Story

আমিয়াখুম ভ্রমণের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা

October 25, 2026

10 views

আমার জীবনের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়ংকর আর স্মৃতিতে জাগরূক  হয়ে থাকবে এবারের নাফাখুম - আমিয়াখুম ট্যুর।প্রায় মরতে মরতে  বেঁচে ফিরে এসেছি। আমি দীর্ঘদিন ট্যুর করি। এটা আমার প্যাশন। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের অনেক পপুলার দর্শনীয় স্থান আমার দেখা হয়েছে। অনেকদিন থেকেই আমার নাফাখুম আমিয়াখুম যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু যেহেতু এটা ট্রেকিং ট্যুর আর এক্সপেন্সিভ (অন্তত আমার কাছে)তাই ব্যাটে বলে মিলছিল না। কিন্তু এবারের ইদে সব কিছু মন মতো হয়ে যাওয়াতে বেরিয়ে পড়লাম নাফাখুম এর উদ্দেশ্যে। 


রাত ৮ টায় আমরা সায়েদাবাদ থেকে বান্দরবান এর বাসে একটা ট্যুর গ্রুপ এর সাথে উঠে পড়ি। সেখানে আরো কয়েকটা ট্যুর গ্রুপ ছিল। সব মিলে প্রায় ৩৫ জন।  বাস ছেড়ে দিল,তারপর রাতের ঠান্ডা হাওয়া উপভোগ করতে করতে পৌছে গেলাম চকোরিয়া। সেখান থেকে আরেকটা বাসে আলীকদম।  আলীকদম থেকে চান্দের গাড়ি করে থানচি। থানচি থেকে ট্রলারে করে 

পদ্মঝিরি।


থানচি থেকেই মূলত নো নেটওয়ার্ক এর আওতায় পড়ে। কোন নেট নেই এরপর আর।আর এখানেই আমাদের দুর্ভোগ এর সূচনা।কথা ছিল আমাদের রেমাক্রি পর্যন্ত ট্রলারে করে নিয়ে যাওয়া হবে। তারপর সেখান থেকে ৪-৫ ঘণ্টা  হেঁটে থুইসা পাড়ায় পৌঁছে যাব। কিন্তু বিধি বাম!! ট্রেকিং যেহেতু করতে এসেছি প্রকৃতি আমাদের ট্রেকিং এর আদ্যোপান্ত শিখিয়ে দিল। বলা হলো তেল সংকট এর কারণে ট্রলার আর সামনে যাবে না আমাদের এখান থেকেই ট্রেকিং শুরু করতে হবে।পদ্মঝিরি থেকে আমাদের ট্রেকিং এর শুরু হলো বেলা ১ টায়।


প্রথমে ভালোই লাগছিল ঝিরিপথ ধরে হাঁটছিলাম,পাহাড়ি দৃশ্য উপভোগ করতে করতে। লাঞ্চ করে নিলাম। তারপর আবার ঝিরি ধরে হাঁটা। আসল খেলা শুরু হলো বিকাল ৪ টার পর।একের পর এক পাহাড় চলে আসছিল সামনে। ওগুলো বেয়ে বেয়ে উপরে উঠি। সন্ধ্যা নেমে গেলে আমাদের বলা হলো দোকানে বসে কিছুক্ষণ রেস্ট নিতে।আর আধা ঘণ্টা হাঁটলেই আমরা থুনচি পাড়ায় পৌঁছে যাব। কিন্তু দেখা গেল আধা ঘণ্টার স্থানে ২ ঘন্টা পার হয়ে গেলেও পাড়ার দেখা মিলছে না। একে তো ক্লান্ত শরীর তার উপর উঁচু উঁচু খাড়া পাহাড়ের ঢাল। এর মধ্যে আবার রাত নেমে এসেছে। টর্চ জ্বালিয়ে সকলে হাটছিলাম। আমাদের গ্রুপে বেশ কয়েকজন লোক ছিল প্রায় পঞ্চাশোর্ধ। তারা আগে তেমন ট্যুর করেনি।এটা যে ট্রেকিং ট্যুর তারা এটাও জানতো না🤣 জাস্ট আমিয়াখুম এর ভিউ দেখে আর হুজুগে পড়ে চলে এসেছে। তাদের সবার অবস্থা খারাপ। হাঁটছে আর হোস্ট কে গালি দিচ্ছে। ইয়াং যারা তারা ও হতাশ। এরকম ট্যুর হবে কেউ প্রত্যাশাই করেনি। সবার শরীর টালমাটাল জাস্ট মনের জোরে হাঁটছে সবাই। পথ যেন শেষ ই হয় না। 


