পদ্মার বুক চিরে যখন ভোরের কুয়াশা সরে যেতে থাকে, তখন চরাঞ্চলের মাটির অদ্ভুত এক রূপ চোখে পড়ে। ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল ইউনিয়ন। পদ্মা নদীর ভাঙা-গড়ার খেলায় এই অঞ্চলের মানচিত্র প্রতি বছর নতুন করে আঁকা হয়। কখনো নদী গ্রাস করে সাজানো ফসলের খেত, বসতভিটা আর বাপ-দাদার কবর; আবার কখনো গর্ভ থেকে উগড়ে দেয় খাঁটি সোনার মতো উর্বর পলিমাটি। নদীর বানের জলের সাথে লড়াই করে টিকে থাকা এখানকার মানুষের নিয়তি। মাতুব্বর ডাঙ্গি গ্রামটিও তেমনি এক চিরন্তন যুদ্ধের সাক্ষী। গ্রামের বেশির ভাগ মানুষের জীবন বাঁধা জাল আর নৌকার সাথে। দিনভর খরস্রোতা পদ্মায় ইলিশ, বোয়াল আর পাঙাশের পেছনে ছুটে যাদের রাত কাটে তেলের কুপি জ্বালিয়ে, তারাই আবার শুকনো মৌসুমে চরের মাটিতে কোদাল চালায়। এই মাতুব্বর ডাঙ্গিরই এক ডানপিটে, সরল যুবক মতিন। বয়স চব্বিশ-পঁচিশের কোঠায়। শরীরটা যেন নদীর কালো জলের মতোই টানটান আর বলিষ্ঠ। বাপ মরে যাওয়ার পর বুড়ো মা আর একখানা ছোট ভিটে ছাড়া মতিনের সম্বল বলতে কিছু ছিল না। কিন্তু পদ্মার বুকে নাও ভাসিয়ে বৈঠা বাওয়ার সাহস আর কাঁধের পেশিতে মাটি কাটার যে জোর মতিনের ছিল, তা পুরো ডাঙ্গির লোক একবাক্যে স্বীকার করত।
মতিনের জীবনের একমাত্র শান্ত দিঘি ছিল কুলসুম। পাশের বাড়ির রহিম শেখের মেয়ে। ডাগর ডাগর চোখ, গায়ের রঙ চরের কাশবনের মতো নরম রোদে পোড়া উজ্জ্বল শ্যামলা। কুলসুম যখন কলসি কাঁখে পদ্মার ঘাটে জল আনতে যেত, তখন নদীর ঘূর্ণিও যেন ক্ষণিকের জন্য শান্ত হয়ে যেত। মতিন জাল শুকানোর নাম করে ঘাটের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
"ও মতি ভাই, রোদের মইদ্দে খাড়ায়া শরীরের চামড়া কালা করতেছো ক্যান? ঘরে কি কাম নাই?"
কুলসুমের এই এক চিলতে হাসিমাখা কথার জবাব মতিনের মুখে ফুটত না। সে শুধু ভেজা গামছাটা কাঁধে ফেলে লাজুক হেসে বলত, "নদীর পানি দেখতে আইছি কুলসুম। পানি না দেখলে রাইতে ঘুম ধরে না।"
"হু, নদীর পানি না আরও কিছু! কার্তিকে তো বিয়া, হেই ভাবনা ভাইবো। ঘরে এক ছটাক চাল থাকে না, নদীর পানি গুইন্যা পেট ভরবো?"
