আমার কপালে একটা গভীর কাটা দাগ আছে। এটা আমার ভাই এর দেওয়া। আমি যখন খুব ছোট ছিলাম তখন আমার ভাই আমাকে কোলে নিতে গিয়ে ফেলে দেয় যার ফলে একটা গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে রক্তপাত হয়। কয়েকটা সেলাই পড়ে, নির্দিষ্ট সময় পর ঐ ক্ষত সেরে গেলে ও দাগ টা স্পষ্ট হয়ে আছে। আমার বোন এর গালে ও একটা দাগ আছে ভাই এর দেওয়া। ছোটবেলায় দুষ্টুমি করতে গিয়ে কেটে দিয়েছিল।
ও ছোটবেলা থেকেই অনেক মেধাবী ছিল। শহরের নামকরা স্কুলে চান্স পেয়েছিল।বাবা মা এর অনেক স্বপ্ন ছিল ওকে নিয়ে। বড় হবে। অনেক ভালো জব পাবে। আরো অনেক কিছু। সব স্বপ্ন হয়তো পূরণ হয় না।
আমার বই পড়া প্রথম শুরু হয় আমার ভাই এর হাত ধরে। ও অনেক গল্পের বই পড়তো। আমাকে ও পড়তে দিতো। চাচা চৌধুরী, ঠাকুরমার ঝুলি, গোপাল ভাড়। যে বয়সে বাচ্চারা কার্টুন দেখে সময় কাটাতো,আমরা তখন পড়তাম বই। যেকোন মানুষের জীবনে আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য একজন মানুষ লাগে। আমার জীবনের আলো এনে দিয়েছিল আমার ভাই।
৫ম শ্রেণী পাশ করে ৬ষ্ঠ শ্রেনী তে উঠার পর হঠাৎ করে একদিন খুব জ্বরে পড়লো। ডাক্তার দেখানো হলো, ঔষধ খাওয়ানো হলো। সেরে উঠলো। কিছুদিন পর আবার জ্বর। আবার ডাক্তার ঔষধ। ডাক্তার অনেক টেস্ট দিল। তারপর টেস্টের রিপোর্টে আসলো ব্লাড ক্যান্সার। লাস্ট স্টেজ। আমাদের পরিবার এর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। আমাদের সাজানো গোছানো পরিবার মুহূর্তেই ভেঙে তছনছ হয়ে গেল। ওকে বাঁচানোর জন্য আমার বাবা মা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলো। হায়াত না থাকলে আর কীভাবে বাঁচানো যাবে।
ডাক্তার বলে দিল ও আর এক মাস বাঁচবে।
ভয়ংকর দু:খে জর্জরিত হয়ে আমরা ভাই এর সেবা করতে লাগলাম। ও নিজে ও বুঝতে পেরে গিয়েছিল ও আর বাঁচবে না। তবুও হাসিমুখে কথা বলতো। মজা করতো আমাদের নিয়ে।
এক মাসের মাথায় ও মারা গেল। বাবা পুত্রশোকে পাগল প্রায়। মা বার বার বেহুশ হচ্ছেন। আমরা স্তব্ধ নির্বাক। ওই শোক কাটিয়ে উঠতে আমাদের অনেক সময় লেগেছিল। এখনো হঠাৎ করে ওর কথা মনে পড়লে বুক টা কেমন যেন হু হু করে উঠে।
ভাই নেই, কিন্তু ওর স্মৃতি আমার কপালে, বোনের গালে রয়ে গেছে। যতবার এই দাগ টা দেখি ততবার ই আমার ভাই এর কথা মনে পড়ে যায়। জানিনা ও কেমন আছে। যেখানেই থাকুক ভালো থাকুক এই কামনা।