অন্ধকারে একবার পাহাড়ে উঠি আবার নেমে ঝিরিপথ দিয়ে হেঁটে আবার আরেকটা পাহাড়। আমার মনে হয় ৭-৮ টা পাহাড় অন্ধকারে আমরা অতিক্রম করেছিলাম। রাত প্রায় ১০:৩০ এ আমরা পাড়ায় পৌঁছে গেলাম।আমি লিটারেলি শুয়ে পড়লাম পাড়ার উঠানে। শরীরে আর এক বিন্দু শক্তি নেই। আধা ঘণ্টা এভাবে শুয়ে থাকার পর আমাদের জুমঘরে রুম ঠিক হলো।৫ জন মেয়ের জন্য একটা রুম যেখানে আবার রান্না ও হচ্ছে। ফ্লোরে চাটাই বিছিয়ে শোয়ার ব্যবস্থা। না খেয়েই শুয়ে পড়লাম। আমি ভেবেছিলাম আমিয়াখুম বোধ হয় আর যেতে পারবো না। শরীর এ এত ব্যথা ছিল। ১২ টা নাগাদ রাতের খাবার দিল। কোনরকম মুখে গুজে তারপর কিছু ঔষধ খেয়ে নিলাম। 


পরদিন সকালে ও শরীর খুব ব্যথা তবুও মনের জোরে বের হয়ে পড়লাম আমিয়াখুম এর উদ্দেশ্যে। আমাদের টিমের ৩৫ জনের মধ্যে আমিয়াখুম রওনা দিল মাত্র ১০ জন। তার মধ্যে আবার আমরা ২ জন মেয়ে।আঙ্কেল সমাজ বেশ ট্রল করলো আমাদের নিয়ে "দেখ, আমরা পারিনা আর বাচ্চা বাচ্চা মেয়ের কি সাহস!!


যাই হোক ২ ঘন্টা হাঁটার পর সেই কাঙ্ক্ষিত দেবতা পাহাড়। যা কিনা আমিয়াখুম যাওয়ার পথে সবচেয়ে ডেঞ্জারাস পাহাড়। কারণ এর উচ্চতা প্রায় ১৯০০ ফুট আর সবচেয়ে বড় কথা এটি প্রায় ৯০° খাড়া।দড়ি বেয়ে প্রাণ হাতে নিয়ে নামলাম।একটু এদিক সেদিক হলেই খাদে পড়ে আর কোন অস্তিত্ব থাকবে না। 


দেবতা পাহাড় থেকে নেমে ভেলাখুম তারপর আমার স্বপ্নের আমিয়াখুম চলে আসলাম। ২ দিন যা কষ্ট করেছিলাম, সব মুহূর্তেই পানি হয়ে গেল।

.......................এত্ত সুন্দর....................!!!! 

 আমিয়াখুম এ ছবি তুলে গোসল করে আবার দেবতা পাহাড়ের কাছে চলে আসলাম। আরেক এডভেঞ্চার।  কখনো হেঁটে, কখনো বসে,কখনো হামাগুড়ি দিয়ে তারপর চূড়ায় উঠলাম।।সেখান থেকে নেমে পাড়ায়। 


পরেরদিন আবার তল্পিতল্পা গুটিয়ে নাফাখুম যাত্রা।কথা ছিল সেখান থেকে রেমাক্রি গিয়ে তারপর বোটে করে থানচি, তারপর চান্দের গাড়ি, তারপর বাসে করে ঢাকা।নাফাখুম দেখে রেমাক্রি আসলাম। এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। রেমাক্রি আসার পর আর নৌকার দেখা নেই। সকাল থেকে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল। হোস্ট গেছে নৌকা আনতে। তার আসার খবর নেই। এদিকে নো নেটওয়ার্ক এর কারণে তার সাথে যোগাযোগ ও করা যাচ্ছে না। আমাদের প্যাকেজ এ লাঞ্চ আছে সেটা ও করানো হচ্ছে না। আমরা সবাই টুকটাক খেয়ে নিলাম।