কুলসুম মুখ টিপে হেসে ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে উঠে যেত। আর মতিনের বুকের ভেতর বেজে উঠত হাজারটা ঢোলের বাদ্য। আগামী কার্তিক মাসেই তাদের বিয়ের দিন ধার্য হয়েছে। মতিনের মা রহিমা খাতুন বহু কষ্টে কিছু কাঁসা-পিতলের বাসন আর দুটো রুপার বালা জমিয়েছেন ছেলের বউয়ের জন্য। মতিনের স্বপ্ন খুব বড় ছিল না,ছোট একখানা টিনের চালা, ঘরে কুলসুমের হাতের গরম ভাতের থালা, আর পদ্মার বুকে নিজের একটা জাল-নৌকা। এইটুকু পেলেই তার জীবন স্বর্গ।
কিন্তু পদ্মার চরে স্বর্গ বেশিদিন টেকে না। কারণ, পদ্মার বুকে জেগে ওঠে নতুন মাটি। বর্ষার জল নামার পর নর্থচ্যানেলের দক্ষিণ সীমানায় জেগে উঠল এক সুবিশাল চর। শত শত একর পলিমাটির সেই নতুন ভূমি যেন কোনো ঘুমন্ত দৈত্যের মতো জেগে উঠেছে কুয়াশা ভেদ করে। সকালে সূর্যের আলো পড়তেই সেই ধূসর মাটি রুপোর মতো চকচক করে। চরের খবর বাতাসে ছড়াতে সময় লাগল না। আর চর মানেই মাটির লোভ, চর মানেই ক্ষমতার মহড়া, চর মানেই রক্তের দাগ।
মাতুব্বর ডাঙ্গির প্রধান ইরফান মাতুব্বর। চওড়া বুকের পাটা, চোখেমুখে চিল-শকুনের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। এককালে নিজেও লাঠি-সড়কি চালিয়ে বহু চরের দখল নিয়েছেন। এখন বয়স হয়েছে, কিন্তু চরের ওপর থেকে লোভ কমেনি। এই নতুন জেগে ওঠা "দক্ষিণের চর" তার চাই-ই চাই। কিন্তু বাধা একটাই,নদীর ওপারে চরভদ্রাসন সীমানার প্রভাবশালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের নজরও পড়েছে এই চরে। চেয়ারম্যানের বাহিনী ইতিমধ্যে ওপারে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সন্ধ্যা নামতেই ইরফান মাতুব্বরের কাঁচারি ঘরে হারিকেনের আলোয় গ্রামের জোয়ান মরদদের জমায়েত হলো। বাতাস থমথমে। মাটির দাওয়ায় বসে আছে মাতুব্বর ডাঙ্গির ত্রিশ-চল্লিশ জন যুবক ও প্রবীণ। সবার মুখ গম্ভীর। মাঝখানে রাখা তামাকের হুঁকো থেকে ভকভক করে ধোঁয়া উঠছে। মতিনও বসেছিল এক কোণে। তার মাথায় ঘুরছিল আগামী কার্তিকের বিয়ের খরচ, হাটে জাল বিক্রির হিসাব।
হঠাৎ ইরফান মাতুব্বর উঠে দাঁড়ালেন। গলার রগ ফুলিয়ে বজ্রকণ্ঠে বললেন, "শোনো ডাঙ্গির মানুষেরা! দক্ষিণের চর আমাগো বাপদাদার সীমানার মইদ্দে পড়ছে। ওই চরে একসময় আমাগো হালচাষ ছিল, নদী ভাইঙা নিয়া গেছিল। এহন পদ্মা আবার ফেরত দিছে। কিন্তু ওই ওপারের চেয়ারম্যানের শকুন চোখ পড়ছে আমাগো মাটির ওপর। তোমরাই কও, পরেরে কি নিজের ভিটা ছাইড়া দেওন যায়?"
