুঝতে দিত না। সবাই ভাবত, ছেলেটা খুব সুখে আছে। অথচ তার হাসির আড়ালে কতটা অভিমান জমে ছিল, সেটা কেউ জানত না।
আরিয়ানের জীবনে একটা মেয়ে এসেছিল, নাম নীলা। মেয়েটা তার জীবনে আসার পর ছেলেটা প্রথমবারের মতো স্বপ্ন দেখতে শিখেছিল। ছোট ছোট বিষয়েও সে খুশি হতো। সকালে ঘুম থেকে উঠে একটা মেসেজ পাওয়া, রাতে ঘুমানোর আগে কয়েকটা কথা বলা—এই সামান্য জিনিসগুলোই তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখ ছিল।
নীলাও একসময় তাকে বলেছিল, “তুমি কখনো আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?”
আরিয়ান হেসে বলেছিল, “আমি তো তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য আসিকিন্তু মানুষ সব সময় নিজের কথা রাখতে পারে না। কখনো পরিস্থিতি বদলে যায়, কখনো মানুষের মন বদলে যায়, আবার কখনো দুজন মানুষ একে অপরকে ভালোবাসার পরও একসঙ্গে থাকতে পারে না।
ধীরে ধীরে নীলা বদলে যেতে লাগল। আগের মতো কথা বলত না, খোঁজ নিত না, আরিয়ানের ছোট ছোট অভিমানগুলোও তার কাছে বিরক্তিকর মনে হতো।
একদিন আরিয়ান জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি আর আমাকে আগের মতো ভালোবাসো না?”
নীলা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “সবকিছু আগের মতো থাকে না, আরিয়ান।”
কথাটা খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু আরিয়ানের কাছে মনে হলো, কেউ যেন তার সাজানো পৃথিবীটা এক মুহূর্তে ভেঙে সে আর কোনো প্রশ্ন করেনি। কারণ সে বুঝেছিল, যে মানুষটা একসময় তার নীরবতাও বুঝত, আজ তাকে নিজের কষ্টের কারণ ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে।
কয়েক দিন পর নীলা চলে গেল। কোনো ঝগড়া হলো না, কোনো বড় অভিযোগও ছিল না। শুধু দুজনের মাঝখানে একটা দূরত্ব তৈরি হলো, যে দূরত্ব একসময় তাদের সব কথাকে নীরব করে দিল।
আরিয়ান অনেক দিন অপেক্ষা করেছিল। প্রতিদিন ফোনের পর্দায় তাকাত, পুরোনো কথাগুলো পড়ত, আর মনে মনে ভাবত—হয়তো একদিন নীলা ফিরে এসে বলবে, “চলো, আবার নতুন করে শুরু করি।”
কিন্তু সেই দিন আর আসেনি।
এক বছর পর এক সন্ধ্যায় আরিয়ান নদীর ধারে বসে ছিল। সূর্য ডুবে যাচ্ছিল, বাতাসে হালকা শীত। হঠাৎ তার ফোনে নীলার একটাকেমন আছ?”
মাত্র দুটি শব্দ।
অথচ এই দুটি শব্দের অপেক্ষায় সে কত রাত কাটিয়েছে!
আরিয়ান অনেকক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার ইচ্ছে করছিল লিখতে—“ভালো নেই। তোমাকে ছাড়া কিছুই আগের মতো নেই। আজও তোমার কথা মনে পড়ে।”
কিন্তু সে লিখল,
“ভালো আছি। তুমি কেমন আছ?”
নীলা বলল, “আমিও ভালো আছি। তোমার কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে।”
আরিয়ান মৃদু হাসল। তারপর লিখল,
“জানো, একসময় তোমার সঙ্গে কথা না হলে আমার দিন শেষ হতো না। আর আজ দেখো, তোমার সঙ্গে কথা না বলেও একটা বছর পার করে দিয়েছি।”
নীলা উত্তআরিয়ান ফোনটা পকেটে রেখে নদীর দিকে তাকাল। তার চোখে পানি ছিল না, মনে কোনো অভিযোগও ছিল না। শুধু একটা উপলব্ধি ছিল—জীবনে কিছু মানুষকে আমরা হারাই না, বরং তাদের ছাড়া বাঁচতে শিখে যাই।
সেদিন বাড়ি ফিরে সে নিজের ডায়েরিতে শেষবারের মতো নীলার নাম লিখল।
তারপর লিখল—
“তোমাকে পাওয়ার জন্য একসময় নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছি। আজ তোমাকে ভুলে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছি না। কারণ তুমি আমার জীবনের একটা সুন্দর অধ্যায় ছিলে। সব সুন্দর অধ্যায়ের শেষটা সুখের হয় না, তবু সেই অধ্যায়ের সৌন্দর্য মিথ্যা হয়ে যায় তুমি ভালো থেকো। কোনো একদিন যদি আমার কথা মনে পড়ে, মনে রেখো—একটা মানুষ ছিল, যে তোমার কাছ থেকে কিছু পাওয়ার আশায় নয়, তোমাকে ভালো রাখতে পারলেই সুখী হতো।
আর আমি?
আমি আবার বাঁচতে শিখব। নিজের জন্য, নিজের স্বপ্নের জন্য।
কারণ জীবন কখনো একজন মানুষকে হারিয়ে শেষ হয়ে যায় না। জীবন অপেক্ষা করে—আমরা আবার কখন নিজের হাতটা নিজেরাই ধরব।”
ডায়েরিটা বন্ধ করে আরিয়ান জানালার বাইরে তাকাল। আকাশে চাঁদ উঠেসেদিন সে প্রথমবার বুঝেছিল, কাউকে ভালোবাসা মানে সারাজীবন তার অপেক্ষায় থাকা নয়; কখনো কখনো ভালোবাসার সুন্দরতম পরিণতি হলো, মানুষটার ভালো চেয়ে নিজের পথে এগিয়ে যাওয়া।
সমাপ্ত। 🖤