হোস্ট আসলো প্রায় সন্ধ্যায়। এই রাতের বেলায় আমাদের সাঙ্গু নদী দিয়ে যেতে হবে।যেখানে সাঙ্গু নদী হচ্ছে পাহাড়ি নদী। চলতি পথে সব বড় বড় পাথর।দিনের আলোতেই ওখানে চলা যায় না। আর রাত। তবুও বুকে সাহস নিয়ে উঠে পড়লাম। গ্রীষ্মকাল হওয়া তে পানি কম। কিছুদূর গিয়ে সবাই নৌকা থেকে নেমে নৌকা ঠেলতে লাগলো।এক জায়গায় গিয়ে নৌকা আর চলেইনা, তারপর আমরা নেমে কিছুদূর পাড় ধরে হাটলাম। মাঝি নৌকা ঠেলে নিয়ে আসলো। তারপর নৌকায় উঠার সময় আমরা নদীর উপর দিয়ে হেঁটে ট্রলারে উঠতে হবে কারণ পানি কম।কিছুদূর গেলাম। মাঝ নদী তে গিয়ে দেখি তীব্র স্রোত। প্রায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। কোনমতে গাইড কে ধরে বাঁচলাম। এরপর নৌকা চলতে শুরু করল বড় বড় পাথরের মাঝখান দিয়ে। এক জায়গায় এসে প্রায় উল্টে গিয়েছিল। আল্লাহ বাঁচিয়ে দিলেন আবার। 


তিন্দু এসে পৌছালাম। মাথায় এখনো টেনশন এই রাতে কীভাবে থানচি যাব। পাহাড়ি উঁচু খাড়া পথ। অন্ধকারে চান্দের গাড়ি তো চলতে পারবে না। এক ঘন্টা ওয়েট করার পর হোস্ট বললো অনেক দেরি হয়ে গেছে। এ সময় চান্দের গাড়ি চলবে না।আর আমরা যে বাসে উঠব তা রাতে না গেলে আর যাওয়া যাবে না আমাদেরকে নিজের টাকায় তিন্দু তে থাকতে হবে তারপর নিজের টাকায় ঢাকা পৌছাতে হবে। ওরা লাঞ্চ এর পরিবর্তে সকালে নাশতা করাবে। এই কথা শুনে সবাই তো অবাক।  এত টাকা দিয়েছি, এত কষ্ট করে এই পর্যন্ত এসে এখন এই কথা তাছাড়া নো নেটওয়ার্ক এর কারণে কেউ চাইলে ও বিকাশ বা ব্যাংক থেকে টাকা উঠাতে পারবে না।তারপর সবাই মিলে বুঝিয়ে শুনিয়ে হোস্ট কে তিন্দু থাকার খরচ আর অন্যান্য খরচে রাজি করালো। 


সকাল হলে আমরা ট্রলারে করে থানচি, তারপর চান্দের গাড়ি করে চকোরিয়া আসলাম। এখানে এসে আরেক বিপদ। ইদের কারণে ঢাকাগামী কোন ডিরেক্ট বাস নেই। হোস্ট কিছুক্ষণ চেষ্টা করে তারপর আমাদেরকে বাস ভাড়া দিয়ে দিল। চকোরিয়া থেকে চট্টগ্রাম আসলাম। সেখান থেকে আবার বাসে করে ঢাকায় পৌছালাম ভোর ৫ টায়। তারপর স্বস্তির নি:শ্বাস ছাড়লাম।যত দিন বেঁচে থাকব এই ট্যুর এর কথা আমি কখনোই ভুলব না।


আর যারা আমিয়াখুম যাবেন ভালো করে খোঁজ খবর নিয়ে যাবেন।আর সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন।  ট্যুরিজম সেক্টর কে রক্ষা করতে আমাদের এক হতে হবে✊✊

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login