ভিড়ের মধ্য থেকে বয়স্ক করিম মাঝি বলল, "কিন্তু মাতুব্বর, চেয়ারম্যানের তো বন্দুকধারী লোক আছে। কাইজ্জা বাধলে তো রক্তারক্তি হইবো। পুলিস-প্রশাসনও তো চেয়ারম্যানের পকেটে।"
"থাম ব্যাটা করিম!" মাতুব্বর ধমকে উঠলেন, "মাটি কি বিনে রক্তে পাওয়া যায়? পদ্মার পারের মানুষ রক্তে ডরায় না। যে চর দখল করব, মাটি তারই হইব। আমাগো বাঁশের লাঠি আর শলার সড়কের সামনে চেয়ারম্যানের গুন্ডারা টিকতে পারব না।"
মাতুব্বরের চোখ তখন ঘুরতে ঘুরতে কোণে বসে থাকা মতিনের ওপর গিয়ে স্থির হলো। সভা শেষে সবাই যখন ধীরে ধীরে বের হয়ে যাচ্ছে, মাতুব্বর মতিনের কাঁধে শক্ত এক থাবা বসালেন।
"মতি, একটু খাড়ো। কথা আছে।"
মতিন দাঁড়িয়ে পড়ল, "কইন মাতুব্বর কাকা।"
মাতুব্বর দরজার ঝাঁপটা টেনে দিয়ে মতিনের একদম মুখের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন, "শোন মতি, ডাঙ্গির মইদ্দে তোর মতো তাগড়া জোয়ান আর সাহসী পোলা দ্বিতীয়টা নাই। গাঙের ঢেউয়ের সাথে লড়াই কইরা তুই মাছ ধরস। এই কাইজ্জায় ডাঙ্গির দলের নেতৃত্ব তোরে দিতে হইব। তোরে আমি দলের আগায় দেখতে চাই।" মতিনের বুকটা কেঁপে উঠল। সে আমতা আমতা করে বলল, "মাতুব্বর কাকা, আমি তো কোনোদিন লাঠিয়াল দলের সাথে যাই নাই। জাল বাই, নাও চালাই, মাছ ধরি। কাইজ্জা-ফ্যাসাদ আমি ভালো পারি না। আর সামনে কার্তিক মাসে আমার বিয়া... মা একলা ঘরে..."
মাতুব্বরের মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠল এক তীব্র উপহাস, "আরে মরদ পোলারা কাইজ্জা করতে ডরায় নাকি? কাপুরুষের মতো কথা কস ক্যান? শোন মতি, এমনি এমনি তোরে কইতাছি না। যদি রোববারে চরের দখল তুই আমাগো হাতে তুইল্যা দিতে পারস, তবে ওই নতুন চরের সবচেয়ে উর্বর দুই বিঘা জমি তোর নামে লেইখ্যা দিমু। চিন্তা কইরা দেখ,দুই বিঘা জমি! আর কোনোদিন নদীতে জাল বাইতে হইব না। বউ নিয়া সুখে খাবি, পোলাপান মানুষ করবি। আর না গেলে মনে রাখিস, এই ডাঙ্গিতে কিন্তু বাপ-দাদার ভিটায় মাথা গুঁইজ্যা থাকা কঠিন হইয়া যাইব।"
লোভ আর ভয়,দুটো বিষাক্ত সাপের মতো মতিনের বুকের ভেতর ছোবল মারল। দুই বিঘা জমি! নর্থচ্যানেলের পলি পড়া জমিতে একবার বীজ বুনলে সোনার ফসল ফলে। কোনোদিন আর কুলসুমকে অভাব দেখতে হবে না। অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটবে না। কিন্তু পরক্ষণেই চোখের সামনে ভেসে উঠল কাইজ্জার রক্তাক্ত রূপ,ধারালো ফলার সড়কি, রামদা আর আর্তনাদ। মতিন কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু পাথরের মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
মাতুব্বর তার নীরবতাকে সম্মতি ধরে নিয়ে পিঠ চাপড়ে বললেন, "সাবাশ! আগামী রোববার ভোরে ফজরের আযানের লগে লগে নাও ছাড়ব। গাঙ পার হইয়া চরে উঠমু। ঢাল-সড়কি সব আমার ঘরে রেডি আছে।"
রাতের নিস্তব্ধতায় মতিনের ঘুম এল না। কাশবনের মধ্য দিয়ে বয়ে আসা হিমেল হাওয়া টিনের বেড়ার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকছিল। বিছানায় শুয়ে মতিন শুধু শুনতে পাচ্ছিল পদ্মার অবিরাম কলকল শব্দ। নদী যেন ডাকছে, সতর্ক করছে। শনিবার দুপুরে কুলসুম নদীর ঘাটে এল একা। মতিন তখন নৌকার গলুইতে বসে আনমনে জালের ছেঁড়া সুতো জোড়া দিচ্ছিল। কুলসুমের পায়ের শব্দে সে চমকে তাকাল। মেয়েটার মুখের রঙ ফ্যাকাশে, চোখের কোণে জল শুকিয়ে দাগ পড়ে গেছে।
"মতি ভাই।"
"কুলসুম? এই ভরদুপুরে এইহানে আইছ ক্যান? কেউ দেইখ্যা ফালাইব।"
কুলসুম ঘাটের কিনারায় এসে দাঁড়াল। তার বুকটা ঘন ঘন ওঠানামা করছিল। "ডাঙ্গির মানুষের মুখে মুখে কথা রটছে মতি ভাই। তুমি নাকি কাইল ভোরে কাইজ্জায় যাইতাছো? চরে যাইবা লাঠি লইয়া?"
মতিন দৃষ্টি নামিয়ে নিল। ভেজা কাঠখণ্ড দিয়ে নৌকার তক্তায় আঁচড় কাটতে কাটতে বলল, "মাতুব্বর কইছে কুলসুম। না গেলে গাঁওয়ে থাকতে দিব না। আর যদি চর দখল করবার পারি, মাতুব্বর আমারে দুই বিঘা জমি দিব। দুই বিঘা জমিন হইলে আমাগো আর অভাব থাকব না রে কুলসুম। আমরা সুখে থাকমু।"
কুলসুমের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ল কাদার ওপর। সে খপ করে মতিনের শক্ত হাত দুটো চেপে ধরল। চরাঞ্চলের শক্ত মেয়েটার গলা কান্নায় ভেঙে পড়ল, "আমার জমি লাগব না মতি ভাই! আমি শাকপাতা সিদ্ধ খাইয়া তোমারে নিয়া এই ভাঙা ঘরে থাকমু। তুমি যাইও না। আমার মনডা কাইল রাত থেইকা খালি কু গাইতাছে। বুকটা ধড়ফড় করতাছে। তুমি কাইজ্জায় যাইও না!"
"কুলসুম, ডাঙ্গির মান-ইজ্জতের সওয়াল। আমি পিছু হটলে গাঁয়ের লোকে কাপুরুষ কইব। মাতুব্বরের বিরাগভাজন হইলে ভিটামাটি ছাড়া করব। আমারে যাইতে হইব কুলসুম। তুমি দোয়া কইরো।"
"কিসের মান-ইজ্জত? মাতুব্বরদের মান-ইজ্জত তো গরিবের রক্ত দিয়া কেনা হয় মতি ভাই!" কুলসুমের গলার স্বর এবার তীব্র হয়ে উঠল, "চরের মাটি তো মাতুব্বররা ভোগ করব, আর মরবা তোমরা। আল্লার দোহাই লাগে মতি ভাই, তুমি যাইও না। তুমি না ফিরলে আমি কার মুখ চাইয়া বাঁচুম?"
মতিন কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে ধীরে ধীরে কুলসুমের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। পুরুষের অহংকার, মাতুব্বরের হুমকি আর দুই বিঘা জমির মায়াবী হাতছানি তাকে অন্ধ করে দিয়েছিল। নদীর বাতাস তখন যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে চরের কাশবন কাঁপিয়ে চলে গেল।
রোববার। ভোরের কুয়াশায় চরাঞ্চল তখনো আবছা। পুবের আকাশে রক্তিম আভা ফুটে ওঠার আগেই মাতুব্বর ডাঙ্গির ঘাটে এসে ভিড়ল চারখানা বড় গয়না নৌকা। ঘাটজুড়ে থমথমে উত্তেজনা। পঞ্চাশ-ষাটজন তাগড়া যুবক ও প্রৌঢ় জড়ো হয়েছে। সবার হাতে চকচক করছে দেশীয় অস্ত্রের বহর,লোহার বল্লম, খাঁজকাটা সড়কি, বাঁশের ধারালো লাঠি আর বাঁকা রামদা। বুকের ওপর শক্ত বেতের তৈরি ঢাল বাঁধা, যা প্রতিপক্ষের ফলার আঘাত ঠেকানোর বর্ম। শরীরে সরিষার তেল মেখে নেমেছে অনেকে, যাতে ধস্তাধস্তির সময় পিছলে বের হয়ে যাওয়া যায়।
ইরফান মাতুব্বর ঘাটে দাঁড়িয়ে তদারকি করছেন। তার হাতে একটা রুপো বাঁধানো লাঠি।
"শোনো সবাই! দক্ষিণের চরের মাথায় লাল নিশান পুততে হইব। চেয়ারম্যানের কুত্তারা যদি আগায় আসে, একটাকেও জ্যান্ত ফেরত যাইতে দিবা না। মতি, এই নে তোর ঢাল আর সড়কি!"
মতিনের হাতে তুলে দেওয়া হলো তিন হাত লম্বা একটি চকচকে লোহার সড়কি আর শক্ত বেতের ঢাল। হাতের মুঠোয় লোহার শীতল স্পর্শ লাগতেই মতিনের মেরুদণ্ড বেয়ে এক অদ্ভুত শীতল স্রোত বয়ে গেল। তার মনে পড়ল, এই হাতে সে মাছ ধরেছে, জাল বুনেছে, পরম মমতায় চারা রোপণ করেছে। আজ সেই হাতে মানুষের বুক বিদীর্ণ করার অস্ত্র। নৌকা ছাড়ার মুহূর্তে ঘাটের একপাশে ঝাউগাছের আড়ালে একটি ছায়া নড়ে উঠল। মতিন চোখ তুলে তাকাল। চাদর মুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কুলসুম। কুয়াশায় তার মুখ স্পষ্ট নয়, কিন্তু মতিন অনুভব করতে পারল,সেখান থেকে একজোড়া চোখ অন্ধের মতো চেয়ে আছে। সেই চাহনিতে কোনো অভিযোগ নেই, আছে এক অচেন সমুদ্রের সমান হাহাকার।
মতিন মুখ ফিরিয়ে নিল। সে আর তাকাতে পারল না।
"জয় মাতুব্বর ডাঙ্গি! আল্লাহু আকবার!"
গগনবিদারী চিৎকারে নিস্তব্ধ ভোরের শান্তি খানখান হয়ে গেল। দাঁড়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দে চারটি নৌকা পদ্মার বুক চিরে এগিয়ে চলল দক্ষিণের চরের দিকে। নদীর জল তখন রক্তিম আকাশের ছায়ায় লাল হয়ে উঠেছে, যেন নদী নিজেই জানান দিচ্ছে সামনে কী অপেক্ষা করছে। দক্ষিণের চর তখনো নিঝুম। পলিমাটির ওপর সকালের নরম রোদ পড়েছে। চরের বালিতে ফুটে আছে ঘাস আর বুনো কাশফুলের ঝাড়।
নৌকা থেকে একযোগে লাফিয়ে পড়ল মাতুব্বর ডাঙ্গির লাঠিয়াল বাহিনী। মতিন দলের একেবারে সামনে। তার বুটজুতো নেই, খালি পায়ে পলিমাটির ঠান্ডা স্পর্শ লাগতেই শরীরটা কেমন যেন শিউরে উঠল। তারা দ্রুত চরের উঁচু ঢিবির দিকে এগোতে লাগল লাল নিশান ওড়ানোর জন্য।
কিন্তু চেয়ারম্যানের বাহিনীও বসে ছিল না। চরের অপর প্রান্তে আগে থেকেই ওঁৎ পেতে ছিল তারা। হঠাৎ কাশবনের ভেতর থেকে ভেসে এল রণহুঙ্কার,"মাররে মার! ডাঙ্গির পোলাগো একখানাও যেন ফিরা না যায়!"
মুহূর্তের মধ্যে কাশবনের আড়াল থেকে বের হয়ে এল প্রায় শ-খানেক লোক। তাদের হাতে শুধুই দেশীয় অস্ত্র নয়, রোদে চকচক করে উঠল বন্দুকের নল। পাইপগান আর একনলা বন্দুক নিয়ে চেয়ারম্যানের ভাড়াটে ক্যাডাররা চরের ঢালু বেয়ে ছুটে আসতে লাগল।
ইরফান মাতুব্বর পেছন থেকে চিৎকার করে উঠলেন, "ডরাইস না মতি! আগাইয়া যা! কাইজ্জা থেইকা পালাইলে পিছন দিয়া সড়কি মারুম!" মতিনের ভেতর তখন এক আদিম উন্মাদনা ভর করল। সামনে মৃত্যু, পেছনে অপমান। বাঁচার একমাত্র উপায় এখন লড়াই। সে ঢাল উঁচিয়ে ধরে গলার সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল, "ধর রে ধর!"
শুরু হয়ে গেল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা সেই নারকীয় কাইজ্জা। মাটির দখল নেওয়ার এই লড়াই কোনো নিয়মনীতি মানে না। মুহূর্তের মধ্যে চর পরিণত হলো এক জীবন্ত কসাইখানায়। বাঁশের লাঠির সশব্দ আঘাত, ঢালে ঢালে ঠোকাঠুকির ধাতব শব্দ, আর মানুষের পৈশাচিক চিৎকারে চরের আকাশ বাতাস কেঁপে উঠল। মতিনের সামনে এসে পড়ল এক বিশালদেহী লাঠিয়াল। লোকটা রামদা উঁচিয়ে কোপ বসাতে চাইল মতিনের ঘাড়ে। মতিন দ্রুত বাঁ হাতের ঢাল তুলে কোপটা প্রতিহত করল। ধাতব শব্দে তার হাত অবশ হয়ে আসার উপক্রম হলো। পরক্ষণেই সহজাত ক্ষিপ্রতায় ডান হাতের সড়কিটা চালিয়ে দিল লোকটার পেটে। তীক্ষ্ণ ফলাটা চামড়া ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যেতেই লোকটা এক অমানুষিক আর্তনাদ করে বালির ওপর লুটিয়ে পড়ল। ছিটকে আসা গরম রক্তে মতিনের মুখ আর বুক ভিজে গেল।
নিজের শরীরে অন্যের রক্ত লাগতেই মতিনের মাথা ঘুরে উঠল। সে থমকে গেল। এই কি সে চেয়েছিল? এই কি সেই দুই বিঘা জমির দাম?
কিন্তু ভাবার সময় ছিল না। ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এল তীব্র গুলির শব্দ,*ঠাঁই! ঠাঁই!*
চেয়ারম্যানের বন্দুকধারীরা গুলি ছুড়তে শুরু করেছে। মাতুব্বরের লোকেরা কোনোদিন বুলেটের মুখোমুখি হয়নি। লাঠি আর সড়কি দিয়ে তো আর সীসার গুলি ঠেকানো যায় না। চোখের পলকে ডাঙ্গির দুজন মানুষ বুকে গুলি খেয়ে বালির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ল।
"পালাও! বন্দুক চালাইছে! জান বাঁচাও!"
মাতুব্বর ডাঙ্গির ব্যুহ ভেঙে পড়ল। যে যার মতো চরের বালির ওপর দিয়ে নৌকার দিকে দৌড়াতে লাগল। স্বয়ং ইরফান মাতুব্বর সবার আগে দৌড়ে নৌকায় গিয়ে উঠলেন।
কিন্তু মতিন তখন দাঁড়িয়ে ছিল পেছনে পড়া আহত এক কিশোরকে টেনে তুলতে। ছেলেটি তাদের গ্রামেরই ছমিরুদ্দিনের ছেলে। পায়ে বল্লমের খোঁচা খেয়ে পড়ে গেছে।
"মতি ভাই, আমারে ফালাইয়া যাইও না, ওরা আমারে মাইরা ফেলব!" ছেলেটা কাঁদছিল।
মতিন এক হাতে ঢাল ফেলে দিয়ে ছেলেটাকে কাঁধে তুলে নিল। নৌকার দিকে দৌড়াতে শুরু করল সে। কিন্তু অতিরিক্ত ওজনে তার পা নরম বালিতে দেবে যাচ্ছিল।
পেছন থেকে ছুটে আসছিল চেয়ারম্যানের প্রধান ঘাতক রমিজ শিকদার। তার হাতে তিন হাত লম্বা এক চকচকে বল্লম। দূর থেকেই মতিনকে নিশানা করল সে।
"ওই যে মাতুব্বরের প্রধান মোড়ল যায়! ধর ওরে!"
মতিন নৌকার একদম কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। আর মাত্র কয়েক হাত। সে আহত ছেলেটাকে নৌকার গলুইয়ের ওপর তুলে দিল। মাঝিরা তখন আতঙ্কে নৌকা ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম করছে।
"মতি, লাফ দে! জলদি ওঠ!" নৌকার ভেতর থেকে কেউ একজন চিৎকার করল।
মতিন নৌকার তক্তাটা ধরতে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে,বাতাস চিরে এক তীব্র শনশন শব্দ হলো।
এক অবিশ্বাস্য যন্ত্রণায় মতিনের সমস্ত শরীর অবশ হয়ে এল। রমিজ শিকদারের নিক্ষিপ্ত বল্লমের ফলাটা মতিনের পিঠের বাঁ দিক দিয়ে ঢুকে বুকের ছাতি ফুঁড়ে বের হয়ে গেছে। মতিন স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হাত থেকে খসে পড়ল পদ্মার ভিজে মাটি।চোখের সামনে হঠাৎ সব অন্ধকার হয়ে এল। নদীর নীল জল, সোনালী চর, ভোরের আকাশ,সব যেন এক নিমেষে কালো হয়ে গেল। কোনো চিৎকার তার গলা দিয়ে বেরোল না, কেবল একদলা তাজা ফেনা ওঠা রক্ত মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল চরের বালিতে।
মতিন ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সেই পলিমাটিতে,যে মাটির লোভে সে এসেছিল, যে মাটি তাকে দুই বিঘার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। নৌকাগুলো তখন তাকে ফেলে রেখে দূর পদ্মায় পালিয়ে যাচ্ছে। মতিন মুখ থুবড়ে পড়ে রইল চরের বালির ওপর। তার রক্তাক্ত হাতটা প্রসারিত হয়ে রইল সেই মাটির দিকে, যে মাটির এক কণাও তার হলো না। তার কানের কাছে তখন শুধু বাজছিল এক চেনা কণ্ঠের কান্না,*"আমার জমি লাগব না মতি ভাই... তুমি না ফিরলে আমি কার মুখ চাইয়া বাঁচুম?"*
পরের দিন বিকেলে পদ্মার পারের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল কান্নায়। পুলিশ এসে চরের দখল নিয়েছে। সরকারিভাবে চর সিলগালা করা হয়েছে। চেয়ারম্যান কিংবা ইরফান মাতুব্বর,কাউকেই পুলিশ ছোঁয়নি। তারা থানার ওসির সাথে বসে চা খাচ্ছে আর সমঝোতার খসড়া তৈরি করছে। শুধু ডাঙ্গির ঘাটে এসে ভিড়েছে পুলিশের একখানা ট্রলার। ট্রলারের পাটাতনে সাদা পলিথিনে মোড়া একটা নিথর দেহ।
গ্রামের শত শত মানুষ ভিড় করেছে ঘাটে। কিন্তু কারও মুখে কোনো কথা নেই। চরাঞ্চলের মানুষের চোখের জলও যেন নদীর নোনা জলে শুকিয়ে গেছে। মতিনের বুড়ো মা ঘাটের মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে বুক চাপড়াচ্ছেন, "ওরে আমার বাজানরে! কার লাইগ্যা জমিন আনতে গেলিরে বাপ? আমার বুক খালি কইরা তুই কোন চরে ঘুমাইলি রে..."
ভিড়ের এক কোণে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল কুলসুম। তার মাথায় ঘোমটা নেই, পরনের শাড়ির আঁচল ধুলোয় লুটোপুটি খাচ্ছে। মেয়েটার চোখ দুটো শুকনো, কিন্তু সেই চোখের দৃষ্টি দেখলে যে কারও বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠবে। সে কোনো চিৎকার করল না, কাঁদল না। শুধু ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল সেই নিথর দেহের পাশে। পলিথিনের মুখটা সামান্য খোলা। মতিনের শান্ত মুখটা দেখা যাচ্ছে। সেই চেনা কপাল, রোদে পোড়া নাক, আর বন্ধ চোখের পাতা। কুলসুম ঝুঁকে বসল। কাঁপাকাঁপা হাতে ছুঁয়ে দিল মতিনের ঠান্ডা কপাল। তারপর পরম মমতায় মতিনের রক্তাক্ত আঙুলগুলো নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল।
"তুমি তো কথা রাখলা না মতি ভাই," কুলসুম ফিসফিস করে বলল, তার কণ্ঠস্বর শুধু মৃত মতিনই যেন শুনতে পেল, "দুই বিঘা জমি দিয়া আমি কী করুম? কার লাইগ্যা কার্তিক মাসে আলতা পরুম? ঘর তো ভাঙলই, আমার পরাণডাও ভাইঙা দিয়া গেলা..."
কুলসুমের এই নিঃশব্দ কান্নার কোনো সান্ত্বনা কারও জানা ছিল না। নদীর ওপার থেকে তখন ভেসে আসছে শালিকের ডাক। পদ্মা বয়ে চলেছে তার আপন খেয়ালে। এই নদী কত ঘর ভাঙে, কত নতুন চরের জন্ম দেয়। আর সেই চরের পলিমাটিতে মিশে থাকে মতিনের মতো হাজারো নিঃস্ব, হতভাগা যুবকের রক্ত। মাতুব্বরদের ক্ষমতার লড়াই থামে না। চেয়ারম্যানদের সম্পদের ক্ষুধা মেটে না। কিছুদিন পর এই দক্ষিণের চর হয়তো আবার অন্য কোনো নামে জেগে উঠবে, অন্য কোনো মাতুব্বর নতুন কোনো মতিনকে ডেকে বলবে,"শোন, তুই এই কাইজ্জার লিড দিবি, তোরে দুই বিঘা জমি দিমু।"
আর কোনো এক হতভাগিনী কুলসুম নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে একা একা কাঁদবে। তবুও যুগ যুগ ধরে পদ্মার কূলে এই কাইজ্জার খেলা শেষ হয় না। মাটি মানুষের রক্ত চায়, আর ক্ষমতাবানরা সেই রক্তে নিজেদের সিংহাসন রাঙায়। দক্ষিণের চরে তখন সন্ধ্যা নামছে। রক্তিম আকাশের নিচে পড়ে থাকা নতুন পলিমাটি ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে, যেন এক আদিম গোরস্থান,যেখানে স্বপ্নেরা জন্ম নেওয়ার আগেই চরের মাটিতে জীবন্ত সমাধিস্থ হয়ে যায়।